Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
এক্স টু দি পাওয়ার জিরো
এক্স টু দি পাওয়ার জিরো

শান্ত নদীটির পটে আঁকা ছবিটি। ছোট শিশু যেন কবির শব্দকল্পে চিত্রিত নদী। বর্ষার অস্থিরমতি নদী কখন যে শীতে জমাট কুয়াশা মলিন দুর্বোধ্য রূপ ধারন করবে কেউ জানেনা। প্রতি মুহূর্তের ঘটনায় সে এঁকে দিচ্ছে মায়ের নিটোল কপালে ভ্রুকুঞ্চন। কোন সাধনে একে নির্দিষ্ট স্থির ধারায় বাঁধা যাবে সেই চিন্তায় ব্যাকুল মা। অনেক দোলাচলের পর মা রণিতা বুঝতে পারে রঙ্গনের জন্য বিশেষ স্কুলের প্রয়োজন। অথচ মুখফুটে স্বামী অনিলকে সে কিছু বলতে পারেনা।

উভয়ের চাকরির কারণে ওরা আদি নিবাস ছেড়ে এসেছে। রঙ্গনের জন্মের পরের দেড়-দু-বছর অবধি রণিতা আয়া মাসির কাছে বাচ্চাকে রেখে কাজে যেত। রঙ্গনের মানসিক জগতের অসম বিকাশে রণিতা দিন দিন আনমনা হয়ে পড়ছে। পুরুষ মানুষ নিজের ঘোরে থাকে। অনিলের ধারণা রণিতা একটু বেশি ভাবছে। রঙ্গন একদিন বেখেয়ালে খাট থেকে নামতে গিয়ে হাতে চোট পায়। হাড়ের ডাক্তার রঙ্গনকে হাতে ক্রেপ লাগিয়ে দেন। অনিলকে আলাদা ডেকে ডাক্তার আরও একটি কথা বলেন যা অনিল চেপে যায়। রণিতা অনিলকে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করে উত্তর পায় না। রণিতার সন্দেহ হয়, সে অনিলকে না জানিয়ে ডাক্তারের সাথে দেখা করে। সব শোনার পর সে শ্বশুর শাশুড়ির সাহায্য নেওয়ার কথা ভাবে। দেরি না করে সে ছেলেকে নিয়ে হাজির হয় শ্বশুরঘর। অনিলের বাবা মনযোগ দিয়ে সব শোনে। মা সরাসরি বৌমাকে বলেন, "দাদু ভাইয়ের যদি শারীরিক অসুবিধে থাকে তা আমার ছেলের কারনে নয়।" শ্বাশুড়ির কথায় ঝাঁঝে রণিতা কতটা অসন্তুষ্ট বোঝা গেল না। দাদুর কোলে চুপটি করে বসে থাকা রঙ্গন বাঁধাল বিভ্রাট। ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে সে মাকে আঙুল দিয়ে কিছু ইঙ্গিত করে। রণিতা ঘড়ির দিকে তাকায়। ঘড়িতে চারটে বেজে গেছে। রণিতার ওঠার নামগন্ধ নেই। বিচিত্র ভঙ্গিমায় হঠাত হাত-পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে রঙ্গন। দুর্বোধ্য ভাঙা উচ্চারণে বলা, "ঘ ঘ ঘ র যা যা", কথাগুলো দাদুর নজর এড়ায় না। সে নাতি কে জড়িয়ে ধরে বলে, মাত্র আড়াই বছর বয়সে দাদুভাই তুমি ঘড়ি দেখতে পারো! রঙ্গন দাদুর দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকায়। রণিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

আজ শনিবার অনিলের ছুটি রণিতাও রান্নাঘরের কাজে ব্যস্ত। অনিল কাগজের খবরে মগ্ন। হঠাৎ অনিলের ফোন বেজে ওঠে। রঙ্গন খাটে ঘুমাচ্ছে, ঘুম ভাঙলেই অশান্তি। তড়িঘড়ি অনিল ফোন তুলে দেখে বাবার নম্বর। অবাক হয় অনিল, বাবা এমারজেন্সি না হলে বড় একটা ফোন করে না। ভীত সন্ত্রস্ত অনিল মায়ের খবর জিজ্ঞেস করে। মা ভালো আছে শুনে নিশ্চিন্ত হয় সে। ওপাশ থেকে ভেসে আসা কথার নির্বাক শ্রোতা অনিল। বাবা ফোন রেখে দিলে ক্রোধে উন্মাদ হয়ে খবরের কাগজ তালগোল পাকিয়ে ছুঁড়ে মারে। কাগজের মন্ড আছড়ে পড়ে রঙ্গনের মুখে। আর কি বাঁশ হয় রণিতার, সে ভেবেছিল রঙ্গন ঘুম থেকে ওঠার আগে বাড়ির সমস্ত কাজ শেষ করে ফেলবে। রণিতা জানতে চায়, বাবা কি এমন বলল যাতে তুমি এমন রিয়াক্ট করলে। অনিল চেপে যায়। কারণ বাবা জানিয়েছে তার নিজের প্রপিতামহর এই রোগ ছিল। তিনি কথা বলতে পারতেন না অথচ তার ভাস্কর্য আজ দেশের বেশ কয়েকটি সংগ্রহশালায় রাখা আছে।

রঙ্গনের ভবিষ্যৎ নিয়ে বলা কথার তাপ উত্তাপে ওদের ভালোবাসার সম্পর্ক বর্তমানে ম্যড়মেড়ে হওয়ার উপক্রম। এই ঘটনার পর অনিল ব্যবহারে বদল এনেছে, এখন একটু বেশিই সময় দিচ্ছে সে। কিছুদিন ধরে ওদের শারীরিক সম্পর্কেও ভাটার টান ছিল। আস্তে আস্তে আগল খুলছে, দিন আবার আগের সরল পথে ছুটছে। উপোষী অনিল যেন ক্ষ্যাপা ষাঁড়, কোন আড়াল রাখতে চাইছে না। এমনকি জোর করে, অনিল রঙ্গনের সামনেই মিলিত হতে বাধ্য করছে রণিতাকে। লজ্জায় রণিতার শরীর প্রথম দিকে সাথ দিত না। পরে মন ছাড়াই শরীরের নিয়মে শরীর মেতে উঠত। এখন আর এই ঘটনায় নতুনত্ত্ব নেই। রণিতা মন থেকে স্বাভাবিক বলে স্বীকার করে নিয়েছে। রঙ্গনের অলীক ভাবনায় কী ছিল বলা মুসকিল। বাপ-মায়ের ঘনিষ্ঠতা দেখলে কিছুদিন আগে সে বাপের জামা, চুল ধরে টান দিত। মায়ের পরিতৃপ্ত মুখমণ্ডলের অচেনা অনুভবে, রঙ্গনের প্রতিক্রিয়া হল, বিচিত্র স্বরে দু'পা ছোঁড়া । দিনরাত কর্মব্যস্ততায় ছুটতে থাকে। অফিস, অসুস্থ পুত্র, স্বামীর ভালোবাসার অত্যাচার সামলে অসম্ভবের লড়াইয়ে সামিল রণিতা। অনিল রঙ্গনের সঙ্গে স্বাভাবিক হয়েছে এই বোধ তার মনবল বাড়িয়েছে। রণিতা বুঝতে পারে তার শশুরবাড়ি যাওয়ার উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে।

রঙ্গন স্পেশাল চাইল্ডদের স্কুলে যাবে ঠিক হয়। অনিল কি ছুঁচো গিলল, ঠিক বোঝা যায় নি। অন্তত তিনটে দিনের আংশিক দায়িত্বভার তার ঘাড়ে চাপবে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ে ছেলেকে নিয়ে প্রথম দিন স্কুলের চৌকাঠ পেরিয়ে নতুন ভুবনে পা রাখে। বাচ্চারা সেখানে গুনতিতে কম নয়। বয়স ওদের তিন থেকে পনেরো। কেউ চুপটি করে বসে আছে, কেউ আঙুলে কিলবিল কেটে মনের কথা নিজেকে বোঝাতে চাইছে। বিরাট একটা একোয়ারিয়াম রাখা আছে ঘরে। প্রকৃতির হাজারো রঙের পোঁচ গায়ে মেখে ছোটবড় মাছের দল সাঁতার কাটছে। একটা হলুদ রঙা মাছ ক্রমাগত জল কেটে চলেছে। সাজানো আগাছার জটলায় ভুড়ভুড়ি কাটছে পাম্প। একটা মাছ সেখানে মাথা কুটে মরছে। একটি শিশু গায়ের হাফহাতা হলুদ গেঞ্জির কিছুটা গলা দিয়ে বার করে আঙুলে টেনে ফুলহাতা বানিয়ে হলদে মাছের পাখনা বানিয়ে নাড়াচ্ছে। অকোয়ারিয়ামের দৈর্ঘ্য ধরে তার মাছ সদৃশ ভেসে চলার অনুভবে আবিষ্ট হয় রণিতা। হলুদ মাছটি কাঁচের দেওয়ালের কাছে এলেই শিশুটি নাক দিয়ে ছুঁতে চাইছে তাকে। নিজের ছেলের কথা ভুলে রণিতা হাঁ করে চেয়ে আছে বাচ্চাটির দিকে। বেখেয়ালে দুফোঁটা জল নেমে এসেছে তার ঠোঁটে। চোখের জলের নোনতা স্বাদে রণিতা দ্রুত সামলায় নিজেকে। এইরকম ভজোকট পরিবেশে অনিল মানানসই নয়। সে দরজা টেনে বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলে যায় রঙ্গনের সময় এলে যেন তাকে ডাকা হয়। হঠাৎ পিছনে একটি মেয়ের চিল চিৎকারে রণিতা ফিরে তাকায়। রঙ্গন নিজের মধ্যে ডুবে আছে। মা তাকে বসিয়ে মেয়েটির কাছে গেছে। সেই সুযোগে রঙ্গন আকোয়ারিয়মের কাছে পৌঁছে যায়। অসামান্য একটি ছবি খাতায় এঁকেছে মেয়েটি — কেঁচো রাখার ফিলটার মিডিয়ায় মাছের ঠোক্কর মারার ছবি। ওদিকে দুহাত নাড়িয়ে মা কে ডাকছে রঙ্গন। মেয়েটির মায়ের কাছ থেকে খাতাটা নিয়ে রণিতা রঙ্গনকে ডাকে। রঙ্গন না এসে কাঁদতে থাকলে রণিতা বাধ্য হয় ছেলের কাছে যেতে। আঙুল দিয়ে নিজস্ব কায়দায় মাকে রঙ্গন জানায়, মোট উনষাটটি মাছ আছে। দূর থেকে স্কুল কো-অর্ডিনেটর ব্যাপারটা লক্ষ্য করেন। এগিয়ে এসে রঙ্গনের পিঠ চাপড়ে তিনি রণিতাকে বলেন, ভরসা করে লড়ে যান। ও ঠিক বলেছে জল পাল্টাবার সময় গোনা হয়েছিল। মাছের সংখ্যা উনষাট।

বাপ-মায়ের ইন্টারভিউয়ের সময় রেক্টর বলেন, বিশ্বাস ও সাধনার বলে এই স্কুল সাফল্যের মুখ দেখেছে। অতীতে বহু শিশু এই স্কুল থেকে সামাজিক হয়ে জগতে নিজস্ব কক্ষপথে স্থান করে নিতে পেরেছে। রণিতা বলে, "এক্সকিউজ মি, আমি আপনাকে একটা কথা জানাতে চাই।" রেক্টর বলেন, "ম্যাডাম, আমি অলরেডি জেনে ফেলেছি।" অনিল উৎসুক হয়ে জানতে চায় ব্যাপারটা। রণিতা ভাবে ও রেক্টরের মুখ থেকে শুনলে আশ্বস্ত হবে। তাই রেক্টরকে বলে, "স্যার আপনি বলুন।" স্যার বলেন, "মুহুর্তে অতগুলো মাছের রঙ মস্তিষ্কে ধারন করে মোট সংখ্যার সঠিক হিসাব বলে দেওয়া এত সহজ কাজ নয়।" রণিতাকে এড়িয়ে অনিলের মুখ ভঙ্গিমায় তাচ্ছিল্য রেক্টরের নজর এড়ায় না। অনিলের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, "প্রথমে শিশুর অভিভাবকদের জানতে হবে স্পেশাল স্কুলের উদ্দেশ্য। কেন আমরা বুঝতে পারি কোন শিশুর কোন শিক্ষা বা থেরাপির প্রয়োজন। এই ক্ষমতা আমাদের অর্জন করতে হয়েছে। এই সত্যে উপনীত হতে অভিভাবকদের কাউন্সেলিং প্রয়োজন।" শেষ কথাটা অনিলের দিকে তাকিয়ে বলেন রেক্টর।

অনিল থতমত খেয়ে কী বলবে ভেবে পায় না। রণিতা বলে, "স্যার, আদতে পৃথিবীর কোন মানুষ কি সম্পূর্ণ? অনেকক্ষেত্রে মানুষ নিজে নিজেকে কাউন্সিলিং করে নয়ত কারও সাহায্য নেয়।" রেক্টর কথা কেড়ে নিয়ে বলে, "ঠিক, তবে এই রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিরাময় কেবল তাদের নির্দিষ্ট সহজাত প্রবৃত্তির বিকাশের মধ্যে দিয়েই ঘটে।" রনিতা বলে, "সেই বিকাশের কাজ আপনারা করে চলেছেন।" রেক্টর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, "অভিভাবকদের এগিয়ে আসতে হবে।"

ওদিকে ছেলে স্পিচ থেরাপি সেরে পাখির খাঁচা, ইলেকট্রনিকসের দুনিয়া ঘুরে এখন যন্তরমন্তর ঘরে এসে হাজির হয়েছে। রঙ্গন প্রথম দুটি বিভাগে কোনরকম আগ্রহ প্রকাশ করেনি। যন্তরমন্তর ঘরে, জাদুকর রুমালকে বেড়াল বানিয়ে দেখাচ্ছেন। আবার পরমুহুর্তে একই রুমাল সাদা ইঁদুর হয়ে যাচ্ছে। রঙ্গনের মনোজগত আলোড়িত হচ্ছে। সে হাত তুলে প্রতিবাদ করতে চাইছে। জাদুকর রুমালটা রঙ্গনের হাতে দিলে সে উল্টেপাল্টে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। জাদুকর এরপর প্রত্যেক বার ফেলে দেওয়া রুমাল থেকে বেড়াল করলে রঙ্গন নিজের ভাষায় চিৎকার করতে থাকে। জাদুকর রঙ্গনের লজিক্যাল ক্ষমতায় মোহর লাগিয়ে রেক্টরের কাছে পাঠান।

আজ দিনটা রণিতাকে আশার আলো দেখিয়েছে। ফেরার পথে সে অনিলকে বলে, "চলো আজ রেস্তোরাঁয় খেয়ে ফিরি।" অনিল নাকচ করে বলে, "কি দরকার ফালতু টাকা পয়সা নষ্ট করার। ছেলের জন্য এখন অনেক খরচ, আমাদের সাবধানে চলা উচিত।" যুক্তি মেনে নেয় রণিতা। অনিলের শুভ বুদ্ধির উন্মেষ হওয়ায় ভালো লাগে তার সে আনন্দে অনিলের হাতে হাত রাখে। অনিল জানে এই পরশের অর্থ ভালোবাসায় অচল থাকার সংকেত।

দিন বয়ে যায়। চাকরি সামলে রণিতা লড়ে যাচ্ছে। অনিল একটু বেশি করে শরীর সর্বস্ব হয়ে যাচ্ছে। সদ্য বিবাহিত জীবনেও অনিল এমনটা ছিল না। রণিতা সামলে নেয় সবকিছু। রণিতা চায় রঙ্গন সকল ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে বড় হোক। সে অতিরিক্ত সাবধানী। প্রতি রাতে সে কন্ট্রাসেপটিভ নেয়। এ খবর অনিলের অজানা। রঙ্গন গর্ভে এসেছে দুজনের সিদ্ধান্তকে মূল্য দিয়ে। অনিল নিজেকে উদাসীনতার খোলসে ঢেকে নজর করে রণিতার শারীরিক কুশলতা। গতরাতে ওরা নিমন্ত্রণ বাড়িতে গিয়েছিল। খাওয়া দাওয়ার অনাচারে রণিতা আন্ত্রিক সমস্যার সম্মুখীন হয়। রণিতা তার অসুস্থতার আঁচ সংসারে পড়তে দেয় না। দাঁতে দাঁত চিপে সহ্য করে নেয় সকল ধকল। যার ফল ভালো হয় না। অসুস্থতার কারণে আজ সে অফিস যেতে পারেনি। অনিল বাড়ি ফিরে শোনে সেই কথা। একাধিকবার রনিতার বমি হয়েছে শুনে অনিলের চোখ চকচক করে ওঠে। তার অসুস্থতার খবরে অনিলের কেন চোখ চকচক করছে তা বুঝতে পারেনা রণিতা। রণিতার মুখমন্ডলের ভূগোল পড়তে পেরে অনিল সাবধানী হয়। ঔৎসুক্য মানুষকে ভুল পথে চালিত করে। অনিল শেষমেশ মনের ভাব প্রকাশ করে ফেলে। অনিলের ইউরিন টেস্ট করানোর উপদেশ ছ্যাঁত করে লাগে রণিতার বুকে। সে মুখে কিছু বলে না।

এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে ওষুধের দোকানে রনিতাকে দেখে অনিল। ওষুধ কিনে রঙ্গনকে নিয়ে রণিতা বাড়ি এলে, অনিল জিজ্ঞেস করে, "কি হয়েছে তোমার, ওষুধের প্রয়োজন হল কেন?" রনিতা চেপে না রেখে সরাসরি বলে, "আমি রোজ কন্ট্রাসেপটিভ নিই।" বিছানায় অনিলের আদিম হিংস্রতায় ভালোবাসার ছোঁয়া দিনে দিনে হারাচ্ছে, দেরি হলেও যা বুঝতে অসুবিধা হয়নি রণিতার। আজ ধোঁয়াশা না রেখে সে সবটা অনিলকে জানিয়ে দেবে। এই লুকোচুরি খেলা তার আর ভালো লাগছেনা।

রঙ্গন বাবু বাড়ি ঢুকে বায়না জুড়েছে। মাকে হিড়হিড় করে টেনে সে ঘরের ভেতর নিয়ে যেতে চায়। স্কুল থেকে সুন্দর একটি বাক্স দিয়েছেন স্যার। তাতে কি আছে রঙ্গনকে এক্ষুনি খুলে দেখতে হবে। অনিল হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে রণিতাকে নিজের দিকে আনার চেষ্টা করলে রঙ্গন মাটিতে পড়ে গিয়ে কাঁদতে থাকে। অনিল রঙ্গনের কান্নার শব্দ ছাপিয়ে গলা তুলে বলে, "শুনে রাখো, আমি একটা সুস্থ সন্তান চাই যে আমার সঙ্গে হাসবে খেলবে কমিউনিকেট করবে।" ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে রণিতা। রঙ্গনের অবাক চাহনি উদাসীন অনিলকে ছুঁতে ব্যর্থ হয়। রণিতা ছেলের কাছে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে। ভীত রঙ্গন মায়ের হাত ধরে টেনে তোলার আবেগে ভেসে গিয়ে রণিতা জড়িয়ে ধরে রঙ্গনকে।

রাত্রে যথারীতি বিছানায় অনিল নিজের করে পেতে চায় রণিতাকে। কোথাও যেন হেরে যাচ্ছে সে। সোহাগের ভাষায় সে আজ নতুন। সে বলে, "তুমি আমায় বুঝতে ভুল করছো। আমি চেয়েছিলাম, তোমার না পাওয়া শখ গুলো পূর্ণ হোক।" সরীসৃপের মত কিলবিল করে গায়ে পিঠে চলছে অনিলের আঙুলগুলো। অনিলের হাত ঘৃণায় রণিতা ঠেলে সরিয়ে দেয়। রণিতা অনিলের শঠতা নিতে পারেনা। সে স্পষ্ট উচ্চারণে বলে, "রঙ্গন আমার কলিজা, যতদিন তুমি রঙ্গনকে ভালোবেসে মেনে নিতে পারবে ততদিন আমি তোমার কাছে অধরা থাকবো। আমাকে স্পর্শ করার অধিকার তুমি হারিয়েছ।"

অনিল এখন রাতে দেরি করে বাড়ি ফেরে। মুখে উগ্র মদের গন্ধ আর চাহনিতে হিংস্র, ললুপ দৃষ্টি। একদিন রঙ্গনকে স্কুলে নিয়ে যাওয়া পথে রণিতার দেখা হয়ে যায় রেক্টরের সঙ্গে। গাড়ি থামিয়ে তিনি ওদের লিফট দেন। অনিল রাতে মত্ত হয়ে বাড়ি ঢোকে। আজ তার গলার বেসুরো গান — আজি সে আঁখি বনের পাখি বনে পালায়। একই লাইনের পুনরাবৃত্তি করে চলেছে অনিল। রণিতা বুঝতে পারে অনিল তাকে নজরে রাখছে। ভালোবাসার অধক্ষেপ ধুয়ে মুছে সাফ করা যায় কি? জানা নেই রণিতার। কিন্তু ইদানিং তার গা ঘিনঘিন করছে। ভাবলে বমি আসছে, অনিলকে সে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল।

রণিতার বাপের বাড়ি অনেকটা দূর। রঙ্গনের স্পেশাল ক্লাসের জন্য সে যে দুদন্ড সেখানে গিয়ে একটু শান্তিতে থাকবে তারও যো নেই। ছন্নছাড়া অকর্মণ্য অনিলকে সে ফেলে দিতে পারেনা। বর্তমানে বাজার হাট সবই তার ঘাড়ে। অনিল সংসারে টাকার যোগান দেওয়া বন্ধ করেছে। পরিচারিকা ঝর্ণা, একদিন জানায় অনিলকে বস্তির মধ্যপ ছেলেগুলোর সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। গুম হয়ে ভাবে রণিতা, সবটা কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। তবে তার শান্তির জায়গা হল ইদানিং অংকের ধাঁধা রঙ্গন সমাধান করতে পারছে। স্কুলের ইন্সট্রাক্টররা উচ্ছ্বসিত রঙ্গনকে নিয়ে। রণিতা আশাবাদী হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।

কোর্টের শমন এসেছে অনিলের নামে। এখন অনিল নেশার আওতায় নেই পেটে তরল পানীয় পড়ার আগেই এসে হাজির হয়েছে রণিতার ব্রম্ভাস্ত্র। ডিভোর্স নোটিশ পাঠিয়েছে রণিতা। নোটিশ হাতে নিয়ে অনিল কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে খাটে বসে পড়ে। রণিতা ছেলেকে নিয়ে স্কুলে গিয়েছে। রঙ্গনকে আনতে যাবে ঝর্ণা। অনিল বাড়িতে থেকে যায়। আজ সে একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে। রঙ্গন স্কুল থেকে ফিরে দেখে বাবা বাড়িতে। বাড়িতেই মদের যোগান এসে গেছে। সঙ্গে এসেছে অচেনা দুজন পুরুষ। গন্ধে ম-ম করছে ঘর। রঙ্গন নাক সিঁটকায়। মদের ঘোরে অনিল বলে, "দেখ, কথা বলতে পারেনা অথচ প্রখর শ্রবনিন্দ্রিয়। শালা, যেমন মা তেমন ছা।" রণিতার আসার আগেই অনিলের স্যাঙাতরা ভেগেছে। বাড়ি ঢুকতেই ঝর্ণা আকারে ইংগিতে সব জানায় রণিতাকে। রণিতা আর রঙ্গন যে ঘরে থাকে সে ঘর দোর দেওয়া থাকে। অনিলের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। ডায়ানিং স্পেশ হয়ে ঘুরে যেতে হয় সেখানে। অনিল নেশার ঘোরে মাঝের দরজা ধাক্কাতে থাকে। রণিতা চেঁচিয়ে বলে, "তোমার সঙ্গে কোন কথা নেই। যা কথা সব আদালতে হবে। যদি মিউচুয়াল ডিভোর্স দিতে রাজি থাক তাহলে তোমার উকিলকে বলো সেটল করতে। টাকাকড়ি কিছু লাগবে না।" রঙ্গন চিৎকার চেঁচামেচিতে ভয় পেয়েছে। সে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে আছে। ঝর্ণার হাত দিয়ে নিয়মমাফিক অনিলের ঘরে রাতের খাবার পৌঁছে যায়। রাগ দেখাতে থালা ছুঁড়ে ফেলে দেয় অনিল। রণিতা আর রেক্টরকে জড়িয়ে অশ্রাব্য গালাগালাজ চলতে থাকে। কোনরকমে রাত কাবার করে লোকাল থানায় কমপ্লেন জানায় রণিতা। আধঘুমন্ত অবস্থায় পুলিশ নেশাতুর অনিলকে তুলে নিয়ে যায়।

রণিতাকে মিউচুয়াল ডিভোর্স দিতে অনিল রাজি হয়নি। একঘেয়ে ধীর লয়ে কেস চলছে। মাঝেমধ্যেই অনিলের উকিল কোর্টের কাছে ডেট নেয়। ইতিমধ্যেই কোর্টের রায়ে অনিলকে ঘর ছাড়তে হয়েছে। অনিল জীবনে হারতে শেখেনি। সে রণিতার ওপর ব্যভিচারের কেস দিয়েছে। অনিল রাস্তায় ঝর্ণাকে শুনিয়েছে, পৃথিবীতে এমন কোন বাহুবলী নেই যে তার অধিকারে থাবা বসাতে পারে। দরকার হলে সে রণিতার পিরিতের লোককে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে। অবাক হয়ে শোনে ঝর্ণা।

সময় অনন্ত, কারও জন্য তার মাথা ব্যথা নেই। অন্য কারও বিষয়ে এ পৃথিবীর কারও বড় একটা মাথা ব্যথা থাকে না। শুধু নিজের চৌহদ্দি ঘিরে বেঁচে থাকা। প্রত্যেকে বাজি ধরে জিততে চায়, অনিল যেমন। রণিতাও কি তাই, হয়ত। দেখতে দেখতে চার বছর কেটে গেছে। কোর্টের অর্ডারে ঘর ছাড়ার পর, অনিলকে রনিতা নতুন অর্ডার ছাড়া ঘরে ঢুকতে দেবেনা। অনিলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেরাজে আছে। সে মহামান্য আদালতের কাছ থেকে পুলিশের উপস্থিতিতে দরকারি কাগজপত্র আনার ছাড়পত্র যোগাড় করে। অনিল চাবিহীন দেরাজ খুলে দেখে সব কাগজ গোছান, পরিপাটি। তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রেশনের কপিও রাখা আছে সেখানে। অনিল উল্টেপাল্টে বারবার সেই কাগজ দেখতে থাকে। নাঃ, অতীতচারি হয়ে লাভ নেই। পাঁচশত টাকার একটা গোছ পড়ে আছে ফাইল বন্দী হয়ে। টাকার বান্ডিলের গার্ডারে আঁটা একটা সাদা চিরকুট। রণিতার হাতে লেখা দু লাইনের চিরকুট তড়িঘড়ি তুলে নিয়ে চোখ বোলাতে থাকে অনিল। চিঠিতে লেখা, "আমি আশাবাদী তুমি একদিন আমাকে ঠিক বুঝতে পারবে। তখন হয়ত আর সময় থাকবেনা।" পুলিশ তাগাদা দিতে থাকে। সব কাগজ গুছিয়ে নিয়ে বেরোবার সময় হঠাৎ কোথা থেকে হাবা রঙ্গন এসে অনিলের সামনে হাজির হয়। নজরদারি করার কারণে অনিল দূর থেকে রঙ্গনকে দেখত আর ভাবত, এই প্রতিবন্ধি ছেলের জন্যই তার জীবনটা শেষ হয়ে গেল। বোধগম্য উচ্চারণে রঙ্গন বলে, "বাবা, এক্স টু দি পাওয়ার জিরোর মান কত বলত? টু টু দি পাওয়ার ওয়ান মানে যদি দুই হয়। থ্রি টু দি পাওয়ার ওয়ান মানে কত?" অনিল বুঝে উঠতে পারেনা আজকের অঙ্গনের বাবা কে? অনিল রঙ্গনের দিকে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করলে পুলিশি ঘাড় ধাক্কা খেতে হয়।

অনিল এখন একা। তার কানে প্রশ্ন বাজছে — বলত, "এক্স মানে কী?" সে উত্তর করছে, "টু নাঃ থ্রি, থ্রি টু দি পাওয়ার ওয়ান।"




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

বিস্তারিত নিয়ম

একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।

আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
3 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top