দেখতে দেখতে আমাদের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ৭৯তম বর্ষে পদার্পণ করল। প্রজাতন্ত্র দিবসের এই পবিত্র মাসে স্বাধীনতা বিষয়ে সামান্য কিছু কথা বলতে গিয়ে মনে হল — হোক সে কথা সামান্য, কিন্তু এক হিসেবে তা অসামান্য। গল্পের মতো হলেও এ কিন্তু গল্পকথা নয় — চরম বাস্তব। তবে প্রচলিত কথাবার্তার বাইরের কিছু কথা। আর যাকে নিয়ে কথা, তিনিও প্রচলিত মানুষদের থেকে একেবারেই অন্যরকম। এবং আরও বলা যায় যে, যে স্থানের পটভূমিতে কথাবার্তাগুলোর জন্ম, সে স্থানটাও সাধারণ মানুষের কাছে চিরকালীন উপেক্ষিত — একেবারে দুয়োরানীর মতো অবস্থা তার। এই কথা হয়তো প্রজাতন্ত্র দিবসের দিনেই মন খুলে বলা যায়। জানা কথা হয়েও এই কথাগুলো অজানা থেকে যায় বহু মানুষের কাছে। যদি পাঠকের ভালো লাগে, তবে ধন্য হব।
গৌড়চন্দ্রিকা ছেড়ে মূল কথায় আসা যাক। মুক্তির কি আসলে কোনো রঙ হয়? হয়। নিশ্চয়ই হয়। আর সে রঙের আলো যখন আকাশ–বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তার অনির্বচনীয় মাধুর্যের রূপ–রসের কথা প্রকাশ করে বোঝানো অসম্ভব। আর সেই মুক্তির রঙ সম্পর্কেই দু-কথা বলে আজ আমাদের সকলের পরমপ্রিয় নয়নমণি, চিরকালের বীর নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে প্রণাম জানানোর একটা ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা আমার এই রচনার মাধ্যমে।
বিষয়টা আমাদের স্বপ্নের মহানায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং স্বপ্নের আন্দামানকে নিয়ে। যাঁকে আমরা নেতাজি নামে বেশি চিনি, সেই সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন সোনার আন্দামানে। প্রসঙ্গত বলা ভালো, আপনারা সকলেই জানেন, এই আন্দামান আমাদের ভারতবর্ষের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ভারতবর্ষেরই যাবতীয় শাসন (এবং শোষণ!) এই আন্দামানেও চলে। এই আন্দামান ইংরেজ শাসন–শোষণের হাত থেকে শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে কবে স্বাধীনতা পেল? আপনি নিশ্চয়ই বলবেন ১৯৪৭-এর ১৫ই আগস্ট। কিন্তু আমি বলব, সে কথা ভুল। সেই আন্দামান স্বাধীনতার স্বাদ–গন্ধ পেয়েছে অনেক, অনেক আগে।
কী হল? ভাবতে অবাক লাগছে? সেই কথাই তো হচ্ছে — শুনুন তাহলে। সেই আন্দামানের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। কিন্তু তখন আন্দামান কেমন ছিল? তখন তা কি প্রকৃতই সোনার আন্দামান ছিল? না। মোটেও না। সে আন্দামান ছিল পরাধীনতার গ্লানিময়তায় জর্জরিত এক দুঃস্বপ্নের আন্দামান। কবি নজরুল ‘দুঃশাসনের রক্ত’ কবিতায় লিখেছেন —
দেবসেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের আন্দামানে।
বিপ্লবীদের কালাপানিতে নির্বাসন সহ্য হয়নি তাঁর। ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতায় কবি লিখেছেন —
সপ্তসিন্ধু তেরো নদী পার
দ্বীপান্তরের আন্দামান
রূপের কমল রুপার কাঠির
কঠিন স্পর্শে যেখানে ম্লান
তো সেই দুঃস্বপ্নের আন্দামানে নেতাজি এসেছিলেন কবে? তিনি এসেছিলেন ১৯৪৩-এ। তারিখটা ছিল ৩০শে ডিসেম্বর। তবে তিনি এলেন, দেখলেন আর জয় করলেন। আমাদের নয় — ইংরেজদের। কী দুঃসাহস ভদ্রলোকের! সদর্প সাহসে ভর করে সে সময় তিনি ভারতের জয়গান গাইলেন। ইংরেজদের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়ে আকাশে উড়িয়ে দিলেন বিজয় পতাকা। আমাদের স্বপ্নের ভারতবর্ষের স্বপ্নের তেরঙ্গা পতাকা দেশের মাটিতে প্রথম উড্ডীয়মান হল আন্দামানের মাটিতে! হাওয়ায় উড়ছে সেই পতাকা পতপত করে, মুক্তির রঙ আকাশে–বাতাসে পবিত্র ফাগ ছড়াচ্ছে আর স্বাধীনতার সুতীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে দিকে–দিগন্তে। হাওয়ায় ভেসে ভেসে কালাপানি পার হয়ে স্বাধীনতা দৌড়চ্ছে সমস্ত ভারতবর্ষের প্রান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখার আকুতিতে। ভেবে দেখেছেন সেই সুখের মুহূর্তের প্রত্যক্ষদর্শী আন্দামানের মানুষগুলোর কথা?
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু মানুষের আবেগের মর্যাদা দিতে জানতেন। তাই স্বঘোষিত স্বাধীনতার অর্ঘ্য পতাকার মধ্যে থেকে ফুল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের মনে, আর তিনি কঠোর বাস্তব এবং আবেগমিশ্রিত মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দিয়ে ঘোষণা করছেন —
আবেগআপ্লুত মানুষ তাঁর কথা শুনছেন অবাক হয়ে আর ভাবছেন — শুনেছিলুম বটে ওই মানুষটার কথা, তবে চোখে দেখিনি। বাবারে বাবা! কী দাপট! একেবারে সোজাসাপ্টা কথাবার্তা! অথচ যেন মন্ত্রোচ্চারণ! নেতাজি সংক্রমিত করে দিয়েছেন মানুষের স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে। জনারণ্য নয় — অল্প কিছু মানুষ, কিন্তু পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে তারা! এই গর্ব তারা রাখবে কোথায়? সারা ভারতের মানুষ যা পেল না, তা তারা পেয়ে গেল অবলীলায়! ভাবুন তো সেই মহামূল্যবান দিনটার কথা। সেটা আমাদের জীবনের জন্য কতটা দামী?
আসলে নেতাজি মানেই পরিবর্তন। নেতাজি আসলে এক আলোকবর্তিকার নাম। তাই অন্য কারো উপর নির্ভর না করে সুভাষচন্দ্রের ভাবনার সঙ্গে সঙ্গেই অলিখিতভাবে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের নাম পরিবর্তিত হয়ে গেল — শহীদ আর স্বরাজ দ্বীপ।
আমি একজন সাদামাটা মানুষ, কিন্তু আন্দামান–নিকোবর প্রশাসনের শিক্ষা বিভাগে যুক্ত থেকে ৩০ বছর কর্মরত থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। তাই এই মুহূর্তে ভাবছি — শহীদ দ্বীপের বাসিন্দা হতে পারা আর অন্যদিকে স্বাধীন ভারতের প্রথম পতাকা উত্তোলনের স্থান, এই দুইয়ের সম্মিলিত সুখের কথা ভেবে আমাদের আত্মশ্লাঘা অনুভব হওয়া কি অন্যায়? মুক্তির রঙ যে এত উজ্জ্বলভাবে প্রতিটি কোষে কোষে আলো জ্বেলে দিতে পারে, তা আন্দামান–নিকোবরে পা রাখলে তবেই বোঝা যায়। মুক্তির রঙের এই দৃষ্টান্তের বোধহয় আর কোনো তুলনাই নেই! আছে নাকি এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের পরিচয় আর কোথাও?
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।