১
আদ্রা-খড়গপুর ট্রেনটা রাইট টাইমে বিষ্ণুপুর পৌঁছে অনেককেই অবাক করে দিয়েছে। স্টেশনের ওভারব্রিজটার ব্যবহার তেমন নেই। অনেক প্যাসেঞ্জারের মতো আলোকও সোজাসুজি বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচের একটা পাথরে পা রেখে নামতে যাবে, এমন সময় ডান হাতের আঙুলে মৃদু স্পর্শ অনুভব করে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখে তনুকে। আলোক পাথরটা ছেড়ে একটু সরে দাঁড়ায়। চোখ তুলে অবিশ্বাসের মতো দ্বিতীয়বার তনুকে দেখে সে। অনেকগুলো পুরুষ মানুষ আর গুটিকয় মেয়ে মানুষের একটা ঢল পাথরের ওপর দিয়ে নেমে গেল।
আলোক পাথরে পা রেখে পুনরায় প্ল্যাটফর্মে ওঠার চেষ্টা করলে তনু ওর ডান হাতটা ধরে সজোরে টান দিল। একেবারে বুকের কাছে এসে মহীরুহের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে অন্তত এক ফুট বেশি লম্বা আলোক। মাথার ওপর আকাশ দেখার মতো করে তনু দেখতে রইল। অতি পরিচিত সেই হাস্যমুখ। হাসির রেখায় ঠোঁট-চিবুকের টোলগুলো উদ্ভাসিত। নাতিঘন দাড়ির ফাঁকে অতি ফর্সা মুখাবয়ব তেমনি আকর্ষক। আলোক যেন একটুও বদলায়নি। আর তনু? তনু যেন নবজন্ম লাভ করে নতুন রূপে রূপায়িত। আলোক তাই তো অমন বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে দেখেই চলেছে।
একরাশ প্রশ্ন ভিড় করে এসেছিল জিহ্বাতে। আলোক শুধু জিজ্ঞাসা করল, "তুমি একা?" এতক্ষণ যে তনুকে নতুন পরিবর্তিত রূপে সবিস্ময়ে দেখছিল, এখন বুঝল সে বিন্দুমাত্র পাল্টায়নি। প্রমাণ তার উৎপাত করা ঝিরঝিরি হাসি। বলল, "সমভিব্যাহারে।" কেমন শীতল হয়ে গিয়ে আলোক বলল, "চলি, একটা জরুরি কাজ আছে।"
তনু খপ করে হাতটা ধরে ফেলল। বলল, "ভয় নেই, আপাতত ছেলের পাহারায় রয়েছি।" পার্শ্ববর্তী সানবাঁধানো বকুল গাছটার দিকে ঘুরে দাঁড়াল তনু। আলোকের নজরে পড়ল একটা ব্রিফকেস, কয়েকটা জলের বোতল আর ফুটফুটে সুন্দর একটি শিশু। দ্রুত পায়ে পৌঁছেই আলোক শিশুটিকে কোলে তুলে নিল।
আলোক বলল, "তোমার ছেলে এত বড় হয়ে গেছে!"
তনু বলল, "তিন বছর হল।"
"ভারী সুন্দর। চুপচাপ। শান্ত। হাসি হচ্ছে?"
গভীর স্নেহ ঝরে পড়ে আলোকের হৃদয় হতে। অপলক দৃষ্টিতে আলোককে দেখছে তনু। ধূধূ করা চোখের দূরপ্রান্তকোণে আগুনের ঝলকা অনুভূত হচ্ছে রয়ে রয়ে।
তনু বলল, "কত দিন পর তুমি আমায় দেখলে!"
আলোক বলল, "নাহ্, তুমি আমায় দেখলে!"
তনু খিলখিল করে হেসে উঠল। "এমন বলছ যেন তুমি আমায় রোজই দেখো।"
আলোক হাসিতে ঠোঁট ভাসিয়ে বলল, "দেখি তো। শুনতে শুনতে দেখি, দেখতে দেখতে শুনি। এই হৃদয়হীনা মায়াবিনী পাষাণীর কথা কে তোমায় শোনায় শুনি?"
"সে অনেক আছে। থাক সে কথা। কিন্তু, তোমার একে দেখছি না?"
"একে! একে ফর্টি সেভেন!" তনু মজা করল।
"মাননীয়া তনুশ্রী মুখার্জি। আমি দ্বৈপায়নবাবুর কথা বলছি।" আলোক নাটকীয় ভঙ্গিতে কথা বলল।
"নাম-গোত্র সবই জানো দেখছি! সোনা-রূপোর কাজ করা বিয়ের কার্ডটা যে পাঠিয়েছিলে, তা বুঝি স্মৃতিতে আর নেই!"
"কলেজ ডিবেটে 'ওল্ড ইজ গোল্ড'-এর বিপক্ষে তুমি তো বলেছিলে, 'পাস্ট ইজ পাস্ট। পাস্ট ইজ দ্য করপস অফ এ পার্সন... ডোন্ট পন্ডার ওভার ইট।' বলেছিলে না?"
"বলেছিলাম। অ্যান্ড আই অ্যাম ট্রাইং দ্য বেস্ট টু অ্যাপ্লাই ইন এভরি ওয়াক অফ মাই লাইফ।"
"কিন্তু এভাবে এত সব কথা বলার কোনো মানে হয় না, তনু। মিনিংলেস।"
কয়েক মুহূর্ত দুজনেই চুপচাপ।
"হোয়্যার ইজ দ্বৈপায়নবাবু?"
সশব্দ হাসির তরঙ্গ উঠল সহসা। আলোক বলল, "ওই পেটডাঙরা মুচকুন্দ-মার্কা লোকটা যদি তোমার দ্বৈপায়নবাবু হতেন, তবে কী খুশিই যে হতাম!"
"সত্যিই খুশি হতে?"
"মাই জয় উড নো নো বাউন্ড। আমার আনন্দের সীমা থাকত না! দেখতাম, তুমি একটা দৈত্যকে পূজা করছ।"
"জীবনে সত্যিই যাকে পূজা করতে চেয়েছিলাম, আজ মনে হচ্ছে সে একটা দৈত্যই। নইলে এমন উল্লসিত হয়!"
"তনু, এ উল্লাস তো আমার প্রতিহিংসার নয়! তোমার শাস্তির বহর দেখেও আমি উৎফুল্ল হতাম না!"
"তবে কিসের এই উল্লাস? কিসের এই আকাশছোঁয়া উৎফুল্লতা?"
"তোমার রাশি রাশি অহংকারের উপযুক্ত শাস্তি হতো। তোমার সেই আকাশছোঁয়া অহংকারের উপহার-হারগুলো মাঝে মাঝে এখনো দেখি! বসন্তের শোভা নিয়ে আমার গলা জড়িয়ে বুকের ওপর দোল খায়! তোমার ভাষায় কথা বলে।"
"তনু, মনে পড়ে আমাদের পরিচয়ের প্রথম দিনগুলো?"
"মনে পড়ে। অনেক দিনের অনেক কথা মনে পড়ে!"
২
কলিংবেলটা বর্ষার কোলা ব্যাঙের গলায় বেজে উঠল।
"স্যার আছেন, তনু?"
"বাবা তো নেই। বর্ধমান গেছেন। এসো, ভেতরে এসো।"
"কী করছিলে, তনু?"
"ক্যালকুলাস।"
"বাহ্! পড়াশোনা করছ!"
"ধুস, ভোগাস। মাথায় কিছু ঢোকে না। বাবা তোমার কাছে বুঝে নেওয়ার কথা বলছিলেন।"
"আমার কাছে? ক্যালকুলাস! কক্ষনো না! প্রতিদিনই তো সেই গ্রাভিটেশন, অ্যাক্সেলারেশন..."
"আজ তবে গল্প করো।"
"গল্প নয়। তুমি ওভাবে বসে থাকো, একটা ছবি আঁকি।"
"এই ভূতের মতো চেহারাতে! রক্ষা করো।"
"কেন? আজ তোমায় বেশ সুন্দর লাগছে। পাঁচ মিনিট বসো, আমি ঠিক এঁকে ফেলব।"
"এক মিনিটও নয়।"
তনু সামনে চেয়ার ছেড়ে আলোকের পাশে এসে বসল। বলল, "জানো, আলোকদা, আজ রাত্রে এক বিশ্রী কাণ্ড ঘটেছে।"
"বল, শুনি।"
"ঘুমের ঘোরে চিৎকার করে বলছি, 'না, যেও না... প্লিজ... যেও না...' তারপর... বাবা পাশের ঘর থেকে উঠে এসে নাড়া দেয়, 'কী হল তোর? স্বপ্ন দেখছিলি... ওঠ, ঠিক করে শোও।'"
"তনু, তুমি কাউকে কী ভালোবাসো?"
"আমার মতো ভালোবাসতে পারে, এমন মেয়ে সারা বিশ্বে আর দুটো নেই।"
"তনু, ভালোবাসা আর ভালোবাসতে পারা কিন্তু সমার্থক নয়।"
"শুধু একজনকেই ভালোবাসি। তাকে ছাড়া আর কাউকে ভালোবাসতে পারি না।"
তনুর কথায় প্রতীয়মান হয়, সে একজনকেই শুধু ভালোবাসে।
"বাহ্! ভেরি ফরচুনেট দ্যাট ম্যান। আমাকে একদিন দেখিয়ে দিও তো। তার ছবি এঁকে তোমায় উপহার দেব।"
"দেখবে তুমি তাকে? এসো।"
"কোথায়?"
"এসো না।" তনু হাত ধরে টানে আলোককে। "এখানে বস।"
বেডরুমের বিশাল আয়নাটার সামনে প্রায় জোর করে বসিয়ে দিল আলোককে। স্টিলের আলমারি খুলে কী কাজে ব্যস্ত হল। লকারের মধ্যে এত যত্ন সহকারে রাখা! রাখতে হবে না! জুয়েলস অফ হার্ট — হৃদয়রত্ন বলে কথা! আজকালকার মেয়েরা হৃদয়রত্ন ধারণ করে ক্যালকুলাস করে না। ওরা শুধুই ক্যালকুলাস করে, অর্থনীতি পড়ে, এমবিএ করে, এমডি হওয়ার স্বপ্ন দেখে।
"কই... কী হল? দেখাও, তোমার স্বপ্নের রাজপুত্রকে।"
পিছনে দাঁড়িয়ে তনু আলোকের হাত দুটো জড়ো করে বলল, "চোখ বন্ধ কর।"
"বাব্বা! এত আয়োজন! সোনার কাঠি, রুপোর কাঠি ছোঁয়াবে বুঝি?"
"তাই তো! চোখ বন্ধ রাখবে। একদম খুলবে না।"
"জলদি কর, চোখ জ্বালা করছে।"
হালকা নীল রঙের গাউনে তনুকে অসাধারণ লাগছে। আলোকের পিছনে ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, "গুডবয়, এবার সোজা আয়নার মধ্যে দেখো।"
নিজেকে ছাড়া আলোক কিছুই দেখতে পায় না। বলল, "কই, কিছুই দেখতে পাই না যে!"
"এই তো। ভালো করে দেখ।"
তনু আলোকের কাঁধে দু' হাত রেখে ঝুঁকে পড়ে বিহ্বল কণ্ঠে জানাল।
দাঁড়িয়ে পড়ে আবিষ্ট কণ্ঠে আলোক বলল, "তনু!"
নিষ্পলক, নিস্কম্প দাঁড়িয়ে রইল তনু।
"এ কী করলে, তনু!"
"আই লাভ ইউ, আলোকদা। আমি তোমাকেই ভালোবাসি।"
তনু আলোকের বুকে মাথা রাখে।
৩
তনু কোথায় যেন হারিয়ে যায়। উদাস দৃষ্টিতে স্টেশনের বাইরে দূরে শালবীথির দিকে তাকিয়ে থাকে। ওকে ঘিরে থাকে অদ্ভুত এক নীরবতা।
"তনু, পুরোনো স্মৃতির জঞ্জাল টেনে এনে ডুব দিলে বুঝি?"
"নাহ্, তা কেন?"
"তোমার চোখের কোণে ঈষৎ লাল ঝাপসা মেঘ কিন্তু অন্য কথা বলে!"
"ও কিছু নয়। বৃষ্টি যা হওয়ার, কবেই ঝরে পড়েছে।"
"মেঘ আর আসে না কেন?"
"যদি আসে, ভাসে স্বল্পক্ষণ। শুষে নেয় সময়-সাহারা।"
"তোমার বান্ধবীর কথা মনে করিয়ে দিলে। জয়িতা তোমাকে অনেক কবিতা উপহার দিয়েছিল।"
"সঞ্চয়ে আজ আর একটিও নেই।"
"খুব যত্ন করে রাখতে তুমি সেদিন।"
"গুপ্তধনের মতো অনেক দিন আগলে রেখেছিলাম, সঙ্গে তোমার গুটিকয়েক চিঠিও। সময়ে সব কিছুরই কেমন মূল্য হ্রাস পায়।"
"না, তনু। গচ্ছিত সম্পদগুলির মূল্য ক্রমাগত বেড়েই চলছিল। নিঃস্ব, রিক্ত মন মর্যাদা দিতে পারবে না বলেই তাদের নিয়ে বহ্ন্যুৎসব খেলেছে। হৃদয়-স্পর্শহীন মিথ্যা প্রতিশ্রুতির জঞ্জালরাশিকে পুড়িয়ে যথার্থ প্রাপ্যই দিয়েছে, আলোকদা! এতে আমার কোনো দুঃখ নেই! আর আমিই কি পেরেছি তোমার দেওয়া পরম সম্পদগুলি চিরদিনের করে রাখতে?"
"হয়তো রেখেছ। কালের স্রোতের কাছে শাশ্বত করেই রেখেছ।"
মাধুরীভরা প্রেম-ভালোবাসার স্মৃতিচিহ্নগুলি আলোক-তনু দুজনেই কালের গর্ভে নিক্ষেপ করেছে। নিক্ষেপকালে যে যন্ত্রণা, যে নিদারুণ মনঃকষ্ট পেয়েছে, তা কেউ কারও নিকট প্রকাশ করতে পারল না। চিরনীরব রয়ে গেল। আপন আপন মানসপটে কেবল সেই করুণ দৃশ্যগুলি ক্ষণিকের জন্য ভাস্বর হয়ে উঠল।
দ্বৈপায়ন বলল, "তনুশ্রী, পুরীর সমুদ্র থেকে বয়ে নিয়ে যাবে এমন কিছু স্মৃতি তোমার সঞ্চয়ে জমা হল?"
তনুশ্রী বলল, "আপনার?"
দ্বৈপায়ন বলল, "না। তবে সারাক্ষণ যে তুমি 'আপনি, আপনি' করে চললে, তা বোধহয় ভুলব না।"
সমুদ্রের লোনা হাওয়ায় তনুশ্রী মধুর হাসিটি মিশিয়ে দিয়ে বলল, "এখনো তো একটা দিন বাকি!"
৪
"ছোড়দা, আগুন জ্বেলে কী করছিস রে?"
মীনা যে এভাবে কলেজ থেকে অসময়ে চলে আসবে, আলোক স্বপ্নেও ভাবেনি। ভেবেছিল নির্বিঘ্নে কার্যসাধন করবে। কিন্তু হল না। ধরা পড়ে গেল ছোট বোনের কাছে।
"এ কী! সুন্দর সুন্দর ড্রয়িংগুলো পুড়িয়ে ফেলছিস?"
"কিছুই সুন্দর নয়, মীনা। সব জঞ্জাল হয়ে পড়েছিল। তোদের তো আর সময় হয় না। দাদার ঘরটা একটু পরিষ্কার-টরিষ্কার করে দিবি! দেখ না, ঘরটার কী ছিরি হয়ে আছে!"
"থাক, ধরা পড়ে গেছিস। দু' চোখে জল কেন?"
"ধরতে হবে না, আমি পারব।"
৫
আত্মবিশ্বাসে ভরপুর তনুশ্রী ঢেউ ভেঙে একাই এগিয়ে চলে।
"বেশি দূর যেও না, পুরীর সমুদ্রকে চেনো নাই!"
"বেশ চিনি। কিচ্ছু হবে না। আপনি নির্ভয়ে..."
"পিছনে বিশাল ঢেউ! সাবধান! তনুশ্রী, মুখ ঘোরাও। বি রেডি..."
তনুশ্রী দেখল প্রকাণ্ড একটা উঁচু ঢেউ ধেয়ে আসছে... কিন্তু বেশ দূরে। ঠিক সময়ে ডুব দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে বারবার দ্বৈপায়ন একই কথা বলছে, "রেডি থাকো..."
"ঢেউ! ঢেউ! ডুব দাও, তনুশ্রী। চোখ বন্ধ করো। কানে আঙুল রাখো।"
প্রকাণ্ড উঁচু ঢেউ দ্বৈপায়নকেও ভিজিয়ে দিয়ে গেল। খুব ভয় পেয়ে গেছে সে।
ঢেউ মিলিয়ে গেছে... তনুশ্রী কোথায়!
সমুদ্রের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে যেতে কাতর কণ্ঠে, বিহ্বল সুরে ডাক দেয় আলোক, "তনুশ্রী..."
৬
আলোক বলল, "কই, তোমার দ্বৈপায়নবাবু তো এখনো এল না!"
তনু বলল, "এসে যাবে। কিন্তু তুমি কোথায় গিয়েছিলে, বললে না তো?"
"চাকরির সন্ধানে। ইন্টারভিউ ছিল।"
"প্রমোশনের চেষ্টা বুঝি?"
"না, না... চাকরিই পেলাম না, তার আবার প্রমোশন।"
"কেন, সেই ফার্মের চাকরি?"
"সে চাকরি তো কবেই খুইয়েছি।"
"নিশ্চয়ই বসের সঙ্গে ঝগড়া!"
"শুধু ঝগড়া নয়, জেল পর্যন্ত খেটেছি।"
"জেল! তুমি জেল খেটেছ?"
"হ্যাঁ, আগের দিনে যাকে শ্রীঘর বলত।"
"কিন্তু কেন?"
"বসকে থাপ্পড় মেরেছিলাম।"
"বসের গায়ে তুমি হাত তুললে!"
অবাক হলে? ভীষণ অন্যায় করে ফেলেছি, তাই না তনু?"
"সিওর। প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করবে, অথচ লয়ালটি দেখাবে না — এ হতে পারে না!"
"লয়ালটি নিশ্চয়ই বসকে অকারণ খুশি করা নয়!"
"তাও রাখতে হয় বৈকি। দ্বৈপায়নবাবুর কথাই ধরো। কোম্পানির এমডি তিনি। তাঁকে খুশি করতে কত অফিসারই তো সস্ত্রীক ছুটে আসে। তাঁর সামান্য প্রসন্নতায় ধন্য হয় সবাই।"
"শোষণের শৃঙ্খল পরা কারও কারও কাছে মৃত্যুর সমান, তনু। ওভাবে মরতে চাই না। চলি..."
"ইন্টারভিউ কেমন হলো?"
"তোমার শুভেচ্ছা থাকলে আরও ভালো হতো।"
তনু আনমনা হল। হারানো দিনের একটা তীর বুঝিবা বুকে এসে বিঁধল। বলল, "ওসব কথা আর নাই-বা মনে করালে, আলোকদা।"
"সরি, তোমাকে দুঃখ দিলাম। মাঝে মাঝে মনে হয়, তোমার-আমার মধ্যে আজ কত ব্যবধান! আসলে কী জানো, তোমার-আমার পথের প্রান্তে বিরাট এক সাগর এসে পড়ল। সাগরের এপার পর্যন্ত সমস্ত পথটা জুড়ে ছিল একই স্বপ্ন, একই অনুভূতি। তারপর... কখন তুমি সাগর অতিক্রম করলে। পেলে নতুন জগৎ। পুরোনো জগৎ ঝাপসা দৃষ্টি নিয়ে তোমার নতুন জগতের দিকে তাকায়। সে জগতের সুখ, সে জগতের অনুভূতি কিছুই তার জানা নেই...
বাষ্পঘন সমুদ্রের মাঝপথ হতে তাই ফিরে আসতে হয় বারবার। ওপারের নতুন ভুবন হতেও যদি না দেখা যেত ফেলে যাওয়া আলোকময় এপারকে! নতুন সুখ, নতুন অনুভূতির আতিশয্যে যদি বধির হতাম, তবে স্বপ্নের চিরসাথির দীর্ঘনিঃশ্বাসগুলি অহরহ কানে বাজত না। কবে দীপ জ্বেলেছিলাম, তার আলোকরেখা আমার হীরের খনির দ্যুতিকে আজও কতখানি অন্ধকার করে রাখে, কেউ বুঝবে না! কেউ খুঁজবে না! অমনি চোখে জল এসে গেল। ভুলে যেও না, তনু। প্রেম যে চিরউজ্জ্বল, চিরভাস্বর! আর তাই যদি না হবে, তবে এই সংঘর্ষময় জীবনের মাঝেও হারানো স্বপ্ন-অনুভূতিগুলিকে জড়িয়ে দগ্ধ হতে এত সুখ লাগে কেন! ওই তো তোমার দ্বৈপায়নবাবু আসছেন ওভারব্রিজের ওপর! আমি চলি, তনু..."
"পরিচয় করবে না?"
"আর হিংসা করতে ইচ্ছা করে না, তনু!"
"এখনো?"
"হ্যাঁ, তনু... তোমাকে নয়, তোমার ভাগ্যকে।"
"তাই কর। আলোকদা, তুমি তাই করো।" বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে তনু বলে উঠল।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।