মানুষ একটা জিনিস খুব যত্ন করে আঁকড়ে ধরে রাখে — "ট্রেডিশন"। আর আমরা ভারতীয়রাও এই শব্দটার প্রেমে হাবুডুবু খাই। আমাদের মনে হয়, আমাদের চারপাশের যা কিছু 'ঐতিহ্য', তা সব বৈদিক যুগ থেকে, নিদেনপক্ষে খনা-বরাহমিহিরের আমল থেকে সোজাসুজি আমাদের ড্রয়িংরুমে এসে ল্যান্ড করেছে। কিন্তু যেটাকে আমরা আমাদের সংস্কৃতি ভাবছি, সেটা যদি কোনো কোম্পানির সেলস টার্গেট হয়?
একটু খতিয়ে দেখলে বুঝবেন, যাকে আপনি ‘অনন্তকাল ধরে চলে আসা নিয়ম’ বলে ভক্তি করছেন, তার আসল জন্ম হয়তো আমেরিকার কোনো এক এয়ারকন্ডিশন্ড বোর্ডরুমে, নয়তো বম্বে-কলকাতার কোনো তড়তড়ে পিআর এজেন্সির মগজে! আসুন, আজ এরকম কিছু তথাকথিত ঐতিহ্যের হাড়হাদ্দ একটু চিনে নেওয়া যাক। মাঝে মধ্যে একটু ধাক্কা খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো!
লাল পোশাকে সান্টাদাদু: কোকা-কোলার স্পনসর্ড ইমেজ
ছোটবেলা থেকে ক্রিসমাসের কার্ডে আমরা যে ভুঁড়িওয়ালা, লাল কোট পরা, শ্বেতশুভ্র দাড়িঅলা, হো-হো-হো করা সান্টাকে দেখে আসছি — তাকে দেখলে মনে হয় না স্বয়ং যিশুর ঠিক পরের জেনারেশনের মানুষ?
টুইস্টটা এখানেই। আদি সেন্ট নিকোলাস কিন্তু রোগা-ভোগা, সিরিয়াস চেহারার একজন সাধু ছিলেন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাঁর পোশাকের রঙ কখনো সবুজ, কখনো বেগুনি, তো কখনো নীল, কখনো লালও হতো। কিন্তু ১৯৩১ সালে আমেরিকার এক ঠান্ডা পানীয় প্রস্তুতকারক কোম্পানি — হ্যাঁ, কোকা-কোলা — ভাবল, শীতকালে তো কেউ আর বরফ দেওয়া কোল্ড ড্রিংকস খায় না, সেলস বাড়াতে গেলে তো একটা জবরদস্ত ইমোশনাল ফায়ারপ্লেস লাগবে। তারা হ্যারল্ড সুন্ডব্লোম নামের এক ইলাস্ট্রেটরকে দিয়ে সান্টাকে একদম নিজেদের ব্র্যান্ডের লাল-সাদা রঙে রাঙিয়ে দিল। ব্যাস! কোকা-কোলা আমাদের কল্পনাকে এমন ‘স্ট্যান্ডার্ডাইজ’ করল যে, আজ লাল ছাড়া অন্য রঙের পোশাকে সান্টাকে দেখলে মনে হবে এটা নির্ঘাত ‘ফেক’ সান্টা। আমরা ভাবছি ঐতিহ্য, আসলে এটা একটা সাকসেসফুল উইন্টার ক্যাম্পেইন!
কোকা-কোলা সান্টাকে সৃষ্টি করেনি, কিন্তু পৃথিবীর কল্পনায় সান্টার "ডিফল্ট ভার্সন"টা প্রায় স্থায়ীভাবে ইনস্টল করে দিয়েছে।
হিরের আংটি: ডি বিয়ার্স-এর মাস্টার স্ট্রোক
"হিরে নাকি চিরদিনের!" বাঙালি মধ্যবিত্তের বিয়ের বাজারেও এখন সোনার পাশাপাশি একটা ছোট্ট হিরের কুচি না থাকলে কেমন যেন স্ট্যাটাস ডিসকাউন্ট হয়ে যায়। পাত্রীপক্ষ ভাবেন, মেয়েকে হিরে দেওয়া মানে ভালোবাসার গভীরতা মাপা। কিন্তু ১৯৩৮ সালের আগে খোদ আমেরিকাতেও এনগেজমেন্টে হিরের আংটি দেওয়ার চল খুবই সীমিত ছিল। তখন মানুষ সোনা, নীলকান্তমণি বা রুপো দিত।
১৯৪৭ সালে এল সেই অমর স্লোগান — A Diamond is Forever। ব্যস, ভালোবাসা নামক একটা বায়বীয় অনুভূতিকে তারা একটা খনিজ পাথরের সাথে আঠা দিয়ে জুড়ে দিল। আজ যে হিরে কিনে আমরা ভাবি আভিজাত্য, তা আসলে গত শতাব্দীর অন্যতম বড় একটা কৃত্রিম মনোপলি আর্ট!
তাই আজও বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের রিজার্ভে সোনা মজুত রাখে, হিরে নয়। কারণ সোনার আন্তর্জাতিক বাজার অনেক বেশি লিকুইড এবং এর দাম নির্ধারণও তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ। অন্যদিকে এক গয়নার দোকান থেকে কেনা হিরের গয়না অন্য দোকানে একই গুরুত্ব বা মূল্য পাবে — এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
ভালোবাসা চিরদিনের হতে পারে, কিন্তু হিরের রিসেল ভ্যালু নয়।
ধনতেরাস: ধন্বন্তরি যখন ধনকুবের!
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ ছিল, ইদানীং যুক্ত হয়েছে ‘ধনতেরাস’। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশীতে এখন কলকাতার গয়নার দোকানে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। সবাই সোনা বা বাসন কিনতে ছুটছেন, কারণ ওটা নাকি ‘শুভ’! সোনা না কিনলে যেন লক্ষ্মীদেবী বাড়ি থেকেই পালাবেন।
এবার শুনুন আসল সত্য। এই দিনটার আসল নাম ছিল ‘ধন্বন্তরি ত্রয়োদশী’। ধন্বন্তরি কে? পুরাণ মতে তিনি সমুদ্রমন্থন থেকে উঠে আসা আয়ুর্বেদের দেবতা, স্বাস্থ্যের দেবতা। এই দিনে মানুষ নিজের ও পরিবারের সুস্বাস্থ্যের প্রার্থনা করত। কিন্তু শব্দের খেলা দেখুন — ‘ধন্বন্তরি’র ‘ধন’ শব্দটাকে আমরা খুব সুবিধাজনকভাবে গুলিয়ে ফেললাম ধনসম্পদ আর টাকা-পয়সার সাথে। বাজার এই ভাষাগত কনফিউশনটাকে লুফে নিল। এবং মার্কেটিংয়ের কৃপায় জনমানসে ধনতেরাস মানে "আজ কিছু না কিনলে অমঙ্গল" — প্রায় এমনই একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। যে দেবতা আমাদের প্রেসক্রিপশন লিখতেন, তাকে আমরা এখন সোনার বিল লিখতে বসিয়ে দিয়েছি!
সিগারেট: ফুসফুস পোড়ানো ‘উইমেন্স লিবারেশন’
সবচেয়ে মারাত্মক সাইকোলজিক্যাল খেলাটা খেলেছিলেন এডওয়ার্ড বার্নেস — যাঁকে পাবলিক রিলেশনসের (এবং প্রপোগান্ডারও) জনক বলা হয়। আর একটা পরিচয় দিই? তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত সাইকোঅ্যানালিস্ট সিগমন্ড ফ্রয়েডের আপন ভাগ্নে! মামার সাইকোলজিকে ভাগ্নে কীভাবে ব্যবসায় লাগালেন, দেখুন।
১৯২০-র দশকে আমেরিকায় মেয়েদের প্রকাশ্যে ধূমপান করাটা সামাজিকভাবে চরম ট্যাবু ছিল। আমেরিকান টোব্যাকো কোম্পানি দেখল, দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা যদি সিগারেট না ছোঁয়, তবে তো বিশাল লস! তারা বার্নেসকে দায়িত্ব দিল।
বার্নেস কোনো সাধারণ বিজ্ঞাপন বানালেন না, তিনি মেয়েদের ইমোশন আর অধিকারের জায়গায় হিট করলেন। তিনি তাঁর মহিলা সেক্রেটারিকে দিয়ে শহরের নামী ও অভিজাত পরিবারের মেয়েদের কাছে গোপনে একটা টেলিগ্রাম পাঠালেন। তাতে সামাজিক ট্যাবু ভেঙে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠা করতে নিউ ইয়র্কের ইস্টার প্যারেডে মহিলাদের জনসমক্ষে সিগারেটে খেতে আহবান জানানো হলো।
"Torches of Freedom" নামের এই মার্কেটিং ক্যাম্পেইন এতটাই সফল যে তৎকালীন বিখ্যাত সাংবাদিক ও নারীঅধিকার অ্যাক্টিভিস্ট রুথ হলও নারীদের এই পদযাত্রায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন এই বলে:
Women! Light another torch of freedom! Fight another sex taboo!
কোথাও কোনো ব্র্যান্ডের নাম নেই, কোনো পেইড মডেল নেই! ওদিকে বার্নেস নিজে আগে থেকে সব মিডিয়া আর ক্যামেরাম্যানদের ফিফথ অ্যাভিনিউতে লাইন করিয়ে রেখেছিলেন। মেয়েরা টেলিগ্রাম পেয়ে জড়ো হলো, সিগারেট ধরালো, আর পরদিন খবরের কাগজের ফ্রন্ট পেজে হেডলাইন হলো — "মেয়েরা স্বাধীনতার দাবিতে ধূমপান করছে!" সিগারেট হয়ে উঠল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে মেয়েদের বিদ্রোহ আর নারী স্বাধীনতার প্রতীক। যেটা ছিল আদতে একটা প্রিপ্ল্যানড মার্কেটিংয়ের স্ক্রিপ্ট, মানুষ সেটাকে ভাবল স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব।
এর পরের কয়েক বছরে নারীদের মধ্যে ধূমপান দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। সেই মনস্তত্ত্বের খুব একটা পরিবর্তন আজও হয়নি। এখনও অনেক তরুণ-তরুণী প্রথম সিগারেটে টান দেন নিকোটিনের জন্য নয়, বরং বিদ্রোহের অনুভূতিটাকে ছুঁয়ে দেখতে। নেশাটা অনুসরণ করে আসে।
টুইস্টটা কোথায় জানেন? যে মানুষটা গোটা দেশের মেয়েদের মগজে সিগারেটকে ‘আজাদি’র প্রতীক হিসেবে স্ক্রিপ্ট করে দিলেন, জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনিই ধূমপানের ক্ষতি সম্পর্কে প্রকাশ্যে সতর্কতার কথা বলেন। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে ধূমপানকে একটি "antisocial action" বলেও মন্তব্য করেছিলেন।
এর মানে এই নয় যে সব ঐতিহ্য বানানো, বা সব রীতির পেছনে কোনো কর্পোরেট ষড়যন্ত্র আছে। তবে ঐতিহ্য যেমন অনেক সময় জন্মায় সমাজে, তেমন আবার অনেক সময় জন্ম দেয় বাজারও। এই পুরো খেলাটাকে ইতিহাসবিদ এরিক হবসবম ও টেরেন্স রেঞ্জার বলেছিলেন Invention of Tradition বা ‘ঐতিহ্যের আবিষ্কার’।
আসলে কর্পোরেট যখন কোনো জিনিসকে আপনার মগজে ‘ঐতিহ্য’ বলে গেঁথে দিতে চায়, তখন তারা ব্যাকগ্রাউন্ডে এতটাই নিখুঁত স্ক্রিপ্ট লেখে, যে বিষও অমৃতের মোড়কে বিক্রি করা সম্ভব হয়।
আর পলিটিক্স?
...সেটা নিয়ে না হয় পরে কোনোদিন আলোচনা করা যাবে।
মূল ভাষা: ইংরেজি। এটি বাংলা অনুবাদ।
লেখক মার্কেটিং ম্যানেজমেন্টে এমবিএ এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট। ভোর ৪:৩০-এ উঠে নিয়মিত ব্যায়াম করেন; বজরংবলীর ভক্ত। বাঙালি না হয়েও বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ রয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি 'উদ্যোগ' ওয়েব ম্যাগাজিনে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করেন।