ফুটবলের প্রতি বিশেষ করে বাঙালির আবেগ যে কতটা খাঁটি, তার প্রমাণ মেলে ১৯৯৭ সালের ফেডারেশন কাপের সেমিফাইনালে, যেখানে কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে ইস্ট বেঙ্গল বনাম মোহনবাগানের ম্যাচে রেকর্ড ১.৩ লাখ দর্শক উপস্থিত হয়েছিল।
অবশ্য এই আবেগের শিকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। সেই কবে ১৯১১ সালে ব্রিটিশদের বুট পরা অপরাজিত ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্টকে খালি পায়ে ২-১ গোলে হারিয়ে মোহনবাগান আইএফএ শিল্ড জিতেছিল। সেটি শুধু একটা ম্যাচ জয় ছিল না, ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক অদম্য লড়াই।
তাহলে আজ আমাদের এই দশা কেন? ১৪০ কোটির একটি দেশ একটা বিশ্বকাপ দল তৈরি করতে পারে না। বৈপরীত্যটা সত্যিই চোখে পড়ার মতো।
আসলে মূল সমস্যাটা প্রতিভার অভাব নয়। আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে ভারত না থাকলেও, ভারতীয় বংশোদ্ভূত একাধিক ফুটবলার বিভিন্ন দেশের হয়ে বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জনকারী দলে খেলছেন। নিউজিল্যান্ডের সরপ্রীত সিং, অস্ট্রেলিয়ার নিশান ভেলুপিল্লাই, ডিআর কঙ্গোর স্যামুয়েল মুতুসামি কিংবা কাতারের তাহসিন মোহাম্মদ জামশিদ তারই উদাহরণ।
অর্থাৎ প্রতিভা আছে, আবেগও আছে। অভাব সঠিক পরিকাঠামো, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং আধুনিক স্পোর্টস সায়েন্সের কার্যকর ব্যবহারের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রিকেট যেখানে ভারতের ক্রীড়া বাজারের সিংহভাগ দখল করে নিয়েছে, ফুটবল সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার শিকার হয়েছে। বাংলা, কেরালা কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের গলিতে গলিতে প্রতিভার অভাব নেই; কিন্তু সেই প্রতিভাকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার মতো যুব অ্যাকাডেমি, কোচিং কাঠামো ও পেশাদার ফুটবল সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি।
তবুও বিশ্বকাপ এলে আমাদের ফুটবলপ্রেমের বিন্দুমাত্র অভাব হয় না। নিজেদের দেশের পতাকা মাঠে না উড়লেও, ধার করা পতাকা নিয়েই আমরা উন্মাদনায় মেতে উঠি। পছন্দের টীমের পক্ষ নিয়ে বন্ধুদের সাথে ঝগড়া না করলে বাঙালির ফুটবল বিশ্বকাপ সম্পূর্ণ হয় না। আগামী ৪০ দিন শুধু ঝগড়া করার স্বার্থে আমরা আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড বা অন্য যে কোনো দেশের নাগরিক হয়ে যেতে পারি।
হয়তো এটাই ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর দিক। বিশ্বকাপ আমাদের নয়, কিন্তু বিশ্বকাপের আনন্দটা আমরা নিজেদের করে নিতে জানি।
প্রকাশিত হলো — বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর ❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ সংখ্যা। সাহিত্য, ভাবনা ও সৃজনশীলতার নানা রঙে সাজানো এই সংখ্যায় আপনাকে স্বাগত।
চলুন, একসাথে পড়ি, ভাবি, আর Glocal বাংলার জন্য Vocal হই।