কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
উত্থানের পূর্বলগ্ন
জীবুন্নেষা খাতুন
একদিন ছিঁড়ে যাবো এই নিয়তির জাল,
মুঠোয় পুরবো আমি ঝোড়ো হাওয়া, মহাকাল।
চারিদিকে চক্রব্যূহ, নিয়মের নিষ্ঠুর উল্লাস,
তারি মাঝে গুমরে মরে ক্ষয়ে যাওয়া বিশ্বাস।
সবাই তো মেতে আছে কৃত্রিম আলোকের মোহে,
আমার একাকীত্ব পুড়ছে শুধু তীব্র দোহে।
অস্তিত্ব বোধহয় এক অন্তহীন দহন,
বাস্তবতার মঞ্চে শুধু মুখ বুজে সহন।
মরীচিকা পিছে ছুটে ক্লান্ত এই চারণভূমি,
শত আঘাতেও আজ স্তব্ধ, নির্বাক তুমি।
তাই নির্মমতার কাছে থমকে দাঁড়ায় অধিকার,
বুকের পাঁজরে জমে উপেক্ষার অন্ধকার।
তবুও অমাবস্যার রাতে যখন চূর্ণ মেঘেরা ডাকে,
রক্তের প্রতিটি বিন্দু নতুন এক স্পর্ধাকে আঁকে।
পথটা হয়তো দুর্গম, চারিপাশে শুধু শ্যেনদৃষ্টি,
সময়ের চাবুকে হবে বেদনার অবিরাম সৃষ্টি।
তবুও একদিন এই ধ্বংসস্তূপের বুক চিরে,
আমার আত্মপ্রকাশ ঘটবে রুদ্ররূপের ভিড়ে।
সেদিন স্তব্ধ হবে এই অহংকারী মহাবিশ্ব,
আমার জয়ের আলোয় জগত মেনে নেবে তারাদৃশ্য।
লেখিকা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করে বর্তমানে B.Ed অধ্যয়নরত। পেশাগতভাবে একটি স্কুলে জীবন বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে। নিয়মিত না লিখলেও লেখাই তাঁর অনুভব প্রকাশের সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম। ভাবনা, অনুভূতি ও জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়গুলোকে শব্দে ধরতে ভালোবাসেন।
অসম্পূর্ণতার ভেতর পূর্ণতা
অশোক নন্দন
তোমার চোখে প্রথম যে আলোর রেখা দেখেছিলাম,
সেটা ভোর ছিল না —
ছিল এক অচেনা ঋতুর শুরু।
তুমি হেসেছিলে খুব স্বাভাবিকভাবে,
আর আমি ভেতরে ভেতরে বদলে গিয়েছিলাম।
তোমার নামটা উচ্চারণ করলে এখনো
জল ছুঁয়ে ওঠা বাতাসের মতো লাগে —
নরম, কিন্তু গভীর কোনো সুর রেখে যায়।
আমরা কোনো বড় প্রতিশ্রুতি দিইনি কখনো,
শুধু হাঁটছিলাম পাশাপাশি,
সময়ের ভিড়ের ভেতরেও একটু আলাদা হয়ে।
তোমার হাত ধরার মধ্যেকোনো নাটক ছিল না,
শুধু ছিল একরাশ নিশ্চিন্ত নীরবতা।
ভালোবাসা বোধহয় এমনই —
কথার চেয়ে বেশি থাকে বিরতিতে,
স্পর্শের চেয়ে বেশি থাকে অনুপস্থিতিতে।
আজও যখন তোমাকে ভাবি, মনে হয় —
সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি,
কিছু কিছু অনুভূতিচিরকাল অসম্পূর্ণ থাকলেই
সবচেয়ে সম্পূর্ণ হয়।
আশ্রয়
সন্দীপ গাঙ্গুলী
আমার একপাশে পাহাড়িয়া ফুলডুংরি
আর অন্যপাশে উত্তরের তোর্সা
স্বপ্নেরা ঘন হয়ে জড়িয়ে রাখে
মাছরাঙার ঠোঁটের শৈশবকে
কাপাস তুলোর মত ভেসে বেড়ায়
দখিনা বাতাসের সান্নিধ্যে,
পরীদের সাজিয়ে তুলি
জলফড়িংয়ের ডানার গোধূলীর রঙে
সবুজ ঘাসের ডগায় তিরতির করে
একটা অনন্ত দুপুর...
এরাই আমায় ভালবাসতে শেখায়
আমার স্বপ্ন সকল রাখা থাকে
কোন নাম না জানা পাখির
উদাস করা গ্রীবায়
আমার বালিশে চাদরে আগলে রাখতে চাই
ঘুমাতুর চোখের অপ্রাপ্তির অভিলাষ।
জানলার পর্দা সরিয়ে আলো ঢুকে আসে
শহুরে জীবন ব্যস্ত হওয়ার আগেই
সবার অলক্ষ্যে লুকিয়ে রাখি
আমার টুকরো টুকরো আলসে আদরে মাখা
রংবিলাসের মুহূর্তদের।
অদৃশ্য প্রেমের অগ্নি
স্মৃতিলেখা মাইতি
প্রেম কেমন হয়, বলো তো,
বলতে পারবে কি তুমি?
যদি আমি খুব ভুল না হই,
প্রেম মানে থাকে শত চেষ্টার পর ভুলে না যাওয়া।
প্রেম মানে কাছে থাকা নয়,
প্রেম মানে মনের গভীরে যাওয়া।
আর সেই মনের প্রেম হল অদৃশ্য অগ্নিবীর,
যে অগ্নিবীর জ্বলবে,
কিন্তু প্রকাশ পাবে না।
তবে সেই অগ্নিবীরের তাপ
নিরবে অনন্তকাল জ্বলতে থাকে,
মনে মনে অদৃশ্য এক আলোয়,
সেই প্রেমের চিরন্তন ধারা বহে যায়।
যে ভালোবাসা কখনো সত্যি প্রকাশ পায় না,
তবে মনের গহীনে চিরকাল রয়ে যায়।
প্রেম যেন এক অনন্ত সঙ্গী,
দুঃখের মুহূর্তেও যা আমাকে মনে করাবে,
যে ভালোবাসা কখনোই হারিয়ে যায় না।
এই প্রেম আমার অন্তরের শক্তি,
যা আমাকে সবসময় সাহস দেবে।
যেখানে প্রিয় মানুষটি নিজেও জানে না,
কিন্তু হৃদয়ের নিঃশব্দ সংযোগ
সবসময় বর্তমান থাকে।
কোনো কারো ওপর নির্ভর না করে,
নিজের মানসিক জগতে
এক চিরন্তন আনন্দের আশ্রয়।
লেখিকা বর্তমানে বি.এড. পাঠরত। ছবি আঁকা, কবিতা লেখা এবং বিভিন্ন ধরনের সৃজনশীল লেখালিখির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। অবসর সময়ে তিনি সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে ভালোবাসেন। প্রকৃতি, সমাজ ও মানুষের অনুভূতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর লেখার বিষয়বস্তু গড়ে ওঠে। সাহিত্য ও শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্যতম প্রেরণা।
অধিকারহীন
গৌতম কুমার রায়
জানি, পাবো না কোনোদিন,
তবুও তোমাকে বেসেছি ভালো,
মনে হয়,
কোনো এক ভোরে ফিরে এসে তুমি বলবে,
"এইতো আমি,
শুধু তোমার হয়ে থাকব বলে এলাম।"
সে ভোর আর আসে না,
তবুও রাতের তারা জেগে থাকে,
হৃদয়টা অবুঝ,
আশার সলতে নেভাতে জানে না।
যার উপর কোনো অধিকার নেই,
তার জন্যই বুক ফেটে যায়,
নিশুতি রাতে জমে ওঠে
না-বলা কথার হিমালয়।
তুমি হাসো দূরের বারান্দায়,
অন্য কারো গানের সুরে,
আমি সেই হাসি কুড়িয়ে রাখি
পুরনো ডায়েরির ভাঁজে,
লুকিয়ে রাখি চোখের নোনা জল,
যাতে কেউ না দেখে।
ডাকতে মানা, ছুঁতে মানা,
তবু মন তো নিয়ম মানে না,
নিষেধের কাঁটাতার ডিঙিয়ে
ছুটে যায় তোমার উঠোনে।
তুমি থাকো স্বপ্নের গোপন কুঠুরিতে,
যেখানে চাবি নেই, তালা নেই,
শুধু দীর্ঘশ্বাস আছে।
অধিকার নেই, তবু ভালোবাসি —
এইটুকুই আমার বেঁচে থাকা,
তোমার হতে পারিনি বলে
এইটুকুই আমার যন্ত্রণা।
লোকে বলে
ভালোবাসার অন্য নাম নাকি বেদনা,
তাই বুঝি আজও তোমার ছায়ার পিছে
মন ছুটে যায় অকারণে।
তুমি কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকো বুকের গভীরে,
তবুও তোমায় বুকেই রাখি পরম আদরে,
কারণ আমি জেনে গেছি —
বেদনা ছাড়া ভালোবাসা বাঁচে না
এই পৃথিবীর কোনো ঘরে।
লেখক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ গোয়েঙ্কা কলেজ অফ কমার্স অ্যান্ড বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে অ্যাকাউন্টেন্সিতে অনার্সসহ বি.কম. ডিগ্রি অর্জন করেছেন। কবিতা, গল্প, অনুগল্প, ভ্রমণকাহিনি, ছড়া, প্রবন্ধ ও পত্র রচনায় তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে তাঁর প্রথম একক পঞ্চবান কাব্যগ্রন্থ ‘জীবন রেখা’ প্রকাশিত হয়। পরের বছর কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলায় প্রকাশিত হয় একক কবিতা সংকলন ‘তোকে ছাড়া…’ এবং একক পঞ্চবান কাব্যসংকলন ‘রামধনু রং’। সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তিনি জীবনের নানা অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে শব্দে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে চলেছেন।
চন্দ্রালোকে প্রেয়সী
আসারুল সেখ
প্রাণপ্রিয়েষু,
নিশীথের নীরবতায় যখন চন্দ্রালোক
আমার কাননে নেমে আসে,
আমার অন্তর তখন শুধু
তোমারই অনুরাগে ভরে ওঠে।
হে প্রিয়তমেষু,
তোমার পল্লবের ন্যায় স্নিগ্ধতা
সমীরণের মতো ছুঁয়ে যায় আমার চিত্ত।
অজান্তেই তব অনুরাগে ডুবে থাকে
আমার নিঃশব্দ মন।
বিরহের এই নিঃশব্দ প্রহরে
তোমার লাবণ্যময় মুখ যেন
চন্দ্রালোকে ভাসে।
নিশীথের নক্ষত্ররা
শিযেন তব লাবণ্যেরই মৃদু প্রতিচ্ছবি।
হে মমপ্রিয়েষু,
আমার চিত্তে যখন মর্মবেদনা ভাসে,
তব উপস্থিতি তখন
সুধাধারা হয়ে নামে আমার অন্তরে।
হে হৃদয়প্রিয়েষু,
জেনে রেখো —
এই অন্তরের অনন্ত অনুরাগ
চিরকাল তোমারই জন্য।
যেথা নীরব গোধূলি নামে,
সেথা তব স্মৃতিই আমার একমাত্র আলো।
গভীর বিশ্বাস
রানী সেন
মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা রেখে যাবো আমি,
এই বিশ্বাস নিয়ে ছুটে চলি অনন্তকাল।
যেখানে থাকবেনা কোনো বন্ধ দুয়ার
প্রয়োজনে সবার পাশে থাকবে সবাই।
যেখানে ফুটবে কাঁটা বিহীন সুগন্ধ গোলাপ
হাজার পাপড়ি নিয়ে ফুটে উঠবে পদ্ম,
সুরভিত মনের মাধুরী দিয়ে গাঁথা হবে মালা।
ভালোবাসার মেলবন্ধন হবে বিশ্ব জুড়ে।
মানুষের মনের যত হিংসা হানাহানি লোভ
ফল্গুধারায় সবকিছু ধুয়ে যাবে এক লহমায়।
স্রোতস্বিনী ধারা বয়ে নিয়ে যাবে আলোকিত প্রাণ।
অফুরন্ত স্বপ্ন বুকে জড়িয়ে
একসাথে সবাই এগিয়ে যাবে নতুন পথের খোঁজে।
এক গভীর বিশ্বাসে এই স্বপ্ন দেখি আমি প্রতিদিন।
লেখিকা একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে এবং সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক সাহিত্য পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ 'ফিরে এসো রোদ্দুর' এবং গল্পসংকলন 'ভালোবাসার কখনো মৃত্যু হয় না'। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি মানুষের অনুভূতি, সম্পর্ক ও জীবনের নানা অনুষঙ্গকে তুলে ধরতে ভালোবাসেন।
আমার কালি মা
তীর্থ মুখার্জী
দেহপট শোধন করে,
নয়ন মাঝে তোমায় ভেবে
তোমায় নিয়ে যাপন করি
অবিচ্ছেদ্য অবিরাম
কলি যুগের কালিমা
আমায় মাখতে দিলো না আমার কালি মা।
এযুগের নামে কাটে পানি আর ভক্তিতে জল রে।
গুরু ভজি বলে কালি,
কালো মানিক দেখায় দিলি।
কলি যুগের কালিমা
আমায় মাখতে দিলো না আমার কালি মা।
গুরুর দেহে তোমার বাস
আমি পাই তার নির্যাস।
মাঠে ঘাটে ঘুরে মরি
তবু পাইনি গুরুর দেখা রে
খুঁজতে খুঁজতে তিনিই দেখি
বসে আছেন অন্তরেতে।
কলি যুগের কালিমা
আমায় মাখতে দিলো না আমার কালি মা।
শব্দের জীর্ণ রিকশাওয়ালা
পাগল দার্শনিক
কলম টানা এক শ্রমজীবী মজদুর
আমি কণ্ঠের উচ্চারণে
সভামঞ্চ কাঁপাতে পারি না;
তাই শব্দের নীরব অন্ধকারেই আশ্রয় খুঁজি।
আমি কবি নই —
আমি মূলত শব্দবাহী এক ক্লান্ত বাহক,
ভাষার অন্তঃপুরে ঘাম ঝরানো এক দিনমজুর।
দিনের অন্তিম প্রহরে যেমন কোনো কুলি
কাঁধে জমে থাকা ধুলোর স্তর ঝেড়ে ফেলে,
আমিও তেমনি বাক্যের শরীর থেকে
ক্লান্তির ক্ষতচিহ্ন মুছে দিই।
লেখা আমার কাছে
কোনো স্বর্গীয় অলৌকিকতা নয়,
নয় দেবদূতের উপহারস্বরূপ কোনো আশীর্বাদ।
এ এক অন্তহীন দহন,
রক্তে গলিত শ্রমের নোনাধরা উপাখ্যান।
প্রতিটি বাক্য যেন
পাথর কেটে পথ নির্মাণের শ্রমসাধ্য আয়োজন;
প্রতিটি উপমা যেন
খর রৌদ্রে ঘামভেজা কোনো মজুরের স্তব্ধ দীর্ঘশ্বাস।
মানুষ সাহিত্যকে নক্ষত্রলোকের জাদু বলে ভ্রম করে,
অথচ আমি জানি —
শব্দের ভিতরে সামান্য আলো জ্বালাতে হলে
কত বিস্তীর্ণ অন্ধকার বয়ে নিতে হয়।
আমি কোনো অলংকারসর্বস্ব সাহিত্যসভায়
জন্ম নেওয়া মানুষ নই;
আমি ভাঙা চায়ের দোকানের ধোঁয়াটে বিকেল,
লোকাল ট্রেনের গুমোট ভিড়ে
আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাস,
কাদামাটির গন্ধমাখা
শ্রমিকহাতের কর্কশ আত্মীয়তা।
আমার কলম কোনো
সৌখিন অভিজাত্যের অলংকার নয়;
এটি ক্ষুধার বিরুদ্ধে প্রতিদিন টেনে চলা
এক জীর্ণ রিক্সা,
যার চাকায় জমে থাকে
অনাহার, অপমান আর অবহেলার শুকনো কাদা।
কখনো কখনো মনে হয়,
আমি কাগজের উপর শব্দ লিখি না —
ইট বহন করি।
আমি অলংকার নির্মাণ করি না,
বোঝা নামাই।
আর সেই বোঝা নামানোর বিনিময়ে যদি
দু’মুঠো স্বীকৃতি কিংবা সামান্য মানবিক স্নেহ জোটে,
তবেই দিনের শ্রম সার্থক মনে হয়;
তবেই রাত্রির ক্ষুধার্ত নীরবতা
কিছুক্ষণের জন্য হলেও স্তব্ধ হয়ে আসে।
কারণ আমি জানি —
সাহিত্য আসলে কোনো রাজমুকুট নয়;
এটি ক্রুশবিদ্ধ এক শ্রমের নাম।
শব্দ মানে কেবল সৌন্দর্য নয়,
শব্দ মানে আত্মক্ষরণও।
আর যে মানুষ নিজের অন্তর্গত রক্তক্ষরণকে
ভাষার শরীরে ধারণ করতে পারে,
একমাত্র সেই-ই হয়তো সত্যিকারের লেখক।
প্রভাতের শিশিরভেজা আলোয় তাই
আজও আমি শব্দের পুরোনো রিক্সা টেনে চলেছি —
ক্লান্ত, তবু অবিচল;
নিঃস্ব, তবু অন্তর্গত বিশ্বাসে দীপ্ত।
লেখক সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ রচনায় তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব অনুভূতির ভুবন, যেখানে জীবনদর্শন, প্রেম, প্রকৃতি ও আধ্যাত্মিক ভাবনা এক অনন্য মেলবন্ধনে ধরা দেয়। পেশায় একজন সরকারি কর্মচারী হলেও অন্তর্লোকে তিনি নিরন্তর এক সাধক-লেখক। তাঁর ছদ্মনাম “পাগল দার্শনিক”— যা তাঁর সাহিত্যচিন্তারই প্রতিফলন: প্রশ্নমুখর, অনুভবনির্ভর এবং অস্তিত্বসন্ধানী।
সবার উপরে মানুষ সত্য
গোবিন্দ মোদক
বিশ্বজুড়ে বন্ধু আমার হিন্দু মুসলমান,
পার্সি জৈন শিখ বৌদ্ধ কিংবা খ্রিষ্টান।
বিশ্ব-ভ্রাতৃত্বের ছোঁয়া আমার রক্ত জুড়ে,
গান গাই আমি বিশ্বজুড়ে মানবতার সুরে।
একমাত্র তীর্থ আমার এই পৃথিবীর মাটি,
বিশ্ববাসী ভাই-বোন সব এই কথাটা খাঁটি।
ভালোবাসি কলকাতা ঢাকা প্যারিস লন্ডন,
পৃথিবীতে অসহায় যতো আমার আপনজন।
বিশ্বাস করি সবার মধ্যেই আছেন ভগবান,
ঈশ্বর আল্লাহ বা গড বলো তিনি বিরাজমান।
মন্দির-মসজিদ হৃদয়েতে, গির্জাও মনের মাঝে,
তিনি আছেন সর্বত্রই সকল রকম কাজে।
"সবার উপরে মানুষ সত্য" – মনে রাখা চাই,
মানবতার চেয়ে বড়ো আর কিছু তো নাই।
লেখক ‘কথা কোলাজ’ সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক, জন্ম নদীয়া জেলায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.কম ডিগ্রিধারী এই প্রচারবিমুখ, আত্মমগ্ন মানুষটি ছোটবেলা থেকেই কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রম্য রচনা, উপন্যাস এবং ছোটদের জন্য ছড়া-কবিতা ও গল্প লিখে চলেছেন। নানা বিষয়ে সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি লেখা দেশ-বিদেশের অসংখ্য পত্র-পত্রিকা ও দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫টি। পেয়েছেন বহু পুরস্কার ও সম্মাননা।
হারানো দিন
অলোক রায়
আবার আমি ফিরতে চাই,
সেই ছোট্ট বেলার দিনে,
বাবা যখন মেলার মাঠে,
বেলুন দিতো কিনে।
দুপুর বেলায় মাঠের ধারে,
ঘুড়ি উড়াতাম কত,
রাতের বেলায় দাদুর কাছে,
গল্প শুনতাম কত।
ঠাকুমার ঐ বৃদ্ধ মুখে,
আদরভরা ডাক,
দাদুভাই, কাল সকালে গল্প হবে —
এখন নাহয় থাক।
ইস্কুল থেকে ফেরার পথে,
দৌড়োদৌড়ি করা,
মাস্টারমশাই ঘা মারতো,
দিতে না পারলে পড়া।
খেজুর গাছের রসের হাঁড়ি,
ভেঙেছি কত — হিসেব নেই,
পিচ রাস্তার পাথর নিয়ে,
ঢিল ছুঁড়ে কত দৌর দেই।
রোজ রবিবার ছুটির দিন,
সবচেয়ে বড় খুশির দিন,
পাড়ার যত বন্ধু মিলে,
ক্রিকেট খেলাতাম সারাদিন।
বিকেলে গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে,
একটাই ছিল ভয়,
হোমমাস্টার লাঠি হাতে,
দারুণ ছিল নির্দয়।
মায়ের স্নেহ, বাবার আদর,
দাদু-ঠাকুমার সাথে,
পড়তে বললে ভাত খাবোনা —
বায়না করতাম রাতে।
দুর্গাপুজোয় নতুন জামা,
নতুন করে সাজা,
হাতে বন্দুক, চশমা চোখে,
সাজতাম মহারাজা।
ছোট্ট বেলার দিনগুলো সব,
চোখের সামনে ভাসে,
আনমনা হয়ে নিজেকেই বলি —
তা কি আর ফিরে আসে।
ক্লাচার
অঙ্কিতা মন্ডল
মায়াবী চোখের টানে
কখনো পাগল হইনি,
অঙ্গুলির চরম স্পর্শে
কখনো আটকে রইনি।
আমায় আটক করেছে
তোমার মেঘবরেণ্য কেশ,
শৌখিন কাঁটা গাঁথলে তাতে
লাগতো বড়ো বেশ।
শৌখিন কাঁটা হয়ে
খোপায় সাজতে চাই না,
সৌন্দর্যের রমরমাটা
আমার ঠিক সয় না।
চাই থাকতে ওই অগোছালো
চুলে আটকে রয়ে,
পরিপাটি না,
তোমার স্বাচ্ছন্দ্যের ক্লাচার হয়ে।
লেখিকা মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা এবং বর্তমানে বহরমপুর কলেজে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক স্তরে অধ্যয়নরত। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা 'কালো', যা 'আলোর ঘ্রাণ' সংকলনে স্থান পেয়েছিল। এছাড়াও 'শখের কলম', 'চিত্ত নিয়ন্ত্রণ', 'রাধাকৃষ্ণ রঙ্গ' এবং 'The Restless Time' শীর্ষক রচনাগুলি বিভিন্ন সংকলন ও সাহিত্যপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। সাহিত্যচর্চার পথে তিনি এখনও নিরন্তর অনুসন্ধানী—সিন্ধুর সন্ধানে বিন্দু সৃষ্টির সাধনায় নিয়োজিত এক নবীন কলম।
প্রাণ ভোমরা
সুজাতা সরকার
ধুলি মেদুর পথে সবুজের আচ্ছাদনে
সে শান্তির নীড় এক বুক আশা সোনালী স্বপ্নের ভিড়ে
আজ ও এই হৃদয়মাঝে স্মৃতির ভিড় তোলে
পাখীর কলতানে,
নিস্তব্ধ ধূধূ গানে
বাতাসের শব্দ যেথা
চুপিচুপি কথা বলে
ফুলের রঙে রঙিন সে পুষ্প
রমনী সর্বদা যেন তাই আনন্দ হিল্লোল তোলে।
দূরে ওই ঝর্নার জলে গোলাপী রঙ্
পদ্মেরা পাথরের বুকে যেন গড়ে চলে
অমোঘ প্রেম কাহিনী
একা সে পথে যেতে
বুকের মধ্যে প্রকৃতি ভরে
প্রাণ কথা শোনায় সে স্বপ্নালু বাহিনী।
লেখিকা একজন সরকারি স্কুলের উচ্চমাধ্যমিক বিভাগের শিক্ষিকা। অবসর সময়ে ভ্রমণ ও লেখালেখি তাঁর প্রিয় অনুষঙ্গ। ভ্রমণের পথে প্রকৃতির রূপ, বৈচিত্র্য ও অনুভূতিকে তিনি শব্দে প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। চারপাশের অভিজ্ঞতা ও অনুভব থেকেই তাঁর লেখার উপাদান সংগ্রহ করা হয়, যা পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে তিনি ভালোবাসেন।
প্রথম ক্ষণ
অচিন পাখি
প্রতুলের সাথে ঐশ্রীর প্রথম দেখা
অচিন পাখির এক দেশে,
সন্ধ্যার রঙ মিশেছিল তখন
নদীর নরম আবেশে।
নীল শাড়ি গায়ে, আলতা মাখা পায়ে,
সে যেন হেঁটে আসে কোনো রূপকথার ছায়ে।
চোখ দুটো তার
শ্রাবণের ভেজা মেঘের মতো গভীর,
হাসিতে লুকিয়ে ছিল কতো অজানা অধীর।
প্রতুল তখন থমকে গিয়ে ভাবলো নিঃশব্দে,
এমন কাউকে কি আগে দেখেছে কোনো স্বপ্নে?
হাওয়ায় ভেসে এল
শিউলি ফুলের মিষ্টি সুবাস,
দু’জনার মাঝখানে নেমে এলো
এক নীরব বিশ্বাস।
ঐশ্রী বললো কিছু না,
শুধু চোখে দিলো ভাষা,
প্রতুল বুঝলো,
এ বোধহয় জন্মজন্মান্তরের আশা।
দূরে কোনো বাঁশির সুর কাঁপিয়ে দিল বন,
অচিন সেই দেশে শুরু হলো এক অনন্ত অনুরণন।
আজও প্রতুল মনে রাখে সেই প্রথম ক্ষণ,
নীল শাড়ির ভাঁজে লুকিয়ে ছিল তার সারাজীবন।

বিলাপ
স্বপন চক্রবর্তী
রসাল বৃক্ষ কহে — ওহে কন্টকী,
মানুষের সাথে কেন এত মাখামাখি?
সারাটি জীবন ধরে দিলি এতো ফল,
যে মানবে দিলি সে প্রতারক, খল।
অর্থগৃধ্নু লোভী এক মানব দুর্বৃত্ত,
শিয়রে শমন আজি তার হেতু নিত্য।
কন্টকী হেসে কহে — হে রসাল বৃক্ষ,
তোরও জীবনে আজ সমহারে দুঃখ।
দেখেছিস নারিকেল বৃক্ষের দশা,
যার সাথে তোর ছিল অত ভালবাসা।
আজ তার প্রাণনাশ খণ্ড বিখণ্ডে,
ফল কি সে কম দিল অশিষ্ট চণ্ডে?
ভাবিস নি তুই সখা পেয়ে যাবি পার!
যতই দিস না ফল শত কি হাজার!
মানুষ স্বার্থপর এক নিষ্ঠুর প্রাণী,
স্বার্থের বশে করে আত্মীয় হানি।
আমরা তো তার কাছে তুচ্ছ জড় অতি,
আমাদের প্রাণনাশে তার কি-বা ক্ষতি!
মানবজাতির তাই ধ্বংস অনিবার্য,
হারায়েছে শুভবুদ্ধি, হারায়েছে শৌর্য।
এই তো সেদিন হায় জীবাণু বিষাক্ত,
মনুষ্য জীবন হায় করেছিল রিক্ত।
তবু করে হানাহানি, যুদ্ধে আজি মত্ত,
লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু, নির্জল সত্য।