Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
এক মাড়োয়ারি জামাইয়ের কলমে বাঙালির জামাইষষ্ঠী
এক মাড়োয়ারি জামাইয়ের কলমে বাঙালির জামাইষষ্ঠী

যেহেতু আমি মাছ-মাংসের ধারকাছ দিয়েও যাই না, তাই আমার শাশুড়ি মা — যাঁকে আমি আদর করে ‘আন্টি’ বলেই ডাকি — প্রতি বছর জামাইষষ্ঠী এলেই বড্ড দুশ্চিন্তায় পড়ে যান; জামাইয়ের ঠিকঠাক যত্নআত্তি হলো তো? অথচ যে আপ্যায়ন নিয়ে তাঁর এত চিন্তা, তার মেনুতেই থাকে অন্তত গোটা দশেক রাজকীয় নিরামিষ পদ! আর তার মধ্যে দই, মিষ্টি, বাসন্তী পোলাও বা চাটনির মতো 'সাইড ডিশ'গুলো তো আমি গুনতির মধ্যেই রাখছি না।

শাশুড়ির এই এলাহী কাণ্ড আর সাত-পাঁচ ভাবনা দেখে তাঁর কন্যারত্নটি আবার আড়ালে মুখ বাঁকায়। কারণ সে খুব ভালো করেই জানে, এই জামাইটিকে কেউ যদি স্রেফ ভালোবেসে একটু ডাল আর আলুভাজাও রেঁধে দেয়, তবে সে তাতেই তৃপ্তি করে এক থালা ভাত সাবাড় করে দিতে পারে!

এখানে অবশ্য কোনো কড়া ধাঁচের নারীবাদী আবার অন্যরকম গন্ধ খুঁজতে যাবেন না যেন! আমি নিজেও মনে-প্রাণে একজন নারীবাদী। আমার অর্ধাঙ্গিনী যে আমার ব্যক্তিগত রাঁধুনি নয়, সে বোধ আমার বিলক্ষণ আছে এবং আমি তা মাথা পেতে মানিও। রান্না করা, বাসন মাজা বা ওয়াশিং মেশিনে জামাকাপড় কাচার মতো রোজকার গেরস্তালির কাজগুলো আমরা দুজনে মিলেই করি। তবে আজকের এই লেখাটা সেই সাম্যের ডঙ্কা বাজানোর জন্য নয়, প্রসঙ্গটা অন্য।

খাঁটি মাড়োয়ারি ঘরের ছেলে হওয়ার দরুন আমাদের পরিবারে জামাইদের এভাবে ‘জামাইষষ্ঠী’র নিমন্ত্রণ পাওয়ার কোনো চল নেই, পাওয়ার কথাও নয়। কিন্তু এক রূপসী বাঙালিনীর সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হওয়ার দৌলতে ওই দিনটায় আমিও শ্বশুরবাড়ির দরজায় গিয়ে হাজির হই। কলকাতায় আজন্ম বড় হওয়ার কারণে এই প্রথাটার সাথে ভাসাভাসা পরিচয় আমার আগে থেকেই ছিল। তবে এই দেদার খাওয়াদাওয়ার আড়ালে যে স্বয়ং মা ষষ্ঠীর পুজোর একটা মস্ত বড় ব্যাপার জড়িয়ে আছে, সেটা বিয়ের আগে আমার জানা ছিল না।

এই গত বছরই জামাইষষ্ঠীর আসরে বসে আমার খুড়শাশুড়ির মুখে প্রথম শুনলাম এই উৎসবের উৎপত্তির পেছনের এক ভারী অদ্ভুত লোককাহিনী। আমার মতো যাঁরা পেটপুজোর আমেজে এই আসল গল্পটাই আগে জানতেন না, তাঁদের জন্যই মূলত আজকের এই খেরোর খাতা খোলা —

সে অনেক অনেক কাল আগের কথা। গ্রামবাংলার এক বনেদি গেরস্ত বাড়ি। সেই বাড়ির সাতটা বউয়ের মধ্যে ছোট বউটি ছিল যেমন ডাগর-ডোগর, তেমনই তার এলাহী লোভ! তবে ভাববেন না যেন টাকা-পয়সা, সোনা-দানা বা গয়নাগাটির দিকে তার মন ছিল; তার যত লোভ ছিল ওই পেটপুজোর ওপর। ইংরেজি কেতাবি ভাষায় যাকে বলে Gluttony!

তা সেই পেটুক ছোট বউ করত কী, বাড়ির সবার অলক্ষ্যে হাঁড়ি-কুঁড়ি ঘেঁটে ভালো-মন্দ সব খাবার সাবাড় করে দিত। আর পেট ঠান্ডা হতেই মুখটি চুন করে বাড়ির একটা কালো বিড়ালের ওপর দোষ চাপিয়ে বলত, "মাগো! ওই চোর বিড়ালটা এসে আবার সব খেয়ে গেছে!" বাড়ির লোকেরাও সরল বিশ্বাসে ভাবত, বিড়ালটাই নির্ঘাত চোর। ব্যস, আর যায় কোথায়! বিনা দোষে সেই গরিব বিড়ালটার ওপর যখন-তখন লাঠিপেটা চলত, যাকে বলে একেবারে নিয়ম করে 'লাঠ্যৌষধি' প্রয়োগ করা আর কী!

হলো কী, ওই বিড়ালটা তো যেমন-তেমন কেউ ছিল না, সে ছিল স্বয়ং মা ষষ্ঠীর বাহন! রোজ রোজ অমন বিনাদোষে মার খেয়ে কালো বেড়াল তো চোটে লাল। সোজা দেবীর দরবারে গিয়ে কেঁদে-কঁকিয়ে সব নালিশ জানাল। দেবীও রেগে আগুন, মনে মনে ভাবলেন, "দাঁড়াও, এর একটা হিল্লে করতেই হচ্ছে!"

এরপর ছোট বউয়ের যখন প্রথম ছেলে হলো, বিড়ালটা মাঝরাতে ওত পেতে থেকে কুটুস করে বাচ্চাটাকে মুখে তুলে নিয়ে গিয়ে দেবীর থানে লুকিয়ে রাখল। এমন ধারা চলল পরপর ছয় ছেলের বেলাতেই।

এদিকে পাড়া-পড়শিরা তো ছিছি করতে লাগল। সবাই বলতে শুরু করল, "মেয়েটার কী অলক্ষুণে ঘুম গা! মা হয়ে নিজের কোলের সন্তানকে আগলাতে পারে না!" কেউ কেউ তো আড়ালে আবডালে ফিসফাস জুড়ে দিল যে, বউটা আসলে একটা ডাইনি, নিজের ডবডবে লোভী পেটে নিজের ছানাপোনাদেরই গিলে খাচ্ছে!

শেষে যখন একটা কন্যাসন্তান হলো, ছোট বউ মনে মনে শক্ত হলো — "না, এবার আর ঘুমোলে চলবে না, রহস্যের শেষ দেখেই ছাড়ব।" সে সারারাত চোখ দুটো টিপটিপ করে জেগে রইল। যেই না মাঝরাতে বিড়ালটা চুপিচুপি এসে খুকিকে মুখে তুলতে গেছে, অমনি বউটা এক লাফে উঠে বিড়ালটাকে হাতেনাতে ধরে ফেলল! হাতের ভারী বালাটা খুলে কষে এক ঘা মারল বিড়ালের গায়ে। বিড়ালটা জখম হলো ঠিকই, কিন্তু মুখ থেকে বাচ্চাটা ছাড়ল না; ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল আর সেই রক্তে মাখামাখি হয়েই খুকিকে নিয়ে সে দে ছুট!

মা-ও ছাড়ার পাত্রী নয়, রক্তের দাগ ধরে ধরে সে-ও পিছু পিছু দৌড়ল। দৌড়তে দৌড়তে একেবারে মা ষষ্ঠীর ডেরায় গিয়ে হাজির। সেখানে গিয়ে তো তার চোখ চড়কগাছ! দেখে, তার হারানো ছয় ছেলে পরম আহ্লাদে ষষ্ঠী দেবীর চারধারে হুটোপুটি করে খেলছে, আর দেবী মা নিজে তার সদ্য জন্মানো খুকিকে কোলে নিয়ে আদর করছেন।

তখন মা ষষ্ঠী গম্ভীর হয়ে ছোট বউকে তার সব কীর্তি মনে করিয়ে দিলেন, বললেন অবলা জীবকে অমন মিথ্যে দোষ দিয়ে পেট পুজো করার শাস্তিই সে পেয়েছে। মুক্তি পেতে হলে তাকে ওই বিড়ালের কাছেই ক্ষমা চাইতে হবে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ছোট বউ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল এবং বিড়ালটার কাছে হাতজোড় করে ক্ষমা চাইল। মন গলে গেল বিড়ালটারও, সে ক্ষমা করে দিল। এরপর সব ছেলেমেয়েকে বুকে জড়িয়ে আনন্দের কান্নায় ভাসতে ভাসতে সে বাড়ি ফিরে এলো এবং দিকে দিকে মা ষষ্ঠীর মাহাত্ম্য প্রচার করতে লাগল। দেবীও খুশি হয়ে তার সংসার সন্তান, ধনধান্য আর সুখে-শান্তিতে ভরিয়ে দিলেন।

গল্প তো শেষ হলো, কিন্তু প্রথার শুরু হলো ঠিক এখান থেকেই। মেয়ে আর জামাইয়ের সংসারে যাতে মা ষষ্ঠীর এই কৃপা আর আশীর্বাদ আজীবন বজায় থাকে, সেই মঙ্গলকামনা করেই মেয়ের বাপের বাড়ি থেকে প্রতি বছর এই বিশেষ দিনে তাঁদের সাদর আমন্ত্রণ জানানো শুরু হলো। আর এইভাবেই, সেই পুণ্য তিথিটি কালক্রমে হয়ে উঠল বাঙালির অতি প্রিয় আর আদরের 'জামাইষষ্ঠী'।

আর সেই নিয়ম মেনেই তো আজ এতগুলো বছর পার করে, মাড়োয়ারি ঘরের ছেলে হয়েও আমি দিব্যি ফুলবাবু সেজে শ্বশুরবাড়ির রাজকীয় নিরামিষ থালার সামনে এসে বসি!

আজকের দিনে জামাইষষ্ঠীকে আমরা অনেকেই খাওয়াদাওয়ার উৎসব হিসেবেই দেখি। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। কিন্তু গত বছরের আড্ডায় গল্পটা শোনার পর বুঝলাম, রাজকীয় থালা আর এলাহী পদগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও পুরোনো এক বিশ্বাস — পরিবারের মঙ্গল কামনার বিশ্বাস। তাই পরেরবার শাশুড়ি মা যখন আমার থালায় আরেক চামচ বাসন্তী পোলাও তুলে দিতে চাইবেন, তখন আর শুধু আপ্যায়ন নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই দীর্ঘ লোকস্মৃতিকেও মনে পড়বে।

বিঃ দ্রঃ মূল নিবন্ধটি ইংরেজিতে রচিত; এটি অনুবাদ।

ভালো লাগলে উৎসাহ দিন
মনীশ চৌধুরী পেয়েছেন সর্বমোট জন পাঠক / পাঠিকার উৎসাহ



আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের আষাঢ় সংখ্যাটি প্রকাশিত হবে ৩০ জুন, ২০২৬ (১৪ আষাঢ়, ১৪৩৩)। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ২৫ জুনের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মান। বিস্তারিত তথ্য এবং লেখা পাঠানোর ডিজিটাল ফর্ম ওয়েবসাইটে দেওয়া আছে।

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। প্রকাশিত মতামত বা বিশ্লেষণ Bangali Network-এর নিজস্ব অবস্থান, নীতি বা মতাদর্শের প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। প্রকাশিত মতামত বা বিশ্লেষণ Bangali Network-এর নিজস্ব অবস্থান, নীতি বা মতাদর্শের প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top