Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
অসমাপ্ত
ডিসক্লেইমার

লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। প্রকাশিত মতামত, বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা Bangali Network-এর নিজস্ব অবস্থান, নীতি বা মতাদর্শের প্রতিফলন নাও হতে পারে।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্যের যথার্থতা, ব্যাখ্যা এবং প্রাসঙ্গিকতার দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network প্রকাশের পূর্বে যুক্তিসঙ্গত সম্পাদকীয় পর্যালোচনা সম্পন্ন করলেও উল্লিখিত তথ্য, উদ্ধৃতি, সূত্র বা ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ নির্ভুলতা, পূর্ণতা বা হালনাগাদকরণের বিষয়ে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার

লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। প্রকাশিত মতামত, বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা Bangali Network-এর নিজস্ব অবস্থান, নীতি বা মতাদর্শের প্রতিফলন নাও হতে পারে।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্যের যথার্থতা, ব্যাখ্যা এবং প্রাসঙ্গিকতার দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network প্রকাশের পূর্বে যুক্তিসঙ্গত সম্পাদকীয় পর্যালোচনা সম্পন্ন করলেও উল্লিখিত তথ্য, উদ্ধৃতি, সূত্র বা ব্যাখ্যার সম্পূর্ণ নির্ভুলতা, পূর্ণতা বা হালনাগাদকরণের বিষয়ে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

অসমাপ্ত


"দিল তো মেয়েটা ল্যাং মেরে। আমি বলেছিলাম তোকে, ওর পিছনে এত ছোঁক ছোঁক করিস না। হারামজাদার যদি কোনও হুঁশ থাকে!" — এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল অনামিকা। অনামিকা চিরদিনের ঠোঁটকাটা — যাকে যা মুখে আসে বলে দেয়। কে কী ভাবল বা ভাবছে, পাত্তা দেয় না কোনওদিন।

"আচ্ছা অনি, তুই কি ব্রা পরিস? পরিস না তো! তাহলে মেয়েদের মতো ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছিস কেন?"
"আমাকে কেন ঠকাল? আমি ওকে আমার প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবেসেছিলাম।"
"তোকে প্রথম থেকে বলে আসছি, ও একটা বিচ! না, তোর তো স্বর্গের অপ্সরা চাই। বুঝলে বন্ধু, আমরা মেয়েরা হলাম বহ্নি, আর তোমরা হলে পতঙ্গ। রূপের মোহে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছ কী মরেছ!"
"তুই নিজে মেয়ে হয়ে এই কথাগুলো কী করে বলছিস?"
"জানিস না, রতনে রতন চেনে? তাই আমরা মেয়েরা মেয়েদের ভালোই চিনি।"
"বাজে বকছিস খুব।"
"বেশ ছাড়, তোর ব্রেকআপের পার্টি উপলক্ষে এক বোতল বিয়ার খাওয়াবি চল।"
"ছোটলোক।"
"সেম টু ইউ, ডার্লিং!"


অনিরুদ্ধ আর অনামিকা একই অ্যাপার্টমেন্টে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকে। দুজনের পরিবারের মধ্যে সখ্যতাও বেশ নিবিড় এবং ওদের দুজনের মধ্যেও বন্ধুত্বটাও। দুজনে একেবারে হরিহর আত্মা। যদিও দুজনে সারাদিন ঝগড়া করে আর বাড়িতে বকা খেয়ে খেয়ে মরে।

অনিরুদ্ধর বাবা একজন ব্যাংক ম্যানেজার। আর অনামিকার মা-বাবা উভয়েই স্কুলশিক্ষক। অনামিকা নামটা যতই শুনতে ভালো লাগুক, অনিরুদ্ধ ওকে "অনামিকা" না বলে "অনামুখো" বলে ডাকে। মাঝে মাঝে অনামিকা রেগে গেলেও অনিরুদ্ধ ওকে আরও বেশি করে বলে। তাই অনামিকা কিছুই বলে না আর।

এই তো সেদিন অনিরুদ্ধ একটা কাজে একটু বেরোবে, ইতিমধ্যে বিপত্তি। বাথরুমে পড়ে গিয়ে পায়ে আঘাত পেল অনামিকা। ওর বাবা বাড়িতে ছিলেন না। অনামিকা যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল।

"ও মা গো! মরে গেলাম গো!"

মা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে দেখলেন, মেয়ে বাথরুমে পড়ে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠেছে। অগত্যা অনিরুদ্ধকেই ডাক পাড়লেন।

"বাবা অনি, আয় না বাবা একটু। অনামিকা বাথরুমে পড়ে গেছে।"

সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এসে অনি দেখল, যন্ত্রণায় বেচারি হাউ হাউ করে কাঁদছে। উঠে দাঁড়াবে, সেই ক্ষমতাটুকুও নেই। অনিরুদ্ধ পাঁজাকোলা করে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিল।

"মোটা কোথাকার একটা! দিন দিন খা আর মোটা হ।"
"আমি মোটা? ঝেড়ে মারব এক লাথি।" — বলে সজোরে পা ছোড়ার চেষ্টা করতেই ব্যথায় চিৎকার করে উঠল।

"আমার সেবা কর, বুঝলি অনি, ভালো বউ পাবি। আর এখন থেকে অভ্যাস থাকলে বউয়েরও সেবা করতে কোনও অসুবিধা থাকবে না।"
যত সমস্যার শুরু অনামিকার এক বান্ধবীর জন্য। অপর্ণা নামের মেয়েটি দেখতে বেশ সুন্দরী। কোনও এক অনুষ্ঠানে গিয়ে মেয়েটিকে প্রথম দেখে অনিরুদ্ধ। সেদিন থেকে অনামিকার কানের পোকা মেরে দিয়েছে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্য।

"মেয়ে দেখেছিস, কী ছুকছুক করা শুরু করে দিয়েছিস! আমার কথা শোন ভাই, ওর পিছনে পড়িস না। ও বাচ্চাদের ডাইপারের থেকেও বেশি বয়ফ্রেন্ড বদল করে। পরে কষ্ট পাবি।"
"মুখের কী ভাষা! মেয়েদের মুখের ভাষা কোথায় একটু ভদ্র হবে — মার্জিত হবে, তা নয়! এত অবলীলায় তুই কী করে বলিস বল তো কথাগুলো? গা জ্বলে যায় একেবারে! তুই আলাপ করিয়ে দিবি কিনা বল?"
"কেন রে শালা, গালাগাল দেওয়ার অধিকার তোরা ছেলেরা মায়ের পেট থেকে নিয়ে বেরোস নাকি রে? বেশি কথা। চেষ্টা করে দেখতে পারি, পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায় কি না। তুই মনে হয় নিজেকে শাহরুখ খান ভাবছিস?"
"একদমই না, ওনার লেভেলই ম্যাচ করতে পারব না। তুই কিন্তু ঘেঁটে দিবি না। তোর মুখটাই শালা অপয়া। অনামুখো!"
"আবার? বলেছি না ওই নামে ডাকবি না?"


অনামিকার কৃপায় পরিচয়টা তো হল। কথাবার্তাও বেশ এগোল এবং ঘনিষ্ঠতাও বাড়ল। বেশ কিছুদিন ধরে প্রেমপর্বও চলল। একদিন সেই মেয়ে এসে জানাল, সে আর এই সম্পর্কের মধ্যে থাকতে চায় না।

"অনিরুদ্ধ, আমি আর আমাদের এই সম্পর্কের মধ্যে গভীরতা খুঁজে পাচ্ছি না। সমস্ত উষ্ণতা হারিয়ে সম্পর্কটা কেমন ঠান্ডা ঘরে চলে যাচ্ছে।"
"হঠাৎ তোমার এরকম কেন মনে হচ্ছে, অপর্ণা?"

"তোমার একার ইচ্ছায় কিছু হবে না, অনিরুদ্ধ। আমি এই সম্পর্কের কোনও ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি না। তুমি কবে চাকরি পাবে, কবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে, সেটা একটা বড় প্রশ্নচিহ্ন। তুমি ভাবছ, আমাদের বাড়িতে এতদিন আমাকে তোমার জন্য অপেক্ষা করতে দেবে? এখনই ছেলে দেখছে, আমি গ্র্যাজুয়েশনের দোহাই দিয়ে আটকে রেখেছি। কিন্তু কদিন? হয় তুমি এখনই কিছু একটা কর, না হলে …"

"আচ্ছা একটা কথা আমাকে বলতে পারো, কোন সংবিধানে লেখা আছে যে শুধু ছেলেরাই মেয়েদের দায়িত্ব নেবে? মেয়েরাও তো নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে একটা বেকার ছেলের দায়িত্ব নিতে পারে।"
"তুমি কথাটা ঠিকই বলেছ। কিন্তু এই সব তত্ত্বকথার কোনও উত্তর নেই।"
"বেশ, তাহলে আর বলার কিছু নেই। ভালো থেকো।"

ছিপছিপ করে বৃষ্টি পড়ছিলই। মদ খেতে বেরিয়ে এ তো ভারী ঝামেলা!

"অনামুখো, তোকে বলেছিলাম আজ মদ খাব না। শুনলি না! দেখ তো এবার কী করে বাড়ি যাব?"
"কেন, তুই আমাকে কোলে করে নিয়ে যাবি!"
"তোকে? কোলে? অসম্ভব!"
কিছুদূর গিয়ে অনামিকা ধপ করে বসে পড়ল।
"কী হল? চল।"
"আমি আর পারছি না। আমাকে প্লিজ কোলে নে।"
"দুজনেরই পা ঠিক নেই, পড়ে যাব।"
"কিছু হবে না।"
ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
"কোলে নিতে পারব না। পিঠে চাপ।"
"কী সুন্দর বেতালের মতো আমাকে কাঁধে নিয়ে ঘুরছিস। তুই আমার বিক্রম, আমি তোর বেতাল। আচ্ছা অনি, যদি তুই আমাকে এইভাবে চিরদিন বয়ে নিয়ে যেতে পারতিস!"
"মানে?"
"মানে তুই বুঝবি না।"
"তুই কি মাল খেয়ে সত্যি সত্যিই নিজেকে বেতাল ভাবছিস, যে বেতালের মতো হেঁয়ালি করে কথা বলছিস? মাল খেলেই তুই বাজে বকিস।"

চলতে চলতে হঠাৎ "ধপাস"! ভেজা রাস্তায় আছাড় খেয়েছে দুজনে। মাটিতে পড়ে গিয়ে দুজন দুজনকে তুলবে কী, হেসেই কুটোকুটি দুটিতে!

"বললাম তোকে, আমি তোর মতো হাতিকে বইতে পারব না। কোমরটা মনে হচ্ছে গেল আমার। দাঁত বের করিস না তো, গায়ে জ্বালা ধরছে আমার!"

"আমিও তো পড়ে গেছি বল। তুই কি একা পড়েছিস? তুই তোর বউকেও তো তুলতে পারবি না দেখছি। তোর 'অপর্ণা ডার্লিং'কে কাঁধে নিয়েছিস কোনওদিন?"
"নাম বলছি নাম, পিঠ থেকে। ওর নাম করবি না আমার সামনে। আমি ওকে সহ্য করতে পারি না!"
"বলেছিলাম আমি। এখন ন্যাকা কান্না কাঁদছিস কেন? কেন গিয়েছিলি ওর পেছন পেছন? বল?"
"আমার খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে। আমাকে একটা আলিঙ্গন দিবি?"
"ঠিক আছে।"

হৃৎস্পন্দন যেন হঠাৎ করে বেড়ে গেল অনামিকার। কোনওদিন এত সোহাগে আগে কখনও জড়িয়ে ধরেনি কেউ। নিজের মুখরা, ঠোঁটকাটা ব্যক্তিত্বের পিছনে যে একটা মন আছে, নিজেই কখনও টের পায়নি! এই মুহূর্তে অনিরুদ্ধর থেকে আপন ওর কেউ নেই যেন! আচ্ছা, অনিরুদ্ধর মনেও কি একই অনুভূতি? কই, ও নিজে তো কখনও বুঝতে পারেনি। ওর এত কাছের বন্ধু অনিরুদ্ধ, তবুও কখনও ওর প্রতি দুর্বল — এ কথা তো মনে হয়নি! তাহলে কি অনামিকা নিজেই দুর্বল হয়ে পড়ছে অনিরুদ্ধর প্রতি?


সকাল থেকেই শরীরটা অস্বস্তি করছিল। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। সেটাকে পাত্তা দিল না অনিরুদ্ধ। বাড়ি ফেরার পথে অটোতে চেপে ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। কোনওরকমে বাড়ি পৌঁছতে পারলে হয়। জ্বরটা এসেই গেল শেষপর্যন্ত। বাড়ির সামনে অটো থেকে কোনওরকমে নেমে ভাড়াটা মেটাল। আর এক পা-ও এগোতে পারছে না। ওদের ফ্ল্যাটটা তিনতলায়। লিফট অবধি যেতে পারলে আর সমস্যা নেই। লিফটে উঠে জ্বরের ঘোরে "দুই" নম্বর সুইচ টিপে দিল। লিফট থেকে বেরিয়ে সামনেই অনামিকাদের ফ্ল্যাট। অনামিকাদের ফ্ল্যাট নম্বর ৩০১, ওদেরটা ৩০২। আর যে চলতে পারছে না। অনামিকাকে কি ডাকবে? না, থাক। ওদের আর ব্যস্ত করে লাভ নেই। লিফটের দরজাটা বন্ধ করে এক পা এক পা করে এগোতে গিয়ে অনামিকাদের ফ্ল্যাটের সামনে ধপ করে পড়ে গেল। সকাল থেকে কিছু খাওয়াদাওয়া হয়নি ঠিক করে, তাই আরও বেশি দুর্বল ছিল শরীরটা।

আওয়াজ শুনেই অনামিকার মা আর অনামিকা ছুটে এলেন। বেরিয়ে এসে দেখেন, অনিরুদ্ধ উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। দুজনে বেশ আঁতকে উঠলেন। অনামিকা এগিয়ে গিয়ে অনিরুদ্ধকে চিত করে দিল।

"মা, এ তো অনি। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে একেবারে!"
"বেচারা দুর্বলতার কারণে পড়ে গেছে রে। বাবা অনি, ও অনি! চোখটা খোল বাবা!"
কোনও সাড়া নেই। শুধু দু-একবার "উঁ! উঁ!" শব্দ করল।

"অনামিকা, ওকে ভেতরে নিয়ে চল। ওর মা-বাবাও তো আজ দিল্লি গেল। ছেলেটার জ্বর! কী কাণ্ড দেখ দেখি! চল, ভেতরে নিয়ে চল!"

দুই মা-মেয়েতে কষ্টেসৃষ্টে ভেতরে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শোয়াল অনিরুদ্ধকে। থার্মোমিটারে তাপমাত্রা মেপে দেখা গেল প্রায় একশো তিন।

টানা দুদিন জ্বর কমল না। জ্বরের ঘোরে ভুলভাল বকতে লাগল। এই দুদিন দিনরাত এক করে সেবা করেছে অনামিকা। তৃতীয় দিন থেকে একটু সুস্থ হলো অনিরুদ্ধ। কিন্তু জ্বরটা এখনও আছে। ঘোরটা একটু কাটতেই চোখ মেলে চাইল অনিরুদ্ধ।

"তুই আমার বাড়িতে কী করছিস?"

"প্রশ্নটা একটু ভুল হয়ে গেল সোনা! আমি তোর বাড়িতে না, তুই আমার বাড়িতে আছিস।"
"কবে থেকে?"
"সেই পরশু রাত থেকে।"
"এই দুটো দিন তাহলে?"
"তুই জ্বরে বেহুঁশ হয়ে ছিলি। তোর সেবা করলাম আমি, আর দু রাত তুই শুধু 'অপর্ণা', 'অপর্ণা' জপ করে গেলি।"
"সরি রে।"
"বেশ, আর বেশি কথা বলতে হবে না। শরীরটা খুব দুর্বল। দুটো দিন কিছু খাওয়া হয়নি ঠিক করে। একটু স্যুপ করে আনছি গরম গরম। লক্ষ্মী ছেলের মতো খেয়ে নে দেখি।"
"ভালো লাগছে না রে।"
"একদম চুপ। বেশি কথা। না খেলে সুস্থ হবি কী করে? ওষুধ পেটে পড়েনি। খাবারটা না খেলে ওষুধটাও দিতে পারব না। তুই বোস, আমি এখুনি আসছি।"

অনামিকা যেই উঠে দাঁড়িয়েছে, হাতটা ধরল অনিরুদ্ধ।

"আমার পাশে একটু বোস না, প্লিজ।"

"হঠাৎ!"
"বোস না, প্লিজ!"
"বল।"
"এই দুটো দিন ঘুমোসনি বোধহয় ঠিক করে? চোখের নীচে কালি পড়েছে মনে হচ্ছে! কী হল? কিছু বল।"
"তুই হাঁফাচ্ছিস। মুখটা একটু বন্ধ দে, প্লিজ।"
"চুপ করে বোস। তোর সঙ্গে বহুদিন বসে গল্প করিনি। শুধু হাসি-ঠাট্টা-ইয়ার্কি, এগুলোই চলে। আচ্ছা, তুই কোনওদিন কাউকে ভালোবাসিসনি? মানে কাউকে ভালো লাগেনি কোনওদিন? যদিও আমি জানতে পারতাম সবার আগে। তাও আজ জানতে চাইছি, মনে মনে কাউকে ভালো লাগেনি?"

অনামিকার গলা বুজে এল। এ কী কথা বলছে অনি? চোখের কোলে নিজের অজান্তেই জল চিকচিক করে উঠল। মুখটা ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। চোখের নীচের কালিটাও ঠিক দেখে নিয়েছে অনিরুদ্ধ। ছেলেটার কাছ থেকে কিছু লুকোতে পারেনি আজ পর্যন্ত। কিন্তু ছেলেটা নিজের মনের কথাই বুঝল না কোনওদিন। চিরদিন খালি মরীচিকার পিছনে ছুটে বেড়িয়েছে। ওকে একা দোষ দিয়ে লাভ নেই, অনামিকা নিজেও তো নিজের হৃদয়ের কথা বুঝতে পারেনি। বুকের ভেতর উথালপাতাল সাগরের ঢেউ বারবার বিধ্বস্ত করতে লাগল অনামিকাকে। আর বসে থাকতে পারল না। হাতটা একটানে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে গেল রান্নাঘরে। স্যুপটা বানাতে বানাতে দু-একফোঁটা চোখের জল পড়ল স্যুপের মধ্যে। যা হয় হবে, মনের কথাটা বলেই ফেলবে অনিরুদ্ধকে। এখনই না, একটু সুস্থ হলে।


সেদিন দুপুরে কলেজ থেকে বাড়ি ঢুকেই অনামিকা দেখল, মা কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। ফোনে কথা বলা শেষ হওয়ার পর অনামিকা জানতে চাইল —

"কে গো মা?"
"তোর জন্য একটা সম্বন্ধ এসেছে।"
মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল অনামিকার।
"এখনই?"
"এখনই নয়। আগে দেখাসাক্ষাৎ হোক।"

অনামিকার আর কথা বলতে ইচ্ছে করল না। মায়ের সব বিষয়ে খুব তাড়াহুড়ো। ওর মনে কী চলছে, কখনও কিছু জানতে চায়নি। ওর কান্না পাচ্ছে। মা-বাবার মতের বিরুদ্ধে কোনওদিনই যেতে পারবে না অনামিকা এবং যেতে চায়ও না।

কিছুদিন পর পাকা দেখা সম্পন্ন হল। দিনক্ষণ নির্ধারিত হল।

"তো! আমাদের ছেড়ে চলে যাবি?" — বলল অনিরুদ্ধ।
"তুই খুশি?"
"নিশ্চয়! যতই হোক, তুই আমার ঘাড় থেকে নামবি। যা অত্যাচার করিস আমার ওপর।"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনামিকা বলল, "তা ঠিক! ভালোই তো হবে, তোকে আর কষ্ট দেব না! তুই ভালোভাবে কথা বলতে শিখিসনি, না? আমার সঙ্গে ঝগড়া না করলে তোর দিন চলে না, বল?"

"ঝগড়া করলাম? আমি?"
"তুই আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যা! বের হ বলছি!"
"বেশ। তোর কোনও কারণে মাথা গরম হয়ে আছে বুঝতে পারছি। আমি আসছি এখন। মাথা ঠান্ডা হলে আসব।"
"বেরো! দূর হ!"

অনিরুদ্ধ চলে গেল।

"আমার রাগটাই শুধু দেখলি অনি? আমার মনটাও যে খারাপ, সেটা দেখলি না। আমি এই বিয়েতে খুশি হতে পারছি না। আমি শুধু তোকে চেয়েছিলাম।" — নিজের মনে মনে বলল অনামিকা।

সকাল থেকে বাড়িতে ব্যস্ততা। কারণ — আজ অনামিকার বিয়ে। লোকজন, আত্মীয়স্বজনের সমাবেশে বাড়ি গমগম করছে। অনিরুদ্ধও বেশ ব্যস্ত। হাতে হাতে অনেক কাজ করে দিয়েছে। আন্টি, অর্থাৎ অনামিকার মা, তাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।

সন্ধ্যাবেলায় অনামিকাকে সাজানো হচ্ছে। অনামিকার বান্ধবী, জুনিয়ররা সকলেই রয়েছে।

"অদিতি, অনি কোথায় রে? বিকেল থেকে দেখছি না?"
"কে? অনিরুদ্ধদা? ও তো খুব ব্যস্ত। এখন তো পাবে না। বর আসবে, সেই দায়িত্বেই আছে। সকাল থেকে পরিশ্রম করছে বেচারা।"
"একবার ডেকে দিতে পারবি?"
"এখন? ফোন করে দেখো।"
"আমার ফোনটা মায়ের কাছে। একটু ডেকে দে না।"
"বেশ, দেখছি। তোমাকে সাজানো হয়ে গেলে চলে যাব। তখন ডেকে দেব।"
"লক্ষ্মী সোনা বোন আমার, একটু দেখিস। ওর সঙ্গে খুব দরকারি কথা আছে।"

বাইরে উলুধ্বনি শোনা গেল। সকলে হৈ হৈ করে উঠল।

"চল চল, বর এসে গেছে।" — বলে দুদ্দাড় করে নামতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।
"অদিতি, অনিকে ডেকে দিস যেন!" — চেঁচিয়ে বলল অনামিকা।
"অনিরুদ্ধদা, তোমাকে অনামিকাদি ডাকছে।"
"আমাকে? এখন? বল, আমি ব্যস্ত আছি। যেতে পারছি না।"
"জানি না। খুব দরকার বলল।"
"ধ্যুর! কোথায় সে?"
"ঘরে।"
"বেশ, যাচ্ছি।"

লিফট থেকে নেমেই অনামিকাদের ফ্ল্যাট। দরজাটা ভেজানো ছিল। ঠেলতেই খুলে গেল। কিন্তু অনামিকা কোথাও নেই।

"অনামিকা! অনামিকা!" ড্রয়িংরুমটা পেরিয়েই ব্যালকনি। "অনামিকা! অনামিকা!"

দেখল, অনামিকা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে।
"কী রে অনামিকা? ডাকলি কেন?"

একটু চমকে উঠল অনামিকা।

"যতদূর মনে পড়ছে, তুই আমাকে 'অনামিকা' বলে কোনওদিন ডাকিসনি আজ পর্যন্ত।"
"হুম! কিছু ডাকনাম আছে, যেগুলোর অধিকার একটা সময় পর ছাড়তে হয়। তাছাড়া তুই রাগও করিস। আজ এই শুভ দিনে তোকে আর রাগাতে ইচ্ছে করছে না। মনে হচ্ছে, কোনও একটা অধিকার যেন হারিয়েছি।"

ঠোঁটটা একটু কেঁপে উঠল অনামিকার।

"বল, ডাকলি কেন? কী দরকার?"
"কিছু খাওয়াদাওয়া করেছিস? মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে, কিছুই পেটে পড়েনি। সকাল থেকে এত পরিশ্রম করছিস — এত ব্যস্ত আছিস, একবার আমার সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে আসতে পারিসনি!"
"আমার কথা ছাড়। কীজন্য ডেকেছিস বল? আমার অনেক তাড়া এখন।"
"তোকে একটা জিনিস দেব বলে ডেকেছি। কিন্তু আমাকে কেমন লাগছে বললি না?"
"খুব সুন্দর। মনে হচ্ছে স্বর্গের অপ্সরা।"
"ঠাট্টা করছিস?"
"একেবারেই না। বল, কী দিবি?"

হাতটা পিছন থেকে বের করে আনল অনামিকা। একটা ডায়েরি।

"এটা কী?"
"ডায়েরি!"
"ডায়েরি, সে তো আমিও দেখছি। কিন্তু এটা কীজন্য?"
"পড়ে দেখিস।"
"এখন?"
"না। তুই আমাকে কথা দে, কাল আমার বিদায়ের আগে তুই এটা খুলে দেখবি না।"
"আচ্ছা। কী লেখা আছে এতে?"
"তুই নিজেই পড়ে নিস।"
"আর কিছু?"
"না। আজ শেষবার একটা জিনিস চাইব, দিবি?"
"আবার কী হল?"
"আজ আমায় একটা আলিঙ্গন দিবি? তোর কষ্ট হলে যেমন আমি দিয়েছি।"
"এটা হয় না, অনামিকা।"
"প্লিজ!"

জড়িয়ে ধরতেই অনামিকা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলল। কয়েক ফোঁটা জল অনিরুদ্ধর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।

বিয়ে সম্পন্ন হল। বিদায়ের সুর বাজল। সানাইয়ের সুর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। চলে যাওয়ার সময় অনিরুদ্ধর দিকে একবারও ফিরে তাকাল না। বরং দু-একবার চোখে চোখ পড়তেই চোখটা নামিয়ে নিল।

নিজের বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল অনিরুদ্ধ। আকাশটা কেমন কালো হয়ে আছে। একটু পরেই বৃষ্টি নামবে বোধহয়। অনিরুদ্ধর মনটাও একেবারে ভালো নেই। যাওয়ার সময় একটা কথাও বলল না ওর সঙ্গে! যদিও অনামিকার মনও খারাপ ছিল, তাই বলে একটা কথাও বলবে না!

হঠাৎ করে ডায়েরির কথাটা মনে পড়ল। কী এমন লেখা আছে ডায়েরিতে যে ওর বিদায়ের আগে খুলে দেখতেই বারণ করল? কোথায় যে গেল ডায়েরিটা? দুদিনের এই ব্যস্ততার মাঝে ওটার কথা মনেও ছিল না। কোথায় যে রেখেছিল? অনেক খোঁজাখুঁজির পর নিজের কম্পিউটার টেবিলে দেখতে পেল কালো রঙের ডায়েরিটা।

কালো রং ওর এবং অনামিকার দুজনেরই প্রিয়। ডায়েরিটা খুলে বসল চেয়ারে।

প্রথম পাতায় অনামিকার ব্যক্তিগত বিবরণ। কয়েকটা পাতা উল্টানোর পরে দেখা গেল একটা পুরোনো গোলাপ, যেটা শুকিয়ে গেছে। পাশে লেখা, "অনি'র গাছের প্রথম গোলাপ।" তারপরের কয়েকটা পাতায় বিশেষ কিছু লেখা নেই। কয়েকটা পাতা পেরোনোর পর অনিরুদ্ধ বুঝতে পারল অনামিকার শেষ বলা কথাগুলো। অনামিকার কান্না, বিয়ের মণ্ডপ পর্যন্ত ওর হাত না ছাড়তে চাওয়া, শেষবারের মতো ওকে জড়িয়ে ধরতে চাওয়া — সবকিছু জলের মতো স্বচ্ছ হয়ে গেল। মেয়েটা এত কথা বলত, শুধু অনিরুদ্ধকে ভালোবাসে এই কথাটা বলতেই পারল না! মেয়েরা বোধহয় এইরকমই হয়। ওদের বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না। অনিরুদ্ধকে এই যন্ত্রণাটা চিরদিন কুরে কুরে খাবে যে ওর সত্যিকারের ভালোবাসা ওর সামনেই ছিল, হেলায় হারিয়েছে নিজেই। বাইরে তখন আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছে অঝোর ধারায়।

অনিরুদ্ধর চোখেও তখন শ্রাবণধারা।




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের ভাদ্র ১৪৩৩ সংখ্যাটি ২৫ আগস্ট ২০২৬ (৮ই ভাদ্র) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ আগস্টের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
2 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।