"ডুমুরের ফুল" কথাটার মানে আমরা সবাই জানি — যা সহজে চোখে পড়ে না, বা যা প্রায় অলীক। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, ডুমুরের ফুল নাকি কেউ দেখেনি। কিন্তু আসল সত্যিটা কী জানেন? ডুমুরের ফুল কোনো রহস্যময় কিংবদন্তি নয়। আমরা যেটাকে ডুমুর বলি, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে শত শত খুদে ফুল। বাইরে থেকে দেখতে ফলের মতো লাগলেও, শুরুতে এটি আসলে একটি বিশেষ ধরনের ফুলধারক গঠন (Syconium) — যেন মুখবন্ধ একটা উল্টানো ফুলদানি, যার ভেতরে চুপচাপ বসে আছে অসংখ্য ফুল।
আর এই গোপন কুঠুরির ভেতরেই লুকিয়ে আছে প্রকৃতির ইতিহাসের অন্যতম অদ্ভুত এবং রোমাঞ্চকর এক যৌথ ব্যবসার গল্প। এমন এক পার্টনারশিপ, যার বয়স এতটাই বেশি যে তখন পৃথিবীতে টি-রেক্সের পূর্বপুরুষেরা নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াত।
আজ থেকে প্রায় ৭–৮ কোটি বছর আগে, অর্থাৎ ডাইনোসরদের ক্রিটেসিয়াস যুগে, ডুমুর গাছ আর এক ধরনের বিশেষ খুদে বোলতা (Fig Wasp)-র মধ্যে যেন এক অলিখিত ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছিল। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে Obligate Mutualism বা পারস্পরিক কঠোর নির্ভরশীলতা। সহজ বাংলায় বললে, এরা এমন দুই বিজনেস পার্টনার, যাদের একজন দোকান বন্ধ করলে অন্যজনেরও তালা ঝুলে যাবে।
পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতির ফুল আছে যাদের পরাগায়ন ঘটায় মৌমাছি, প্রজাপতি, পাখি কিংবা বাতাস। কিন্তু ডুমুরের ক্ষেত্রে সেসব চলবে না। তার চাই শুধু সেই আদিম সঙ্গী — ডুমুর বোলতা।
এবার গল্পের সবচেয়ে নাটকীয় অংশ।
ভেতরে ঢুকে সে নিজের গায়ে করে আনা অন্য ডুমুরের পরাগরেণু ছড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে কিছু বিশেষ ফুলে ডিম পাড়ে। সব ফুলে অবশ্য ডিম দেওয়া সম্ভব হয় না। যেসব ফুলে ডিম হয় না, সেগুলো পরাগায়িত হয়ে পরে বীজে পরিণত হয়। অর্থাৎ একই ডুমুরের ভেতরে একদিকে নতুন বোলতার জন্মের ব্যবস্থা হচ্ছে, অন্যদিকে গাছের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও তৈরি হচ্ছে। একেই বলে সত্যিকারের গিভ-অ্যান্ড-টেক পলিসি।
নিজের দায়িত্ব শেষ হলে মা বোলতাটি ডুমুরের ভেতরেই মারা যায়।
এবার নিশ্চয়ই প্রশ্ন আসছে, তাহলে আমরা যখন ডুমুর খাই, তখন কি মরা বোলতাও খেয়ে ফেলি?
উত্তর হলো — না, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ডুমুরের ভেতরে থাকা ফিসিন (Ficain) নামের একটি এনজাইম মৃত বোলতার শরীরকে ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলে। ফলে ডুমুর পাকার সময় তার কোনো বাহ্যিক অস্তিত্ব আর অবশিষ্ট থাকে না।
এদিকে ডুমুরের ভেতরে ডিম ফুটে নতুন বোলতারা জন্ম নেয়। অন্ধ এবং ডানাহীন পুরুষ বোলতারা আগে বের হয়। তাদের জীবনবৃত্তান্ত অবিশ্বাস্য রকম ছোট — স্ত্রী বোলতাদের সঙ্গে মিলন, তারপর ডুমুরের গায়ে সুড়ঙ্গ কেটে বের হওয়ার রাস্তা বানানো। দায়িত্ব শেষ, জীবনও শেষ।
অন্যদিকে স্ত্রী বোলতারা ডানা মেলে সেই সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে আসে। বের হওয়ার আগে তারা ডুমুরের পরাগরেণু গায়ে মেখে নেয়, তারপর উড়ে যায় আরেকটি কাঁচা ডুমুরের খোঁজে। নতুন ঠিকানা, একই ব্যবসা, একই চুক্তি।
ভাবলে অবাক লাগে। টি-রেক্স নেই, ট্রাইসেরাটপস নেই, অসংখ্য দৈত্যাকার প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথচ কয়েক মিলিমিটার লম্বা একটি বোলতা আর একটি ডুমুর গাছের এই বোঝাপড়া কোটি কোটি বছর ধরে একটানা টিকে আছে। বন্য পরিবেশে ডুমুর বোলতা ছাড়া অধিকাংশ ডুমুরের স্বাভাবিক পরাগায়ন হয় না। আবার ডুমুর ছাড়া সেই বোলতারও জীবনচক্র সম্পূর্ণ হয় না। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো সফল পার্টনারশিপ কোনো বহুজাতিক কোম্পানি নয়, কোনো সাম্রাজ্যও নয়। মাত্র কয়েক মিলিমিটারের এক বোলতা আর একটি ডুমুর গাছ। কোটি বছরের পুরোনো সেই চুক্তিতে আজও কোনো পক্ষ চুক্তিভঙ্গ করেনি। পৃথিবীর প্রাচীনতম সফল স্টার্টআপগুলোর তালিকা করলে এদের নাম নিঃসন্দেহে ওপরের দিকেই থাকবে।
তাই পরের বার কেউ যদি বলে, "তুমি তো ডুমুরের ফুল হয়ে গেছো", একটু মজা করতে গম্ভীরমুখে জিজ্ঞেস করুন — "আপনি কি বলতে চাইছেন, আমার কোনো গোপন কারবার আছে?"
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।