কালো তারটা দুটো ল্যাম্পপোষ্টের মাঝে এমনভাবে জুড়ে আছে, যেন জীবনমৃত্যুর মাঝামাঝি এক সেতু। ল্যাম্পপোষ্টের একদিক যদি জন্ম বলে ধরা হয় অন্যদিকটা তাহলে মৃত্যু। এরমাঝে দোদুল্যমান প্রাণের অস্তিত্ব। কখনও তারা এই যাত্রার অন্তিমে পৌঁছোয়, কখনও বা বৃষ্টির অপরিণত ফোঁটার মতই মাঝসমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
অঝোর ধারায় বৃষ্টির মধ্যে সন্ধ্যের মুখে ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডে বসে এরকমটা হঠাৎই মনে হলো সুচেতনার। যদিও এটা নতুন কিছু নয়, ছোটো থেকেই তার এরকম কথা সব মাথায় আসে সময়ে-অসময়ে। কোথায় যেন পড়েছিল একটা, "নামের মাহাত্ম্য মানুষকে তার জীবনে মার্গদর্শন করে।" হয়ত সেই জন্যই সুচেতনা হারিয়ে যায় তার ভাবনার জগতে। নিজের মধ্যে বুঁদ হয় সময়ে-অসময়ে, যেমনটা হয়েছে এখন। গভীর চিন্তায় মগ্ন সুচেতনা হঠাৎ উপলব্ধি করলো তার পাশে কেউ যেন বসে আছে। ছিঁড়ে গেলো চিন্তাসূত্র, চোখ তুলে পাশে তাকাতেই দেখতে পেলো একটি মেয়ে তার পাশে বসে। কিছুক্ষণ আগেও কেউ ছিলো না এই বাসস্টপেজের শেডটাতে। মেয়েটি কখন এলো! আর সবথেকে অদ্ভুত হলো মেয়েটি এই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে এলো কোথা থেকে, তার সামনে দিয়ে তো আসেনি, আগেও আসেনি। ভাবতেই খানিকটা অস্বস্তি হতে লাগলো সুচেতনার। ভূত সে মানে না, তাই সে ভয় কাছে ঘেঁষেনি; তবে বিষয়টি যে অস্বাভাবিক সেটাও সত্যি।
মেয়েটির বয়স অল্প। পাশ থেকে যতটা দেখা যাচ্ছে তাতে মেয়েটিকে দেখতে দশবছর আগের সুচেতনার মত। খুব কৌতূহল হচ্ছে ওকে সামনে থেকে দেখতে। ওর অবয়ব হুবহু সুচেতনার অল্পবয়সের মত। কিন্তু ভদ্রতায় বাঁধছে, এভাবে কি কাউকে সামনে থেকে দেখা যায়? সুচেতনা সুযোগ খুঁজতে লাগলো কথা শুরু করার, সেই অছিলায় নিশ্চয় মেয়েটি মুখোমুখি হবে। সে খানিকটা গলাখাঁকারি দিলো।
আশ্চর্য তো! মেয়েটির কোনো হেলদোল নেই। মানুষ তো একবার চোখ তুলে দ্যাখে? এ যেন পাথরপ্রতিমা বসে আছে। সুচেতনার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছে কৌতূহল দমন করা । সে এবার বাধ্য হয়েই ডাকলো —
"শুনছেন"
"বলুন!" — সুচেতনার দিকে মুখ না ফিরিয়েই বললো মেয়েটি।
"আপনি কোথায় যাবেন? মানে কোন্ রুটের বাস ধরবেন?"
"আপনার আর আমার গন্তব্য একই।"
"মানে? আপনি জানেন আমি কোথায় যাবো?"
"অবশ্যই জানি। আরও অনেক গোপন তথ্য জানি আপনার, যা অন্য কেউ জানে না।"
মেয়েটি এত কথা বলছে কিন্তু ঘুরে দেখছে না কিছুতেই। এবার সুচেতনা খানিকটা কঠিন স্বরে বললো — "আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলুন। আমি জানতে চাই আপনি কে? আর গোপন কথা আমার জীবনে কিছু তো নেই। কি গোপন তথ্য জানেন আপনি?"
"আপনি ক্লাস নাইনে পড়তে একটি ছেলের প্রেমে পড়েন। কিন্তু ছেলেটি আপনার প্রিয় বান্ধবীকে ভালোবাসত। সেটা জানার পর ছেলেটির উপর আপনার এত বিতৃষ্ণা জন্মেছিল যে বান্ধবীকে আকারে ইঙ্গিতে ছেলেটির সম্পর্কে খারাপ তকমা লাগিয়ে দেন। সেটা শোনার পর আপনার বান্ধবী ছেলেটিকে জনবহুল রাস্তায় এতটাই অপমান করে যে ছেলেটি মানসিক ভারসাম্য হারায় তৎক্ষণাৎ। সেদিন বিকেলে যখন জানতে পেরেছিলেন যে ছেলেটি আর সেদিন বাড়ি ফিরতে পারেনি, টালমাটাল অবস্থায় সাইকেল চালাতে গিয়ে ট্রাকের সামনে পড়ে মারা গেছে — তখন সেই পরিস্থিতির জন্য কি নিজেকে আজও অপরাধী মনে হয় না?"
"আমি আপনার সেই বয়েসের বিবেক, সুচেতনা।" — এই কথা বলে মেয়েটি ঘুরে তাকালো সুচেতনার দিকে।
চমকে উঠলো সুচেতনা — এ যে ক্লাস নাইনে পড়া সুচেতনা। নিজেকে যেন আয়নায় দেখছে। আর ভাবার ক্ষমতা হলো না তার। জ্ঞান হারাবার আগে শুধু দেখলো মেয়েটি তার মধ্যে মিশে গেলো।
পরেরদিন সকালে বাসস্ট্যান্ডে আগত যাত্রীরা অজ্ঞাত এক মহিলার মরদেহ দেখে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে মহিলাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তাররা জানান রাত্রি সাড়ে এগারোটা নাগাদ মহিলা আতঙ্কে হার্টফেল করেন। কিন্তু অত রাত্রে মহিলা একা বাসস্টপেজের শেডে বসেই বা ছিলেন কেন, আর কি দেখেই বা ভয় পেলেন, সে রহস্য রহস্যই থেকে গেল।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।