হস্তিনাপুরের ভোর যখন ধীরে ধীরে কুয়াশা সরিয়ে রৌদ্রের মিঠে আলোয় ভাসছিল, তখন রাজপ্রাসাদের একটি নির্জন বারান্দায় দাঁড়িয়ে কুন্তী চুপচাপ তাকিয়ে ছিলেন দূরের গঙ্গার দিকে। তাঁর জীবনের প্রতিটি বাঁকই যেন সেই প্রবহমান জলের মতো — একটানা, থেমে না থাকা, আর অনবরত নিজের ভেতর সব কিছু বইয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু গঙ্গার মতো তাঁর বুকে ঢেউ ছিল, আওয়াজ ছিল, আর ছিল এমন এক গোপন আগুন — যাতে দহিত হয়েছেন অবিরত, কিন্তু কাউকে বলতে পারেননি; পারাও সম্ভব ছিল না।
যুবতী কুন্তী তখন আর পাঁচজন রাজকন্যার মতো ছিলেন না। দুর্বাসা মুনির আশীর্বাদে যে কোনো দেবতাকে আহ্বান করে সন্তান লাভের ক্ষমতা পেয়েছিলেন। সেই অলৌকিক শক্তি তাঁর সারা জীবনকে অন্য রকম করে দিল। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, এটি আশীর্বাদের চেয়েও বড় এক পরীক্ষার হাতছানি। কৈশোরের অজ্ঞতা আর কৌতূহলের মিশেলে তিনি একদিন পরীক্ষা করেই ফেললেন সেই মন্ত্র। তাপস সূর্য সামনে এসে দাঁড়ালেন — অগ্নিময়, দ্যুতিমান, তীব্র, মহাজাগতিক।
আর তারপর জন্ম নিলেন কর্ণ — সেই শিশু, যার ভবিষ্যৎ ভোরের কুয়াশায় তখনও লুকিয়ে ছিল।
কুন্তী তখনও কুমারী। এই গোপন মাতৃত্ব ছিল সমাজের চোখে অসম্ভব, শাস্ত্রের কঠোর বিচারসভায় নিষিদ্ধ। কুন্তীর বুক ফেটে গিয়েছিল — তবু তিনি পারেননি সন্তানকে রাখতে। এক নবজাতককে গঙ্গার স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া যে কেমন বেদনার, তা পৃথিবীর কোনো শব্দ দিয়ে বর্ণনা করা যায় না। তিনি শুধু প্রার্থনা করেছিলেন —
"হে দেবসূর্য, আমার এই সন্তানকে তুমি রক্ষা করো।"
গঙ্গার বুকে ভাসমান সেই ছোট্ট হাঁড়ি দূরে সরে যেতে যেতে যেন কুন্তীর হৃদয়ের এক অংশকে ছিঁড়ে নিয়ে গেল।
বিয়ে হলো পান্ডুর সঙ্গে। কুন্তীর জীবনে তখন নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন। কিন্তু সেগুলো পূর্ণ হওয়ার ঠিক আগে ভাগ্য আবার নিজের নিঃশব্দ ছুরি চালিয়ে দিল। অভিশপ্ত পান্ডু স্ত্রী-স্পর্শে মৃত্যুবরণ করবেন — এই ভয় তাঁর জীবনের সমস্ত রং মুছে দিল। তবু স্বামীর অনুরোধে, তাঁর বংশ রক্ষার তাগিদে, কুন্তী ব্যবহার করলেন দুর্বাসার সেই মন্ত্র।
ধর্ম, বায়ু, ইন্দ্র — তিন দেবতার আশীর্বাদে জন্ম নিলেন যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন। পরে মাদ্রীও একই পথে জন্ম দিলেন নকুল-সহদেব।
একদিকে মা, অন্যদিকে বংশ — দুই দায়িত্বের বোঝা সমান ভারী। কিন্তু কুন্তী বেছে নিলেন নীরব শক্তির পথ। তিনি জানতেন, তাঁর সন্তানদের জীবন হবে সংগ্রামে ভরা। সেই সংগ্রামের জন্যই তিনি কঠিন শিক্ষা দিয়েছিলেন — ন্যায়, সত্য, ধৈর্য, আর সীমাহীন সাহস। কিন্তু নিজের বুকের গভীরে তিনি চেপে রেখেছিলেন আরেক পরিচয় — এক চতুর্থ সন্তানের জন্মদাত্রী হওয়ার সত্য।
আর কর্ণ…
হ্যাঁ, সেই তরুণ যোদ্ধা, যাকে তিনি প্রথম দেখেছিলেন অঙ্গরাজের মুকুটে। বলিষ্ঠ, তেজস্বী, জেদি, অগ্নিময়। মায়ের অন্তর কী ভীষণভাবে কেঁপে উঠেছিল তখন, তা কেউ জানল না। কিন্তু সত্য প্রকাশ করার সাহস তখনও তাঁর ছিল না। কারণ সত্য কখনো কখনো শত্রুর চেয়েও ভয়ংকর।
যদি যুধিষ্ঠির তা শুনে ভেঙে পড়ে?
যদি অর্জুন তার জীবনভর শ্রদ্ধার প্রতিযোগীকে বড় ভাই বলে মানতে না পারেন?
যদি কর্ণ নিজেই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেন?
এই যন্ত্রণার সঙ্গে একাকী লড়াই করেছিলেন কুন্তী। তাঁর নীরবতা একদিকে শক্তি, অন্যদিকে অভিশাপ।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে কুন্তীর সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এল। তিনি গেলেন কর্ণের কাছে — সেই গোপন, নিষিদ্ধ, অশ্রু-ভেজা সত্যটি জানাতে। কর্ণ তাঁকে দেখেই ভেবেছিলেন তাঁর কাছে হয়তো কোনো অনুরোধ থাকবে। কিন্তু কুন্তীর কণ্ঠ যখন সেই দীর্ঘদিন-চাপা কথাগুলো খুলে দিল —
"আমি তোমার মা..."
কর্ণের মুখের রং বদলে গেল, কিন্তু চোখের আগুন নিভল না। তার কণ্ঠ ছিল স্থির, কিন্তু ভিতরে দহন ছিল আগ্নেয়গিরির মতো।
"যদি তুমি আমাকে স্বীকৃতি দিতে, মা, তবে আজকের আমার পথ হয়তো অন্য হতো। কিন্তু এখন? এখন আমি দুর্যোধনের প্রতি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তিনি আমাকে সম্মানের আসন দিয়েছেন, সমাজের অবহেলা থেকে টেনে তুলেছেন। আমি তাকে ছাড়ব না।"
কুন্তীর বুক ভেঙে পড়েছিল। তবু কর্ণ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল —
"তোমার পাঁচ পুত্র থাকবে, মা। যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব — আর আমি। আমি লড়ব, কিন্তু অর্জুন ছাড়া কাউকে হত্যা করব না।"
কুন্তী জানতেন, এই প্রতিশ্রুতির মধ্যেই নিজের মৃত্যুতে স্বাক্ষর করল কর্ণ। তবুও মায়ের আশীর্বাদ তিনি দিয়েছিলেন, কারণ তাঁর আর কিছুই করার ছিল না।
যুদ্ধ শেষ হলো। হস্তিনাপুরের ধুলোর নিচে চাপা পড়েছিল অসংখ্য স্বপ্ন, আশা, অহংকার। আর সেই মৃতদেহগুলোর মাঝে ছিল তাঁর প্রথম সন্তান — সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান এক টুকরো ইতিহাস — কর্ণ। যেদিন বিদুর তাঁর কাছে এসে ফিসফিস করে বলেছিলেন — "কর্ণ পতিত হয়েছে…" — সেদিন রাজপ্রাসাদের শীতল পাথরের মেঝেতে বসে কুন্তী দীর্ঘক্ষণ কথা বলতে পারেননি। তাঁর অশ্রু নীরবে গড়িয়ে পড়েছিল। তিনি কারও সামনে তা দেখাননি — সব লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজের অন্তরের একান্ত অন্ধকারে।
যুদ্ধোত্তর হস্তিনাপুরে তিনি প্রায় ছায়ার মতো হয়ে গেলেন। তাঁর পুত্ররা রাজ্য শাসন করল, ইতিহাস গড়ল — কিন্তু তাঁর অন্তর্জগতের শূন্যতা আর অপরাধবোধ কখনো মুছে গেল না। তাঁর সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা ছিল —
"আমি দুই পক্ষেরই মা, অথচ দুই পক্ষই সন্তানহারা।"
শেষ জীবনে তিনি গঙ্গার তীরে বনবাসে গিয়ে বসবাস করলেন। সন্ধ্যার সময় গঙ্গার ওপর লাল সূর্য পড়লে তাঁর মনে হতো — "গঙ্গাই তো আমার প্রথম সন্তানকে নিয়ে গিয়েছিল..." তিনি চোখ বন্ধ করলে এখনও ভাসমান সেই হাঁড়ি প্রত্যক্ষ করতেন, শুনতেন শিশুর ক্ষীণ কান্না।
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সেই যন্ত্রণা, সেই প্রেম, সেই অসমাপ্ত মাতৃত্বকে নিজের বুকেই আগলে রেখেছিলেন। তাঁর জীবন তাই কেবল পাণ্ডবদের জননী হওয়ার গল্প নয় — এটি এক নারীর নীরব যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের গল্প। এক নারী, যিনি সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, ইতিহাসের কঠিন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও নিজের সন্তানদের রক্ষা করেছেন —
কিন্তু নিজের হৃদয়টা রক্ষা করতে পারেননি।
লেখক পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পলাশী গ্রামের বাসিন্দা। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইগনু ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন। পেশায় শিক্ষক, নেশায় লেখালেখি। কবি, প্রাবন্ধিক ও আবৃত্তিকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি রয়েছে। বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর পাঁচটি বই প্রকাশিত হয়েছে। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য জাতীয় ও রাজ্যস্তরে পুরস্কৃত হয়েছেন।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।