Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
সামন্তদের নালা
সামন্তদের নালা

বান উঠেছে দেখেই বাঁকু মাছ ধরতে গেল। কলিজালটাকে ঘাড়ে নিয়ে, ঝিলেবাড়ির মাথায় খালুইটা ঝুলিয়ে সিধা এসে দাঁড়াল সামন্তদের নালায়। গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তে মাঠের ধার ঘেঁষে সামন্তদের এই নালাটাই বাঁকুর মাছ ধরার নির্দিষ্ট ঘাঁটি। প্রতি বছরই বন্যা ওঠার আগে এবং বন্যা মরার সময় সে ঠিক সবার আগে এখানেই জাল পেতে দাঁড়ায়। জায়গাটা বাঁকুদের নয়, তবু বংশপরম্পরায় মাছ ধরার অধিকার ভোগ করতে করতে আজ কেমন করে যেন বাঁকুদের সম্পত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। খোদ দখলের সম্পত্তি। সমস্তরকম অধিকার ফলিয়ে সেই বাঁকু আজ দশ বছর ধরে এখানে মাছ ধরে আসছে। আগে তার বাবা ধরত, তারও আগে দাদু।

দাদুর কথা বড়ো একটা মনে পড়ে না বাঁকুর, কিন্তু বাবার স্মৃতি তার কাছে খুবই স্পষ্ট। স্পষ্টই বা হবে না কেন? ছোটবেলাতে বাবার সাথে কতবার সে এসেছে এখানে। তবে তখন সে এসেছে মাছ ধরতে নয়, মাছ ধরা দেখতে। বাবা এক কোমর জলে দাঁড়িয়ে কিভাবে জাল ফেলছে আর মাছ তুলছে, সাগ্রহে বাঁকু তাই দেখতে থাকত। বসে থাকত নালাটারই ডান পাশের উঁচু পাড়টায় — বিস্তর ডালপালা মেলা ঝাঁকড়া যে শ্যাওড়া গাছটা আছে, তারই তলায়। জালে মাছ পড়লে বাবার যতখানি না আনন্দ হোত, তার থেকে বেশি আনন্দ পেত নালার পাশে বসে থাকা ছোট্ট এই বাঁকু। মাছ পড়া দেখে তার স্থির দুটি চোখের পাতা আনন্দে খুশিতে হয়ে উঠত দীপ্ত, উজ্জ্বল। উঃ — বসে বসে মাছ ধরা দেখায় কত না আনন্দ!

তবে শুধু যে আনন্দই ছিল তা নয় — কোনো কোনো দিন এর সাথে মিশে যেত গভীর দুঃখ আর আপসোস। যে মাছটা জালে পড়েও লাফিয়ে পালালো, সে ছোটই হোক আর বড়ই হোক, তার জন্য বাঁকুর আপসোসের যেন শেষ থাকত না। এইভাবে সে কতদিন যে পস্তিয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। একদিনের কথা — একটা কেজি পাঁচেক কাতলা মাছ বেমালুম পালিয়ে গেল। পালালো জাল ছিঁড়ে। একটা বড়ো মাছ জালে লেগেছে টের পেয়েই বুঝি তার বাবা তাড়াতাড়ি করে জালটা তুলতে চাইল। সবে জালটার অর্ধেকটা কী উঠেছে, এমন সময় জালের জলে কলকল করে প্রচণ্ড একটা শব্দ! কী যেন একটা ভীষণ আকারের জন্তু জালটাকে ছিঁড়ে ফালা ফালা করে দিল। কেঁপে উঠল জাল দাঁড়ার প্রান্ত দুটো। জালের ফাঁসগুলো ভীষণভাবে কেমন যেন টান টান। মুহূর্তকাল মাত্র। তারপরই জালের সুতোর টান হঠাৎ শিথিল হয়ে পড়ল। দেখা গেল বিরাট একটা ঢেউ তুলে একটা জলপ্রাণী প্রায় তীরের বেগে ছুটে পালিয়ে গেল, মিশে গেল গভীর জলে। সঙ্গে সঙ্গে বাবার কণ্ঠে অস্ফুট শব্দ — “যা, চলে গেল!”

— “পালিয়ে গেল বাবা!” বাঁকুর মুখেও অস্ফুট এক করুণ জিজ্ঞাসা। বাঁকু নির্নিমেষ দৃষ্টি নিয়েই বসেছিল। জলের মধ্যে খদখদ শব্দটা শুনে তার বড়ো বড়ো চোখ দুটি সহসা গভীর এক উত্তেজনায় আরো বড়ো হয়ে উঠল। বিপুল এক আনন্দে আত্মহারা হয়ে নিজের অজান্তেই পাড় থেকেই কিছুটা নেমে প্রায় সে বাবার কাছে এসে দাঁড়াল। মাছটা যখন বাঁদিক থেকে ডানদিকে কুঁদলে কিছুটা লাফিয়ে উঠেছিল, সে তখন মাছটাকে সুস্পষ্ট দেখতে পেয়েছে। পিঠের শিরটা তার কী মোটা, কী চওড়া চওড়া আঁশ, লেজটা নৌকোর হালের মতো ঠিক, গায়ের রঙটা পেকে যেন একেবারে হলুদের মতো লাল হয়ে গেছে।

— “কতদিনের পুরাতন জাল, সুতা গুলান সব পচে গেছে — এতে কী আর এতবড় মাছ আত্তি হয়” — বলতে বলতে তার বাবা যখন শিথিল জালখানা তুলল, তখন দেখা গেল জালের যেখানে এসে মাছগুলো জমা হয় তার ঠিক উপরের দিকের খানিকটা অংশ একটা বড়ো মাপের থালার মতো করে ছেঁড়া। ওই দিকটা দিয়েই মাছটা পালিয়েছে।

— “বিরাট মাছ না বাবা? পাঁচ-ছ কেজি হবে বোধহয়?” বাঁকু জিজ্ঞেস করে। হতাশ কণ্ঠে বাঁকুর বাবা উত্তর দেয় — “হ্যাঁ, তাতো হবেই; মাছ তো লয় যেন একটা দামড়া বাছুর।”

সে রাত্রে বাঁকু ভালো করে ঘুমোতে পারেনি। বিছানায় শুয়ে শুয়ে বারবার তার মাছটার কথাই মনে পড়েছে। সেই বিরাট শির, চওড়া আঁশ, লাল-হলুদ রঙ, জালটাকে দু-ফাঁক করে লাফিয়ে ওঠা, সর্বশেষে জাল ছিঁড়ে পালিয়ে যাওয়া — সব দৃশ্যই এক এক করে বারবার কতবার তা মনের পর্দায় ভেসে উঠেছে। স্বপ্নের ঘোরে সে প্রতিজ্ঞা করেছে — “মাছ, তুই বাবার জাল ছিঁড়ে পালিয়েছিস; কিন্তু কোথায় যাবি? আমি বড়ো হই তোকে ধরে আনবো, শক্ত সুতোর জাল দিয়ে ধরবোই ধরবো।”

সেদিনের সেই ছোট্ট বাঁকু ধীরে ধীরে বড়ো হয়েছে। এখন সে পাকাপোক্ত এক জোয়ান ছোকরা। সুঠাম স্বাস্থ্য-বলিষ্ঠ দীর্ঘ চেহারা; চওড়া লোমশ যেমন বুকের ছাতি, হাত-পায়ের পেশীগুলোও তেমনি শক্ত আর মজবুত। সারা শরীর জুড়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত সবসময় এমন একটা শক্তির ঢেউ খেলছে — তাতে করে জনা পাঁচেক ডাকাতকে ভাগিয়ে দেওয়া তার কাছে যেন কোনো কষ্টসাধ্য ব্যাপার নয়। সেই তেজী দুরন্ত বাঁকু এখন সামন্তদের নালায় মাছ ধরছে।

ভর সন্ধেবেলা। শ্রাবণ মাস। এখন বৃষ্টি না হলেও আকাশ কিন্তু ঘন মেঘে আচ্ছন্ন। ঘন ঘোর শ্রাবণের বর্ষা বলতে যা বোঝায়, তা গত তিন দিন ধরে হয়ে গেছে। আগের তিনটা দিন অবিশ্রান্ত ধারায় বৃষ্টি যেমন হয়েছে, তেমনি বয়ে গেছে ঝাপটা। ঝাপটাটা থেমেছে গতকাল মাঝরাতের সময়, আর বৃষ্টিটা ভোরের দিকে। তবে বৃষ্টিটা একেবারে থামেনি; আজও দুপুর পর্যন্ত টিপটিপ করে পড়ছিল। বিকালের একটু আগে একেবারে ধরেছে। মেঘ কিন্তু একেবারে কাটেনি। এখনো সারা আকাশ জুড়ে ঘন কালো মেঘের আস্তরণ। বিধ্বংসী ঝড়ের যে উন্মত্ততার দাপট ছিল, সে ভাবটা এখন আর নেই; সেই হিসাবে আকাশ কিছুটা শান্ত বলা যেতে পারে। তবে আকাশের দুর্যোগ কিছুটা কমলেও পৃথিবীর মাটিতে দুর্যোগ বেড়েছে। মাঠ-ঘাট-পথ-প্রান্তর সবই জলে ভরে গেছে। উৎসমুখে প্রবল বৃষ্টির ফলে শীলাবতী ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। জল ছুটছে কানায় কানায়। ছলাৎ-ছলাৎ করে অসংখ্য অজস্র ছোট-বড় ঢেউ তুলে সে বাঁধা বন্ধনহীনভাবে দুরন্ত বেগে ছুটে চলেছে নীচের দিকে। ক্রুদ্ধ গর্জনে শীলাবতী যেন ফুঁসছে-দুলছে, লাফাচ্ছে। শীলাবতীর এই রূপ বাঁকুর কাছে কোনো নতুন নয়। বছর বছর সে নদীর এই বর্ষাকালীন ছবি দেখে আসছে। ভয় তো লাগেই না; বরং এ সময়টা তার কেমন যেন একটা রোমাঞ্চ-ভাব জাগে। নদীটাকে মনে হয় যুদ্ধ সাজে সজ্জিতা রণরঙ্গিণী এক নারীর মতো।

বান পড়েছে তিন সন্ধের সময়। বাঁকুর এতদিনের যা অভিজ্ঞতা, তাতে নদীর জল যত জোরেই বাড়ুক অন্তত ঘণ্টা তিনেক সে সামন্তদের নালায় মাছ ধরতে পারবে। কোমর-প্রমাণ জল ভেবেই জাল পেতেছিল বাঁকু। আশ্চর্য! দু’খেয়া জাল তুলে সবে মাত্র তৃতীয়বার তুলেছে — একটা সের দুই উঠে এল জালে। তৃপ্তির আনন্দে বাঁকুর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল। খালুইয়ের মধ্যে মাছটা রেখে আবার জাল পাতল। এবারে হাত-চেটোর মতো গোটাচারেক পোনাচারা উঠে এল।

বেশ কয়েক বছর ধরে এরকম মাছ পড়েনি। আজ মাছ পড়া দেখেই নিজেকে নিজেই খানিকটা অবাক হল বাঁকু। যতবারই জাল তোলে, তত বারই ছোট চুনোপুঁটি, বাটা’র সঙ্গে রুই-কাতলা-মৃগেল মাছের সাইজ মতো করে কয়েকটা পোনাচারাও উঠে আসে। বাঁকু মনে মনে বলে, “আহা, কার পুকুর যে ভেসে গেল!” পরক্ষণেই ভাবে, “যাক মরুক; যার ভেসেছে, ভাসুক — সে তো দুটো মাছ পাচ্ছে।” বাজে চিন্তা বাদ দিয়ে তাই মাছ ধরাতেই সে আবার মনোনিবেশ করল। আগ্রহ সহকারে একবার জাল ফেলতে লাগল, আর একবার তুলতে লাগল।

নালাটার যেখানে দাঁড়িয়ে বাঁকু মাছ ধরছে, সেখান থেকে শীলাবতীকে দেখা যায় না। একটা উঁচু পাড় তাকে আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু দেখা না গেলেও কী হবে? নদীর বুক দিয়ে ছুটন্ত জলস্রোতের হু-হু, কল-কল শব্দ তার কানে আসছে; নদীর পাড় ভাঙছে — সে শব্দও পাচ্ছে সে। একটানা ব্যাঙের গোঙানি, সামনে কাঁটা মনসার ঝোপে শ্যাওড়া গাছে ঝি-ঝি পোকার বিরামহীন চিৎকার — সবই সে শুনতে পাচ্ছে; কিন্তু তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। সে মাছ ধরার নেশাতেই ঘোর — কী এক মোহময় নেশাতে সে যেন আচ্ছন্ন। দু-কূল ছাপিয়ে নদীর ফেনামিশ্রিত ঘোলাটে, কাদা জলের মাঠে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে সদ্য-ধানগাছের চারা। এদিকে কোমর ছাড়িয়ে পেট ছুঁই ছুঁই করছে বন্যার জল। বাঁকু সবই বুঝতে পারছে, কিন্তু তবু সে জাল গুটিয়ে উঠে আসছে না। তাকে আজ নেশায় পেয়ে বসেছে — মাছ ধরবে, আরও অনেক-অনেক মাছ; বাড়ি গিয়ে তার বৌকে সে চমকে দেবে। অবাক করে দেবে। নিজের আপনজনকে সুখী করার, চমৎকৃত করার জন্যে কাজের প্রতি মানুষের কী অদ্ভুত টান, কী আন্তরিক প্রয়াস! সমস্ত রকম ভয় সেখানে তুচ্ছ, বিপদের কথা সেখানে অচিন্তিত, অভাবিত।

হঠাৎ একটা শব্দে বাঁকুর মনোযোগে চিড় ধরল। না, বন্যার ঢেউয়ের শব্দ নয়, পাড় ভাঙার শব্দ নয়, ব্যাঙের ডাক কিংবা ঝিঁঝিঁর আওয়াজ নয়। একটা অন্য ধরনের শব্দ, অন্য ধরনের আওয়াজ! একটু বিচলিত হয়েই বাঁকু একবার ডানদিকে দৃষ্টিটা ফেরাল। আর তখনই তার বুকের ভিতরটা কেমন যেন ছ্যাৎ করে উঠল। খানিকটা দূরে মাঠের আল ভেঙে কালো মতো কী যেন একটা এগিয়ে আসছে! আলটা দিয়ে হাঁটুর উপর বানের স্রোত বইছে; তারই উপর দিয়ে আসার ফলে ছপছপ একটা আওয়াজ উঠছে। মনে হচ্ছে মানুষের মতো — কিন্তু অন্ধকারে ঠিক ঠাওর করতে পারছে না বাঁকু। আকাশের বুকে মেঘের ঘনঘটা; তার উপর আবার আর একটা ঘন-গাঢ় কালো মেঘ পূব দিক থেকে ছুটে আসছে। মেঘ তো নয়, যেন একটা বিশাল আকারের পাহাড়-প্রমাণ দৈত্য — ভয়ঙ্কর ক্রোধে মুহ্যমান হয়ে বিশাল হাঁ করে এগিয়ে আসছে, যেন আস্ত রাখবে না, গিলে ফেলবে গোটা আকাশটাকে।

ধরণীর বুকে তখন এমনিই গাঢ় অন্ধকার যে, বাঁকু তার নিজের হাতটাকে পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছে না। পৃথিবীর অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত! এই অন্ধকারের বুক চিরেই আসছে একটা ছায়ামূর্তি — পা টিপে টিপে। সারা দেহ তার কালো কাপড়ে ঢাকা; মনে হচ্ছে নারীমূর্তি সেটা। কাদাময় কালো জলের উপর একটা কিম্ভুত কিমাকার ছায়া পড়েছে। না-মানুষ-টানুষ তো হবে না। কারণ বাঁকু ভালোভাবেই জানে, সে ছাড়া অন্য কারো আসার সাহস নেই এখানে। বিশেষ করে এ সময় — এই বাদলা বানের দুর্যোগে।

তবে কি কোনো ডাকাত? তার জালে অনেক মাছ পড়েছে জানতে পেরেই কেড়ে নিতে এসেছে? কিন্তু মেয়ের বেশে আসছে কেন? নাকি অন্য কিছু! ভূতের ভয়ে বাঁকুর সারা গা’টা ছমছম করে উঠল। এর আগে বাঁকু কোনোদিন ভয় পেয়েছে বলে মনে হয় না। সে বাগদী ঘরের ছেলে। শরীরে তার ভয়-ডর বলতে কিছু নেই। বন-বাদাড়, শ্মশান-মশান, ভাগাড়-কবর — যে কোনো স্থানই যে কোনো সময় সে স্বচ্ছন্দে ঘুরে আসতে পারে; সে সন্ধ্যায় হোক, রাত-দুপুরই হোক। সবাই জানে, বাঁকুর মতো সাহসী এই তল্লাটে দ্বিতীয় জনটি নেই। এ হেন বাঁকুর বুকের ভেতরটা কী যেন একটা অজানা ভয়ে শিরশির করে উঠল।

মাথার মধ্যে একটা কাহিনি রেখাপাত করেছে — যে কাহিনি শুনেছে সে বাবার কাছে, শুনেছে গ্রামের আরও কিছু বৃদ্ধ মাতব্বরের মুখে। লোকশ্রুতিতে বলে — নদীর মুখ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে যেখানে যেখানে নালাটার শুরু, তারই বাঁদিকের যে উঁচু জায়গাটা পড়ে আছে, সেখানে নাকি একসময় সুন্দর এক গৃহ ছিল। কোন এক দূর দেশের এক সামন্তরাজ তার অদ্ভুত খেয়ালের বশে সেই গৃহ নির্মাণ করেছিলেন। সামন্তরাজের কী শখ জাগল যে তার দেশ থেকে দূরে, কোন এক নদীর তীরে, একেবারে গাঁয়ের বুকে, বট-অশত্থের স্নিগ্ধ-শীতল ছায়ায় একটি বিলাস কানন তৈরি করবেন — যাকে বলে মধুকুঞ্জ। সেখানে থেকে তিনি পল্লীপ্রকৃতির বুকে শরৎ রানির অপূর্ব শোভাময় রূপটিকে প্রাণভরে উপভোগ করবেন। ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে তিনি শীলাবতীর তীরে এই জায়গাটায় পছন্দ করলেন।

সামন্তরাজের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ সম্পূর্ণ হল। তার ভাবনা মতই বিলাস ভবনটি ইঁট-চুন-বালি-সিমেন্ট দিয়ে বানানো হল; বানানো হল বাঁশ, কাঠ, খড় আর মাটি দিয়ে গাঁয়ের বুকে গাঁয়ের বাড়ির মতো করেই। সৌন্দর্য-প্রিয়তার নির্দশন স্বরূপ বিলাস কক্ষের তিনদিকে অপূর্ব-অপূর্ব সব সুগন্ধময়ী ফুলের গাছ লাগানো হল। আর পিছন দিকে কাটা হল একটা জলাশয়। নৌকা-বিহার করতে করতে নৌকা যাতে সহজে ঢুকতে পারে আর বেরুতে পারে, তাই জলাশয় থেকে নদীর মুখ পর্যন্ত গভীর করে একটা চওড়া নালা খনন করা হল — সংযোগ রক্ষাকারী নালা।

ভাদ্র ফুরিয়ে শরৎ পড়লেই সেই সামন্তরাজ নৌকা চড়ে ঠিক এসে হাজির হতেন — গ্রামের বুকে তার স্বর্গপুরীসম এই বিশাল কুঞ্জে। মাস দুয়েক তিনি থাকতেন এখানে। সূর্যডোবা বিকেলে শীলাবতীর রূপালী ঢেউয়ের উপর নৌকা বিহার করতে করতে তিনি অপার বিস্ময়নেত্রে দেখতেন প্রকৃতির অপূর্ব লীলা-বৈচিত্র্য। সবুজ শ্যামলে মোড়া মাধুর্যমণ্ডিত সুষমাঝরা পল্লী-জননীর আশ্চর্য ছবিটিকে তিনি যেন চোখ দিয়ে গিলতেন। সারা বিকালটা নদীর জলে কাটিয়ে ঠিক সন্ধ্যার সময় দু’পাশে সাদা কাশফুলের ছায়া মাড়িয়ে সংযোগকারী নালাটার মধ্য দিয়ে ফিরে আসতেন জলাশয়ে। তার এই আনন্দবিহারে সঙ্গী হিসাবে আসত তাঁরই কিছু বিশ্বস্ত পরিচারক। আর মধুনিশি যাপনের জন্য আসত কচি বয়সের এক সুন্দরী তরুণী।

সেবার এই মধুকুঞ্জে এসেই সামন্তরাজ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। রোগীর অবস্থা হল সংকটজনক — একেবারে মর-মর। দেশের বাড়িতে অসুস্থতার খবর গেল। শোনামাত্রই সামন্তরাজের পঁচিশ বছরের ছেলে বড়ো এক ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে বাবাকে দেখতে হাজির হলেন সেই বিলাসকাননে। ডাক্তারের চেষ্টায় অল্পদিনের মধ্যেই সামন্তরাজ সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু হল এক অন্য বিপদ! কী যে মতিভ্রম হল সামন্তরাজের ছেলের — বাবার রক্ষিতা, রাত্রিকালের অঙ্কশায়িনীকে প্রথম দেখা মাত্রই ভালোবেসে বসলেন তিনি। রক্ষিতা তরুণীটির প্রেমে সামন্তরাজের ছেলে মুগ্ধ হলেন, হলেন আসক্ত।

রক্ষিতাদের মা হওয়া তো চলেই না — এমন কী মা হতে চাওয়ার ইচ্ছেটাও চরমতম অপরাধ, ভীষণ একটা পাপ। নিয়তি কিন্তু অলক্ষ্যে থেকে এরকমই কিছু একটা বুঝি চাইছিল! মধুকুঞ্জে রক্ষিতা হিসাবে আসা সেই তরুণী হঠাৎ সব ভুলে, সামন্তরাজের সেই ছেলের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিল। মা হওয়ার প্রবল ইচ্ছায়, ছোট্ট একটি সন্তানের ব্যাকুল বাসনায় ঢেলে দিল তার হৃদয়ের গহন গভীরে সুপ্ত থাকা যত ইচ্ছা, কামনা, বাসনা — যত স্বপ্ন-সাধ! 

ব্যাপারটা সামন্তরাজের কানে গেল। তাই ছেলেকে ডেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন — “এসব কী শুনছি? একটি রক্ষিতার সঙ্গে এ কী তোমার ব্যবহার?”

ছেলে কোনো জবাব না দিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন। বাবা এবার আদেশ করে বলেন — “শোন, যা হবার হয়েছে; আর এগিয়ো না। মেয়েটির সংস্পর্শ পরিত্যাগ করো।”

— “কিন্তু বাবা, ও যে আমার সন্তানের...”

ছেলের কথায় সামন্তরাজ মৃদু হাসলেন। বললেন — “ও কিছু না; সে সব আমি ঠিক করে নেব। তুমি শুধু মেয়েটার সঙ্গ থেকে দূরে থেকো। তুমি বুদ্ধিমান ছেলে, আশা করি বাবার সম্মান রাখবে।”

আর বুদ্ধি! প্রেম কী বুদ্ধির দাসত্ব করে? না, যুক্তি-তর্কের কথা শোনে, মানে? সামন্তরাজের ছেলে তাই সেদিন ঠিক করে নিলেন বাবার রক্ষিতাকে নিয়ে পালিয়ে যাবেন দূরে অন্য কোথাও। কিন্তু ঘটে গেল অঘটন। যেদিন পালিয়ে যাবার কথা, তার আগের দিন সকালে শোনা গেল সামন্তরাজের রক্ষিতা হঠাৎ আত্মহত্যা করেছে, মরেছে বুকে ছুরি বিধে। মৃতদেহটা পড়ে আছে রক্তাপ্লুত অবস্থায় — মধুকুঞ্জ থেকে এক কিলোমিটার দূরে, যেখানে নালাটা মোড় নিয়ে শীলাবতীর দিকে বেঁকে গেছে, সেই মোড়ে এক কাশঝোপের ধারে; পা দুটো ভাসছে নালাটার জলে।

প্রথম ভালোবাসার ফুলকে এরকম নিষ্ঠুরভাবে ঝরে যেতে দেখে সামন্তরাজের ছেলের হৃদয় গভীর বেদনায় টলমল করে উঠল। মনের দুঃখ মনে চেপে সেই দিনই তিনি বাবার অভিশপ্ত মধুকুঞ্জ পরিত্যাগ করে চলে গেলেন। সামন্তরাজেরও কী হল, তিনিও আর থাকতে পারলেন না। পরের দিনই তিনি তার দলবল নিয়ে পালিয়ে গেলেন। গেলেন চিরকালের মতো। ছেঁড়া কানির মতো পিছনে পড়ে রইল বহু টাকা-পয়সা ব্যয়ে নির্মিত তার শখের বিলাসকুঞ্জ, সাধের আমোদভবন।

আর এরই সাথে কুকুর, শৃগাল আর শকুনের খাবার হয়ে নালার কাশঝোপের পাশে পড়ে রইল সামন্তরাজের মধুনিশি যাপনের সঙ্গিনী সুন্দরী যুবতীর পচা-গলিত মৃতদেহটা এবং মাতৃত্ব লাভের আশা থেকে বঞ্চিত তার অতৃপ্ত অশরীরী আত্মা! এই রোমহর্ষক কাহিনির সত্যতার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া না গেলেও, তখনকার সেই নৌকা-বিহারের জন্য খনন করা নালাটাই কালের স্রোত বেয়ে কেমন করে যেন “সামন্তদের নালা” বলেই পরিচিত আজ। যা বাঁকু জানে, জানে বাঁকুর গ্রামের মানুষ।

গ্রামের কোন এক বৃদ্ধের মুখে বাঁকু আরও শুনেছিল — সেই মৃতা রক্ষিতার অতৃপ্ত আত্মা নাকি রাতের অন্ধকারে নালার তীর ধরে কেঁদে কেঁদে কতদিন ঘুরে বেড়িয়েছে। সে দেখেনি; তার কোন পূর্বপুরুষ দেখেছে। এখন আর সচরাচর দেখা মেলে না। তবে একেবারেই যে দেখা যায় না, তা নয়। ঘোর অমাবস্যার দিন, রাত্রির গাঢ় অন্ধকারে, দুর্যোগপূর্ণ ভয়ঙ্কর পরিবেশে তাকে এখনও দেখতে পাওয়া যায়। আর সে দেখা দেয় নানা বেশে, নানা রূপে। মানুষ মরে গেলে তার আত্মা আবার ঘুরে বেড়ায়? যতসব গালগল্প! — এই বলে বাঁকু সে সব কথা হেসে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু আজ সেই কথা মনে করেই কেমন যেন ভয় করছে বাঁকুর। মহা দুর্যোগের সময় সে আসে! হ্যাঁ, এই তো পৃথিবীর বুকে ঘন অন্ধকার; নদীতে বান, চারদিকে জলে জলময়, আকাশে ঘুরঘুটে মেঘ, গুডগুড শব্দ; নির্জন, জনপ্রাণীহীন নালার পাশে সে একা — একেবারেই একা। এখন রাত কটা হবে? হ্যাঁ, ভূত-প্রেত-পিশাচ আসার এই মহা সন্ধিক্ষণ। আর দেখতে হবে না — সে নিশ্চিত সেই পিশাচিনীর কবলেই পড়েছে। কী কুক্ষনেই যে সে বের হয়েছিল! আর মাছের লোভে এতক্ষণ বা থাকলই কেন? নিজেকে নিজেই ধিক্কার দেয় বাঁকু।

বিপদের সময় মানুষ দেবতার নাম করে। ওটা করলে নাকি মনে সাহস বাড়ে। বাঁকুও ঠাকুরের নাম জপতে জপতে জালটাকে গুটিয়ে ডাঙায় উঠে এল। তারপর মাছের খালুইটা ডান হাতে শক্ত করে চেপে ধরে, জালটাকে ঘাড়ে নিয়ে সাহস ভরে দাঁড়াল। সাময়িক ভীতিটা তার কেটে গেছে। ভূত-পেতনি-পিশাচ যাই হোক, সেও একবার দেখে নেবে। হয় সে নিজে মরবে — না হয় তাকে মেরে শেষ করে দিয়ে যাবে।

এদিকে সেই আবছায়া-কালো মূর্তিটা মাঠের আল পেরিয়ে আরও অনেকটা এগিয়ে এসেছে। সামনাসামনি হতেই বাঁকু গর্জে উঠল — “কে কে তুই?”

মেয়ে মানুষের গলায় মূর্তিটা উত্তর দিল — “আমি মালতী গো, মালতী। ভয় পেলে বুঝি?”

— “মা-ল-তি!” বাঁকু অবাক হল।

— “হ্যাঁগো হ্যাঁ, আমি তোমার মালতি। অনেক রাত হল, তুমি বাড়ি ফিরছো না দেখে তাই এসেছি। চলো, ঘরে যাই। কই, কতগুলো মাছ হয়েছে! দাও, খালুইটা আমায় দাও।” বলেই মূর্তিটা সেই অন্ধকারের মধ্যেই হাত বাড়াল।

কিন্তু বাঁকু খালুই তো দিলই না; বরং ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। বাঁকুর বৌ-এর নাম মালতী। বাঁকু তাকে আদর করে মালতি বলে ডাকে। তাই মূর্তিটার মুখ থেকে 'মালতি' নামটা শুনে কেমন হকচকিয়ে গেল সে। তারপর ভাবতে লাগল বৌ-এর কথাই। মালতীকে বাঁকু বড় ভালোবাসে। মালতীও তাকে খুব ভালোবাসে। বরং বলা যেতে পারে, কিছুটা বেশিই ভালোবাসে। স্বামী-দেবতার প্রতি কী তার ভক্তি, কী শ্রদ্ধা! বাঁকু এর জন্য গর্বিত।

কিন্তু মালতি এ সময় এত রাত্রে খানা-খন্দ, জল-বান পেরিয়ে এখানে আসবে — এ কী করে হতে পারে? তাছাড়া সে জানে, মালতী এখন ভরা পোয়াতি। আট মাস না ক’মাস চলছে। মালতি তাকে বলেছিল, সামনের আশ্বিন মাসে নাকি খালাস হবে সে। শরীর তার এখন দুর্বল। সেই দুর্বল শরীরে মালতি এখানে এসেছে — এ একেবারে অবিশ্বাস্য! এই সেই বহুদিনের আগের মৃতা রক্ষিতার অশরীরী আত্মাই মালতীর রূপ ধরেই বাঁকুর সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে। কারণ ওরা তো সব বেশেই সয়তে পারে।

বাঁকু আরও একটা কথা শুনেছিল — মাছেদের উপর ভূত-পেতনীদের নাকি ভীষণ টান। মাছ দেখলে সেটাই তারা চেয়ে বসে। না দিলে কিছু করবে না, কিন্তু দিয়ে দিলেই সব্বোনাশ! তখনই পটাং করে ঘাড় মটকে দেবে — নয় রক্ত চুষে খাবে।

তাই মালতীরূপী মূর্তিটা যখন মাছের খালুইটা চাইল, তখন বাঁকু সঁভয়ে পিছিয়ে গেল আর খালুইটাকে আরও শক্ত করে বুকের কাছে চেপে ধরল। একটা আশ্চর্যের অকারণ ভীতি থেকে উদ্ভূত মানুষের যে সব ভাবনা-চিন্তা, বিশ্বাস, সংস্কার আর ধ্যান-ধারণাকে বাঁকু এতদিন অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কার বলে হেসে অবজ্ঞাভরে বেমালুম উড়িয়ে দিয়েছে, আজ জ্বলন্ত সত্যি হয়ে ভর করছে তার মাথায় — চিন্তায়, চেতনায়।

বাঁকু ভয়ে পিছিয়ে যেতেই মূর্তিটা বলল — “হ্যাঁগো, তুমি কী আমাকে অন্য কিছু ভাবছো? না গো, সে সব কিছু না। আমি তোমার মালতিই।”

— “মালতি! ভুলাবার আর জায়গা পাসনি শয়তানি? আমার মালতি এত রাত্রে এখানে এসেছে — মরতে তার সাধ কি! অবিকল মালতির রূপ ধরে, তার কথা নকল করে এসেছিস আমাকে ভুলিয়ে দিবি? আমি তোর সব ছল ধরে ফেলেছি। তুই নকল মালতি।”

— “না গো না,” প্রায় কেঁদে উঠল মূর্তিটা। “আমিই তোমার আসল মালতি। অন্ধকার বলে চিনতে তোমার কষ্ট হচ্ছে। আমি মালতিই, অন্য কিছু নই। হ্যাঁগো, তুমি কী নিজের বৌকে পর্যন্ত চিনতে পারছো না? তোমার কী মাথা খারাপ হয়ে গেল?” গলার স্বর জড়িয়ে আসে মূর্তিটার।

— “ছাড় পথ, ছাড়। আমায় যেতে দে” — বলেই মূর্তিটার গা ঘেঁষে প্রায় এগিয়ে যায় বাঁকু। তারপর নদীর পথটা ধরে দ্রুত চলতে থাকে — পিছন দিকে আর না তাকিয়ে।

— “তুমি আমায় ফেলে যাচ্ছো কেন? দাঁড়াও, আমিও তোমার সাথে যাব” — চিৎকার করতে করতে মূর্তিটাও দ্রুতবেগে বাঁকুকে অনুসরণ করে।

আকাশের মেঘটা এতক্ষণ কুজ্ঝটিকা হয়ে ফুঁসছিল। এবার চেপে বৃষ্টি এল। বড়ো বড়ো ফোঁটা হয়ে ঝরতে লাগল মুষলধারে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রাস্তার ভিজে মাটি আরও ভিজে পিছল হয়ে উঠল। পিছল সে মাটিতেই বাঁকুর পা হঠাৎ হড়কে গেল। কাঁধের জালটা ছিটকে রাস্তার বাঁদিকের ঠিক নিচে বাঁশঝোপটার পাশে গিয়ে পড়ল। ওখানের একটা ছোট্ট নালা দিয়ে জল বইছে। তারই স্রোতে জালটা গেল ভেসে। বাঁকু নিজেও হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল আর কি — কিন্তু পাশেই একটা আকন্দ গাছকে আঁকড়ে ধরে কোনোমতে সামলাল। মাছের খালুই কিন্তু ছাড়েনি।

ওদিকে পিছনে অনুসরণকারী নারীটি আবার কাছে এসে পড়েছে। — “কী গো, পড়ে গেলে নাকি? ছুটছো কেন? আস্তে চলো না। জাল কোথায়? ও কী — ভেসে গেল যে! আমাকে খালুইটা দাও, ধরি। তুমি জালটা কুড়িয়ে নিয়ে এসো।”

মূর্তিটা বলল এক, কিন্তু বাঁকু করে বসল আর এক। এবার বাঁকু দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে গেল। শেষ বাঁচার আশায় হঠাৎ সে পিছু অনুসরণকারিণী নকল মালতীকেই আক্রমণ করে বসল। তার সবল দু’টি হাত দিয়ে ঝাপটে ধরে ক্রোধের সঙ্গে বলে উঠল — “তোর সাহস তো কম লয়, শয়তানি! বাঁকু পাতরের কাছ থেকে খালুই নিতে চাস! তোকে একেবারে মেরে ফেলবো, শিলাইয়ের জলে ডুবিয়ে মারবো।”

— “ওগো না না, এ তুমি কী করছো? আমি ভূত লই! আমি মানুষ — তোমার মালতি। ছেড়ে দাও আমায়!” চিৎকার করতে থাকে মূর্তিটা।

ছাড়বে কী — বাঁকুর হাত সাঁড়াশির মতো চেপে বসেছে তখন তার গলায়।

বৃষ্টি তেমন সমানভাবেই হয়ে চলেছে। তারই মাঝে চলছে ভূত আর মানুষের ধ্বস্তাধ্বস্তি। ভূত ভেবে একজন অপরজনকে মেরে ফেলতে চায়, আর অপরজন চিৎকার করে বলতে থাকে সে ভূত নয়, সে মানুষ।

এ স্থানটা অন্য জায়গার থেকে অনেকটা উঁচু। খুব বড়ো বন্যাতেও এখানটা ডোবে না। তবে নদীর পাড়। বাঁদিকটার খানিক নিচে সমতল জমি, বাঁশগাছ আছে দু’ঝাড়, আর কিছু কচু গাছের বন। কিন্তু ডান দিকটায় ভয়ঙ্কর খাদ। এর পনেরো-কুড়ি ফুট নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে শীলাবতীর জল। নদীটা পূব দিক বরাবর আসতে আসতে ঠিক এই খানটাতেই প্রচণ্ড একটা মোড় নিয়ে দক্ষিণ দিকে ঘুরে গেছে। তাই নদীর প্রায় সমস্ত জলটা এখানে প্রবলভাবে ধাক্কা খায়। এখন আবার চলছে বন্যা। এখনটাতে তাই নদীর অবস্থা ভীষণ-ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা অনন্ত জলরাশি যেন আক্রোশে ফেটে পড়ছে। বড়ো বড়ো ঢেউ আসছে আর আছড়ে পড়ছে। জলটা লাফিয়ে উঠছে পাঁচ-ছ’ ফুটের উপর। জলটা লাফিয়ে উঠেই প্রচণ্ড বেগে লাট্টুর মতো কয়েক পাক ঘুরে আবার ফুলে-ফেঁপে ক্রুদ্ধ উচ্ছ্বাসে বেরিয়ে যাচ্ছে দক্ষিণ দিকে। এখানে পড়ে গেলে আর রক্ষা নেই — জনমের মতো খেল খতম।

এই খাদটার ধারেই বাঁকু পিশাচিনীটাকে প্রায় নিয়ে এসে ফেলেছে। পিশাচিনীটাও শেষ বাঁচার আশায় প্রাণপণ শক্তি দিয়ে বাঁকুকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে। না, পিশাচিনীটা আর পারল না। বাঁকুর অসাধারণ পুরুষ শক্তির কাছে সে কেমন যেন অসহায় — নিস্তেজ হয়ে পড়ল। পিশাচিনী আর ভর পাচ্ছে না। খাদের পিচ্ছিল মাটিতে পা তার হড়কে যাচ্ছে। “ওগো, তুমি আমায় ঠেলে দিচ্ছো কেন? আমি যে গভীর জলে পড়ে যাব। তুমি আমায় ছেড়ে দিও না, আমাকে বাঁচাও” — মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে পিশাচিনী গোঙাচ্ছে। কিন্তু কে শুনবে তার কান্না? ভূতকে বাঁকু কায়দা করে ফেলেছে — সেই আনন্দে সে উল্লসিত-উচ্ছ্বসিত!

বাঁকু এবার একটা ঝাঁকুনি দিয়ে হাতটা উপর দিকে টেনে নিল। “ঝপাস” করে একটা শব্দ। পরক্ষণেই একটা মরণ আর্তনাদ — “ওগো, আমি তলিয়ে যাচ্ছি...”

এরপর এক মুহূর্ত দেরি করেনি বাঁকু। বুকের মধ্যে খালুইটাকে চেপে ধরে উর্ধ্বনিঃশ্বাসে সোজা ঘর। বানের জল ভেঙে কিভাবে ছুটে এল, তা সে জানে না। ঘরের দাওয়ায় পা রেখেই বাঁকু চিৎকার করে ডাকতে লাগল — “মালতি, মালতি! এই মালতি — ঘুমোচ্ছিস নাকি? উঠ, এই দেখ কত মাছ ধরে এনেছি। মালতি, এই মালতি, সাড়া দিচ্ছিস না কেন?”

এত ডাকাডাকিতেও মালতীর কোনো সাড়া পেল না বাঁকু। শুধু দেখল একটা লণ্ঠন টিমটিম করে জ্বলছে। বাঁকুর পাশের ঘরটাতে থাকে হারু এবং হারুর বুড়ি মা। সেই হারুর মা-ই কথা বলতে বলতে বেরিয়ে এল — “কে রে, বাঁকু নাকি? ফিরলি বাবা? এত রাত হল ক্যানে রে? খুব মাছ পড়ছিল বুঝি?”

মালতীকে দেখতে না পেয়ে বাঁকু উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। তাই হারুর মা’র কথার উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞেস করল — “জ্যাঠাইমা, মালতি কোথায়?”
— “ক্যানে, মালতী তোর সঙ্গে আসেনি?”
— “আমার সঙ্গে! কেন আমার সঙ্গে আসবে কেন?” হারুর মা’র কথায় বাঁকু অবাক হল।
“মালতী যে তোর খোঁজেই বেরিয়ে গেছে,” হারুর মা বলল। “তুই ফিরছিস না, এদিকে অনেক রাত হল। তাই—”
— “এ তুমি কী বলছো জেঠিমা!” বাঁকু প্রায় চিৎকার করে উঠল।
— “হ্যাঁরে বাবা, তোকেই সে খুঁজতে গেছে।”
— “দুর্বল শরীরে...”
— “অনেক বারণ করেছিলাম বাবা, কিন্তু আমার মানা সে শুনল না। বললাম, পোয়াতি মানুষ — এই রাতে বেরোস না। সে ব্যাটাছেলে ঠিক চলে আসবে। কিন্তু শুনল না আমার কথা। বেরিয়ে গেল। আর তাকেই দোষ দুব কি! ঘরে দু’দুবার সাপ বেরালো। সেই ভয়েই আরও...”

মালতীরূপধারী পিশাচিনীটার সঙ্গে ধ্বস্তাধ্বস্তির সময় একবার বাঁকুর হাত পিশাচিনীটার তলপেটটায় পড়েছিল। একটা উষ্ণ ছোঁয়ার সঙ্গে পেটের ভিতর কী যেন একটা নড়ে ওঠার আভাস সে পেয়েছিল। এখন তার স্পষ্ট মনে হচ্ছে। তবে সে সত্যিই নিজের ভুলে… মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হচ্ছে বাঁকুর।

“ও কী বিড়বিড় করে কী বলছিস? মালতীকে তুই দেখিস নি?” হারুর মা প্রশ্ন করল।

হাউ হাউ করে বাঁকু এবার কেঁদে উঠল। চোখ-মুখ পাণ্ডুর বিবর্ণ হয়ে গেছে। কাঁদতে কাঁদতেই বলল — “দেখেছি গো জেঠিমা, দেখেছি। আমি তাকে দেখেছি...”
— “দেখেছিস তো কোথায় সে?”
— “শিলাইয়ের জলে।”
— “শিলাইয়ের জলে!” হারুর মা’র চোখের পাতা বিস্ফারিত হল।
— “হ্যাঁগো, জেঠিমা হ্যাঁ। আমি তাকে ভূত মনে করে...”

কথাটা আর সম্পূর্ণ হল না। হঠাৎ হুমড়ি খেয়ে দাওয়ার মেঝেতে পড়ে গেল বাঁকু। লণ্ঠনের মৃদু আলোয় হারুর মা দেখল, বাঁকুর সারা শরীর থেকে দরদর করে ঘাম বেরুচ্ছে। তার মনে হল — যেন কালঘাম।




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

বিস্তারিত নিয়ম

একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।

আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
0 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top