সমুদ্রের অতল গহ্বরে এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে, যা কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানায়। ধরুন, প্রশান্ত মহাসাগরের প্রায় হাজার মিটার গভীরে আপনি কাঁচের মতো স্বচ্ছ ও উজ্জ্বল একটি অস্বাভাবিক লম্বা প্রাণী দেখতে পেলেন। দেখে মনে হচ্ছে, নিয়ন রঙের কোনো বিশালকায় জাদুকরি সাপ। কিন্তু আসল চমক হলো — আপনি যা দেখছেন, তা সাধারণ অর্থে একটি প্রাণী নয়; আবার অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন প্রাণীও নয়!
এর নাম সাইফোনোফোর। সমুদ্রের অন্ধকার জগতের সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ও রহস্যময় বাসিন্দাদের মধ্যে এরা অন্যতম। দেখতে একটি স্বতন্ত্র প্রাণীর মতো মনে হলেও সাইফোনোফোর আসলে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও বিশেষায়িত অংশের এক অনন্য কলোনি। এই অংশগুলোকে বলা হয় ‘জুয়েড’ (Zooid)। জুয়েডগুলো একা বেঁচে থাকতে পারে না। জন্ম থেকেই তারা সম্পূর্ণভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল এবং সম্মিলিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ দেহের মতো কাজ করে।
এই কলোনিতে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। প্রতিটি জুয়েডের কাজ নির্দিষ্ট —
🔸 নেক্টোফোর: এরা শরীরের ওপরের দিকে থাকে। পাম্পের মতো জল ঠেলে পুরো কলোনিকে সামনে বা পেছনে এগিয়ে নিয়ে যায়।
🔸 গ্যাস্ট্রোজুয়েড: এদের কাজ শিকার ধরা ও খাবার হজম করা। এদের সঙ্গে লম্বা বিষাক্ত শুঁড় বা টেন্টাকল যুক্ত থাকে, যার সাহায্যে ছোট মাছ ও চিংড়ি ধরা হয়।
🔸 ড্যাকটিলোজুয়েড: এরা শিকার কাবু করতে এবং আত্মরক্ষার জন্য বিষাক্ত কোষ ব্যবহার করে।
🔸 গোনোজুয়েড: এদের একমাত্র কাজ বংশবৃদ্ধি করা।
যে জুয়েডটি খাবার গ্রহণ করছে, তার নিজস্ব সাঁতার কাটার ক্ষমতা নেই। আবার যে জুয়েডটি কলোনিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সে নিজে খাবার খেতে পারে না — তাকে অন্য জুয়েডের হজম করা পুষ্টির ওপর নির্ভর করতে হয়!
সমুদ্রের প্রায় এক থেকে তিন কিলোমিটার গভীরে, যেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না এবং জলের চাপ প্রচণ্ড, সেখানে কাঁচের মতো স্বচ্ছ এই সুতোর কলোনিগুলো নীরবে সাঁতরে চলে। এদের শরীর থেকে নির্গত নীল ও সবুজ বায়োলুমিনেসেন্ট আলো জ্বলে উঠলে মনে হয়, মহাকাশের কোনো তারা জলের নিচে ভেসে বেড়াচ্ছে।
তবে সব সাইফোনোফোর গভীর সমুদ্রে থাকে না। এদেরই একটি পরিচিত প্রজাতি ‘পর্তুগিজ ম্যান-অব-ওয়ার’, যা সমুদ্রের উপরিভাগে ভেসে বেড়ায়, সাঁতারুদের কাছে আতঙ্কের অপর নাম। বিষাক্ত টেন্টাকলের জন্য এর সংস্পর্শে এলে তীব্র যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়।
এতক্ষণ আপনি যা পড়লেন, তাতে মনে হতেই পারে — যেহেতু অসংখ্য জুয়েড মিলে একটি সাইফোনোফোর তৈরি হয়, তাহলে কি অসংখ্য আলাদা ডিম থেকে তাদের জন্ম?
ঠিক এখানেই রয়েছে জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় চমক। এত বিশাল একটি কলোনির জন্ম হয় মাত্র একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে! প্রক্রিয়াটি সাধারণ কোনো প্রাণীর বেড়ে ওঠার মতো নয়; বরং কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো।
একটি নিষিক্ত ডিম্বাণু থেকে প্রথমে একটি ভ্রূণ তৈরি হয়। পরে তার শরীরে কুঁড়ি বা ‘বাড’ গজাতে শুরু করে। সেই কুঁড়িগুলো ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের বিশেষায়িত জুয়েডে পরিণত হয়। সাধারণ প্রাণীর শরীরে যেমন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তৈরি হয়, সাইফোনোফোরের ক্ষেত্রে তেমনই তৈরি হয় পৃথক কাজের জন্য বিশেষায়িত জুয়েড। তবে তারা মূল কলোনি থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না।
সহজ কথায়, একটি ভ্রূণ থেকেই বারবার অযৌন প্রজননের মাধ্যমে অসংখ্য জুয়েড তৈরি হয়। ফলে একই কলোনির জুয়েডগুলো সবাই একই ডিএনএ বহন করে, অর্থাৎ এরা সবাই একে অপরের একদম নিখুঁত ক্লোন!
২০২০ সালে অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে বিজ্ঞানীরা ‘অ্যাপোলেমিয়া’ প্রজাতির একটি বিশাল সাইফোনোফোরের সন্ধান পান। সর্পিলভাবে ছড়িয়ে থাকা কলোনিটির বাইরের বলয়ের দৈর্ঘ্য আনুমানিক ১৫০ ফুট পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, একটি পূর্ণবয়স্ক নীল তিমির চেয়েও দীর্ঘ!
সাইফোনোফোরের আয়ু কতদিন? আপাতদৃষ্টিতে সহজ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা আরেকটি বড় ধাঁধার মুখে পড়েছেন। কারণ এদের ক্ষেত্রে একটি জুয়েডের আয়ু এবং সম্পূর্ণ কলোনির আয়ু এক বিষয় নয়।
যেহেতু সাইফোনোফোর হাজার হাজার ছোট জুয়েডের সমন্বয়ে গঠিত, তাই এর আয়ু দুইভাবে হিসেব করা হয়। জুয়েডগুলোর আয়ু তুলনামূলকভাবে কম হয়। একেকটি জুয়েডের আয়ু মাত্র কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক মাস। এরা কাজ করতে করতে পুরোনো হয়ে গেলে মারা যায় বা ঝরে পড়ে, আর কলোনিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আবার নতুন জুয়েড গজিয়ে ফেলে!
তবে গভীর সমুদ্রে সাইফোনোফোরকে দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন। তাই বিভিন্ন প্রজাতির সুনির্দিষ্ট আয়ু সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও পর্যাপ্ত তথ্য নেই। শিকারি প্রাণীর আক্রমণ, খাবারের অভাব, সমুদ্রস্রোত ও পরিবেশগত পরিবর্তন তাদের জীবনকালকে প্রভাবিত করে।
অর্থাৎ, সাইফোনোফোর একই সঙ্গে ক্ষণস্থায়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী। হাজার হাজার জুয়েড মিলে গড়ে তোলে এমন এক সত্তা, যা একাধারে একটি প্রাণী, আবার একটি সুশৃঙ্খল কলোনিও। সমুদ্রের সবচেয়ে বিস্ময়কর ধাঁধাগুলোর একটি — যেন প্রকৃতির নিজের লেখা এক অবিশ্বাস্য মহাকাব্য।
লেখক বায়োটেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর। একটি বেসরকারি সংস্থায় কোয়ালিটি কন্ট্রোল এনালিস্ট পদে কর্মরত। শৈশবে 'ছোটদের বিশ্বকোষ' পড়তে পড়তে জীববিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায় এবং এখনো সেই আগ্রহ অটুট। তিনি খুব সম্প্রতি লেখালেখি শুরু করেছেন। ভবিষ্যতে পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে থাকা বিস্ময়কর জীবেদের নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছা রয়েছে। শখ বলতে পুরনো দিনের বিশেষ করে সাদাকালো সিনেমা দেখা।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।