“আপনার সাড়ে ছয় লাখ শিরা আছে, এখুনি বলুন আপনার কোন শিরাটার ব্যথা হচ্ছে? যদি এখুনি না কমাতে পারি, তাহলে আমার ব্যাগসমেত আমাকে ট্রেনের বাইরে ছুড়ে ফেলে দেবেন...” ট্রেনের বগিতে এক হকার ব্যথার মালিশের তেল বিক্রি করছে, একই সঙ্গে নিজের প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন করছে এই বলে। এক যাত্রী রসিকতার ছলে বললেন, “ও দাদা, বলি মনের ব্যথা কমাবার ওষুধ হবে?” অপর এক যাত্রী তখনই বলে উঠলেন, “কী দাদা, আপনি কি ডাক্তার, ওষুধের দোকানের মালিকদের পথে বসাতে চান?” সঙ্গে সঙ্গে একটা হাসির হট্টরোল বয়ে গেল ট্রেনের বগির মধ্যে। কেউ হাসে হা হা হা, কেউ হাসে হু হু, কেউ একটু ভদ্রভাবে হাসার জন্য মুখে রুমাল চেপে ঠোঁটের পাশ দিয়ে ফিকফিক করে হাসে।
এই সবকিছুকে উপেক্ষা করে হকার মশাই আবারও উচ্চস্বরে নিজের ভঙ্গিতে বলে ওঠেন, “মশাই, এতদিন ধরে ডাক্তার, ওষুধ খেয়ে নিজের মেরুদণ্ডটাকে একেবারেই বেঁকিয়ে ফেলেছেন তো। একবার না হয় দেখুন আমার মালিশের তেলটা, হয়তো মেরুদণ্ডটাকে আগের মতো শক্ত করতে না-ও পারি! অন্তত যন্ত্রণার গোড়ায় আঘাত করতে পারব।” সবাই হাসি থামিয়ে কী যেন ভাবনার মধ্যে পড়ে গেল। হকার আবারও বলে উঠল, “ব্যথায় মরে যাচ্ছেন? সারভাইকাল প্রবলেম? পেশিতে মাংস বেড়েছে! এখুনি একবার মালিশ করলেই ভ্যানিশ।” ইতিমধ্যে কোথা থেকে যেন এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “দাদা, মরে যাওয়ার হলে এতদিনে মরে যেতাম, যাইনি যখন আর কিছু হবে না।” লোকটির মধ্যে বাঁচার চেষ্টা বোধ করি ভীষণ কিছু নেই, উপরন্তু মরবার ইচ্ছাও প্রবল নয়। এই সমস্ত মানুষ সমাজে কচুরিপানার মতো। ঢেউ যেদিকে ইচ্ছে সেদিকে নিয়ে গেলেও না আছে আপত্তি, না আছে বিপত্তি। না আছে অভিযোগ, না আছে ক্ষোভ।
এই সব ঠাট্টা-মশকরার মধ্যে দিয়েই প্রতিদিন হকারি করে। প্রতিদিন বাড়ি ফেরে। না থাকে কোনও আফসোস, না থাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এসবের মধ্যে দিয়ে স্টেশন চলে আসে। একে একে নেমে যায় সবাই। কেউ ধরে এসি-ট্যাক্সি, কেউ ধরে অটো, কেউ ধরে টোটো, আবার কেউ বাসের দোলাদুলিতে দুলতে দুলতে যে যার নীড়ে ফিরে আসে। ঠিক পাখিদের মতো। তারপর কেউ আর কারও খোঁজ রাখার প্রয়োজন বোধ করে না।
গিন্নি বলে, “সে তোমার রোজকার। অন্যদিন খুকি জেগে থাকত, খাবার আনবে তুমি, সেই আশায়। আজ হয়তো বুঝে গেছে তুমি কেবল তাকে আশা দেখাও। কোনও দিন আনবে না।”
হকার বলে, “গিন্নি, ইচ্ছে কি আমার করে না! একটাই মাত্র মেয়ের জন্য হাতে করে কিছু নিয়ে আসি। তুমি তো জানো, এই কটা টাকাই তো উপার্জন করি। এতে সারা মাস কীভাবে চলে, তা তোমাকে নতুন করে কী আর বলব। কিন্তু তুমি দেখো, ঠিক কালকে আমি কিছু না কিছু নিয়েই আসব। তুমি দেখো।”
গিন্নি বলে, “আচ্ছা আচ্ছা, হয়েছে। এবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো দেখি। রাত অনেক হয়েছে। কাল ভোরে তো আবার বেরোবে, নাকি!”
টিমটিম করে জ্বলতে থাকা বাল্বটি নিভিয়ে ঘুমিয়ে যায় দুজনে। শুতে শুতে হকার মনে করে, আবার সেই একই শব্দ, একই ট্রেনের মানুষদের ঠাট্টা-মশকরা ঠেলে মালিশের তেল বিক্রি। একটু চোখ জুড়ে আসতে আসতে তার মনে হল, কে যেন তাকে ধরে একটা সোনালি পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যাচ্ছে। চারদিকে কত রং-বেরঙের গাছ। আর ঠিক চূড়ায় মাথায় মুকুট পরা, ময়ূরের পালক গোঁজা রাখাল বালকের মতো পোশাক পরে একজন দাঁড়িয়ে আছে। পেছন থেকে মনে হচ্ছে, যত রং, যত আলো ওই বালকের থেকেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। মুখ দেখার চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। তবে কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়া মলিন হাবভাব। যেন কত শত কোটি বছরের ক্লান্তি।

ইতিমধ্যে ভোর হলে পাখির গুঞ্জন শোনা যায়। গিন্নি ডাকে, “কী গো, ওঠো, ভোর গড়িয়ে গেল যে। যেতে হবে তো, নাকি?”
হকারের কোনও শব্দ নেই, সাড়া নেই। শরীর নিথর, ঠান্ডা। গায়ে হাত দিয়ে চমকে উঠল গিন্নি। “এ কী! এ... কী, কী হল আমার! ওগো, কে কোথায় আছো! আমার কী সর্বনাশ হল!”
হকারের একটা মারাত্মক রোগ ছিল। তা মাঝে মাঝে যখন বাড়াবাড়ি হত, তখন প্রায় মরণাপন্ন অবস্থার সম্মুখীন হতে হত। সে কথা গিন্নিকে কোনও দিন জানায়নি, পাছে দুশ্চিন্তা করে, এই ভয়ে। আজ আর সে পারল না লুকোতে। কী আশ্চর্য দেখো, আর বলতেও হল না। কী অদ্ভুত, না! এইভাবেই হকারের জীবন কাটে, তাই না! ভোর হলেই মালিশের তেল, মালিশের তেল।
গিন্নি যখন এভাবে কাঁদছিল, সেই কান্নার আওয়াজে খুকির ঘুম ভেঙে গেল। সে এসে দেখে তার বাবা ঘুমিয়ে আছে আর মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। চোখ থেকে যেন গঙ্গার বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। সে বাবার কাছে এসে বলে, “বাবা, বাবা, আমার খাবার? রোজই তো বলো। কই বাবা, আমার খাবার?”
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।