জন্ম থেকে প্রথম ১০-১২ বছর অবধি একটি মেয়ে কাটায় তার শৈশবকাল, ১৩-১৯ হলো তার কৈশোর আর ২০-৩০ তার নবযৌবন। আর তিরিশ পেরিয়ে গেলেই? জীবনের এই phase-টারও একটা আলাদা নামকরণ করা উচিত। এই সময় না থাকে নবযৌবনের তারুণ্য বা চাপল্য, আবার প্রৌঢ়ত্ব থাকে বেশ কিছু বছর দূরে! তিরিশ পেরোনো মেয়েরা বুড়িও নয়, আবার কচি খুকিও নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই বয়সি মেয়েরা নিজেদের জীবনে settled। চাকরি-বাকরি, বিয়ে, ঘর-সংসার — বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জীবনের এই পর্বগুলো পেরিয়ে আসে এই মেয়েরা! অনেকেরই হয়তো ৫-৭ বছরের বিবাহিত জীবন, হয়তো কেউ কেউ ১-২টি সন্তানের মা! কিন্তু মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সেই চঞ্চল কিশোরী!? কোথাও যেন থেকেই যায় সে! শুধু চারপাশের পরিবেশের কাছে ভিতরের সেই চাঞ্চল্যকে লুকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যায় তিরিশ পেরোনো মেয়েটি! এই ‘বুড়ো’ বয়সে এসে এসব ছেলেমানুষি করা যে নেহাতই হাস্যকর!
ঘর-সংসার, অফিস — সারাদিনের কাজের ফাঁকে সময় পেলেই একলা মন খাতা খুলে হিসাব করতে বসে কী কী পাওয়া হলো, আর কী কী বা গেল হারিয়ে! রুটিনবদ্ধ কাজের শেষে মনটা যেন সবসময় ‘জীবনে কী করলাম’, ‘সময়টা কেন এত তাড়াতাড়ি হারিয়ে ফেললাম’ — এই চিন্তাতেই মগ্ন থাকে! মন খালি ফিরে যেতে চায় ছোটবেলার মিষ্টি nostalgia-তে! ফেলে আসা রঙিন ছোটবেলা, সেই স্কুলের দিনগুলো, সেই দুই বিনুনি আর স্কুল ইউনিফর্মের দিনগুলো বা কলেজের উজ্জ্বল, রঙিন দিনগুলোর কথা ফিরে আসে বারবার! মনে পড়ে যায় কত পুরোনো ব্যথা, কত গোপন মনখারাপ! যে মন ভেঙেছিল বা যার মন ভাঙতে হয়েছিল, সমানভাবে মনে পড়ে সেসব কথা! বাবা-মায়ের শাসন, আগলে রাখা, বকুনি, আদর-ভালোবাসা, ভাইবোনের খুনসুটি, মারপিট, প্রিয় বান্ধবীর সঙ্গে চলা আড্ডা, ভাগ করে খাওয়া ফুচকা, ঘুগনি... কত না সুমধুর স্মৃতি! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যার সবকিছুই ছেড়ে আসতে হয়েছে পিছনে!
হঠাৎ করেই সেই সদ্য কলেজে ওঠা ঝলমলে তরুণীকে বড্ড miss করতে থাকে মন! কিন্তু সময়ের বালিঘড়ি তো আর উল্টো দিকে যেতে পারে না! ইচ্ছা হয় আবারও সেই ছোটবেলার মতো বাবা-মায়ের মতো করে আগলে রাখুক কেউ! বুকের মধ্যে আশ্রয় দিক সব বিপদ, সব মনখারাপ থেকে! অথচ সব থেকে ভরসার মানুষ দুটোর থেকেই তখন মনের ব্যথা লুকোতে শিখে যায় মেয়েরা! মনে হয়, কী দরকার বয়স্ক, অসুস্থ লোক দুটোকে অযথা বিব্রত করে! মনে হয়, কত চট করে বুড়িয়ে গেল বাবা-মা! অথচ এই তো সেদিনও দুজনকে দেখে মনে হতো জীবনের দুই superhero, এরা দুজন পাশে থাকলে দুনিয়ার কোনও বিপদ কোনওদিনও ছুঁতেও পারবে না!
বিয়ে করে সংসার বসানো মেয়েটার ইচ্ছা হয় তার প্রিয় মানুষটার চোখে আবারও অপরূপা হয়ে উঠতে, প্রথম মিলনের সেই মুগ্ধতা, সেই আকুলতা আবারও ফিরে আসুক। আটপৌরে একঘেয়ে জীবনে উত্তাল প্রেম আসুক নেমে, নিয়ম, কর্তব্য আর দায়িত্ব পালন করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া মনে আবারও সেই ছেলেমানুষি প্রেম ফিরে আসুক! সেই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করা, ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা... সংসারের খুঁটিনাটির হিসাব কষতে কষতে হারিয়ে যাওয়া সেই ভালোবাসা আবারও প্রিয় মানুষটার হাত ধরে ফিরে আসুক তিরিশ পেরোনো মেয়েটার জীবনে! ফিরে আসুক সেই একসঙ্গে বৃষ্টিতে ভেজা, হাতে হাত রেখে পথ চলা, সেই মুখোমুখি বসে কত না অর্থহীন গল্প করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দেওয়া! প্রিয় মানুষটি আবারও মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে গোলাপ গুঁজে দিক মেয়েটার চুলে, পাশাপাশি গঙ্গার ঘাটে বসে শুরু হোক না আবার চা পান মাটির ভাঁড়ে! ফিরে আসুক না সেই প্রথম প্রেমের দিনগুলো আবার!
সমাজের চোখে তিরিশ পেরোনো মেয়ে
ঘরে-বাইরে এ সময় কত মানুষের কত কথার মুখেই না পড়তে হয় মেয়েদের! বয়স তিরিশ পেরিয়েছে? এখনও চাকরি হয়নি! এখনও বিয়ে হয়নি! এখনও বাচ্চা নেয়নি! ওমা, divorce হয়ে গেছে, নিশ্চয়ই মেয়েটারই দোষ, adjust করতে চায়নি!
সারাজীবন মেয়েদের ডানা মেলার আকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর লোকের তো কমতি থাকে না, কিন্তু এই বয়সি মেয়েদের জন্য যেন আলাদাই judgement-এর ঝড় ওঠে! এখন যে বয়সটা বেড়ে গেছে, আর তো ছেলেমানুষি বলে তার দোষ-ত্রুটিগুলোকে ঢেকে রাখা যাবে না। সমাজ বরং চোখ পাকিয়ে আরও চেপে ধরবে তার ভুলগুলোকে, পদে পদে বিচার করবে ‘মেয়েমানুষ’কে!
চাকরি, সংসার আর প্রতিদিনের চাপ
চাকরিরতা হলে সমাজের এক অংশের ধারণা, মেয়েরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন মানেই তাদের জীবনে প্রচুর শান্তি! কিন্তু তিরিশ পেরোনো ওই চাকরিরতা মেয়েরা জানে, চাকরি করলেই সবটা ঠিক হয়ে যায় না! একটা চাকরি আর মাসের শেষের মাইনের জন্য কতটা যুদ্ধ করতে হয়, তার ধারণা কি আছে সমাজের? অফিসে কাজের pressure, সময়মতো পৌঁছোনো এবং ফিরে আসার pressure, ট্রেনে, বাসে, সর্বত্র নিজেকে এবং নিজের সম্মানকে বাঁচিয়ে যাতায়াতের pressure, বাড়িতে বয়স্ক বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, ছোটো বাচ্চার pressure! Promotion হলে নিজেকে প্রমাণ করার pressure, promotion না হলে টিটকিরি শোনার pressure! আর দিনের শেষে নিজের জন্য শুধু পড়ে থাকা অসীম ক্লান্তি! শুধু মাস গেলে কটা টাকা হাতে পেলেই হয়ে যায়, সব ঠিক?!
শরীরও কি আগের মতো সঙ্গ দেয়?
তিরিশ পেরোনো এই শরীরটাও কি আর আগের মতো সঙ্গ দেয়? নিয়মিত ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ির শেষে হাঁটু, কোমর, পিঠের ব্যথা, অফিস ক্যান্টিনে পরপর দুদিন খেলে গ্যাস, অম্বল, গলা জ্বালা, অপ্রয়োজনীয় মেদ বৃদ্ধি, থাইরয়েডের সমস্যা, hormonal imbalance, ত্বকের সমস্যা, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন D বা আয়রনের ঘাটতি!
তিরিশ পেরোনো মেয়েরা এক অদ্ভুত জীব। তাদেরও ইচ্ছা করে কেউ তাদের যত্ন নিক, তাদের মনের যত্ন নিক! কারও ওপর দাবি খাটাতে ইচ্ছা করে, ইচ্ছা করে দিনের শেষে কেউ একবার জিজ্ঞাসা করুক, ‘কেমন আছো, সব ঠিক আছে তো!?’ ইচ্ছা করে হারিয়ে যাওয়া সোনালি দিনগুলো আবার কেউ মুঠোয় ভরে ফিরিয়ে দিক, আবার সেই ছোট্ট মেয়েটা বা সেই চঞ্চল কিশোরীকে কেউ ফিরিয়ে দিক, ফিরিয়ে দিক সেই দায়ভারহীন, ভাবনাচিন্তাহীন সুখের সময়কে! কিন্তু সময় খালি দুর্বার স্রোতে এগিয়ে যায়, তিরিশ পেরোনো মেয়ের নির্ঘুম চোখে গভীর রাতে শুধু একরাশ অপেক্ষা আর হতাশা এঁকে দিয়ে যায়!
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।