ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সম্প্রতি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে একটি চিঠি পাঠান। সেই চিঠিতে রাজ্যের প্রশাসনিক কাজকর্ম ও সরকারি যোগাযোগে বাংলা ভাষার ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় চিঠিটি প্রকাশ করেন এবং ঘোষণা করেন, "আগামী ১লা সেপ্টেম্বর থেকে রাজ্য সরকারের সমস্ত স্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।"
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের ভাষা ও জনগণের ভাষার মধ্যে অযথা দূরত্ব থাকা উচিত নয়। কারণ ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের নয়, ক্ষমতায়নেরও মাধ্যম। প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজে মাতৃভাষার ব্যবহার সাধারণ মানুষকে নিজের অধিকার প্রয়োগে আরও সক্ষম করে তোলে। যখন সরকারি নথি, জমির রেকর্ড, এফআইআর কিংবা সরকারি পোর্টালের বিজ্ঞপ্তি এমন ভাষায় থাকে যা অধিকাংশ নাগরিক সহজে বুঝতে পারেন, তখন প্রশাসনের কাঠামো আর দুর্বোধ্য থাকে না।
ইংরেজি বা অন্য ভাষার ওপর নির্ভরশীলতার কারণে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষকে অনেক ক্ষেত্রেই দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে। মাতৃভাষার বাধ্যতামূলক ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই হয়তো সেই নির্ভরশীলতা কমিয়ে তাঁদের আরও আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর করে তুলবে। তাঁরা নিজস্ব অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবেন। সেদিক দিয়ে বিচার করলে এই সিদ্ধান্তকে নিছক একটি প্রশাসনিক নির্দেশ নয়, বরং নাগরিক অধিকার সুনিশ্চিত করার একটি পদক্ষেপও বলা যায়।
ভারতের সংবিধানের ৩৪৫ নম্বর অনুচ্ছেদ রাজ্যগুলিকে নিজেদের প্রশাসনিক ভাষা নির্ধারণের অধিকার দিয়েছে। সেই অধিকারকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক, পাঞ্জাব, ওড়িশা, গুজরাট ও মহারাষ্ট্রসহ বহু রাজ্য দীর্ঘদিন ধরেই নিজস্ব ভাষাকে প্রশাসনের কেন্দ্রস্থলে স্থান দিয়েছে। একইভাবে হিন্দিভাষী রাজ্যগুলিতেও প্রশাসনের প্রধান ভাষা হিন্দি। পশ্চিমবঙ্গের এই সিদ্ধান্ত তাই ব্যতিক্রম নয়; বরং দীর্ঘদিনের একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক বাস্তবতার দিকে প্রত্যাবর্তন।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, সংবিধানের ৩৫০ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির কেন্দ্র বা রাজ্যের যেকোনো সরকারি কর্তৃপক্ষ বা কর্মকর্তার কাছে অভিযোগের প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র বা রাজ্যে ব্যবহৃত যেকোনো ভাষায় আবেদন করার অধিকার রয়েছে। দেশের বহু হিন্দিভাষী ও দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যের সাধারণ মানুষ নিজেদের ভাষায় এই অধিকার দ্বিধাহীনভাবেই প্রয়োগ করেন। বাংলার মানুষের ক্ষেত্রেও নিজের ভাষায় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা স্বাভাবিক অধিকার হয়ে ওঠাই কাম্য।
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু — দুজনেই মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা শুধু ইংরেজি গবেষণাপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বাংলায়ও নিয়মিত লিখতেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু বিশ্বাস করতেন যে, বিজ্ঞানের জটিল ধারণাগুলো মাতৃভাষাতেই সঠিকভাবে শেখা ও শেখানো সম্ভব। আর জগদীশচন্দ্র তো বাংলা কল্পবিজ্ঞান রচনারও পথিকৃত।
কিন্তু সেই ঐতিহ্যের অনেকটাই আজ অতীত। "What Bengal thinks today, India thinks tomorrow"–এর সেই সময় অতিক্রান্ত; বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চা ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। প্রশাসনিক ও সরকারি কাজকর্মও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই মাতৃভাষার এই বাধ্যতামূলক ব্যবহার আদতে কতটা কার্যকর হবে এবং এই সিদ্ধান্ত সরকারি কার্যক্রমকে আরও সহজবোধ্য করে তোলার পাশাপাশি বাংলা ভাষার মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে কি না, তা সময়ই বলবে। আপাতত এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো যাক।
প্রকাশিত হলো — বাঙালি.নেটওয়ার্ক-এর ❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শ্রাবণ ১৪৩৩ সংখ্যা। প্রকৃতি এখন যেন জলরং; এই সংখ্যার প্রতিটি পাতাও ভাবনার একেকটি ক্যানভাস।
চলুন, একসাথে পড়ি, ভাবি, আর Glocal বাংলার জন্য Vocal হই।