মায়ের মুখের ভাষার চেয়ে পবিত্র এবং আপন একটি মানুষের জীবনে আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু এই ভাষার অধিকারটুকুর জন্যই যখন রাষ্ট্র বুলেটের আগুনে একটা আস্ত উপত্যকাকে ছারখার করে দেয়, আর ১৬ বছরের একটা মেয়ের চোখ উপড়ে নিয়ে যায় বুলেটের সিসা — তখন ইতিহাস আর শুধু তথ্যের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে এক চিরন্তন অশ্রুগাথা।
১৯৬১ সালের ১৯ মে আসামের বরাক উপত্যকার শিলচর রেল স্টেশনের পিচঢালা রাস্তা আর রেললাইনের কালো পাথরগুলো বাঙালির যে তাজা রক্ত শুষে নিয়েছিল, তা কোনও রাজনৈতিক আন্দোলনের শুষ্ক খতিয়ান নয়; তা হলো বুকের পাঁজর দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করার এক মহৎ, মর্মস্পর্শী এবং চিরন্তন কান্নার ইতিহাস।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের ক্ষত তখনও দগদগে। নিজের চেনা ভিটেমাটি, চেনা নদীর জল, ফসলের মাঠ ছেড়ে কোটি কোটি মানুষ রাতারাতি হয়ে গেলেন "উদ্বাস্তু"। পূর্ব পাকিস্তান থেকে তেমনই লক্ষ লক্ষ সর্বহারা বাঙালি পরিবার সীমান্ত পার হয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন আসামের বরাক উপত্যকায় — কাছাড়, করিমগঞ্জ আর হাইলাকান্দির বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। তখনও তাঁদের চোখের জল শুকায়নি, নতুন করে বাঁচার লড়াই সবে শুরু হয়েছে।
ঠিক এই রকম একটা চরম মানবিক সংকটের আবহে, ১৯৬০ সালের এপ্রিল মাসে আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিমলা প্রসাদ চালিহা অসমীয়া জাতীয়তাবাদীদের চাপে বিধানসভায় একটি অত্যন্ত বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য বিল উত্থাপন করেন। বিলের মূল বক্তব্য ছিল, "অসমীয়া" ভাষাকে সমগ্র আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
এই একটি আইনি কলমের খোঁচা বরাক উপত্যকার তৎকালীন প্রায় ৮০% বাংলাভাষী মানুষের পিঠে মরণকামড় বসিয়ে দিল। এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্থ ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও নিষ্ঠুর। যদি বাংলা ভাষা তার সরকারি মর্যাদা হারায়, তবে বরাকের লক্ষ লক্ষ বাঙালি সন্তান স্কুলে মায়ের ভাষায় পড়তে পারবে না, আদালতে বাংলায় বিচার চাইতে পারবে না এবং সমস্ত সরকারি চাকরি থেকে বাঙালি যুবসমাজ রাতারাতি বহিষ্কৃত হয়ে যাবে। এটি ছিল এক পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক ও জাতিগত উচ্ছেদের ক্রূর নীলনকশা।
গ্রামের নিরক্ষর কৃষক, কলকারখানার মজুর, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে ঘরের অন্তঃপুরে থাকা মায়েরা পর্যন্ত ঘর ছেড়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। উপত্যকার আকাশে-বাতাসে তখন একটাই প্রতিজ্ঞা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, "জান দেব, তবু ভাষা দেব না।" সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, ১৯৬১ সালের ১৯ মে বরাক উপত্যকাজুড়ে পূর্ণাঙ্গ ও শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করা হবে।
এই উত্তাল এবং ঐতিহাসিক আন্দোলনের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছিল এক অতি সাধারণ, অথচ history কাঁপানো কিশোরী — কমলা ভট্টাচার্য। ১৯৪৫ সালে অবিভক্ত ভারতের সিলেটের গোলাপগঞ্জের ঢাকাদক্ষিণ গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবেই কমলা তাঁর বাবা রামরমন ভট্টাচার্যকে হারান। এরপর ১৯৫০ সালের পূর্ব পাকিস্তানের ভয়াবহ দাঙ্গার করাল গ্রাস থেকে নিজের সন্তানদের বাঁচাতে মা সুপ্রভাষিণী দেবী এক কাপড়ে, সর্বস্ব হারিয়ে সীমান্ত পার হয়ে শিলচরে চলে আসেন। শিলচরের পাবলিক স্কুল রোডের একটা জীর্ণ, ছোট ভাড়া বাড়িতে শুরু হয় তাঁদের চরম অভাবের সংসার।
মেজদিদি প্রতিভা ভট্টাচার্য একটি ছোট স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দেন এবং তাঁর সেই সামান্য বেতনেই মা, ভাই ও বোনদের নিয়ে পুরো পরিবারটা কোনওমতে আধপেটা খেয়ে বেঁচে থাকত। অভাব এতটাই পিঠোপিঠি ছিল যে কমলার স্কুলের নতুন পাঠ্যবই কেনার সামর্থ্য পর্যন্ত মায়ের ছিল না। মেজদিদির একটা পুরোনো ডিকশনারি চেয়েও কমলা পাননি, কারণ নতুন একটা কেনার মতো টাকা ঘরে ছিল না। কিন্তু কমলার জেদ ছিল ইস্পাতের মতো শক্ত। সহপাঠীদের কাছ থেকে বই চেয়ে এনে রাতের পর রাত কুপির আলোয় পুরো অধ্যায় হাত দিয়ে খাতায় লিখে লিখে পড়তেন তিনি।
এই তীব্র লড়াইয়ের মধ্যেই ১৯৬১ সালের মে মাসে কমলা ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ করেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, টাইপরাইটিং শিখবেন, একটা চাকরি জোগাড় করবেন এবং নিজের মেজদিদি আর বৃদ্ধা মায়ের এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর সংসারের অবর্ণনীয় কষ্ট দূর করবেন। তিনি শুধু একটুখানি সুখ চেয়েছিলেন তাঁর পরিবারের জন্য। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফলের খামটি যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছাবে, ততদিনে কমলা আর এই পৃথিবীতে থাকবেন না।
১৯ মে, ১৯৬১। চারদিকে থমথমে পরিবেশ, কিন্তু বরাকের মানুষের চোখে তখন মাতৃভাষা রক্ষার দীপ্তি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে কমলা তাঁর মেজদিদি প্রতিভার একটা শাড়ি পরে আন্দোলনের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন। বাইরের উত্তাল পরিস্থিতি দেখে বড়দা আর দিদিরা তাঁকে যেতে বারণ করেছিলেন। কিন্তু দেশের ও মায়ের ভাষার অপমানে ১৬ বছরের কিশোরীর রক্ত তখন টগবগ করে ফুটছে। সে বলেছিল, "ভাষার জন্য সবাই যাচ্ছে, আমি কেন ঘরে বসে থাকব?" যাওয়ার সময় মা সুপ্রভাষিণী দেবী মেয়ের জীবনের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে আঁচল থেকে একটা কাপড়ের টুকরো ছিঁড়ে কমলার হাতে গুঁজে দিয়ে বলেছিলেন, "যদি পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছাড়ে, তবে এটা জলে ভিজিয়ে মুখে চাপা দিস, মা।"
মা জানতেন না, এই কাপড়ের টুকরোটি একটু পর তাঁর নিজের মেয়েরই তাজা রক্তে ভিজতে চলেছে। কমলার সঙ্গে তাঁর ছোট বোন মঙ্গলা, ছোট ভাই বকুল আর ভাগ্নে বাপ্পাও স্টেশনের দিকে রওনা দেয়।
দুপুরের দিকে রোদের তীব্রতা যখন চরমে, মা সুপ্রভাষিণী দেবী ঘরে আর স্থির থাকতে পারলেন না। বুকের ভেতরটা কেমন যেন কু গাইছিল। তিনি নিজেই ছুটে গেলেন শিলচর রেল স্টেশনে। সেখানে হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মধ্যে নিজের মেয়েকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন। কমলা পরম মমতায় মায়ের ধুলোমাখা পা দুটি হাত দিয়ে মুছে দিলেন, জল দিয়ে ধুইয়ে দিলেন। মাকে পরম আদরে বললেন, "মা, বড্ড তেষ্টা পেয়েছে, একটু শরবত খাওয়াবে?" দরিদ্র, সর্বহারা মায়ের আঁচলে তখন স্টেশনের দোকান থেকে এক গ্লাস শরবত কিনে দেওয়ার মতো দুটো পয়সাও ছিল না। মা অশ্রুসজল চোখে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। মা জানতেন না, মেয়ের তৃষ্ণার্ত মুখের সেই শেষ আকুতি সারাজীবন তাঁর বুকে তপ্ত শেলের মতো বিঁধে থাকবে।
শিলচর রেল স্টেশনে তখন হাজার হাজার সত্যাগ্রহী রেললাইনের ওপর বসে শান্তিতে গান গাইছিলেন, স্লোগান দিচ্ছিলেন। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে, কোনও আগাম সতর্কবার্তা বা সাইরেন ছাড়াই, রাজ্য সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এবং আসাম রাইফেলসের জওয়ানরা শান্ত, নিরস্ত্র জনতাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় "মাতৃভাষা জিন্দাবাদ" স্লোগান। চারদিকে শুধু বুলেটের শব্দ আর মানুষের আর্তনাদ।
মায়ের দেওয়া সেই কাঁদানে গ্যাস থেকে বাঁচার কাপড়ের টুকরোটি মুহূর্তের মধ্যে কমলার নিজেরই তাজা মগজ আর রক্তে ভিজে লাল হয়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন কমলা। দূর থেকে ছোট ভাই বকুল নিজের দিদির এই মর্মান্তিক, বীভৎস মৃত্যু নিজের চোখে দেখেছিল, যে দৃশ্য সে তার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভুলতে পারেনি।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই শেষ হয়ে যায় কমলার সব স্বপ্ন, তাঁর টাইপরাইটিং শেখার ইচ্ছে আর মাকে সুখে রাখার বাসনা। কমলার বোন মঙ্গলা এক মাস হাসপাতালে অচেতন থাকার পর শারীরিকভাবে বেঁচে ফিরলেও, দিদির ওই রূপ দেখে সারাজীবনের মতো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
শিলচর রেল স্টেশনের সেই রক্তক্ষয়ী দুপুরে কেবল কমলা নন, মায়ের ভাষার জন্য বুক পেতে দিয়েছিলেন আরও বহু বীর তরুণ। স্টেশনের কালো পাথরগুলো সেদিন শুষে নিয়েছিল বাঙালির তাজা ও উষ্ণ রক্ত। সেখানে বুলেটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যান তরুণ ছাত্রনেতা শচীন্দ্র চন্দ্র পাল এবং দেশপ্রেমিক যুবক কানাইলাল নিয়োগী, যাঁরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত স্লোগান দিয়ে গেছেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন চণ্ডীচরণ সূত্রধর, তরণী দেবনাথ এবং তরুণ হীরেন দাস, যাঁদের কণ্ঠ স্তব্ধ হয়েছিল পুলিশের বুলেটে। মায়ের ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সুনীল সরকার, সুকোমল পুরকায়স্থ, কুমুদ রঞ্জন দাস, তড়িৎ ভূষণ সূত্রধর এবং সত্যেন্দ্র দেব। এই এগারো জন বীরের প্রাণহীন দেহ যখন রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়, তখন পুরো বরাক উপত্যকা কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
লড়াই এখানেই শেষ হয়নি। এই বর্বরোচিত পুলিশি হামলার তীব্র জখম আর আন্দোলনের পরবর্তী ধাক্কা সহ্য করতে না পেরে পরবর্তীতে আরও দুজন বীর আন্দোলনকারী — বিজয় কৃষ্ণ সূত্রধর এবং আলিম উদ্দিন — মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সব মিলিয়ে মোট তেরো জন শহীদের তাজা রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল বরাকের মাটি। আলিম উদ্দিনের মতো মুসলিম যুবকের আত্মত্যাগ প্রমাণ করে দিয়েছিল, মায়ের ভাষার প্রতি ভালোবাসা কোনও ধর্মের গণ্ডি মানে না, তা বাঙালির এক অবিভাজ্য আবেগ।
এই তেরো জন শহীদের লাশ, ১৬ বছরের এক কিশোরীর উপড়ে যাওয়া চোখ আর হাজার হাজার মায়ের বুকফাটা কান্নার শব্দ ব্রহ্মপুত্রের জলকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তৎকালীন আসাম সরকার বাধ্য হয় পিছু হটতে। ১৯৬১ সালের অক্টোবর মাসে কুখ্যাত সেই ভাষা আইন সংশোধন করা হয় এবং বাংলা ভাষাকে বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষা হিসেবে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ঢাকা যেমন ১৯৫২-র ২১ ফেব্রুয়ারিতে ভাষা আন্দোলনের রক্তিম ইতিহাস লিখেছিল, শিলচরও তেমনি ১৯৬১-র ১৯ মে-তে রক্তের অক্ষরে নিজের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল।
আজ আমরা যে স্বাধীনভাবে বাংলায় কথা বলছি, লিখছি, ভালোবাসছি — তা এই শহীদদের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে কেনা। ১৯ মে কোনও সাধারণ ছুটির দিন নয়, এটি বাঙালির আত্মমর্যাদা, গভীর বেদনা এবং পরম গৌরবের এক অমর মহাকাব্য। যতকাল বরাক নদী বইবে, যতকাল বাঙালি তার মাকে "মা" বলে ডাকবে, ততকাল কমলা ভট্টাচার্য আর এই তেরো জন শহীদের নাম রক্তের অক্ষরে বাঙালির হৃদয়ে অম্লান থাকবে। তাঁদের স্মরণে আমাদের চোখ আজ অশ্রুসজল, কিন্তু মাথা চিরকাল উন্নত।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।