কলকাতায় জন্ম হওয়ার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই নানান ইস্যুতে প্রতিবাদ আন্দোলন বিক্ষোভ কর্মসূচি সবটাই দেখার সুযোগ হয়ছে, ২০১১ সাল সবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে কলেজের পথে, সেই সময় দেখেছি রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবর্তন। আর ২০২৬ সালেও সাক্ষী রইলাম আরও এক পালা বদলের।
২০১১ সালের পর ছাত্র বিক্ষোভ বলতে প্রথমেই মনে পড়ে ২০১৩ এর ২রা আগষ্ট পুলিশের লাঠির আঘাতে খুন হয়ে যাওয়া শহীদ সুদীপ্ত গুপ্তর নাম। দেখেছিলাম পরিবর্তনের পরে সুদীপ্ত গুপ্তর মৃত্যুর প্রতিবাদে রাজপথ উত্তাল হতে। প্রতিবাদী ছাত্র আনিস খানের হত্যার পরেও দেখেছিলাম ধর্মতলার বুকে ইনসাফ সভা — কি বিশাল জনসমাবেশ এখনও মনে আছে! আর ২০২৪ সালের অভয়া কাণ্ডের পর ১৪ আগস্ট রাত্রিবেলা সাক্ষী থেকে ছিলাম এক অন্য কলকাতার — দেখেছিলাম স্বতঃস্ফূর্ত মানুষের ঢল।
আর তারপর দেখলাম গোটা দেশজুড়ে নতুন জেনারেশন এর নেতৃত্বে শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচানোর লড়াই — একের পর এক পেপার লিকের বিরুদ্ধে দেশজোড়া আন্দোলন; আর সেই আন্দোলনের সমর্থনে ২৪শে জুলাই ২০২৬ কলকাতা শহরের ঐতিহাসিক অভিনব মিছিল।
আমি আমার এই ৩৪ বছরের জীবনে এরকম মিছিল সত্যিই কখনো দেখিনি! একবার ভেবে দেখুন তো, গোটা দেশ জুড়ে যারা শাসন ক্ষমতায় রয়েছে, এক প্রকার তারা নিজেদের সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেছিল! হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে শুধুমাত্র সরকারের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য। একদিকে দৈত্যাকার একটা শক্তি যাদের হাতে রয়েছে সরকারি সমস্ত ক্ষমতা, যাদের হাতে রয়েছে তথাকথিত সংবাদ মাধ্যম, যাদের হাতে রয়েছে সংগঠিত প্রফেশনাল আইটি টিম। এই সব কিছুকে ভেঙে দিয়ে একটা আন্দোলনকে কিভাবে সফলভাবে পরিচালনা করতে হয় তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বর্তমান প্রজন্ম।
এই আন্দোলন যখন আস্তে আস্তে দানা বাঁধতে শুরু করে, আমরা দেখেছি যারা শাসন ক্ষমতায় বসে আছে তারা কিভাবে তাদেরকে কখনো দেশদ্রোহী, কোন পাকিস্তানি দালাল, কখনো আতঙ্কবাদী, কখনো জিহাদী, কখনো বাংলাদেশী, কখনো "শ্রীলংকা, নেপাল করে দেওয়া"র চক্রান্তকারী — যখন যেটা মনে হয়েছে সেই বলে দাগিয়ে দিয়েছে। তারপরেও আমরা দেখেছি লক্ষ লক্ষ নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়ে রাস্তায় নেমেছে, রাস্তায় নেমে লড়াই করেছে, নিজেদের মতো করে প্রতিবাদ করেছে।
আসলে প্রতিবাদ বলতে আমরা এতদিন যা বুঝতাম তার সকল পুরনো ধ্যানধারনা কে ভেঙে দিয়েছে নতুন প্রজন্ম। আমরা দেখেছি মার্বেল থেকে শুরু করে ডিসি, বিভিন্ন অ্যানিমি ক্যারেক্টার সেজে তারা মিছিল এসেছে, হাতে রয়েছে অভিনব সব পোস্টার যার মধ্যে প্রতিবাদ যেমন রয়েছে তার সাথে রয়েছে হাস্যরস যা খুব সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে। পুলিশের লাঠির ঘা খেয়েও দেখেছি নতুন প্রজন্মকে আবার আন্দোলন স্থলে ফিরে আসতে।
শুধু কি লাঠির আঘাত! দিল্লিতে ২০ জুলাই সংসদ অভিযানের দিন আমরা সাক্ষী থেকেছি তো পুলিশের নির্মম আক্রমণের। প্যালেট গান থেকে শুরু করে এক্সপায়ার হয়ে যাওয়া কাঁদানে গ্যাস — সবই প্রয়োগ করা হয়েছিল ছাত্রদের ওপর। তারপরেও তারা আন্দোলন করেছে। আমরা দেখেছি অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা হাসতে হাসতে রিল বানাচ্ছে। তাদের প্রতিবাদের ভাষাকে তাদের মত করে রূপ দিয়েছে তারা। মেয়েদের দেখেছি আন্দোলনে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে প্রতিবাদ করতে। এরকম অসংখ্য টুকরো টুকরো ছোট ছোট উদাহরণ দেওয়া যায়, প্রতিবাদও যে এত মিষ্টি করে, এত অভিনবভাবে করা যায় — এটা নতুন প্রজন্মের আন্দোলন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
২৪ তারিখ কলকাতায় যে মিছিল ডাকা হয়েছিল তার সম্পূর্ণ প্রচার ছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। এক একটা পোস্টে হাজার হাজার লাইক শেয়ার! জানি না পুলিশের কাছে কি ইনফরমেশন ছিল, সেদিনকে পুলিশকে দেখে মনে হচ্ছিল তাদের সমস্ত হিসাব উল্টে গেছে। আসলে পুলিশ প্রশাসন ভাবতেই পারিনি এত হাজার হাজার অল্পবয়সী ছেলে-মেয়ে ছাত্র-ছাত্রী, যুবসমাজ রাস্তায় নেমে আসবে! যখন শিয়ালদা স্টেশনে জমায়েতটা দাঁড়িয়ে রয়েছে মিছিল শুরুর অপেক্ষায়, শিয়ালদা পুলিশ কোর্টের বারান্দা থেকে দেখা গেছে গোটা শিয়ালদা চত্বর কার্যত ভিড়ে থিক থিক করছে। কেউ জাতীয় পতাকা নিয়ে, কেউ তাদের মত করে পোস্টার লিখে এনেছে বাড়ি থেকে। কেউ এসেছে তাদের ছাত্র সংগঠনের পতাকা নিয়ে। কারোর মুখে গান, আবার কারোর মুখে স্লোগান — এই ছিল সেদিনের মিছিলের টেম্পো।
তিনটে বেজে দশ মিনিট, আমি তখন এনআরএস এর সামনে ফুট ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে। একটা জনস্রোতের সাক্ষী হলাম সেদিন! তিনটে দশ নাগাদ মিছিল শুরু হয়, একটা জনস্রোত প্রবাহিত হয় ধর্মতলার দিকে, কার্যত গোটা এপিসি রোডের দুটো মেইন যে রাস্তা সেটা বন্ধ হয়ে যায় ভিড়ের স্রোতে। এই স্রোত অনবরত চলতে থাকে এক ঘন্টা দশ মিনিট মতো। আমি যখন মিছিল শেষে ফুট ওভার ব্রিজ থেকে নেমে আসি, তখন সময় ওই চারটে কুড়ি হবে, তখনো লোক যাচ্ছে মিছিলে! আসলে সেদিনের সেই জনস্রোতের মুখ যখন ধর্মতলায়, মিছিলের শেষ তখনও শিয়ালদার কাছে!
সেদিনের মিছিলকেও বিভিন্নভাবে বদনাম করার চেষ্টা চলেছে। আমি নিজে চোখে দেখেছি, আমার মত যারা মিছিলের শেষে সেদিন ছিলেন তারা প্রত্যেকেই দেখেছে, বাইকে করে শাসকদলের পতাকা নিয়ে বেশ কিছু ছেলে মেয়ে মিছিলকে বিভিন্নভাবে উত্তপ্ত করতে থাকে। মিছিল যখন মৌলালী যুব কেন্দ্রের সামনে দিয়ে যাচ্ছে সেই সময় যুবকেন্দ্রের ভেতর দিয়ে বিভিন্নভাবে স্লোগান দেওয়া, মিছিলে আসা ছেলে-মেয়েদের উত্তপ্ত করার অনেক রকম চেষ্টা চলেছে।
কিন্তু আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, সেদিন ফ্ল্যাগ ছাড়া শাসকদলের আশ্রিত কিছু ছেলেপুলে মিছিলে ছিল এবং তারাই অনবরত মিছিল টাকে বিভিন্নভাবে উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছিল।
এবার আসি সংবাদমাধ্যমের কথায়। মিছিলের ঘোষণা থাকলেও সকাল থেকে কিছু কিছু সংবাদ মাধ্যম প্রচার করতে শুরু করে এই মিছিল নাকি বাতিল হয়ে গেছে! এছাড়া বিভিন্ন রকম কথাবার্তা যা গোটা দেশজুড়ে ওরা প্রচার করেছে, কলকাতার মিডিয়া ও তার বাইরে ছিল না। কখনো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পাকিস্তানের যোগ খুঁজে পাচ্ছে তারা, কখনো বিদেশের ফান্ডিং খুঁজে পাচ্ছে, কখনো চীনের সাথে যোগ খুঁজে পাচ্ছে, কখনো আমেরিকার সাথে যোগ খুঁজে পাচ্ছে! মিডিয়া এই ন্যারেটিভটা প্রচার করে গেছে — তারপরেও আপনি বলতে পারেন বুকে হাত রেখে কেন এই সংবাদ মাধ্যমকে গোদি মিডিয়া বলা হবে না? সেদিন যারা সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের গায়ে হাত দিয়েছিল, তাদের শাস্তি অবশ্যই হোক, কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কর্মীদেরও ভাবতে হবে কোথাও গিয়ে তারা শুধুমাত্র সরকারের তাবেদারি করছে কিনা!
তবে সেদিনের এই মিছিল শুধু কলকাতার নয়, গোটা দেশের ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলন। ওই নিজেদের ঈশ্বর ভাবতে থাকা যারা ঘোষণা করেছিল "এই সরকারের আমলে ইস্তফা হয় না", তাদেরকেও আসলে যে নত করা সম্ভব — এটা দেখিয়ে দিল এই প্রজন্ম। কোটি কোটি টাকা দিয়ে তৈরি করা ব্র্যান্ড; তাকে শুধুমাত্র মিম দিয়ে, জোকস দিয়ে, রিলস দিয়ে, হাসিমুখে কি ভাবে ভেঙে ফেলা যায় — এটা দেখিয়ে দিলে নতুন প্রজন্ম। দিল্লিতে শুরু হওয়া আন্দোলনকে গোটা দেশে কিভাবে ছড়িয়ে দিতে হয়, কিভাবে মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিতে হয় — সেটাও দেখিয়ে দিল নতুন প্রজন্ম।
এবার আসি বাকিদের কথায়। আমার মত যারা একটু আগের প্রজন্মের মানুষ — তাদের কথায়।
সেই দিনের মিছিলে কি শুধুমাত্র জেন-জি ছিল?
উত্তর: না।
যারা এসেছিল সবাই কি নিট পরীক্ষা দিয়েছিল?
সেটার উত্তরও 'না'।
আসলে সেদিন প্রত্যেকে এসেছিল দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বাঁচানোর স্বার্থে। নিজের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। কেউ এসেছিল শুধুমাত্র এই ছেলেমেয়েদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য, কেউ এসেছিলেন ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকার জন্য।
একটার পর একটা ইস্যু, প্রশ্ন করার অধিকার যখন ক্রমশ কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, প্রশ্ন করলেই যখন মিডিয়া, শাসক কোথাও এক হয়ে গিয়ে বিভিন্নভাবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে, সেটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আসলে মানুষ কোথাও কি একটা মঞ্চ খুঁজছিল? যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে মানুষ তার সরকারকে প্রশ্ন করার অধিকারকে নতুন করে চিনতে শিখেছে। আর এই প্রতিবাদ আন্দোলনের মঞ্চটা তৈরি করে দিয়েছে দেশের নতুন প্রজন্ম। আসলে মানুষ এসেছিল শাসককে চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিতে গণতন্ত্রে আসল মালিকের নাম হল জনতা।
তবে লড়াইয়ের প্রথম জয় ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা হলেও এখনো বহু পথ পাড়ি দেওয়া বাকি নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের। তোমাদের এই লড়াইকে জানাই কোটি কোটি সেলাম।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।