About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
অন্ধ কুহক
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

অন্ধ কুহক

কলকাতার বর্ষা এক অদ্ভুত মাদকতা বয়ে আনে — ঠিক যেন কোনও মাতাল কবির অসংলগ্ন প্রলাপ। এই শহরে বৃষ্টির একটা নিজস্ব চরিত্র আছে। উত্তর কলকাতার গলির ভিতর, যেখানে পুরনো আমলের বিশাল সব ইমারত একে অপরের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে — যেন কোনও এক বিস্মৃত ইতিহাসের কঙ্কাল — সেখানে বৃষ্টির জল আলকাতরা-মাখা রাস্তার সঙ্গে মিশে এক বিচিত্র ঘ্রাণ তৈরি করে। গুণময় জানলার ধারে বসে সেই ঘ্রাণ নিচ্ছিল। তার হাতে এক গ্লাস নীল রঙের তরল — দামি ‘স্যাফায়ার জিন’। বরফের টুকরোগুলো কাঁচের গায়ে ধাক্কা খেয়ে টুং টুং শব্দ করছে। ঠিক সাত বছর আগে এই হাতে লেগে থাকত বাঁকুড়ার রাঙামাটির ধুলো আর অভাবের রুক্ষতা, আর আজ সেই হাতে হীরের আংটি আর বহুমূল্য বিষ। একেই বোধহয় বলে ‘সাফল্যের বিবর্তন’।

গুণময় তার পেশাগত জীবনে নিজেকে ‘কনসালট্যান্ট’ বলে পরিচয় দেয়। কিন্তু আদতে সে একজন ‘মায়ার জাদুকর’ বা আরও সহজ করে বললে, ‘চোখের মণির পাঠক’। মানুষের চোখের তারার প্রতিটি কম্পন, প্রতিটি পেশির সংকোচন তার কাছে এক-একটা খোলা বই। সে জানে, মানুষ যখন সত্যি কথা বলে, তখন তার চোখ এক শান্ত হ্রদের মতো স্থির থাকে। কিন্তু যখনই মিথ্যের আশ্রয় নেয়, তখন সেই হ্রদে ঢিল পড়ে। গুণময় মনে মনে হাসে; এই তথাকথিত ‘শিক্ষিত’ সমাজের মুখোশটা কত সহজেই না খসে পড়ে চোখের এক পলকে। সে বুঝেছে, এই শহরে সবাই সাধু সাজার অভিনয় করে, কিন্তু ভিতরে একেকটা কামুক নেকড়ে পোষে। কেউ ভয় পেলে চোখের তারা কাঁপে ধীর লয়ে, খাদের সুরে; কেউ লোভী হলে সেই কম্পন হয় তীক্ষ্ণ, অনেকটা কাঁচ ভাঙার শব্দের মতো।

এই বিদ্যা গুণময় পেয়েছিল বাঁকুড়ার গ্রামের শেষ প্রান্তে থাকা সেই পরিত্যক্ত কালীমন্দিরের এক খ্যাপাটে সাধুর কাছ থেকে। তান্ত্রিকটি তাকে বলেছিল, “শহরে যাবি যা, কিন্তু তোর প্রতিবিম্বকে কখনও খেতে দিবি না। আয়নার ওপারে যে তোর যমজ বাস করে, তাকে উপোস করিয়ে রাখবি। যদি সে পুষ্ট হয়, তবে সে তোকেই গিলে খাবে।”

গুণময় সেই নির্দেশ শোনেনি। সে বুঝেছিল, এই শহরে রাজত্ব করতে গেলে প্রতিবিম্বকে রাজকীয় ভোজ দিতে হয়। তার প্রতিবিম্ব এখন এক বিশাল ছায়ার মতো তার পিছনে ঘোরে, যা সাধারণ মানুষ দেখতে পায় না — যেমন দেখতে পায় না নিজেদের বুকের ভিতরের জমে থাকা অন্ধকারকে।

গত মাসে সে ধর্মতলার এক রিয়েল এস্টেট টাইকুন, মিস্টার চ্যাটার্জিকে এক অভিনব বিপদে ফেলেছিল। চ্যাটার্জি তাঁর নতুন মাল্টি-স্টোরেজ মলের জমি নিয়ে সমস্যায় পড়েছিলেন। গুণময় তাঁর চোখের মণির কম্পন দেখে বুঝে ফেলেছিল যে, জমিটা দখল করতে গিয়ে চ্যাটার্জি একজন বৃদ্ধ প্রহরীকে ঠান্ডা মাথায় খুন করিয়েছেন। সেই অপরাধবোধের কম্পন চ্যাটার্জির চোখে ‘করুণ সুর’ তুলছিল। গুণময় তাঁকে বোঝাল, মলের নিচে সেই প্রহরীর অতৃপ্ত আত্মা ঘুরছে। সেই ‘শান্তি’ ফেরানোর নাম করে সে চ্যাটার্জির কাছ থেকে পনেরো লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অদ্ভুত ব্যাপার! মানুষ পাপ করতে ডরায় না, কিন্তু মরা মানুষের ‘শান্তি’ কিনতে লাখ টাকা খরচ করতে দ্বিধা করে না। সমাজটা আসলে ভণ্ডামির এক বিশাল সার্কাস। অথচ কোনও আত্মা ছিল না, ছিল শুধু গুণময়ের তৈরি করা এক মনস্তাত্ত্বিক জাল।

কিন্তু আজ সকাল থেকে গুণময়ের মন ভালো নেই। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা লাল রঙের পোস্টকার্ডটা তাকে বারবার বিঁধছে। মা চিঠি লিখেছে। বাঁকুড়া থেকে আসা সেই মলিন পোস্টকার্ডে লেখা — বাবার ছানি অপারেশন দরকার। বাবা নাকি প্রায় অন্ধ হয়ে গেছেন। মা আকুল হয়ে ছেলেকে বাড়ি ফিরতে বলেছে।

গুণময় চিঠিটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিল। বাইরের জগৎ ভাববে, সে এক নির্দয় কুলাঙ্গার। এত টাকা, অথচ বাবা-মায়ের জন্য এক পয়সাও পাঠায় না? কিন্তু রহস্যটা অনেক গভীর। গুণময় জানে, তার এই ‘অলৌকিক শক্তি’র উৎস হলো তার ফেলে আসা দারিদ্র্য। হেমলক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা বলেছিলেন, “স্বার্থপরতা হলো আত্মরক্ষার প্রথম ধাপ।”

যেদিন তার মা পেটভরে মাংস-ভাত খাবে, যেদিন তার বাবা সুস্থ চোখে পৃথিবী দেখবে, সেদিন গুণময়ের এই ক্ষমতা লুপ্ত হবে। তার সাফল্যের ভিত্তি হলো তার পরিবারের হাহাকার। এটা এক অলিখিত চুক্তি, যা সে তার ছায়ার সঙ্গে করেছে। নিজের উন্নতির জন্য সে তার আপনজনদের অন্ধত্ব আর অনাহারকে বন্ধক রেখেছে। আমরা সবাই কি তাই করি না? কারও দীর্ঘশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়েই তো অন্যের অট্টালিকা তৈরি হয়।

রাত যত বাড়ছে, গুণময়ের ফ্ল্যাটের ভিতর একটা অস্বস্তি দানা বাঁধছে। দশতলার এই এসি ঘরে বাইরের গরম বা মশার উপদ্রব নেই, কিন্তু দেওয়ালে একটা ছায়া কিলবিল করছে। সেটা কোনও সাধারণ মানুষের ছায়া নয়। একটা দীর্ঘদেহী মাকড়সার মতো দেখতে। আটটা পা দেওয়ালে ছড়িয়ে দিয়ে সেটা যেন গুণময়ের দিকে এগিয়ে আসছে।

গুণময় চোখ বন্ধ করল। সে নিজেকে বোঝাল, এটা নিছকই ‘ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন’। অপরাধবোধ যখন মানুষের অবচেতন মনকে দখল করে, তখন মস্তিষ্ক এরকম অদ্ভুত ছবি তৈরি করে — একেই বলে মগজের কারসাজি। ম্যাজিক রিয়েলিজম বা অতিপ্রাকৃত কিছু নয়, এটা খাঁটি সাইকোলজি। অন্তত সে নিজেকে তাই বিশ্বাস করাতে চাইল।

হঠাৎ নীরবতা ভেঙে একটা শব্দ ভেসে এল। টুং... টুং...।

ট্রামের ঘণ্টি? দশতলার এই হাই-রাইজ অ্যাপার্টমেন্টে ট্রামের শব্দ আসার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু শব্দটা স্পষ্ট। সেই সঙ্গে একটা ভ্যাপসা সোঁদা মাটির গন্ধ ঘরটা ভরে ফেলল। বাঁকুড়ার সেই পরিচিত লাল মাটির গন্ধ।

পরদিন সকালে গুণময় ঠিক করল, তাকে গ্রামে যেতেই হবে। টাকা বা ভালোবাসা নয়, বরং একটা ভয় তাকে তাড়িত করছে। মনে হচ্ছে, তার প্রতিবিম্ব তাকে ইশারা করছে। সে তার ব্যক্তিগত ড্রাইভারকে ছুটি দিল। ব্ল্যাক মার্সিডিজ গ্যারেজে রেখে সে ট্যাক্সি নিয়ে হাওড়া স্টেশনের দিকে রওনা দিল। তাকে আজ শিকড়ের টানে নয়, বরং শিকড় ছিঁড়তে যেতে হবে।

ট্রেনে যাওয়ার সময় গুণময়ের মনে পড়ল সেই সাধুর কথা। সাধু বলেছিল, “প্রতিবিম্ব যখন আয়না ছেড়ে বাইরে আসবে, বুঝবি তোর সময় শেষ।” গুণময় ট্রেনের জানলার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখল। সেখানে সে নিজেকে দেখতে পেল না, দেখল একটা কালো গর্ত। যেন তার অস্তিত্বের সবটুকু নির্যাস কেউ শুষে নিয়েছে। আয়নার ওপারে আজ কেউ নেই, শুধু একরাশ শূন্যতা।

বাঁকুড়া স্টেশনে যখন নামল, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে। চারদিকে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। স্টেশনে কোনও চেনা মুখ নেই। এমনকি রিকশাওয়ালাদের চোখের ভাষাও পাল্টে গেছে। তাদের চোখগুলো কেমন ফ্যাকাসে নীল, যেন তাদের ভিতরে কোনও প্রাণ নেই। গুণময় হাঁটতে শুরু করল। মেঠো পথ পেরিয়ে যখন সে তাদের সেই পুরনো ভাঙা কুঁড়েঘরের সামনে দাঁড়াল, তার বুকটা ধক করে উঠল।

অদ্ভুত ব্যাপার! গ্রামটা যেন হুবহু সাত বছর আগের মতো রয়ে গেছে। বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি। কিন্তু অভাবের সেই রুক্ষতা নেই, বরং একটা জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন ঘরবাড়িগুলোকে জড়িয়ে ধরে আছে। দাওয়ায় মা বসে আছে। কুপি জ্বালিয়ে চাল ঝাড়ছে। বাবা তক্তপোশে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

গুণময় ধীর পায়ে ভিতরে ঢুকল। মা মুখ তুলল না, শুধু বলল, “এলি রে গুণময়? অনেক দেরি করে ফেললি।”

গুণময় দেখল, মায়ের গলার স্বর কেমন যান্ত্রিক। সে বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। “বাবা, তোমার চোখের কী অবস্থা? অপারেশন করতে হবে তো?”

বাবা ধীরে ধীরে মুখ ফেরাল। গুণময় চমকে উঠল। বাবার চোখে কোনও ছানি নেই! বরং তাঁর চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। অতিপ্রাকৃত উজ্জ্বলতা। যেন দুই টুকরো জ্বলন্ত কয়লা। “ছানি তো আমার চোখে পড়েনি গুণময়, ছানি পড়েছিল তোর চোখে,” বাবা হাসল। সেই হাসিটা বাবার স্বভাবসিদ্ধ হাসি নয়, সেটা কোনও যন্ত্রের ঘর্ষণের মতো শোনাল — কর্কশ আর প্রাণহীন। টুং... টুং...।

গুণময় পিছিয়ে গেল। “তোমরা কি সত্যি আমার মা-বাবা? নাকি অন্য কিছু?”

হঠাৎ ঘরের কোণের অন্ধকার থেকে সেই মাকড়সার মতো ছায়াটা বেরিয়ে এল। সেটা দেওয়ালে নয়, মেঝেতে কিলবিল করে এগোতে লাগল এবং অদ্ভুতভাবে মায়ের শরীরের সঙ্গে মিশে গেল। গুণময় আর্তনাদ করে উঠল, “আমি তোমাদের জন্য কত কী করেছি! আমি শুধু তোমাদের অভাবী রেখেছিলাম, যাতে আমার ক্ষমতা না যায়। আমি তোমাদের বড়লোক করতে চেয়েছিলাম মনে মনে...”

মা এবার হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসির দমকে মাটির দেওয়ালগুলো থরথর করে কাঁপতে লাগল। মা বলল, “তুই ভেবেছিলি তুই আমাদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করছিস? না রে হতভাগা। আমরা তোকে টোপ হিসেবে কলকাতায় পাঠিয়েছিলাম। তুই ভাবতিস তোর ওই ‘চোখের মণি পড়া’র ক্ষমতা তোর সাধনা? না, ওটা ছিল আমাদের দেওয়া ঋণ। তুই শহর থেকে যত পাপের টাকা শুষে এনেছিস, তার সিংহভাগ এই মাটির নিচের সিন্দুকে এসে জমা হয়েছে। তুই ছিলি আমাদের মধু সংগ্রহকারী মৌমাছি।”

গুণময় স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সাত বছরের অহংকার, তার আভিজাত্য, তার নীল জিন — সব যেন এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে বুঝতে পারল, সে ক্ষমতার অধিকারী ছিল না, সে ছিল এক দাবার ঘুঁটি মাত্র। মানুষ যখন ভাবে সে নিয়তিকে নিয়ন্ত্রণ করছে, আসলে তখন নিয়তি আড়ালে বসে দাঁত বার করে হাসে।

বাবা তক্তপোশ থেকে নেমে এল। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নামতে শুরু করল। বাবা তাঁর লম্বা, হাড়গিলে হাতটা গুণময়ের কাঁধে রাখল। সেই স্পর্শে গুণময়ের শরীরের রক্ত জমাট বেঁধে গেল। — “শহরের মানুষ ভাবে তারা খুব ধূর্ত,” বাবা বলতে লাগল, “তারা শরীর কেনে, জমি কেনে, সম্মান কেনে। কিন্তু গ্রামের এই পুরনো ভিটেগুলো কী কেনে জানিস? তারা আত্মা গিলে খায়। তুই ভেবেছিলি তোর প্রতিবিম্বকে তুই রাজকীয় ভোজ দিচ্ছিস? আসলে তুই নিজেকেই খাওয়াচ্ছিলি তাকে।”

হঠাৎ বাবার চোখের সেই জ্বলন্ত কয়লার মতো আলো গুণময়ের চোখের ওপর স্থির হলো। গুণময় অনুভব করল, তার চোখের মণিগুলো তীব্রভাবে কাঁপছে। এত তীব্র কম্পন সে জীবনে দেখেনি। সেটা কোনও সুর নয়, সেটা একটা বিলাপ। — “তোর কাজ শেষ গুণময়। এখন থেকে তুই আর দেখবি না। তুই শুধু অনুভব করবি। তোর দেখার ক্ষমতা এখন থেকে আমাদের কাজে লাগবে।”

বাবার হাতটা গুণময়ের চোখের ওপর চেপে বসল। এক তীব্র, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা। মনে হলো, কেউ গরম লোহা দিয়ে তার চোখ দুটো উপড়ে ফেলছে। গুণময় চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না। শুধু কানে বাজতে লাগল সেই ট্রামের ঘণ্টি — টুং... টুং... টুং...।

এখন অন্ধকারই গুণময়ের জগৎ। বাঁকুড়ার সেই ভাঙা কুঁড়েঘরের এক কোণে সে পড়ে থাকে। গ্রামের লোক ভাবে, গুণময় পাগল হয়ে গেছে। শহরের সেই ফ্ল্যাট, সেই ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স এখন পুলিশের দখলে। এক বিশাল জালিয়াতির মামলায় তার নামে ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে, কিন্তু গুণময়কে কেউ খুঁজে পায়নি। কারণ সে এখন আর মানুষ নেই।

সে এখন দেখতে পায় না ঠিকই, কিন্তু সে গন্ধ পায়। সে বুঝতে পারে, যখন মধ্যরাতে তার মা ওই ঘরের মাটির নিচের সিন্দুক খোলে। সেখানে টাকা নেই, সেখানে ভর্তি হয়ে আছে মানুষের কান্নার প্রতিধ্বনি। সে অনুভব করতে পারে, তার বাবা আসলে কোনও মানুষ নয়, বরং সেই পরিত্যক্ত মন্দিরের অভিশাপের এক শরীরী রূপ। সবচেয়ে ভয়ানক মুহূর্ত আসে অমাবস্যার রাতে। গুণময় অনুভব করে, তার পিঠের শিরদাঁড়া ফেটে হাড়গুলো অদ্ভুতভাবে বাইরের দিকে বেরিয়ে আসছে। তার দুই হাত লম্বা হয়ে যাচ্ছে, আঙুলগুলো সুচালো হয়ে মাকড়সার পায়ের মতো রূপ নিচ্ছে। তার প্রতিবিম্ব এখন আর আয়নায় নেই, সেটা এখন তার শরীরের ভিতরে ঢুকে গেছে। মা তাকে খাবার দেয় না, বরং তাকে একটা অন্ধকার গর্তে লুকিয়ে রাখে। মাঝে মাঝে যখন কোনও অপরিচিত পথিক বা ধূর্ত কোনও শহরের লোক ভুল করে এই গ্রামে আসে, মা তাকে ঘরের ভিতর ডেকে আনে। অন্ধকারে বসে গুণময় শুনতে পায় সেই আগন্তুকের চোখের মণির কম্পন। সে বুঝতে পারে, লোকটা লোভী নাকি ভীরু। তখন গুণময়ের শরীরের ভিতরকার সেই মাকড়সাটা জেগে ওঠে। সে ধীরে ধীরে দেওয়াল বেয়ে সেই শিকারের দিকে এগোতে থাকে।

শহরের মানুষ মনে করে, তারা প্রতিবিম্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে জানে। কিন্তু তারা জানে না, প্রতিবিম্ব যখন শিকারি হয়ে ওঠে, তখন আয়না ভেঙে যায়। গুণময় এখন সেই ভেঙে যাওয়া আয়নার এক-একটা টুকরো, যা দিয়ে তার বাবা-মা নতুন কোনও শিকারের আত্মা কাটাকাটি করে। টক ঝাল মিষ্টি, ঈর্ষা দ্বন্দ্ব অনাসৃষ্টি, হাসি কান্না আর মাঠভরা বৃষ্টি — সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে এই আদিম অন্ধকারে। বাঁকুড়ার আকাশে এখন চাঁদ ওঠে না, সেখানে এখন এক বিশাল মাকড়সার জাল ছড়িয়ে আছে। আর সেই জালের প্রতিটি সুতোয় ঝুলে আছে একটা করে শহরের মানুষের পাপ আর গুণময়ের মতো এক-একটা ‘গুণের নিধি’র চুরমার হয়ে যাওয়া স্বপ্ন। শহরের আলকাতরার গন্ধ এখন গুণময়ের নাকে আর পৌঁছায় না। তার নাকে এখন কেবল একটাই গন্ধ — তাজা মানুষের রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা পুরনো মন্দিরের ধূপের ধোঁয়া। এটাই এখন তার জগৎ। এটাই তার প্রতিবিম্বের শেষ কারিগরি। আসলে আমরা সবাই অন্ধ, তফাৎ শুধু এটুকুই — কেউ চোখের অভাবে দেখতে পায় না, আর কেউ বিবেকের অভাবে অন্ধ হয়ে রাজত্ব করে।




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের শারদ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৫ অক্টোবর ২০২৬ (১৭ই আশ্বিন) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
0 0 ভোট
স্টার
guest
1 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top

    ‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

    ‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।