বাঙালি খাদ্যরসিক জাতি। কচুর লতি থেকে কুমড়োর ফুল — সবই বাঙালির খাদ্য। কলা পাকা না হলেও কাঁচা, এমনকি মোচাও বাঙালি রান্না করে খেতে জানে। কাজেই ভেরেন্ডাকে বাঙালি একটু বাঁকা চোখেই দেখে। ভেরেন্ডার ফল কাঁটাওলা, শক্ত, তেতো এবং বিষাক্ত। সহজ কথায়, খাওয়ার অযোগ্য।
সম্ভবত ভেরেন্ডা ভেজে পেটে পুরতে পারেনি বলেই ‘ভেরেন্ডা ভাজা’ বাঙালির কাছে অকাজের চূড়ান্ত নিদর্শন হয়ে উঠেছে। এই শব্দবন্ধটি অর্থহীন কাজের রূপক হিসেবে বহুল ব্যবহৃত হলেও ভেরেন্ডাকে ফেলনা ভাবা কিন্তু বোকামি হবে। বাঙালির হেঁশেলে স্থান না পেলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ভেরেন্ডা একটি অত্যন্ত মূল্যবান বাণিজ্যিক ফসল — ক্যাস্টর অয়েলের একমাত্র উৎস।
ভেরেন্ডা উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম Ricinus communis, যা ইউফোরবিয়েসি (Euphorbiaceae) পরিবারের অন্তর্গত। বাংলায় অঞ্চলভেদে এটি ভেরেন্ডা, ভেড়েন্ডা বা রেড়ি নামে পরিচিত। এর ফলগুলো কাঁটাযুক্ত ক্যাপসুলের মতো এবং ভেতরে থাকা বীজগুলোর গায়ে চিতাবাঘের চামড়ার মতো নকশা থাকে।
ভেরেন্ডার বীজ অত্যন্ত বিষাক্ত। এতে ‘রাইসিন’ নামের একটি মারাত্মক বিষাক্ত প্রোটিন থাকে। তবে কোল্ড প্রেস পদ্ধতিতে তেল নিষ্কাশনের সময় রাইসিন তেলের সঙ্গে আসে না; এটি অয়েল কেকে থেকে যায়। ফলে প্রাপ্ত ক্যাস্টর অয়েল শিল্প ও চিকিৎসাক্ষেত্রে নিরাপদে ব্যবহার করা যায়। এই তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই ‘রিসিনোলিক অ্যাসিড’ নামক একটি বিশেষ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা তেলটিকে উচ্চ সান্দ্রতা ও পোলারিটি দান করে।
ক্যাস্টর অয়েলের ব্যবহার প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা থেকে শুরু হয়েছিল। পিরামিডে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, ফ্যারাওরা প্রদীপের জ্বালানি এবং ত্বকের সুরক্ষায় এই তেল ব্যবহার করতেন। আজও রূপচর্চায় চুল ও ভ্রুর পরিচর্যা এবং ত্বকের ময়শ্চারাইজার হিসেবে ক্যাস্টর অয়েলের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিসীম। সাবান, শ্যাম্পু, প্লাস্টিক, নাইলন, সিন্থেটিক রেজিন এবং বিভিন্ন রঙ তৈরিতেও ভেরেন্ডার তেল অন্যতম প্রধান কাঁচামাল।
বিমান ও মোটরস্পোর্টসের ইতিহাসে ক্যাস্টর অয়েলের অবদান অবিস্মরণীয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে রেসিং কার ও বিমানের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনে ব্যবহৃত সাধারণ খনিজ তেল প্রচণ্ড তাপে পাতলা হয়ে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলত। কিন্তু ক্যাস্টর অয়েলের রাসায়নিক গঠনের কারণে এটি চরম উষ্ণতাতেও তার ঘনত্ব ধরে রাখতে পারত এবং ধাতব অংশের ওপর একটি পাতলা, অবিচ্ছেদ্য সুরক্ষাবর্ম তৈরি করত।
১৮৯৯ সালে চার্লস চিয়ার্স ওয়াকফিল্ড (১ম ভাইকাউন্ট ওয়াকফিল্ড) ইংল্যান্ডে ‘CC Wakefield & Company’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর গবেষকরা আবিষ্কার করেন যে খনিজ তেলের সাথে ক্যাস্টর অয়েল মেশালে একটি অত্যন্ত উচ্চমানের লুব্রিকেন্ট তৈরি হয়। এই সূত্র থেকেই ১৯০৯ সালে জন্ম নেয় বিখ্যাত ব্র্যান্ড 'ক্যাস্ট্রোল' (Castrol) — যার নামটি সরাসরি এসেছিল Castor Oil শব্দবন্ধটি থেকে!
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধবিমানের ইঞ্জিন (যেমন বেন্টলি বি আর ২) এবং পরবর্তীকালের গ্রাঁ প্রি (Grand Prix) রেসিংয়ে ‘ক্যাস্ট্রোল-আর’ ছিল এক নম্বর পছন্দের লুব্রিকেন্ট। রেসট্র্যাকে এই তেল দহনের পর যে বিশেষ মিষ্টি গন্ধ বের হতো, তা সেকালের মোটরস্পোর্টস অনুরাগী ও রেসারদের কাছে গতি ও রোমাঞ্চের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
বর্তমান যুগে আধুনিক স্পোর্টস কারে সিন্থেটিক অয়েল ব্যবহার করা হয়, কারণ বিশুদ্ধ ক্যাস্টর অয়েল দীর্ঘদিন ইঞ্জিনের ভেতরে থাকলে জমে গিয়ে বার্নিশ তৈরি করতে পারে। তবে আজও টু-স্ট্রোক রেসিং কার্ট, ভিন্টেজ স্পিডওয়ে মোটরবাইক এবং মডেল এয়ারক্রাফটের ইঞ্জিনে তাৎক্ষণিক ও সর্বোচ্চ সুরক্ষার জন্য ক্যাস্টর অয়েল ব্লেন্ড ব্যবহৃত হয়।
পশ্চিমবঙ্গ তথা পূর্ব ভারতে ভেরেন্ডা গাছ প্রাকৃতিকভাবে প্রচুর জন্মালেও এর বাণিজ্যিক চাষ এখনো সীমিত। মজা করে বলাই যায়, বাংলার ভেরেন্ডা গাছের প্রতি বাঙালি আজও একচোখা!
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।