আর দিন কয়েকের অপেক্ষা মাত্র! মণ্ডপে মণ্ডপে দশপ্রহরণধারিণী, মহিষাসুরদলনী দেবী দুর্গা পূজিত হবেন। আগমনি গানে, বাঙালির মননে তিনি হৈমবতী, মা মেনকার আদরিণী ঊমা, স্নেহময়ী জননী, আপনভোলা মহেশ্বরের প্রেমময়ী স্ত্রী। ভারতীয় পুরাণে তিনি নারীশক্তি ও অদ্বৈততত্ত্বের প্রতীক। ষোড়শোপচারে সেই দেবী দুর্গার আরাধনার আয়োজনে ব্যস্ত সবাই। আর অন্যদিকে, খবরের কাগজে, টিভির পর্দায় দেশের ছোট-বড় শহরে, গণ্ডগ্রামে, মেট্রো সিটিতে, স্কুলের বাসে, টয়লেটে, লিফ্টে, গাড়িতে নারীর যৌন নির্যাতন-অত্যাচারের খবর! দেবী দুর্গা যখন পূজিতা, ঠিক তখনই এই সমাজের মেয়েরা অবলা, সহজলোভ্য, ভোগবাসনা চরিতার্থ করার বস্তু!
দেশজুড়ে ধর্ষণের ঘটনা আজ জলভাত। শুরুটা অনেক আগের। এখন শুধু সেসব জানা যাচ্ছে। সমাজের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে আছে শুধু ত্রিকোণ ছোট্ট একটা মাংসের শরীর, যার খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছে এক বিশালদেহী অতিকায় পুংদণ্ড! যেখানে কোনও বালাই নেই বয়সের, সম্পর্কের, সম্বন্ধের কিংবা আইনের! ধর্ষণের বিভিন্নতায় আজ শুধু লজ্জা হয় না, অবাকও হতে হয়। স্বামী, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, পরিচিত ও অপরিচিত ব্যক্তি দ্বারা ধর্ষণ তো হয়েই থাকে, সেই সঙ্গে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ, শাস্তিমূলক-প্রতিহিংসামূলক ধর্ষণ, একই ব্যক্তি দ্বারা বিভিন্ন নারীর ধর্ষণ, হেফাজতে ধর্ষণ, রক্ষক দ্বারা ধর্ষণ (স্কুল বাস, হোস্টেল, মানসিক ভারসাম্যহীন নারীদের আবাসে), জাতিগত বৈষম্যমূলক ধর্ষণ, প্রথাগত ধর্ষণ, সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন বা দাঙ্গার সময়ে বা যুদ্ধকালীন ধর্ষণ!
ধর্ষণ যে নারীর কোথায় আঘাত করে, নারী জন্ম না হলে সে যন্ত্রণা বোধ করি আর কারো তেমনভাবে হওয়ার কথা নয়। যে সমাজে সেই শিশুকাল থেকেই মেয়েকে শেখানো হয় অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য তার দেহ-মন তৈরি করতে, যে সমাজে মেয়েদের মানুষ বলে গণ্যই করা হয়নি কোনও কালেই, সেই মাটিতে তো ধর্ষণের বীজ বরাবরই ছিল। সেটা শুধু চাপা ছিল। এখন ঘরে-বাইরে, অফিসে-আদালতে, রাস্তায়-বাসে আনন্দের ফ্রি সান্নিধ্য লাভের জন্য ধর্ষণ করা হচ্ছে। অনেকের(!) দৃষ্টিতে ধর্ষণ নিছক আনন্দেরই কর্ম! ছেলে-পিলেরা বয়সকালে অমন একটু-আধটু করেই থাকে। এমন মতামত সমাজে চালু রয়েছে। মেয়েরা আজ উচ্ছৃঙ্খল হয়েছে। মেয়েদের পোশাক, মেয়েদের অবাধ চলাচল, আচার-আচরণ সবই ধর্ষণের জন্য দায়ী, এই ভাবনা সমাজে প্রতিষ্ঠিত! কিন্তু আট মাসের যে শিশুটিকে ধর্ষণ করা হয়েছিল, সে কেমন উত্তেজক পোশাক কিংবা ভঙ্গিমায় নিজেকে তুলে ধরেছিল, যার কারণে সেই শিশুটিকে ধর্ষিতা হতে হয়েছিল- সেটা নিশ্চিয়ই সমাজের বিশিষ্টরা বলতে পারবেন! মেয়েদের ছোট পোশাককে যারা ধর্ষণের কারণ বলে উল্লেখ করেন তারা পোশাক বিশেষজ্ঞ কি না জানা নেই, তবে তারা প্রাচীন ভারতের পোশাকের ওপর গবেষণা করলে 'কাঁচুলি' নামে একটি পোশাকের সন্ধান পাবেন। সেই 'কাঁচুলি' পোশাক শকুন্তলা পরিধান করতেন! শকুন্তলা ছিলেন হিন্দু পুরাণে বর্ণিত দুষ্মন্তের স্ত্রী ও সম্রাট ভরতের মা।
আমাদের সমাজে প্রতিটি মেয়ে সারাক্ষণ ধর্ষণের আতঙ্ক নিয়েই তো বড় হয়। যখন থেকে দুহাত মেলে আকাশ দেখতে চায় , তখন থেকে চারপাশ তাকে নির্বাসিত করে দেয়। প্রতি মুহুর্তে একটি মেয়েকে নিজের নিরাপত্তার ভাবনায় ব্যস্ত থাকতে হয়। 'এই না আমার জামার হাতল গলিয়ে অন্তর্বাস উঁকি দিচ্ছে, এই না আমার ওড়নাটা খসে পড়ে বুকটা উঁচু দেখাচ্ছে, এই না আমার শাড়ির আঁচলটুকু ছোট হয়ে পেটের অংশটা উঁকি মারছে'! নিজেকে গোছাতে আর ঢাকতেই ব্যস্ত থাকতে হয় প্রতিটি মেয়েকে। আসলে একটি মেয়ের তো জানা নেই তার শরীরের শেষ কোথায়। তাই সে ঢাকতে ঢাকতেই ব্যস্ত রাখে নিজেকে!
যখন স্কুল বাসে ছোট্ট শিশুটির ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় হয় দেশ, তখন 'নাবালিকা ধর্ষণকাণ্ড অপরাধ' বলে মন্তব্য করা হয়। হোঁচট খেতে হয় সেখানেও। 'নাবালিকা ধর্ষণকাণ্ড অপরাধ' কথাটার মানে বুঝে উঠতে পারি না! মনে হয় 'নাবালিকা ধর্ষণকাণ্ড অপরাধ' মানে কি সাবালিকা ধর্ষণকাণ্ড অপরাধের কোঠায় পড়ে না! এর জবাব নিশ্চয়ই 'জীবন বিশেষজ্ঞরা' জানবেন! আট মাসের শিশুই হোক কিংবা ৮০ বছরের বৃদ্ধা, ধর্ষণকাণ্ডে উভয়েই তো ধর্ষিতা নারী! ধর্ষণ তো ধর্ষণই! কেন তবে এই বিভাজন? সমাজের দু-মুখো দুর্বল অবস্থানটা এতেই তো খোলসা হয়ে যায়।
অনেকেই বলে থাকেন, অহরহই বলে থাকেন, 'যে দিন রাতের অন্ধকারেও রাজপথে নারী নিরাপদ থাকবে, সেদিনই নারীর সঠিক স্বাধীনতা আসবে'। শুনে অবাক হই! আট মাসের যে শিশুটির ধর্ষণ হয়, সে কোন রাজপথে রাতের অন্ধকারে ঘুরঘুর করছিল, যে তাকে ধর্ষিতা হতে হয়েছিল! কারো কারো মতে সমাজে শিক্ষার অভাবেই ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে! তাদের বলতে চাই, রাষ্ট্রসঙ্ঘের কার্যালয়ে কর্মরত মহিলারা যখন গন্তব্যে পৌঁছনোর জন্য লিফ্টের ব্যবহার করেন, তখন লিফ্টে থাকা তাদের পুরুষ সহকর্মীরা একা পেয়ে তাদের জাপটে ধরেন। সংবাদপত্রে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছে। তখন চুনকালি কোথায় পড়ল! শিক্ষার মুখেই তো।
ধর্ষণের পর ধর্ষিতাকে সহানুভূতি দেখিয়ে, সে অবলা বলে প্রতিষ্ঠা করে এই সমাজ আবারও তাকে ধর্ষণ করে। বলপূর্বক করমর্দনও এক ধরনের অসম্মান। সেখানে একটি মেয়েকে বলপূর্বক নিগ্রহ করার পর এই সমাজ তাকে অসূচিতার তকমা দেয়। তখন আবারও ধর্ষণ হয় তার! আমাদের সমাজে ধর্ষকের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে তাকেই বিয়ে করার উপদেশ দেওয়া হয়! কত সহজেই একজন স্বামী সমাজের বেঁধে দেওয়া আইনে(!) তার স্ত্রী 'সম্পত্তি'র ওপর অনায়াসেই কিল-ঘুষি চালিয়ে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন চালাতে পারেন! এই সমাজেই তো আমরা দেখি বুক চিতিয়ে সাজাপ্রাপ্ত ধর্ষক সাজার মেয়াদ কাটিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে ধর্ষিতার বাবাকে অনায়াসেই গুলি করতে পারে! ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে গোটা দেশে ৩১,৬৭৭ টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। সেই নিরিখে গড়ে প্রতিদিন দেশে ৮৬ টি ধর্ষণের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। চতুর্থ জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা অনুযায়ী, ভারতে প্রতি তিন জনে একজন বিবাহিতা মহিলা পারিবারিক হিংসার শিকার। দেশে বছরে প্রায় ৭,৫০০ মহিলা পণের দাবিতে প্রাণ হারাচ্ছেন।
ভাবনা কান্ত প্রজাতন্ত্র দিবসে রাফাল ওড়ালেন, সেনা আধিকারিক সীমা সিংহ'দের দশ বছর লড়াইয়ের পর সেনার পার্মানেন্ট কমিশনে মেয়েদের নিয়োগে সুপ্রিম সিলমোহর পড়ল — আর এতেই দেশে শুরু হয়ে গেলো উদযাপন! উফ ভাবা যায় না সে কী হইচই! কিন্তু কেনো? একটা স্বাভাবিক ঘটনাকে এতো অস্বাভাবিক করে দেখানোর প্রয়োজন কেনো পড়লো? ভাবনা, সীমারা যোগ্য বলেই তো নিজেদের যোগ্যতায় সেই সম্মান অর্জন করেছেন। কিন্তু এসব তো কেউ বললেন না! যারা এসব অস্বাভাবিকতার পেছনে রয়েছেন তাদের শাস্তি কেনো হলো না? এক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টে 'পুরুষতন্ত্রের' বিরুদ্ধে কোনো পিআইএল'ও তো জমা পড়লো না!
সত্যি খুঁজতে গিয়ে এলোমেলো আমরা। নিজের অজান্তে নিজেরাই কখন যেনো মিথ্যে হয়ে যাই! মেয়েদের পায়ের শেকল আরও শক্ত-পোক্ত করে বেঁধে দিতে প্রতিনিয়ত সুচতুরভাবে বিয়ে নামক একটি প্রক্রিয়ার অনিবার্যতা আর তাকে কাম্য, শেষ গন্তব্য বলে দেখানো, বোঝানো হচ্ছে। এভাবে মেয়েদের সক্রিয় ইন্দ্রিয়গুলোকে ক্রমাগত বিধ্বস্ত ও আক্রান্ত করা হচ্ছে! কোনো মেয়ে বিয়ের পক্ষে থাকতেই পারেন আবার কেউ বিপক্ষেও যেতে পারেন। অবস্থান গ্রহণের স্বাধীনতা রয়েছে তার। কিন্তু সেখানেই সমাজের সবচেয়ে নিচু তলায় একটি কুমারী মেয়ের স্বাধীন জীবন যেমন প্রশ্নচিহ্নের মুখোমুখি, সমাজের উঁচু তলার ছবিটাও সেই একই!
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, বিয়ের প্রতি আজ ভারতীয় মহিলাদের অনীহা ক্রমেই বেড়ে চলেছে! তাদের একটা বড় অংশ অবিবাহিত থাকতে চাইছেন। সরকারি সমীক্ষা রিপোর্ট বলছে, ২০১১ সালের পরিসংখ্যানে ১৫-২৯ বছরের মেয়েদের মধ্যে বিয়ের প্রতি অনীহা যেখানে ছিল ১৭.৫ শতাংশ, সেখানে ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯.৯ শতাংশ! এতে স্পষ্ট হচ্ছে বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসছেন মেয়েরা। জোর গলায় তারা বলছেন একা থাকতেই তারা বিশ্বাসী। একা থাকা তাদের কাছে আরামদায়ক। সমাজের প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে তারা আঙুল দেখিয়ে বলে দিচ্ছেন ঠিক কতটা সঠিক তাদের সিদ্ধান্ত! দেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও সম্ভবত মেয়েদের বিয়ের প্রতি অনীহাই বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে! আর তাই হয়তো ভারতের বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্করকেও উদ্বেগের সঙ্গে বলতে হচ্ছে, 'ভারতীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে। জবরদস্তি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের খুব বিপজ্জনক পরিণতি হতে পারে। এটি লিঙ্গ ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে'।
তাই বলাই যায়, দুঃখরাও মাঝে মাঝে ঠকে যায়! তীব্র যন্ত্রণায় ডুবে থাকা মন যখন বোকা বনে যায়, তা অপূর্ব আনন্দ দেয়! ঠকে যাওয়া মানে তো এক অর্থে বোকা বনে যাওয়াই। সেই বোকা বনে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রে সুন্দরের জন্ম দেয়। প্রাপ্তিযোগ ঘটনায়। অবশ্যই জীবনের নিরিখে। অনুমানের বাইরে গিয়ে মেয়েদের একা থাকার সিদ্ধান্ত আজ সমাজকে বোকা বানিয়ে দিয়েছে! এই বোকা বনে যাওয়া তৃপ্তি দেয়। এভাবে বোকা হতে ভালো লাগে! কথায় বলে, আশি বছরেও পুরুষের কাম নিবৃত্তি হয় না। আর তাই হয়তো ৮০ বছরের বৃদ্ধাকেও ধর্ষিতা হতে হয়! পুরুষের তবে কি কোনো 'পজ' নেই? না কি এটা মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করার ছলনা মাত্র! তবে মেয়েদের তো 'পজ' রয়েছে। আর হয়তো এবার সেই 'পজ' বাটনেই হাত রাখলেন মেয়েরা! ভাগ্যিস!
লেখিকা আসামের শিলচরের বাসিন্দা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে। লেখালেখি ছাড়াও তাঁর পেশা সাংবাদিকতা — সাংবাদিক হিসাবে কুড়ি বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা। সামাজিক, পরিবেশগত এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত কলাম লেখায় তিনি একজন বিশেষজ্ঞ। বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং সাংবাদিকতা করছেন। বই পড়া এবং গান শোনা তাঁর প্রধান শখ।