আমি মধ্যবিত্ত বাঙালি। জ্ঞান হওয়া থেকেই এটা বিশ্বাস করতে শুরু করি আর যাই হই না কেন আমি টাটা, বিড়লা হতে চাই না। আসলে আমার জন্মটা হয়েছে সত্তরের দশকে। কলকাতা যখন সবেমাত্র অতিক্রম করেছে বাঙালির শেষ সশস্ত্র বিপ্লব — নকশাল আন্দোলন। তখনো কেউ বুঝতে পারে নি যে এরপর বহু বছর বাঙালি শুধু সেই রোমান্টিসিজম বুকে নিয়ে বাঁচবে। এখানে আর তেমন বড়সড় বিপ্লব হবে না। শিরদাঁড়া ভেঙে যাবে। আমি সেই যুগে জন্ম নেওয়া বাঙালি। তার মানে আমি জন্ম থেকেই বিপ্লবী। বিপ্লবের সাথে কি টাটা বিড়লা আম্বানি খাপ খায়? এখন যা করাপশন ভ্রষ্টাচার, এই শব্দগুলো তখন বামপন্থী ডিক্সেনারিতে এই ভাবে ব্যাখ্যা করা হতো — সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, সামন্ততন্ত্র, ধনিকতন্ত্র, বুর্জোয়া, ফ্যাসিস্ট। এই সব বামপন্থী শব্দগুলো শুনতে শুনতে আমাদের ছোটবেলায় বড় হয়ে ওঠা। এই বুঝে বড় হয়ে ওঠা তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি বিলিয়ে দিয়ে টাটা, বিড়লারা কখনোই লেংটি পড়ে সন্ন্যাসী হয়ে যাবেন না। দেশের ভর-সংখ্যার মানুষদের শোষণ করে রক্ত চুষে নিয়ে সম্পদ ও সম্পত্তির বিষম বণ্টনের মধ্যে দিয়ে শিল্পপতিদের জন্ম হয়। একদা গরিব দরদী বামপন্থী নেতারা, মিছিলে মিটিংয়ে এই শিল্পপতিদের নিকৃষ্ট জন-বিরোধী, গণ-বিরোধী, শোষক, তোষক ঠাউরে দিয়ে যারা ক্ষমতায় এল, পরে দেখলাম তলায় তলায় তাদের ছেলেরাই শিল্পপতি হতে চায়!
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালা বদলের সাথে সাথে রাজনৈতিক ভাবনা চিন্তারও পালাবদল ঘটতে থাকে আম মানুষের মনস্তত্ত্বের ভেতরে। মাঝ বয়স আসতে আসতে দেখলাম কমিউনিজম বামপন্থা সারা পৃথিবীতে সংকটের মুখে এবং বিলুপ্তপ্রায়। বাঙালি এখন বিএমডব্লু গাড়ি কিনতে চায়। সিঙ্গুরে ন্যানো কারখানা হবে। এতদিন যারা বিরোধ করে এসেছিল সেই তারাই টাটাদেরই বাংলায় ধরে নিয়ে আসছে! মধ্যবিত্ত বাঙালিরও একটা ন্যানো গাড়ি থাকতে পারে। সপ্তাহে একদিন খাসির মাংস খাওয়া বাঙালিও স্বপ্ন দেখতে পারে — শিল্পপতি হওয়ার, বড়লোক হওয়ার। এই স্বপ্ন না দেখলে ন্যানো গাড়ির বিক্রি হবে না। ধুতি পাঞ্জাবি খুলে নিয়ে কোট-প্যান্টালুন, গলায় বেল্ট পরিয়ে বাঙালিকে কর্পোরেটের চাপরাশি বানানো যাবে না।
একটু ভাল করে বুঝে দেখুন, এই শিল্পপতি হয়ে যাবার স্বপ্ন দর্শনটা শিল্পপতিই বিলোচ্ছে। যে বিলোচ্ছে সে কখনওই চাইবে না আপনি তার সমকক্ষ হন। মাথায় চড়ে বসা তো দূরের কথা। আপনি পোদের সামনে হুলো আর নাকের সামনে মুলো নিয়ে ছুটছেন। এই শতকে ঢুকতে ঢুকতে আমরা বুঝতে শুরু করে দিলাম শিল্পপতিদের মহিমা বা মহত্ত্ব। এক চোখে কানকি মারা যোগ-গুরু রামদেব 'পতঞ্জলি' খুলে কোটিপতি হয়ে উঠতে চাইলেন। সন্ন্যাসী-শিল্পপতি! ভারতবর্ষের প্রাচীন দর্শন ত্যাগ, তিতিক্ষা সব যেন আমূল বদলে যেতে শুরু করল। ভোগে, বৈষয়িক উন্নতিতে আমাদের সার্বিক উন্নতি? এ দর্শন তো ভারতবর্ষের দর্শন নয়! আমদানি করা। ভারতবর্ষের একেবারে বিপরীত একটি দর্শন। ভারতবর্ষের জলবায়ুতে যা খাপও খায় না। সেই পাশ্চাত্যের ফেলে দেওয়া দর্শন বিশ্বায়নের হাত ধরে আমাদের মধ্যে বদ্ধমূল হয়ে উঠতে লাগল। কারণ তারা তো আজকে আমাদের দর্শন গ্রহণ করছে!
এর মধ্যে আমরা অনেকগুলি শব্দ শিখে ফেলেছি — স্টক মার্কেট, শেয়ার বাজার, সেন-সেক্স, জিডিপি। আর একটা শব্দ আমাদের মাথার ভিতরে ঢুকে গেছে — উর্জা। এই সবগুলোকে মানবজাতির উর্জা বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা অত্যন্ত ভয়ঙ্কর বীভৎস কেবল নয়, নৃশংসও বটে। মানুষকে পণ্য থেকেও নিকৃষ্ট করে তুলবে আর পণ্যকে মানুষের থেকেও দামি বানাবে। স্বভাবতই স্বামীজি, নেতাজি, গান্ধীজী এঁরা এখন ভিনগ্রহের বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী। কার্ল মার্কস বা গান্ধীজী নয়, জাকারবার্গ, ইলন মাস্ক, ধীরুভাই আম্বানি, জামশেদজি টাটা — এঁদের নিয়ে বই লেখা শুরু হল, এঁদের নিয়ে সিনেমা বানানো হল। মার্কেটে ঘুরে বেড়াল সাফল্যের চাবিকাঠি। আমাদের স্বপ্নগুলো সব শিফট করে গেল। আমাদের রোল মডেল গুলো সব বদলে গেল। এখন আর আমরা ন্যানো তে আটকে নেই। মধ্যবিত্ত বাঙালি এক নিঃশ্বাসে বলে দিতে পারে পৃথিবী বিখ্যাত অনেকগুলো গাড়ির মডেলের নাম।
এই শিফট এই পরিবর্তন কাদের ইশারায়? কাদের ইশারায় মধ্যবিত্ত পুতুলনাচ নাচছে? আর এর ফল কে ঘরে তুলবে? — সে সব নিয়ে আজকে আমি কথা বলতে আসিনি। কারণ আমরা দুটোই দেখেছি এখানে! একদিন ন্যানো বিরোধ করা নেত্রীকে আজকে শিল্পপতিদের দরজায় দরজায় ঘুরতে দেখেছি। বাংলায় নতুন শিল্পপতি সৌরভ গাঙ্গুলির জন্ম দেখেছি। তাঁকে পাশে বসিয়ে নিয়ে বঙ্গ শিল্প সম্মেলন দেখেছি। বাঙালির গুজরাটি হওয়ার কী প্রবল ঝোঁক তা দেখেছি৷। আগে কি বাঙালি শিল্পপতি ছিল না? ছিল বৈকি। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর কলকাতার সুবিদিত জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্যবসায় বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা। কিন্তু এত শতাব্দী ধরে বাঙালি ঝুঁকল কোন দিকে? বিষয় সম্পত্তি লাটে তুলে জমিদারি ছেড়ে শিলাইদহে বজরায় ভেসে ভেসে কবিতা লিখে বেড়ানো রোমান্টিক নাতি রবি ঠাকুরের দিকে। কারণ ছেঁড়া ধুতি পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়ালেও বাঙালির এটা গর্ব ছিল তাদের মতো শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি বোধ গুজরাটির নেই। বাঙালির নোবেল পুরস্কার পাওয়া রবি ঠাকুর রয়েছে। শিল্প, সংস্কৃতি তাদের সহজাত। বাঙালি মেয়ে টেঁপী বিয়ের আগে আর কিছু শিখুক না শিখুক অন্তত খানকয়েক গান শিখত।
যাই হোক! কালে কালে গোদি মিডিয়া এবং অন্যান্য গণমাধ্যম গুলোর দৌলতে জেনে উঠতে পারলাম শিল্পপতিদের মধ্যে এমনও আছেন যিনি করোনার সময় সর্বোচ্চ অনুদান দিয়েছেন। যদিও সেই অনুদানের পরিমাণ কত? পিএম কেয়ার ফান্ডে সেই অনুদান আসলে কার পকেটে গেল? — অনেক কিছুই আমাদের জানার বাইরে। হয়তো কোনোদিন আমরা জানতেও পারব না। তবে শিল্পপতিদের সম্পর্কে তীব্র বিতৃষ্ণা নিয়ে আমাদের জন্ম হয়েছিল। একেবারে ভিলেন ছিল আমাদের চোখে। রতন টাটার মতো লোক সেটা বেশ বদলে দিয়েছিলেন। তিনি ব্যতিক্রমী। আজীবন অবিবাহিত রতন টাটা কেবল নিরাশ্রয়, ক্ষুধা-পীড়িত, সামাজিক দুর্ব্যবহারের শিকার মানুষ নয়, কুকুর-বিড়ালদের প্রতিও সহমর্মি ছিলেন।
পদ ও মর্যাদার তুলনায় নিরাভরণ জীবনই যাপনে অভ্যস্ত রতন গ্রামোন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প-সংস্কৃতি এবং গণ উদ্যোগের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। বিশেষত, কৃষির বাইরে অন্য জীবিকায় গ্রামের মেয়েদের নিযুক্তির ব্যাপারে তাঁর তত্ত্বাবধানে ট্রাস্ট কাজ শুরু করে। এর বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত অঞ্চলে ত্রাণ ও পুনর্বাসনের কাজ তিনি নিরলস ভাবে করে গিয়েছেন। গ্রামোন্নয়ন, চিকিৎসা ও শিক্ষার সর্বজনীন প্রসারের সমর্থক রতন টাটা কেবল বিভিন্ন জনহিতকর, প্রাণীহিতকর কাজে নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন তাই নয়, ভারত যে এক নতুন যুগে পা রাখতে চলেছে তা তিনি অনুধাবন করেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতেও শুরু করেছিলেন। নিঃসন্দেহে ভারতের নিরিখে রতন টাটার চলে যাওয়া একটা বড় ক্ষতি। তবে অন্যান্য শিল্পপতিরা কি রতন টাটাকে অনুধাবন করতে পারবেন?
বাংলায় একটা প্রবাদ বাক্য প্রচলিত আছে — 'রতনে রতন চেনে, শুয়োরে চেনে কচু!'
লেখক ছোট থেকেই একরোখা, প্রথাগত শিক্ষা ও সমাজ ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থাশীল-প্রতিবাদী। শিল্পকলা উপজীব্য হলেও ব্যতিক্রমী এই মানুষটি নিজেকে এমন একজন সৈনিক বলে মনে করেন যাঁর অস্ত্র কালি-মাটি-কলম। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখকের কাব্য, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। নিবাস কলকাতার টালিগঞ্জ অঞ্চলে। বর্তমানে স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে আত্মমগ্ন।