শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন শুধুমাত্র বেতন বৃদ্ধির দাবি নয়, তা গোটা উৎপাদন ব্যবস্থার শোষণমূলক চরিত্রের বিরুদ্ধে এক ধারাবাহিক সংগ্রাম। এই সংগ্রামের পথেই গড়ে উঠেছে ট্রেড ইউনিয়ন, যা শ্রমিকদের সংগঠিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের কাল থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়, এমনকি আজও, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় গভীর ছাপ রেখে চলেছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে শ্রমিক আন্দোলনের সূচনা মূলত ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে, যখন বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক নিয়োগের পরিমাণ বাড়তে থাকে। কলকাতা, মুম্বই, চেন্নাই এবং আহমেদাবাদের মতো শহরে জুট মিল, কটন মিল, রেলওয়ে এবং বন্দরে শ্রমিকদের শোষণ চলত দৈনিক ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ, সামান্য মজুরি এবং কোনো সুরক্ষা ছাড়াই। ১৮৭৭ সালে মুম্বইয়ের কটন মিল শ্রমিকদের ধর্মঘট, এবং ১৮৯৯ সালে ট্র্যাম শ্রমিকদের আন্দোলন — এগুলোই ছিল শ্রমিক চেতনার প্রথম দিকের প্রকাশ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ভারতের শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটে। বলশেভিক বিপ্লবের প্রভাবে এবং দেশীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত হয়ে শ্রমিক আন্দোলনও নতুন গতি পায়। এই সময়েই গড়ে ওঠে ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন — অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC), ১৯২০ সালে। লোকমান্য তিলক, লালা লাজপত রাই, শরৎ বসু, এম এন রায় প্রমুখ এই আন্দোলনের প্রাথমিক পর্বে নেতৃত্ব দেন।
AITUC-এর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সংগঠিত শ্রমিক ফেডারেশনের সূচনা হয়, যারা শুধু শিল্প-কারখানার ভেতরের সমস্যাই নয়, রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবিকেও নিজেদের আন্দোলনের অংশ করে তোলে। তখনকার শ্রমিক আন্দোলন ছিল রাজনৈতিকভাবে তীব্র এবং প্রায়শই কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক, এমনকি কংগ্রেস ঘরানার নেতৃত্বাধীন। ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের এই রাজনৈতিকীকরণ একদিকে যেমন শ্রমিকদের অধিকারের দাবি জোরালো করেছিল, অন্যদিকে বিভাজনও ডেকে এনেছিল।
ব্রিটিশ সরকার শ্রমিক আন্দোলনের এই বিকাশ দেখে প্রথমে ১৯২৬ সালে ট্রেড ইউনিয়ন অ্যাক্ট প্রণয়ন করে, যা শ্রমিক সংগঠনকে আইনি স্বীকৃতি দিলেও তার স্বাধীনতাকে কার্যত নিয়ন্ত্রণে রাখে। বহু আন্দোলনের জবাবে আইনশৃঙ্খলার নামে ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের গ্রেফতার করা হত, ধর্মঘট রুদ্ধ করা হত। কিন্তু এই দমননীতি আন্দোলনকে ঠেকাতে পারেনি।
১৯৩৪ সালে CPI (Communist Party of India) গোপনে সংগঠন চালালেও ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির বিরাট অংশ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এই সময়ে শ্রমিক ইউনিয়ন গুলির মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু হয়। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের একটি বিশেষ দিক ছিল জাতীয়তাবাদ ও শ্রেণিসংগ্রামের সংমিশ্রণ।
স্বাধীনতার পর নতুন সংবিধানে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার স্বীকৃতি পেলেও, প্রকৃত পরিস্থিতি বদলাল না। দেশভাগের পর বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে, এবং পুঁজিপতিদের আধিপত্যে শ্রমিক স্বার্থ পদদলিত হতে থাকে। এই সময়েই জাতীয় স্তরে বিভাজন ঘটে ট্রেড ইউনিয়ন গুলির মধ্যে — AITUC ছাড়াও কংগ্রেস ঘনিষ্ঠ INTUC, সমাজতন্ত্রী ঘরানার HMS, হিন্দুত্ববাদী BMS, CPI(M) ঘনিষ্ঠ CITU প্রভৃতি ইউনিয়ন গঠিত হয়। এই বিভাজন অনেক সময়ে শ্রমিক স্বার্থের বদলে রাজনৈতিক দলের স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়।
১৯৭০-৮০’র দশকে শ্রমিক আন্দোলনের দুটি উল্ল্লেখযোগ্য ধাপ ছিল — এক, দিল্লির কাছাকাছি ফারিদাবাদ, গুরুগ্রাম ও গাজিয়াবাদের শিল্পাঞ্চলে স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক বিদ্রোহ এবং দুই, পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকারের সময়ে রক্ষণশীল ট্রেড ইউনিয়ন নীতির বিকাশ। পশ্চিমবঙ্গে যদিও শ্রমিক স্বার্থের পক্ষে নানা আইন কার্যকর হয়, তবুও বাম সরকারের পরে তৃণমূল আমলে তা একেবারে ভেঙে পড়ে। পুরনো ট্রেড ইউনিয়ন গুলি কার্যত অচল হয়ে পড়ে, আর নতুন কর্পোরেট সংস্থাগুলিতে ইউনিয়ন গঠনের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
বিগত এক দশকে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্পোরেটপন্থী নীতি, শ্রম আইনের সংস্কার এবং একের পর এক রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় শ্রমিক সংগঠনগুলি বহুবার দেশজোড়া ধর্মঘট করেছে। ২০১৬, ২০১৯ ও ২০২০ সালের দেশব্যাপী ধর্মঘটগুলোতে কোটি কোটি শ্রমিক অংশগ্রহণ করেন। কৃষক আন্দোলনের সাথেও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর জোট তৈরি হয়। কিন্তু সংগঠিত ক্ষেত্রের বাইরের অগণিত অস্থায়ী, চুক্তিভিত্তিক, গিগ-ইকোনমির শ্রমজীবী মানুষের কাছে আজকের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন কতটা প্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবু সত্য এই যে, শ্রমিকদের সম্মিলিত প্রতিবাদের বিকল্প নেই। ট্রেড ইউনিয়নের ইতিহাস শুধুমাত্র সংঘর্ষের ইতিহাস নয়, তা শ্রমিক চেতনার বিকাশ, গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াই এবং সামাজিক ন্যায়ের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। আজকের দিনে এই ইউনিয়নগুলির দায়িত্ব — নিজেদের গণ্ডির বাইরে গিয়ে বৃহত্তর শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাঁদের সংগঠিত করা এবং নতুনতর শোষণের রূপের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলা।
শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় — একাকী কেউ কিছুই নয়, সম্মিলিত লড়াই-ই একমাত্র পথ।