চাকরিহারাদের বিক্ষোভের খবর শুনতে শুনতে সেদিন ট্র্যাঙ্গুলার পার্কের সামনে দিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎই কানে এল ভরাট গলার "কোলাহল তো বারণ হল, এবার কথা কানে কানে"। ভাবলাম তবে কি অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে নীরব থাকাই এখন একমাত্র পথ? তখনও একই শিল্পী উদাত্ত কন্ঠে গেয়ে উঠলেন, "আমার প্রতিবাদের ভাষা, আমার প্রতিরোধের আগুন জ্বলে"। সেই শিল্পীই রবীন্দ্রগানের বিমূর্ত বাঙ্ময়তার পোস্টার বয় যিনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, "আমার আত্মজীবনী তো এক পৃষ্ঠায় শেষ হয়ে যাবে"।
১৯১১'র ঐতিহাসিক বছরে তথাকথিত ম্লেচ্ছ পরিবারে যে সন্তানের জন্ম, তাঁর নাম অচিরেই ইতিহাসের পাতায় লেখা হবে বিধাতা বোধহয় এরকমই কিছু ঠিক করে রেখেছিলেন। তবু জীবনের চরৈবেতি তো সিনেমার সরলীকৃত স্ক্রিপ্ট নয়, তাই আচমকা গানের জগতে 'হরিজন' হওয়া, আবার জন্মের ১১৪ বছর পরেও রবিঠাকুরের গানে চূড়ান্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকা, এও এক বিরলতম নিদর্শন। দেবব্রত নামের আক্ষরিক অর্থে দেবতার প্রতি ভক্তি থাকলেও তিনি নিজে কখনোই আধ্যাত্মিকতার পূজারী ছিলেন না, তিনি নিজে সেরকমই লিখে গেছেন। তবু পূজা পর্যায়ের গানে ওঁর উপস্থাপনের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরের পদতলে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছেন।
নিরাকারবাদী ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত দেবব্রতের কন্ঠমাধুর্যে "তোমার পূজার ছলেই তোমায় ভুলেই থাকি"র সুর মুছে দেয় ভগবান, গড, আল্লাহর সংকীর্ণ ভেদাভেদ। কোমল গান্ধার চলচ্চিত্রে অনিল চট্টোপাধ্যায়ের লিপে যখন ধ্বনিত হয় "আকাশভরা সূর্য-তারা… বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান", তখন 'কাঁচা বাদাম' বা রক-মেটালের জগঝম্পে জেন-এক্স বা জেন ওয়াইও ক্ষণিকের জন্য মুগ্ধতার আবেশে বিহ্বল হয়। ভাবতে শুরু করে, কে এই সেরিব্রাল গায়ক যাঁকে নিতান্তই 'ব্রাত্যজন'-এর তকমায় সীমাবদ্ধ রাখা হল? মনের গভীরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকেই বোধহয় অত আন্তরিকভাবে গাওয়া যায় "তোমরা যা বলো তাই বলো, আমার লাগে না মনে", যদিও সেটাও ওঁর পক্ষেই সম্ভব।
ভাগ্যিস সোশ্যাল মিডিয়ায় আত্মপ্রচারের যুগে দেবব্রত জন্মাননি, তাই প্রবল আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন দেবব্রত বিশ্বাসকে ইউটিউবে গানের বিকিকিনি করে জনপ্রিয়তা পেতে হয়নি, কনক বিশ্বাস বা সুপ্রভা রায়ের আত্মীয় হওয়ায় নেপোটিজমের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি। আজও স্বকীয় গায়নশৈলীর জোরে জর্জ বিশ্বাসের ক্যাসেট ও রেকর্ড সর্বাধিক বিক্রিত। 'এসেছিলে তবু আসো নাই' গানে দেবব্রত যখন গাইছেন "পাতায় পাতায় বিন্দু বিন্দু ঝরে জল, শ্যামল বনান্তভূমি করে ছলছল" তখন যে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যপটের অবতারণা ঘটে তা ভাষায় অবর্ণনীয়। বিদেশি যন্ত্রের অনুষঙ্গ এই দোহাই দিয়ে যতই জর্জ বিশ্বাসকে একঘরে করা হোক, রবীন্দ্রগানের অনির্বচনীয় অনুভব সঠিকভাবে খুব বেশি কেউ বিশ্লেষণ করতে পারেননি।
বহুশ্রুত গল্পের কথা মনে পড়ছে, একবার এক খ্যাতনামা গায়িকা এসেছেন ওঁর কাছে 'তোমার দ্বারে কেন আসি' শিখতে। যতবারই তিনি গাইছেন, "একটি চাওয়া ভিতর হতে ফুটবে তোমার ভোর আলোতে", ততবারই জর্জ বিশ্বাসের বক্তব্য, "অইলো না, আবার গান"। কয়েকবার পুনরাবৃত্তির পরে বীতশ্রদ্ধ গায়িকা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তখন দেবব্রতের জবাব, "দিদিমণি রবীন্দ্রনাথ সেরিব্রাল, সেই দোষডা কি আমার?... রবীন্দ্রনাথের ভোর হয় চাইরটার সময়। আপনার ভোর হইত্যাছে বেলা দশটায়। অমন জোরে অমন স্পষ্ট কইরা ভোর হয় না। ভোর হয় অস্ফুটে।"
দেবব্রত বিশ্বাস বোধহয় রবীন্দ্রনাথের গানের যোগ্য কান্ডারী যিনি সুখে দুঃখে, প্রতিটি অনুভূতিতে বাঙালি হৃদয়ে একাত্ম হয়ে আছেন। 'নয়ন ছেড়ে গেলে চলে' গানটির সঞ্চারীতে যখন "ব্যথা রে মোর মধুর করি"-তে নিষাদের পরিশীলিত প্রয়োগ ঘটাচ্ছেন দেবব্রত, তখন স্বজন বিয়োগের স্মৃতি উস্কে চোখের কোণ ভিজে যেতে বাধ্য। আবার 'যেতে যেতে একলা পথে' গানের ক্ষেত্রে "বুঝি বা এই বজ্ররবে" অংশে উচ্চ সপ্তকের ঋষভ ও কোমল গান্ধারের সূক্ষ্মতা মানসিক দুর্যোগের ঘনঘটায় হৃদয়ের অন্তঃপুরে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
ব্রাহ্মসমাজের অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথের দর্শন পাওয়া দেবব্রত নিজেও জানতেন না তাঁর প্রস্থানের ৪৫ বছর পরেও শুধু তাঁকে নিয়ে বিচিত্রপত্রে আলোচনা হবে, দিকে দিকে দেবব্রত বিশ্বাস স্মরণ কমিটি ওঁকে নিয়ে আড্ডার আয়োজন করবেন। একসময়ের বামপন্থী মনোভাবাপন্ন জর্জ যখন সুস্পষ্ট উচ্চারণে ইংরেজি তর্জমায় গেয়ে ওঠেন, "দিস ওরিনেস ফরগিভ মি ওহ মাই লর্ড" তখন মনেহয় চার্চের কোনো ফাদার রবীন্দ্রনাথের জীবনদেবতার কাছে নিজেকে চূড়ান্তভাবে সমর্পিত করার আকুতি জানাচ্ছেন, জীবনের ওঠানামায় ক্লান্তি, অলসতা সরিয়ে লড়াইয়ের শক্তি প্রার্থনা করছেন। কাজী নজরুলের কাছে গান শিখে রেকর্ড করা হোক, পঙ্কজ মল্লিকের কাছে হিন্দি গান শেখা, গণনাট্যের ছত্রচ্ছায়ায় শ্রমিকের বঞ্চনা, শোষণের প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়া, সবেতেই সপ্রতিভ দেবব্রত কেন হঠাৎ সংকীর্ণ রুদ্ধতার শিকার হয়ে গুটিয়ে নিলেন সেই প্রশ্নের আলোচনা আজ অনুচিত। তবু যে ব্রাত্য শিল্পী একদা 'যদি কিছু আমারে শুধাও' এর মতো প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর গান রেকর্ড করেছিলেন তাঁকে কোনো পুরস্কারের ঘেরাটোপে বিচার করার চেষ্টা অমার্জনীয় অপরাধ।
প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ পবিত্র সরকার একটি লেখায় দেবব্রত বিশ্বাসের স্মৃতিচারণায় 'লার্জার দ্যান লাইফ' শব্দবন্ধের ব্যবহার করেন, যা সত্যিই সংগীত পরিব্রাজক দেবব্রতের প্রতি যথার্থ বিশ্লেষণ। তিনি নিজে তো বটেই, ওঁর পরম প্রিয় 'রবীন্দ্রসঙ্গীতের হিরো' হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দুজনে কেউই সে অর্থে শান্তিনিকেতনে সঙ্গীতশিক্ষা বা কঠোর গানের তালিম না নিলেও যেভাবে বঙ্গ সমাজের অন্তঃপুরে হিমেল হাওয়ার পরশ ছড়িয়ে দিয়েছেন, বিন্দুমাত্র ভনিতা না করে, তা একালের প্রচারসর্বস্ব তরুণ প্রজন্মের কাছে দৃষ্টান্ত শুধু নয়, ঈর্ষণীয়ও বটে। ভীষ্মদেব, কলিম শরাফী থেকে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, বহু গুণীজনদের সংস্পর্শে এসেও নিতান্তই ছাপোষা কেরানিগিরি ও বিতর্কিত গায়ক হয়ে থাকার কাহিনী 'গল্প হলেও সত্যি'। বিশালাকার এশিয়ার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশের এক অধিবাসী 'কুখ্যাত গায়ক দেবব্রত বিশ্বাস' যখন স্নিগ্ধতার আবেশে গেয়ে ওঠেন "দুঃখ বলে রইনু চুপে, তাহার পায়ের চিহ্নরূপে" তখন প্রাচীন সংস্কৃত শ্লোক মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় — 'চক্রবৎ পরিবর্তন্তে দুঃখানি চ সুখানি চ'।
রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গানে দেবব্রত বোধহয় একমেবাদ্বিতীয়ম, 'নীল অঞ্জনঘন পুঞ্জছায়ায়' থেকে 'আবার এসেছে আষাঢ়', সবেতেই বজ্রের মতো দৃঢ়তা, সাথে কন্ঠের মন্দ্র সপ্তক, সবমিলিয়ে ধারণা করা যায় যে ওঁর গানের সিডি রবীন্দ্রনাথের কাছে আগে থেকে পাঠানো গেলে আরও কয়েকশত বর্ষার গান আমরা পেতাম। রবীন্দ্রগানের জন লেনন কিম্বা পল রবসন, দেবব্রত বিশ্বাসকে যেভাবেই ব্যাখ্যা করি, ওঁর সাবলীল গায়কী ও আবেগের আতিশয্যে ভরপুর থেকেও উচ্চকিত না হওয়া, এই বোধ কোনো ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স করে শেখা যায় না। দেবব্রত বিশ্বাসের এই সেরিব্রাল চেতনার জন্য প্রয়োজন নেই কোনো বিকৃত অঙ্গভঙ্গির গায়নশৈলী, প্রয়োজন নেই কোনো প্রাণহীন ওয়ার্কশপের, প্রয়োজন শুধু আন্তরিক মননবোধের।