বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ৬৫,৫৬৬ টি। এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষ ৫৯ হাজার ৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ শিক্ষকের সংখ্যা ১ লক্ষ ২৭ হাজার ৮০৯ জন এবং মহিলা শিক্ষকের সংখ্যা ২ লক্ষ ৩১ হাজার ২৮৬ জন।
শিক্ষার প্রথম স্তর প্রাথমিক শিক্ষা। এই স্তরের শিক্ষা, নৈতিকতা, মানসিক গঠনসহ নানা বিষয় নিয়ে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষার পরবর্তী স্তরে প্রবেশ করে। কাদামাটি দিয়ে কুমার যেমন শিল্পকর্ম তৈরি করেন শিক্ষকও তেমন ছোট ছোট শিশুর মাঝে বপন করেন ভবিষ্যৎ মানবের বীজ। চিকিৎসকবৃন্দ সমাজকে সেবা দেন। তাই তাদের বলা হয় সেবক। শিক্ষকবৃন্দ সমাজকে শিক্ষার আলো দান করেন। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষকবৃন্দ অক্ষরজ্ঞান দান করে জাতির চোখে জ্ঞানের আলো প্রজ্জ্বলিত করেন।
দান গ্রহণ করতে হয় অবনত শিরে।
বিজ্ঞানের উন্নতি মানুষকে মেধাবী করে গড়ে তোলে কিন্তু সেই মেধা যদি সঠিক জ্ঞান এবং পথের সন্ধান না পায় তা হলে বিপথে পরিচালিত হয়। শিক্ষক জ্ঞান আর পথের সন্ধান দান করেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য শিক্ষকের দানের জন্য অপেক্ষা করতে হয় গোটা জাতির। সুতরাং শিক্ষকের ক্ষেত্রে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী শব্দটি অপমানজনক।
কথায় বলে, যে দেশে তেল এবং ঘি-এর দাম সমান সে দেশে কোনো বিচার নেই। আমাদের দেশ স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পার করেছে আরো তিন বছর আগে। অথচ শিক্ষকের বেতন একজন এ ক্যাটাগরি পত্রিকার ঝাড়ুদারের সমান।
প্রাথমিকের শিক্ষক হবার জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক চাইলেও ৪০% বর্তমানে স্নাতকোত্তর শিক্ষক রয়েছেন এই ডিপার্টমেন্টে। পদন্নোতিবিহীন এই পেশায় কেন মেধাবীরা ঝাড়ুদারের সমতূল্য বেতন নিয়ে পড়ে থাকবেন? রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে মেধার শোষণ এটা।
শিক্ষকদের শিক্ষক করে গড়ে তোলার কোনো চেষ্টাই নেই এ দেশে। শিক্ষকবৃন্দ সময়মতো বিদ্যালয়ে আসেন কিনা, ক্লাসে ঠিকমতো পড়ান কিনা তা দেখার জন্য নানা ধরনের কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষককে যদি পাহারা দিতে হয় তাহলে সে শিক্ষক হয় কী করে?
পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে শিক্ষকদের জন্য এতোটা হয়রানি আছে কিনা জানা নেই।
রাত দিন যখন তখন নানা ধরণের প্রজ্ঞাপন, এটা করো ওটা করো আদেশ, এই ভিজিট সেই ভিজিটের ঝামেলা এসবের কারণে প্রাথমিকের শিক্ষকদের মূলতঃ রাত দিন চব্বিশ ঘন্টাই মাথায় কর্মক্ষেত্র নিয়ে চলতে হয়। যে কোনো সময় যে কোনো আদেশের জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়।
শিক্ষকতা অন্যান্য পেশার সাথে গুলিয়ে ফেলার কারণে শিক্ষক শব্দটির প্রকৃত অর্থের সাথে সমাজ পরিচিত নয়।
শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা আর অবস্থান সময়ের সাথে সাথে উন্নত হবার কথা ছিল। কিন্তু যতো দিন যাচ্ছে সমাজে প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদা তলানীতে গিয়ে ঠেকছে। মানসিকভাবে সমাজ আর প্রশাসন সকলেই ধরে নেন এরা ফাঁকিবাজ, ক্লাস করান না ইত্যাদি।
প্রশ্ন হলো শিক্ষক নিয়োগে নৈতিকতা যাচাইয়ের জন্য কী করা হয়।
মেধা আর নৈতিকতা দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া শিক্ষক হয় না। ১৯৯৩ সালে শিক্ষকতায় যোগ দেবার পর থেকে শুনছি সময় মতো স্কুলে আসতে হবে আবার সময় মত স্কুল থেকে বের হয়ে যেতে হবে। ২০২৫ সালেও একই কথা শুনছি। তাহলে উন্নতি কোথায়? সময়ানুবর্তিতা, নৈতিকতা, সত্যবাদীতার শিক্ষা শিক্ষক দিবেন অথচ শিক্ষকের এই গুণাবলি নিয়েই যদি প্রশ্ন থাকে তাহলে সে শিক্ষক হবে কী করে?
কিছু ফাঁকির ফলাফল একটু দেরিতে প্রতিফলিত হয়। শিক্ষকদের আর্থিকভাবে এবং অন্যান্য সুযোগ সুবিধার দিক দিয়ে বঞ্চিত করে রাখার ফলাফল ধীরে ধীরে সমাজে প্রতীয়মান। লেখাপড়া শেষে এমন একটি পেশা মানুষ কেন বেছে নিবে যেখানে অসম্মানজনক বেতন এবং সারা জীবনে কোনো প্রমোশন নেই? অথচ এরচেয়ে কম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তার মর্যাদা ভোগ করেন অনেকেই। প্রতিটা পেশায় আছে প্রমোশনের ব্যবস্থা। জীবনের উজ্জ্বল হাতছানিকে উপেক্ষা করে স্বপ্ন দেখে কি কেউ এ পেশায় আসবে? এখানে মানুষ আসে বাধ্য হয়ে। থেকে যায় কোথাও কিছু না পেয়ে।
আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক দেশ গঠনের জন্য প্রয়োজন হবে আদর্শ শিক্ষকের। প্রকৃত গুরুবিহীন মানবিক মানুষ তৈরি হবে না দেশে। আমরা ক্ষুধাকে জয় করেছি কিন্তু মানবিক মানুষ হতে পারিনি। নৈতিকতা, মূল্যবোধের অভাবে ভয়ঙ্কর সব অন্যায় আমাদের গ্রাস করছে।
মানুষের মানুষ হবার জন্য শিক্ষকের বিকল্প নাই। তাই শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা এবং তার সম্মানের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। একটা সভ্য সমাজে শিক্ষককে মাথায় রাখা হয়। তার মর্যাদা থাকে সবার উপর। আমাদের দেশের শিক্ষকদের তাদের সম্মানের প্রশ্নে রাস্তায় নামতে হয়। সমাজের ঘুম ভাঙ্গাতে নিজেদের অসম্মানের কথা চিৎকার করে বলতে হয়। এটা গোটা জাতির জন্য লজ্জার!
শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছাড়া যাকে খুশি তাকে এনে এক একটি পদে বসিয়ে দেবার ফলাফল "কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই।" কেন প্রাথমিক শিক্ষার চিত্র করুণ, কোথায় কোথায় ত্রুটি, কী এর সমাধান তার পরামর্শ শিক্ষকদের কাছেই চাইতে হবে। প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রতিটি পদে শিক্ষকতার পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করতে না পারলে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কারণে উন্নতি তো হবেই না বরং নানা ধরণের ভোগান্তি পোহাতে হবে। সুতরাং শতভাগ পদোন্নতি যোগ্যদের মধ্য থেকেই দিতে হবে।
পরিশেষে, সমাজ এবং রাষ্ট্র সকলকে উপলব্ধি করতে হবে শিক্ষক চাকুরি করেন না। তিনি দান করেন। দান গ্রহনেও যোগ্যতা লাগে।
তার দান মাথা পেতে নেবার জন্য এই সমাজ কি প্রস্তুত?
লেখিকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এম. এস. এস, তিন দশকেরও বেশি তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা। ২০০০ সালে শিশু অধিকারের ওপর গল্প লিখে লাভ করেন সুনীতি অ্যাওয়ার্ড। ২০১২ সালে ঢাকা জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। 'উজান স্রোতের নদী' গ্রন্থের রচয়িতা, ঢাকার 'খেয়ালী নাট্য গোষ্ঠী'র সাবেক সহ-সভাপতি, বর্তমানে দৈনিক 'যায়যায়দিন' পত্রিকার নিয়মিত কলামিস্ট।