প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু বিশেষ গুণ থাকে — সেটি হয় ঈশ্বরপ্রদত্ত, নয়তো নিজ প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও কর্মকুশলতার মাধ্যমে অর্জিত। এই বিশেষ গুণ বা প্রতিভা হয়তো সবসময় আমাদের চোখে পড়ে না, কারণ তা অনেক সময় প্রচারের আলোয় নয়, বরং নীরব, নিঃশব্দ কর্মের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। আজ আমি এমনই এক অনন্য কর্মকুশল, নিরহংকারী এক মানুষের কথা বলব, যার সঙ্গে এক অপ্রত্যাশিত রাত্রিকালীন সাক্ষাৎ আমার মনে বিশেষ ছাপ ফেলে গেছে।
কর্মসূত্রে আমাকে প্রায়শই রাতে গাড়িতে করে বিভিন্ন জায়গায় টহল দিতে হয়। সেই যাত্রা হয় আমার সহকর্মীদের সাথে। আবার কখনও সখনও পরিবারের সঙ্গে রাত্রে অফিস থেকে বাড়ি যাওয়া অথবা বাড়ি থেকে অফিসে ফেরত আসতে হয়। সেই যাত্রা পথে জাতীয় ও রাজ্য সড়কের ধারে মাঝেমধ্যেই চোখে পড়ে কিছু খাবার হোটেল ও ধাবা — যেখানে গাড়ি থামিয়ে খানিক বিশ্রাম নেওয়া যায়, সঙ্গে পাওয়া যায় চা, স্ন্যাকস বা রাতের খাবার। এসব স্থানে বিশেষভাবে লক্ষ্য করি একটি প্রচলিত চিত্র — একজন ব্যক্তি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বা বসে, হাতে টর্চ নিয়ে রাস্তায় চলমান গাড়িগুলোর দিকে আলো প্রক্ষেপ করে মনোযোগ আকর্ষণ করছেন, যাতে যাত্রীরা সেই হোটেলে এসে কিছু খাওয়া-দাওয়া করেন।
এই ব্যক্তিদের কর্ম যত সাধারণ দেখায়, আদতে তা সহজ নয়। গভীর রাত, ক্লান্তি, ঘুমের টান, প্রখর ঠান্ডা, বৃষ্টি বা গ্রীষ্মের দাবদাহ — সবকিছুর মাঝে দাঁড়িয়ে থেকেও তারা তাদের কাজ, অর্থাৎ আলো প্রক্ষেপ করে যান। তারা জানেন না কোন গাড়ি থামবে, কোনটা চলে যাবে, কিন্তু গ্রাহকের প্রতীক্ষা তাদের বিরতি নিতে দেয় না।
একদিন রাত প্রায় দেড়টা। আমরা, অর্থাৎ আমি, আমার সহধর্মিণী এবং পুত্র, কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম ফিরছিলাম কলকাতা-মুম্বই জাতীয় সড়ক ধরে। এই রাস্তাটি দীর্ঘ এবং মাঝরাতে অধিকাংশ সময়ই একেবারে শুনশান থাকে। কিছু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ দেখি রাস্তার ধারে একটি খাবার হোটেলের সামনে একজন ব্যক্তি টর্চের আলো নাড়াচ্ছেন। আলোটা যেন আমায় ডাকছে, যেন বলছে, "এসো, একটানা যাত্রা পথে একটু বিরাম নাও, এক কাপ চা পান করো।" আমি বরাবরই চায়ের প্রতি দুর্বল, তাই ড্রাইভারকে বলি গাড়িটা থামাতে।
গাড়ি হোটেলের সামনে থামতেই একটি অদ্ভুত নিস্তব্ধ পরিবেশ চোখে পড়ল। হোটেলটি প্রায় জনমানবশূন্য, আশেপাশে কোনও শব্দ নেই, শুধুই রাতের নিঃশব্দতা। কেবল একজন ব্যক্তি একটি প্লাস্টিক চেয়ারে বসে রয়েছেন। তার উপস্থিতি ছাড়া চারদিকে যেন এক গভীর শূন্যতা। চা পাওয়া যাবে কিনা জানতে আমি তার দিকে এগিয়ে গেলাম।
তার সামনে গিয়ে যে দৃশ্যটি আমি দেখলাম, তা আমাকে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ করে দিল। তিনি চোখ বন্ধ করে বসে ছিলেন, নিঃশব্দ, একেবারে স্থির। দেখে মনে হচ্ছিল তিনি ঘুমাচ্ছেন, কিন্তু তার ডান হাতটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উঠছে ও নামছে, আর তার হাতে ধরে থাকা টর্চের আলো ঠিকঠাক রাস্তায় গাড়ির দিকে সিগন্যাল দিচ্ছে। এই দৃশ্য দেখে আমার মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় পড়া রাজশেখর বসুর লেখা বিখ্যাত গল্প 'বিরিঞ্চিবাবা'-র বরদা-খুড়োর কথা। বরদা মুখুজ্যে কী নিপুণভাবে নাক না ডেকে, মাথা না নেড়ে ঘুমিয়ে পড়তেন অথচ দেখে বোঝার উপায় থাকত না যে তিনি ঘুমাচ্ছেন! এখানে যেন ঠিক তেমনই এক জীবন্ত 'বরদা-খুড়ো' চোখের সামনে দেখতে পেলাম।
লোকটি হয়তো দিনের পর দিন এমন কাজ করছেন। ক্লান্ত শরীর, কিন্তু দায়িত্ববোধে অটল। হয়তো পরিবারের দায়িত্ব, হয়তো জীবিকার তাগিদ তাকে বাধ্য করেছে এই কাজ করতে। কিন্তু তিনি নিজের কাজকে এমন নিখুঁতভাবে আয়ত্ত করেছেন, যেখানে শরীরের কোনও এক অঙ্গ হাল ছেড়ে দিলেও আর এক অঙ্গ নিষ্ঠার সাথে কর্তব্য পালন করে চলেছে। আমাদের সামনে এমন বাস্তব নিদর্শন খুবই বিরল।
আমি তাকে ডাক দিলাম, বেশ কয়েকবার। এরপর তিনি চোখ খুললেন। চোখে লজ্জার ছাপ, হয়তো নিজের অজান্তে ঘুমিয়ে পড়ার জন্য কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন। আমি অনুভব করলাম, এখন তার ছবি তোলা বা নাম জিজ্ঞাসা করা ঠিক হবে না। তার সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা আমাদের দায়িত্ব। কারণ, এমন মানুষরা প্রচারের জন্য কাজ করেন না, তারা কাজ করেন প্রয়োজনে, কর্তব্যবোধে।
তিনি আমাদের খুব সাধারণভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, "কি খাবেন ?" আমি হাসি মুখে চা পানের বাসনা প্রকাশ করলাম। মিনিট পনেরোর মধ্যেই তিনি ধোঁয়া ওঠা গরম চা পেশ করলেন। চায়ের স্বাদ অভূতপূর্ব ছিল কি না, তা নিয়ে কিছু বলব না, কারণ ওই মুহূর্তে চায়ের স্বাদের চেয়েও বড় ছিল মানুষের মনের স্বাদ — মানবিকতা, নিষ্ঠা, আর কর্মকুশলতার এক অপূর্ব নিদর্শন।
গাড়িতে ফিরে এসে আমরা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ ছিলাম। তারপর আমার স্ত্রী বললেন, "আশ্চর্য এক মানুষ, তাই না?" আমি মাথা নাড়লাম — হ্যাঁ, এমন মানুষই তো প্রকৃত নায়ক। যাঁরা প্রচারের আলোয় নেই, অথচ তাদের নিরব দায়িত্ববোধের ভরসায় পথে যাতায়াত করে চলেছে সমাজের একটি বড় অংশ।
আমরা যেসব পেশাকেই 'ছোট' বলে অবজ্ঞা করি, সেই পেশায় যুক্ত মানুষদের অনেক সময় এই ধরনের কর্মকুশলতা এবং নিষ্ঠা আমাদের চোখে পড়ে না। অথচ, ঠিক তারাই আমাদের যাত্রাপথকে সহজ, সুরক্ষিত এবং স্বস্তিদায়ক করে তোলেন। কেউ হয়তো জেগে রাত কাটিয়ে আমাদের একটু বিরাম নেওয়ার সুযোগ করে দেন, কেউ আবার রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে গভীর রাতে পরিশ্রম করে আমাদের গরম চা পরিবেশন করেন।
সেই মানুষটির নাম আমার অজানা। কিন্তু তার কর্মকুশলতা, তার দায়িত্ববোধ এবং নীরব কর্মনিষ্ঠা আজীবনের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেলেন — কাজের মধ্যেই গৌরব লুকিয়ে থাকে, নামের মধ্যে নয়।