Go to Bangali.Network
Go to Bangali.Network



লেখা পাঠান


আমাদের কথা
Contests

উদ্যোগ
Web Magazine


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
বাঙালীর আত্মশক্তির জাগরণে ভগিনী নিবেদিতার অবদান
বাঙালীর আত্মশক্তির জাগরণে ভগিনী নিবেদিতার অবদান

"কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস" — রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সংগীতে ঈশ্বরের দূত বা অবতারের যে ছবি দেখি, তা শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব-এর রূপে প্রতিভাত। কিন্তু আমার ধারণায় শ্রীরামকৃষ্ণদেব-এর সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের ও ভগিনী নিবেদিতার রূপও এই গানে অঙ্কিত। স্বামীজি ব্যতীত যেমন শ্রীরামকৃষ্ণ সম্পূর্ণ নন, তেমনই নিবেদিতাকে ছাড়া স্বামীজি অসম্পূর্ণ।

ভগিনী নিবেদিতা প্রসঙ্গে যত আলোচনা আমি পড়েছি, তার মধ্যে বেশিরভাগ আলোচনাতেই নিবেদিতাকে স্বামীজির আলোকে আলোকিত এক ব্রতী স্বরূপ দেখানো হয়েছে। কিন্তু বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্যকে যুক্ত করতে করতে আমি যে নিবেদিতাকে দেখেছি, তিনি নিজের আলোকে দীপ্ত এক মহীয়সী, মাতৃস্বরূপা। তাই স্বামীজির ভগিনী রবীন্দ্রনাথের চোখে হয়ে উঠেছেন 'লোকমাতা'।

এখন প্রশ্ন হ'ল — কে এই নিবেদিতা? কী তাঁর শক্তি যা বাংলার শুধু নারী নয়, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষের মনকে নাড়া দিয়েছিল? যুবসমাজকে জাগিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান কতটা, সেই আলোচনাই আমি করবো।

ভগিনী নিবেদিতার পূর্বনাম — মার্গারেট এলিজাবেথ নোবল। জন্ম তারিখ — ২৮ অক্টোবর, ১৮৬৭। জন্মভূমি আয়ারল্যান্ড। ধর্মীয় পরিবেশে বড় হয়ে ওঠেন। মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী ছিলেন। লন্ডনে শিক্ষকতা করাকালীন ১৮৮৫ সালে এক সভায় স্বামীজির বক্তৃতা শুনে চমৎকৃত হন। তাঁর মনে হয়েছিল, প্রাচ্য থেকে যেন 'নববুদ্ধ' এসেছেন পাশ্চাত্যকে আলোকিত করতে।

স্বামীজির মতে, স্বাধীনতা হ'ল 'আত্মশক্তির জাগরণ'। মার্গারেট এই মতের সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত ছিলেন। তৎকালীন আয়ারল্যান্ড ইংলিশ ক্রাউনের শাসন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বৈপ্লবিক পথে অগ্রসর হয়েছিল। মার্গারেট জন্মভূমিকে মুক্ত করার পথ খুঁজছিলেন। স্বামীজির আলোচনাতে সেই পথ তিনি খুঁজে পান। তিনি উপলব্ধি করেন, স্বামীজির মাতৃভূমি ভারতের অতীত ঐতিহ্যের শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারলে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করবে এবং বিশ্বের অন্যান্য পরাধীন দেশকে স্বাধীনতার পথ দেখাবে।

মার্গারেট মনস্থির করে ফেলেন ভারতে যাবেন। তিনি স্বামীজিকে জানালেন, ভারতে গিয়ে সমাজকল্যাণের ব্রতকাজে নিজেকে নিয়োজিত করতে চান। স্বামীজি প্রথমে আহ্বান জানালেও পরে তাঁকে সচেতন করেছিলেন ভারতের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ সম্পর্কে। কিন্তু মার্গারেট মন তৈরি করে ফেলেছেন — ভারতে যাবেনই। অতঃপর ১৮৯৮ সালে তিনি জাহাজে চড়ে কলকাতায় আসেন।

কলকাতায় স্বামীজি মার্গারেটকে মন্ত্রদীক্ষা দিয়ে সন্ন্যাস-নামকরণ করেন — ভগিনী নিবেদিতা। বাগবাজারের বোসপাড়া লেনে একটা ছোট বাড়িতে নিবেদিতা আশ্রয় নিয়ে মেয়েদের স্কুল খোলেন। কলকাতার শিক্ষিত সমাজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য স্বামীজি স্টার থিয়েটারে সভার আয়োজন করেন। স্বামীজি নিবেদিতাকে পাশ্চাত্যের একটি উপহার বলে উল্লেখ করেন।

নিবেদিতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জগদীশচন্দ্র বসুর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ নিবেদিতার সঙ্গে পরিচিত হয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন কন্যাদের শিক্ষার ভার নেওয়ার জন্য। নিবেদিতা জানতে চান কী ধরণের শিক্ষা। রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের সাহিত্য ও বিজ্ঞান শিক্ষার কথা বললে নিবেদিতা বলেন যে, বাইরে থেকে কোনো শিক্ষা গিলিয়ে না দিয়ে মানুষের ভিতরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলাকেই তিনি যথার্থ শিক্ষা মনে করেন।

নিবেদিতাকে রবীন্দ্রনাথ বুঝতে পেরেছিলেন। পরে তাঁর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লেখেন — "তাহার পরে মাঝে মাঝে নানা দিক দিয়া তাঁহার পরিচয় লাভের অবসর আমার ঘটিয়াছিল। তাঁহার প্রবল শক্তি আমি অনুভব করিয়াছিলাম কিন্তু সেই সঙ্গে ইহাও বুঝিয়াছিলাম, তাঁহার পথ আমার চলিবার পথ নহে। তাঁহার সর্বতোমুখী প্রতিভা ছিল, সেই সঙ্গে তাঁহার আর একটি জিনিস ছিল, সেটি তাঁহার যোদ্ধৃত্ব।"

স্বামীজি নিবেদিতার মধ্যে প্রবল আত্মশক্তি অনুভব করেছিলেন। নারী শিক্ষা ও আর্তের সেবাকর্মের পাশাপাশি নিবেদিতা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে তাঁর সহমর্মিতার কথা স্বামীজিকে জানান। এতে স্বামীজির সায় ছিল। কিন্তু যখন তিনি দেখেন, নিবেদিতা বিপ্লববাদীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, তিনি আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন যে, ওই পথ সন্ন্যাসীদের পথ নয়। নিবেদিতা সংযত হন। তবে ১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের প্রয়াণের পরে নিবেদিতা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। নিবেদিতার সঙ্গে পরিচয় হয় বাল গঙ্গাধর তিলক, বিপিন পাল এবং বরোদায় কর্মরত অরবিন্দ ঘোষের। নিবেদিতা অরবিন্দকে বলেন — "আপনার কাজ তো বাংলায়। আপনার জন্য স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছেলেরা অপেক্ষা করছে।" বারীণ ঘোষসহ তরুণ বিপ্লববাদীদের কাছে নিবেদিতা আইরিশ বিপ্লবীদের কর্মকৌশল ব্যাখ্যা করেছিলেন। তিনি বন্ধু মিস ম্যাকলিয়ডকে চিঠিতে লিখেছিলেন — "I think my task is to awake a nation, not to influence a few women."

লক্ষ্যণীয় যে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে দেশাভিমান জাগিয়ে তোলার জন্য ভগিনী নিবেদিতা অমৃতবাজার পত্রিকায় নিয়মিত ব্রিটিশ শাসনের সমালোচনা করেছেন, অন্যদিকে যুবসমাজকে ভারতের অতীত গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সচেতন করার জন্য রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় বহু প্রবন্ধ লিখেছেন। এরই সঙ্গে সকল ভারতবাসীর অন্তরে জাতীয়তাবাদী স্পৃহা জাগিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে তিনি বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা করতে শুরু করেছিলেন। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা তিনি করেছিলেন কলকাতা টাউনহলে ১৯০৪-এর ২৬ ফেব্রুয়ারি। বক্তৃতার বিষয় ছিল Dynamic Religion। বিপিন পাল এই বক্তৃতাকে ডিনামাইটের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বারোশোর মতো শ্রোতার সামনে নিবেদিতা সেদিন চড়া সুরেলা গলায় যা বলেছিলেন, তার একটি অংশ ছিল — "Religion has never dwelt in a creed that divides man from man; it is in a religion that becomes a national force that is the crying necessity for unity."

প্রশ্ন জাগে — কোন্ শক্তি নিবেদিতাকে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ভারতে টেনে আনলো এবং বাংলায় প্রতিষ্ঠিত করলো? জানা যায়, স্বামীজির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগেই তিনি বৌদ্ধ দর্শন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। বুদ্ধের বাণী "আত্মদীপা বিহরথ" — অর্থাৎ আত্মদীপ হয়ে বিহার করো, নিজেই নিজের দীপ হও — এই কথা তিনি অন্তর থেকে উপলব্ধি করেছিলেন। এইরূপ আত্মশক্তির স্ফুরণ নিবেদিতা স্বামীজির মধ্যে লক্ষ্য করেছিলেন বলেই প্রথম দর্শনে তাঁকে 'নববুদ্ধ' মনে করেছিলেন। উল্লেখ্য, স্বদেশী আন্দোলনকালে তিনি যে জাতীয় পতাকার পরিকল্পনা করেছিলেন, তার কেন্দ্রে এঁকেছিলেন বৌদ্ধ মহাযানী বজ্র, যা জ্ঞান ও শক্তির পরিচায়ক।

নিবেদিতা রবীন্দ্রনাথের মাধ্যমে জাপানি জাতীয়তাবাদী তাত্ত্বিক ওকাকুরার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। সর্বোপরি তিনি প্রখ্যাত রুশ অ্যানার্কিস্ট প্রিন্স ক্রপটকিনের সঙ্গে ১৯০০ সালের কোনো এক সময়ে ইউরোপে যোগাযোগ করেছিলেন — এমন তথ্য স্বামীজির ভাই ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত-এর লেখা থেকে জানা যায়। নিবেদিতার জীবনীকার লিজেল রেমঁ তো স্বামীজির সঙ্গে যোগাযোগের আগেই নিবেদিতার সঙ্গে ক্রপটকিন ও তাঁর পরিবারের যোগাযোগ ছিল, লিখেছেন। যাইহোক, ক্রপটকিনের ধারণা — "বিপ্লব দ্রুততর বিবর্তন ছাড়া কিছু নয়" — নিবেদিতা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন।

অ্যানার্কিস্ট মতাদর্শ নিবেদিতার মতো প্রচণ্ড গতিশীল চরিত্রের নারীকে প্রভাবিত করেছিল। তাই তিনি ভারত থেকে ব্রিটিশ শাসন উৎখাত করতে অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর এই মনোভাব ব্রিটিশ পুলিশের অগোচর ছিল না। তৎকালীন পুলিশের স্পেশাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট টেগার্টের গোপন রিপোর্টে লেখা আছে — "Sister Nivedita was undoubtedly strongly imbued with nationalistic ideas." (১৫ মার্চ ১৯১৪)। এরও চার বছর পরে ঘোষিত কুখ্যাত রাউলাট অ্যাক্ট ছিল আসলে Anarchical and Revolutionary Crimes Act।

নিবেদিতার অ্যানার্কিস্ট কার্যকলাপের প্রভাব তাহলে কি তাঁর প্রয়াণের পরেও বাংলা তথা ভারতের বুকে প্রসারিত হয়েছিল, যা ব্রিটিশ সরকারকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল? এ প্রশ্ন মনে জাগে।

নিবেদিতা ১৯১১ সালে ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। অতিরিক্ত কৃচ্ছসাধনে তাঁর শরীর ভেঙে পড়েছিল। বন্ধু বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র তাঁকে দার্জিলিঙে নিজ বাসভবনে নিয়ে যান। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ওই বছরেই ১৩ অক্টোবর ভগিনী নিবেদিতা প্রয়াত হন। দার্জিলিঙে স্থাপিত তাঁর স্মৃতিসৌধে লেখা আছে — "Here repose the ashes of Sister Nivedita (Margaret E. Noble) of the Ramakrishna-Vivekananda who gave her all to India."

যে মহীয়সী ভারতের মুক্তির জন্য জীবন পর্যন্ত দিয়ে গেলেন, তাঁকে ভারত কতটা মনে রেখেছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।




আপনি কি লিখতে ভালোবাসেন?

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিনের এপ্রিল সংখ্যা ❛নববর্ষ ১৪৩৩❜ প্রকাশিত হবে ১৫ এপ্রিল। ওয়েবসাইটে ঘোষিত বিভাগগুলি থেকে আপনার পছন্দের বিষয়ে লেখা পাঠান ১০ই এপ্রিলের মধ্যে। লেখা পাঠানোর আগে অতি অবশ্যই শর্তাবলী পড়ুন। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ Bangali.Network ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে, এবং ১২ জন পর্যন্ত লেখক / লেখিকা পাবেন 'মাসের সেরা কলম' সম্মান। বিশদে জানতে ও আপনার লেখা পাঠাতে এখানে ক্লিক করুন

পৃষ্ঠা

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ডিসক্লেইমার : লেখা, মতামত, মন্তব্য বা সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের উপরই বর্তায়। এই সমস্ত মতামত Bangali Network-এর নিজস্ব মতামত, অবস্থান বা নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে। লেখক পরিচিতিতে প্রদত্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণ অনুযায়ী প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
অপছন্দ হলে পরামর্শ দিন
মতামত জানাতে মন্তব্য করুন
3.6 12 ভোট
স্টার
guest
20 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ইনলাইন প্রতিক্রিয়া
সকল কমেন্ট দেখুন
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

    বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

    মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
    Scroll to Top