বাঙালির ইতিহাসের একটা বড় অংশ জুড়ে ওলাইচণ্ডী-শীতলা-মনসা-দক্ষিণরায়। দেবী মনসার মাহাত্ম্য প্রচারের কাজে এসেছিল সাত জন মৃত প্রিয়জনের ফেরত আসার গল্প। সনকার সাতটি সন্তানের প্রাণ কেড়েছিলেন মনসা।
বেহুলার গাঙুরের জলে মান্দাসে ভেসে যাওয়া এবং নানা মিথ ও অলৌকিক ক্ষমতায় স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে আনার ঘটনা কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল — তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যারও একটি চেষ্টা করা যায়। তখন শবদেহের মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক ডাক্তার ছিলেন না, আর clinical death, brainstem death / brain death, Cardiac Asystole, CPR, Cardioversion ইত্যাদির নথিভুক্তকরণও হয়নি।
বেহুলার ছয় মৃত ভাসুরের ফেরত আসা?
খুব সম্ভবত Wishful thinking।
বেহুলা কি জানতেন যে তাঁর স্বামীর আবার জেগে ওঠার সম্ভাবনা আছে?
অসম্ভব নয়।
বিজয়গুপ্তের ‘পদ্মাপুরাণ’-এ বেহুলার কুমারী জীবনের অনেকগুলো বছর ভবঘুরে সাধিকা হিসেবে কাটানোর বর্ণনা আছে। নানা মানুষের সাথে মিশে, হরেক রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে হয়তো তিনি এই বিষয়ে কিছু আঁচ করতে পেরেছিলেন (যেমন অন্ত্যজ বেদে ইত্যাদি জনজাতিরাও তাঁদের folk medicine-এর অঙ্গ হিসেবে এই বিষয়ে কিছু ভাসা ভাসা জ্ঞান রাখেন এবং যা হাতিয়ার করে তাঁরা ‘সাপের বিষ ঝাড়ানো’ ইত্যাদি অবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া ও chance factor-এর উপরে নির্ভর করে সর্পাঘাতের ‘চিকিৎসা’ করে উপার্জন করে থাকেন), তাই শ্বশুরবাড়িতে বলে দিয়েছিলেন যে তিনি হয় স্বামীকে ফেরত আনবেন, নয়তো আর কখনো ফিরবেন না।
বিবাহরাত্রিতেই বিধবা হওয়ার পরে ‘অপয়া’ কলঙ্কের হাত থেকে বাঁচতেই কি তিনি এই ফন্দি এঁটেছিলেন? হতেই পারে। এটা এক প্রকার fool proof plan ছিল — স্বামী ফিরলে তিনি আর বিধবা থাকছেন না, আবার স্বামী না ফিরলে তিনিও আর ঘরে ফিরে নিজেকে কলঙ্কময় বৈধব্যের বেড়াজালে আবদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন না; অর্থাৎ দুই তরফেই তাঁর জয় নিশ্চিত।
আমি বিনীতভাবে বলতে চাই যে সর্পাহত রোগীর বেঁচে ফেরার মধ্যে কখনই কোনো miracle ছিল না; আসল miracle ছিল এক অসীম সাহসিনী তরুণীর ইচ্ছাশক্তি, প্রেম, বুদ্ধিমত্তা ও লড়াকু মনোভাবের কাছে নিয়তির হার মানার মধ্যে।
সেই তেজ, যা এক বঙ্গজ তরুণীর একমাত্র সম্পদ। যাকে আশ্রয় করে সে সমস্ত ঐহিক সুখ-শান্তি, আপনজনদের ছেড়ে নিষ্প্রাণ স্বামীকে বুকে আগলে নিশীথে এক অজানায় ভেসে যায়। এ পরীক্ষা কেবল তার একার নয়, এ পরীক্ষা সকল নারীজাতির।
তোমাকে ভাসতেই হোত একাকী
মান্দাসের ভেলায়; সতী নারীর পতি ছাড়া
আর কিবা গতি; গলে পচে
ক্ষয়ে যাওয়া বিবর্ণ বিকৃত শব
ভালোবাসার এত বড় মৃত্যুপরীক্ষা
দিয়েছে কী কখনো কোনো পুরুষপুঙ্গব?
এছাড়া বাঙালি সধবাদের রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আবশ্যকভাবে চুল বেঁধে ফেলা (যেহেতু কালী নামক মনসা-প্রেরিত নাগিনী বেহুলার মাথার খোলা চুলের মধ্যে লুকিয়ে দংশনের সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছিল) এবং সিঁথিতে সিঁদুর বৈ তেল না লাগানো (যেহেতু অপাপবিদ্ধা বেহুলাকে বৈধব্যের শাস্তি দেওয়ার জন্য তাকে কোনো কল্পিত পাপের দ্বারা কলুষিত করা প্রয়োজন ছিল, তাই কালনাগিনী প্রদীপের তেল নিজের লেজের ডগায় নিয়ে তা বেহুলার সিঁথিতে লাগিয়ে দেয়) ইত্যাদির পেছনেও রয়েছে মনসামঙ্গল।
আজও সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে মাথা তুলে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গের ‘নেতি ধোপানীর ঘাট’ ও অসমের ধুবরি জেলার ‘নেতাই ধুবুরী ঘাট’, শূন্য বুক পেতে বসে থাকে বগুড়ার ‘বেহুলার লৌহবাসর’, কলকাতার জনবহুল ‘বেহালা’ অঞ্চলে আয়োজিত ‘বেহুলা-উৎসব’ নীরব সাক্ষ্য বহন করে খাঁড়িপথে বঙ্গোপসাগর অভিমুখে বেহুলার কলার মান্দাসের যাত্রাপথের কল্প-স্মৃতি। আদিগঙ্গার তীরে সিঁদুর-আলতা-শাঁখা-পলা-লোহায় মাখামাখি হয়ে মৃতবৎ স্বামীকে কোলে নিয়ে চুপটি করে বসে থাকেন ভগ্নপ্রায় মৃন্ময়ী রূপে সায়বেনের ঝি।
বেহুলা বিজয়িনী হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই পথ যে কতটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল, তা আমরা জানি। দেবলোকেও সে অনায়াসে কাজ হাসিল করতে পারেনি, সে কথা বলাই বাহুল্য। বেহুলাকে শেষ পর্যন্ত স্বর্গে গিয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে খুশি করতে হয়েছিল তাঁর নৃত্যগীত দ্বারা। এটা নারীর এক অবমাননাই। বেহুলার তো ইন্দ্রকে মনোরঞ্জক নৃত্যগীত দ্বারাই খুশি করতে হয়েছে, বেহুলার দুঃখ-কষ্ট বা ত্যাগ-তিতিক্ষা দেখে তো আর ইন্দ্র বর দেননি;
কবি তানভীর মোকাম্মেল বলছেন:
তোমাকে নাচতেই হো’ত ইন্দ্রের
কামুকী সভায়;
রমণীর মাংসল হিল্লোল ছাড়া
পুরুষের অব্যর্থ মনোরঞ্জন কবে আর হয়।
সে শুধু তার স্বামীর জীবনই ফিরিয়ে আনেনি, স্বামীর অন্য ভাইয়েরা আর যারা ছিল, বা তার সম্পদের যা ক্ষতি হয়েছে, সে সমস্ত কিছুই দেবতাদের কাছ থেকে সে ঠিকই কিন্তু আদায় করে নিয়েছে। কাজেই বেহুলা কেবল একার জন্য সংগ্রাম করেনি, শুধু নিজের স্বামীর কথাই ভাবেনি, সে সকলের মঙ্গলের কথাই ভেবেছে। যূথবদ্ধ দেশপ্রেমের যে রূপ, তারও প্রতীক হিসেবে বেহুলা যেন অপরাজিতা, চিরন্তনী এক কন্যা। ঝাঁপান-রয়ানি-পালাগান-পটচিত্র-চলচ্চিত্র পার করে আজ Digital যুগেও যাঁকে নিয়ে লেখা band-এর গান, নাটক তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
দেবী হওয়া সত্ত্বেও মনসার প্রতাপ Snake Antivenin-এর আবিষ্কারের সাথে সাথেই প্রায় অস্তমিত হয়েছে, কিন্তু সামান্য মানবী হয়েও বেহুলা মিশে আছেন বাঙালির জীবনের অস্থিমজ্জার সাথে এবং for the foreseeable future হয়তো তেমনভাবেই থেকে যাবেন, এমনটা আশা করা যায়।
যদি সুখী হতে চাও ছুঁতে চাও মহাকাল
বেহুলাকে মাছচক্ষু করে
বাংলার সব কটি নদীর কিনার ধরে
হেঁটে চলে বিমুগ্ধ পায়ে অনন্তকাল।
অর্থাৎ বেহুলাযুগ এখনো শেষ হয়নি, বরং আজও বেহুলারা প্রতিদিন সমাজে অদম্য লড়াই চালিয়ে বেঁচে থাকে। আজও বেহুলারা রিলিফ ক্যাম্পে ঘুরে বেড়ায় বাঁচার তাগিদে, লখীন্দরেরা পরিযায়ী হয়ে ফেরে সীমান্তে সীমান্তে।
স্বচ্ছ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা রোজ দেখি বেহুলার মুখ।
তথ্যসূত্র:
মঙ্গলকাব্য
পদ্মাপুরাণ
কবি তানভির মোকাম্মেলের বেহুলা কাব্যগ্রন্থের কবিতার অংশ।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।