কোনো নির্দিষ্ট কবিতায় সরাসরি পৌঁছতে কবির নামের ওপর ক্লিক করুন —
নামহীনদের জন্য
তিতাস ভট্টাচার্য্য
ওদের বিবস্ত্র দেহ পড়ে রয়েছে মাটিতে —
উন্মুক্ত প্রান্তরের নির্লিপ্ত বুকে।
নেমে এসেছে শিকারি পাখির দল,
মহাভোজে আজ তারা উল্লাসে উন্মত্ত।
ঠোঁটের আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছে
ওদের স্বযত্নে লালিত শরীর,
আজন্ম রক্ষিত আত্মসম্মান।
কী ছিল ওদের অপরাধ?
শুধু বেঁচে থাকা?
নাকি নিজের মতো করে
একটু আকাশ চাওয়ার দুঃসাহস?
কারা ওরা? কী ওদের পরিচয়?
সংবাদপত্রের কয়েকটি শিরোনাম,
মোমবাতির আলোয় ক্ষণিক প্রতিবাদ,
তারপর — ভুলে যাওয়া কয়েকটি নাম।
সভ্যতা মুখ ফিরিয়ে নেয়,
আইন হিসেব কষে,
বিবেক ঘুমিয়ে পড়ে ক্ষমতার নরম বালিশে।
শুধু রক্তমাখা মাটি
প্রতিদিন নতুন ইতিহাস লেখে।
কাল আবারও অন্য কোনো শহরে,
অন্য কোনো গ্রামে,
অন্য কোনো মুখ
একই পরিণতির দিকে হাঁটবে।
শকুনেরা অপেক্ষায় থাকবে
মানুষের মুখোশ পরে।
আর আমরা —
চোখ নামিয়ে, কিছুক্ষণ শোক পালন করে,
আবার স্বাভাবিক হয়ে যাব।
কারণ,
এই মৃত্যুগুলো আমাদের কাছে আর সংবাদ নয়,
পরিসংখ্যান নয়,
এ যেন এক চিরচেনা অভ্যাস — নিরন্তর।
আসল দুঃখ
মনোরঞ্জন বিশ্বাস
সন্ধ্যা তখন সাড়ে সাতটা হবে,
বাড়ি ফেরার তাড়া,
কোনমতে আমি তখন সবে
পেরিয়েছি অফিসপাড়া।
আমার পথ আগলে দাঁড়ায় কোত্থেকে
বিদঘুটে এক লোক,
লম্বা ঠ্যাঙা চেহারা, গাল ফোলা
আর কুতকুতে দুই চোখ।
আমি বললাম, "কে? কে তুমি ভাই,
আমি কি তোমায় চিনি?"
লোকটা বলে, "আমি নতুন হেথা,
আসল দুঃখ কিনি।
বলি, তোমার কাছে আছে নাকি
আসল দুঃখ কিছু?
দুঃখগুলো তোমার বলো দেখি,
মূল্য পাবে দুঃখ পিছু।"
বললাম, "দুঃখ আছে ই-এম-আই এর,
প্রমোশনটাও হয় না,
গুনে গুনে খরচ করেও
বাড়তি টাকা কিছু রয় না।
হয়নি কেনা শখের গাড়ি
আর মনের মতো এক কুঠি,
বছরগুলো বয়ে যায়,
পড়ে থাকে ব্যাংককের ছুটি।
দুঃখ হয় কাজের চাপে,
কিংবা যখন জাগে দাঁতের ব্যথা,
দুঃখ হয় সাধ না পুরোলে।
ব্যাস, এই আমার মনের কথা।"
কুতকুতে চোখ বলে,
"এসব দুঃখগুলো ভারি জোলো,
দেখো তো এমনধারা দুঃখ আছে কি?
থাকলে বলো।
ওই যে ছেলেটা ভাত পায় না,
ওই মেয়েটা স্কুলে যায় না,
কোনো শহরে ওদের বসত থাকুক
কেউ তো তা চায় না।
সভ্যতার যান্ত্রব ধাক্কায়
মহীরুহরা পড়ে যায়,
ঘর ফেরা পাখিগুলো
বাসা খুঁজে খুঁজে ফিরে যায়।
তোমার ভবিষ্যতের শৈশবগুলো
ওই ইটভাটায় জ্বলে,
এসব দেখে তোমার বুক ফাটে না?
চোখ ভাসে না জলে?
এমন সব দুঃখ যদি তোমার কখনও
ভুল করেও হয়,
দুঃখ কিনতে তোমার কাছে ফিরে
আবার আসব নিশ্চয়।"
বর্ণমালা
সোমজ্যোতি মল্লিক
আমার শব্দেরা শব্দ করে না।
নিঃশব্দে প্রবাহিত হয় অক্ষরে অক্ষরে,
তারপর চলে যায় ধমনী থেকে শিরায়,
অস্থি, মজ্জা ছুঁয়ে নেমে যায় সময়ের ভিতরে,
কম্পন তুলতে তুলতে।
সময় বড্ড শব্দহীন, হিসেবী,
খোঁজ রাখে শব্দের প্রতিটি চলার,
একের সাথে অন্যকে মিলিয়ে, আলাদা করে
গড়ে, ভেঙে...
রেখে যায় আরো বেশি শব্দ —
অনুভূতির, প্রেমের, বন্ধুত্বের।
মিলন দিয়ে মিলনে, বিচ্ছেদে বিচ্ছেদে
বিদ্রোহের আগুন শিখায়, সর্বত্র।
আমার শব্দেরা শব্দ করে না।
চুপি চুপি এসে পড়ে সহসা,
উল্কা কিম্বা ধূমকেতু — জীবনের ছায়াপথে।
শুধু আঘাত করে সত্ত্বায় —
খুব কঠিন, তীক্ষ্ম।
ছুরির ফলার মতো খুঁচিয়ে
রক্ত ঝরায় ক্রমাগত,
অবিশ্রান্ত ক্লান্তিহীন চলতে চলতে
নিঃশব্দে বলে যায় —
"তোমাদের চৈতন্য হোক"।
জীবনের স্রোত
সুমিত্রা গায়েন
মুহূর্তগুলো হামাগুড়ি দিয়ে চলে যায়
কিছু সযত্নে ধরে রাখি মনের নিভৃতে
বাকিগুলো হারিয়ে যায় সময়ের স্রোতে।
এটাই জীবন।
সময় থেমে থাকে না,
সময় বড়ো অদ্ভুত।
আমার জন্ম, প্রথম বসতে শেখা, হাঁটা, কথাবলা,
অথবা প্রথম ইস্কুলের আঙিনায় পা রাখা —
কোন কিছুই আমার মনে পড়ে না।
আমার মুহূর্তরা মিশে আছে
এক্কা দোক্কা, লুকোচুরি খেলায়;
গ্রীষ্মের দুপুরে কয়েত বেল খাওয়া, সাঁতার কাটা,
বর্ষায় প্রচন্ড বৃষ্টিতে জানলায় দাঁড়িয়ে
বৃষ্টির শব্দ শোনার মধ্যে।
শরতের ভাসা মেঘে হারিয়ে গেছি রামধনুর রাজ্যে,
সাত রঙে মাখামাখি হয়ে পাখির সঙ্গে করেছি বন্ধুত্ব।
উড়ে বেরিয়েছি নীল আকাশে,
লুকোচুরি খেলেছি কাশের বনে,
মাটির খেলনায় রান্না করেছি শিউলি ফুলের ভাত।
অভাবের তপ্ত আগুনে যেমন কমলি, মালতীরা
প্রতিদিন মাটির খোলায় ভাত বসায় —
ক্ষোভের ফ্যান চারিদিকে উছলে পড়ে,
অনটনের আঁচে দুমড়ে মুছড়ে যায় স্বপ্নগুলো।
উঠোনে ছড়িয়ে থাকে অসংখ্য শিউলি ফুল যেন
সাদা সাদা এক একটি ভাত!
হেমন্তের ভোরে শিশিরে স্নাত হয়ে
অগ্রাহয়নের ঘ্রাণে নবান্ন কে স্বাগত জানিয়েছি।
শীতে নরম রোদের চাদর গায়ে জড়িয়ে
সোহাগী মন ঘুরে বেড়িয়েছে অযোধ্যার কোলে,
কিংবা পারডি জলাধারের সৌন্দর্য অবগাহনে।
পুবে খাটতে যাওয়া কমলিরা তখন ফিরে এসেছে।
ঘরে এখন ভাত আছে, মরদও।
এখন ওদের সুখের সময়।
টুসু পরবে অবসন্ন মনটা বড্ড চাঙ্গা,
হাড়িয়ার নেশায় আর পিঠে -পুলির সুবাসে।
ভাঙ্গাচোরা মাটির কুঁড়ে ঘরে
মুহূর্তগুলো প্রতিবছর চাঁদের আলো হয়ে উঁকি মারে
মালতীদের ছেঁড়া কাঁথায়।
বসন্তে প্রকৃতির মতো আমিও সেজে উঠি;
পলাশের লাল কার্পেটে হেঁটে বেড়াই শিমুল বনে।
কৃষ্ণচূড়া স্বাগত জানায়,
কোকিলের কুহু ডাক আমার মনে সুর তোলে।
শাল -পিয়ালের আলিঙ্গনে
সবুজ কে ভালোবেসে ফেলি;
স্বপ্ন দেখি নতুন দিনের।
টুসু মনিরা মহুল কুড়ায়
একমুঠো ভাতের আশায়।
কমলির দুচোখে তখন পলাশ আগুন হয়ে ঝরে।
রুখা সুখা তপ্ত ভূমিতে
রক্তক্ষরণ হয় অভাব অনটনের।
মহুলের নেশায় ক্লান্ত শরীরে
তখন জমে থাকে অবসাদের ধুলো।
ঘুম আসে, এলিয়ে পড়ে খাটিয়ায়,
স্বপ্নরা ভিড় করে অভাবের জানলায়।
মালতী সেই মুহূর্তে দেখে —
গণতন্ত্রের উঠোনে অজস্র মউফুল
যেন ভাত হয়ে ছড়িয়ে আছে।
অপেক্ষা
সায়নী দাস
আমরা রোজই কেউ না কেউ
কারোর অপেক্ষায় থাকি —
কখনো মানুষের,
কখনো পোষ্যের একবার চেয়ে থাকার।
এই দৌড়-ঝাঁপের পৃথিবীতে
বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় আরাম
এই অপেক্ষাতেই।
অপেক্ষার শেষে
একবার চোখে দেখার কী যে আনন্দ
তা তো উভয়েই জানে।
কখনো স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময়
মা, দাদু ,ঠাম্মার অপেক্ষা দেখেছি।
কখনো বন্ধু পাশে বসার অপেক্ষা,
কখনো অনেক দিন না দেখার পর
পেয়েছি অনাবিল আনন্দ।
ঠাকুমা চলে যাবার পরেই
একটা টিয়া পাখি জুটে গেল।
সেও অপেক্ষায় থাকতো আমার বাড়ি ফেরার।
সেই পাখিটা চলে যেতে যেতে
দিয়ে গেল গুলুকে।
যারা এখনো
আমার ঘরে ফেরার আশায় বসে থাকে।
দরজার দিকে তাকিয়ে থাকে —
কেউ যে ফিরবে এই আশায়।
অপেক্ষা কেবল এক প্রাণ থেকে
আরেক প্রাণে বয়ে চলা।
ভালোবাসা ফুরায় না —
শুধু রূপ বদলায়।
লেখিকা বর্ধমানের বাসিন্দা এবং বর্তমানে বি.এড. পাঠরত। ছোটবেলা থেকেই গল্পের বই তাঁর নিত্যসঙ্গী, আর সেই পাঠের অভ্যাস থেকেই ধীরে ধীরে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। শান্তিনিকেতনে পড়াশোনার সুযোগ তাঁর সাহিত্যচর্চায় নতুন অনুপ্রেরণা যোগ করে। সেখানকার খোয়াইয়ের লাল মাটি, আম্রকুঞ্জের ছায়া আর মুক্ত পরিবেশ তাঁকে নিজের ভাবনা কলমে প্রকাশ করতে আরও উৎসাহিত করেছে। মানুষের জীবন ও তার অন্তর্নিহিত গল্পকে নিজের লেখায় ছুঁয়ে দেখতেই তিনি ভালোবাসেন।।
ভালো খবর
কৃষ্ণকান্ত ভট্টাচার্য
অনেক দিন হয়ে গেলো,
কোনো ভালো খবর আসেনি।
সেই খবর,
যেটার জন্য ভোলা যায়, শত কষ্ট, শত যন্ত্রনা,
শত না পাবার অনুশোচনা।
রোজ ই ভাবি,
আজ বুঝি আসবে সেই ভালো খবর।
যে খবরে জড়িয়ে থাকবে না কোনো স্বার্থ,
কোনো লাভ-ক্ষতি,
থাকবে শুধুই ভালো লাগা,
আর অ..নে..ক.. টা ভালো থাকার ইচ্ছা।
সব খবরই তো আসে রোজ,
বাজারের দর, ঝড়ের পূর্বাভাস, মৃত্যু, হানা হানি।
শুধু ভালো খবর টাই আসেনা আর,
জানি না তার অজানা কারণ।
না এলে কী-ই বা যায় আসে?
অপেক্ষাটাই তো বাঁচিয়ে রাখে,
ভালো খবর আসবে বলেই
মনটা আজও আলো মেখে থাকে।
শব্দের সন্তান
তীর্থ মুখার্জী
আমার কয়েক হাজার শব্দের সন্তানেরা,
জন্ম লগ্ন থেকেই তারা দমবন্ধ দিশাহারা।
পৃথিবীর আলোর পর, দেখেনি কেউ তাদের,
স্রষ্টা নিজেই অদেখা করে, সৃষ্টি করেছে যাদের।
নিস্তব্ধ কালো অক্ষরের ফাঁসে তাদের শ্বাস,
অপ্রকাশিত নীরব আর্তনাদে তাদের আশ।
কাগজের ভাজে ভাজে জমে থাকে শুষ্ক অশ্রু,
পঠনের অপেক্ষায় তারা আজও উদ্বেল।
কখনো তারা কবিতা, কখনো কোনো গল্প,
কিম্বা কিছু ভুলে থাকা অভিমান অল্প।
নামহীন কিছু ভাষা, অর্থহীন পরিচয়,
তবু প্রতিটি শব্দে লুকিয়ে থাকে পিতার হৃদয়।
রাতের পর রাত জেগে জন্ম দেওয়া সেই সন্তান,
দিনের আলোয় এসেও পায়নি কোনো স্বীকৃতি-মান।
সৃষ্টির দায়ে আমি স্রষ্টা, অথচ নীরব ঘাতক,
নিজের হাতেই করেছি তাদের ভাগ্যরেখা ক্ষতচিহ্নিত।
তবু একদিন —
যদি কোনো চোখ থামে একটি লাইনে,
যদি কোনো বুক কেঁপে ওঠে একটি বাক্যে,
তখন জানব — আমার শব্দের সন্তানেরা
অবশেষে শ্বাস নিতে শিখেছে।
আর মানুষ হয়ে নয়
অনামিকা
আর মানুষ হয়ে জন্ম নেব না কোনোদিনও...
একান্তই যদি ফেরার সুযোগ আসে —
ওই অনন্ত নীলিমায় এক টুকরো সাদা মেঘ হব;
আকাশের বুকে থেকেও পাহাড়টাকেই ভালোবাসবো।
কখনো বৃষ্টি হয়ে তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দেব,
আবার কখনো মৌন আহ্বানে
তুলোর মতো নরম হয়ে তাকে ছুঁয়ে দেব।
যদি আবারও সুযোগ মেলে —
গ্রামের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া এক শান্ত নদী হব।
ভাঙা-গড়ার সমস্ত উপমা
বুকের গভীরতায় লুকিয়ে রাখব,
তারপর কোনো এক মোহনায়
অবাধ্য কিশোরীর মতো সাগরে মিশে যাব।
আরও একবার যদি সুযোগ পাই —
শরতের ভোরে ঝরে পড়া
এক মুঠো শিউলির ঘাস হব।
শিশিরভেজা পরশে ঘুমন্ত শহরের
আলস্য ভেঙে দেব,
মাটির খুব কাছে থেকে
পৃথিবীর সবটুকু মায়া নিজের গায়ে মাখব।
ভুল করে যদি শেষবার সুযোগ আসে —
তবে আমি চাঁদের স্নিগ্ধ জোছনা হব।
চাঁদের আদরে থেকেও
নিশ্চুপ প্রকৃতিকে আগলে রাখব,
সাঁঝবেলাতেই মায়াজালে জড়িয়ে
সবটুকু আঁধার মুছে দেব।
এসব কিছু যদিও না হই —
তবুও মুখোশের ভিড়ে মুখ খুঁজব না আর,
অভিমানের ভারী চাদরের আড়ালে
অভিযোগ জমিয়ে রাখব না আর।
মিথ্যে মায়ার মরীচিকায়
নিজেকে হারাব না বারবার,
হাজারটা সুযোগ এলেও —
মানুষ হয়ে জন্ম নেব না আর।
কিছু কথা
প্রীতম কুমার ঘটক
রাত তখনো নবীন,
ভোর হতে ঢের বাকি।
গুটি গুটি পায়ে সে দিচ্ছে পাড়ি,
জানালার ফাঁকে আমি খুঁজি ওই চাঁদখানি।
বড় বড় বাড়ির ভিড়ে
তৃণসম আমার ঠিকানা,
হয়তো অন্য কোনো জানালার ফাঁকফোকরে
এখন তার আনাগোনা।
এখনো রাতজাগা পাখিটি কি আসে?
শুনি তো না তার হাঁক-ডাক!
কোলাব্যাঙগুলোও কি ছেড়েছে আমায়?
তাদের ডাকগুলো যেন এমন বৃষ্টিতে
আরো বেশি করে মনে পড়ে যায়।
তারাগুলো দিনের আলোয় মুখ লুকোবে,
হারিয়ে যাওয়া জোনাকিগুলোর খোঁজ
এখন কোনো শিশু আর কি করে?
স্মৃতিগুলো দিনের আলোয় থাকে চুপ করে,
নিকেশ কালো তিমিরে উঠে তারা ধিকিধিকি।
দিনগুলো সামনে এগোয়,
পিছিয়ে রয়ে যাই আমি —
নাকি মাইলফলক পেছনে ফেলে
সামনে এগোই আমি?
কিছু প্রশ্ন জবাবের আশায় রয়,
কিছু অভিমানের দূরত্ব
কখনো পার করা না যায়।
হলদেটে পুরোনো ডায়েরির পাতায়
হিজিবিজি কালির আঁচড় শুধু পড়ে রয়ে যায়।
লেখক উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারের অধিবাসী। লেখালেখির প্রতি টান ছোট থেকেই, ডুয়ার্সের অকৃত্রিম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে নিজের লেখায় আঁকার চেষ্টা করতেন। কর্মসূত্রে তিনি দিনহাটার কাজী নজরুল হাই স্কুল (বড় নাটা বাড়ী)-এর একজন শিক্ষক। পেশাগত জীবনের পাশাপাশি কবিতা, ছড়া সাহিত্য ও নানা ভাবনামূলক শিক্ষণীয় রচনায় নিজের মনের কথা ফুটিয়ে তুলতে ভালোবাসেন।
আমি আর স্বপ্নের মুখোশ
দেবনাথ সুকান্ত
যেদিন সবকটি ভুল পুঞ্জিভূত করব,
সেদিন স্বপ্নের মুখোশ
নারী সেজে সামনে দাঁড়াবে,
হাত তুলে ডাকবে কামনায়।
ওদিকে ঘুম তার টোপ ফেলে বসে আছে,
গভীরে তার চোখ দেখতে পাচ্ছি।
আমি এখন বড়ো বেশি কান্নাতুর।
তুমি কেন এখনও মিছিল করে যাও
যে সম্মুখে,
সে ইমান বিকিয়ে অভিনেতা হয়ে গেছে কবেই?
দ্বিধাবিভক্ত রাস্তা
তার ফাটলগুলোকে আগলে রাখছে,
সন্তানসম বিষণ্ন জল
সে ফাটল ভরিয়ে দিচ্ছে।
আমার পরমাশ্চর্য মালিক এখন বাজারে দাঁড়িয়ে
হাতে করে তুলে ধরতে চাইছে
অবিক্রীত ফসল।
তার হৃদয়-নিঃসৃত আগুন
ভোগ থেকে, ভক্তি থেকে
তুলে নিচ্ছে আত্মা,
যেখানে একদিন মিলিয়ে যাব ভেবেছিলাম।
লেখক ১৯৮১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন কারখানা ও কয়লাখনির শ্রমিক — শ্রমিকের চোখ দিয়েই দেখেন পৃথিবী। সেই আলোড়নে উঠে আসে তাঁর যাপিত জীবনের কবিতা। লিখেছেন 'ছেদবিন্দু', 'টানেলের মুখে কিছু হায়রোগ্লিফ', 'এক অপরিহার্য রক্তরেখায়', এবং 'অন্ধকারে এক জলস্রোত' নামক কবিতার বই। তাঁর জন্ম দুর্গাপুরে, পড়াশোনা বর্ধমানে। কর্মসূত্রে ঘুরেছেন বোকারো, রাঁচি, হাজারীবাগ। বর্তমানে বার্নপুর ইস্কোতে কর্মরত।
আমিন
সিদ্ধার্থ লাহা
তানুময় মস্ত আমিন!
জরিপ করে সে —
পাহাড়, পাহাড়িয়া নারী।
কোন পাহাড় কত উঁচু,
কোন নদী কত গভীর,
ডুবসাঁতার দেওয়া কি হবে ঠিক!
জাহাজ করবে নোঙ্গর কোন ঘাটে।
কোন জমি কত সমতল,
মফস্বলের মহফিল!
চোখ তার কোন ফুল লাল,
হলুদ ফুল কোথায় করে নাচ।
তানুময় জীবনভর মেপে যায় —
মাঠ নদী পাহাড়,
পাহাড়িয়া নারী।
দিন শেষে অন্ধকার!
বাড়ি ফেরে একাকী আঁধার-ঘরে।
তানুময় মস্ত আমিন,
কভু করে নি জরিপ সে নিজেরে।
জোকার
বিশ্বনাথ বসাক
জোকার দেখলেই হাসে লোকে
এমন কি তার রূপ?
জানেনা না, কি সেই কারণ
সে অবাক, সে নিশ্চুপ।
কত কৌতুক ভরা দৃষ্টি
তার পানে থাকে চেয়ে
নিষ্ঠুর তামাশার তরঙ্গ ওঠে
তার হৃদয় পারদ বেয়ে
জীবন সার্কাসে যেন সে এক
বেরঙিনের অভিরুপ।
কত বঞ্চনার করতালি বাজে
তার সব নীরবতা জুড়ে,
প্রতিদিন যেন তার অস্তিত্ব হারায়
কোন্ সে আস্তাকুঁড়ে।
চেয়েছিল এক বন্ধু আকাশ,
সে তো অলীকের ওপার হারিয়েছে।
শত বিশ্বাস বেলুন ফেরেনি তো আর।
কত ছলনার জীবাশ্ম ওঠে,
তার মনের সমাধি খুঁড়ে।
আজ ক্লান্ত সে
জ্বলতে জ্বলতে একা,
বেনামী ধূপের মত ফ্যাকাশে ধোঁয়ায় উড়ে
অন্তরে হচ্ছে শেষ অবিরত।
কোন সে জলছবি ভাসে
তার ওই বোবা আয়নায়,
নেমেছে কি এই মহীমঞ্চে
সংহীন জোকারের ভূমিকায়?
হয়তো তার শুকনো অশ্রুতে
মরু সাহারা রয়েছে অক্ষত।
বৃষ্টির ওপারে তুমি
ডা. ফারহিন সেহনাজ
আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি —
মেঘলা আকাশের নরম ছায়ায়
শহরটা যেন ধুয়ে-মুছে
আরও একটু মায়াবী হয়ে উঠেছে।
জানালার কাঁচে বৃষ্টির ফোঁটা,
দূরে ভেজা গাছের সারি,
আর বাতাসে মিশে থাকাসেই চেনা মাটির গন্ধ —
সব মিলিয়ে আজ মনটা
অদ্ভুত ভালো লাগায় ভরে আছে।
শুধু এই ভালো লাগার মাঝেও
কোথায় যেন একটু শূন্যতা —
কারণ,
এই বৃষ্টিটা তোমার সঙ্গে দেখার ইচ্ছে ছিল।
তুমি আজ অনেক দূরে,
অথচ কী আশ্চর্য —
এই বৃষ্টির প্রতিটি শব্দে
তোমার কথাই মনে পড়ে।
হয়তো একই মেঘের নিচে
তুমিও কোথাও দাঁড়িয়ে আছো,
তোমার শহরেও হয়তো
ঠিক এই মুহূর্তে বৃষ্টি নামছে —
আর আমার মতোই তুমিও কি একবার
আমায় মনে করছো?
বৃষ্টি থেমে যাবে একদিন,
মেঘ সরে যাবে আকাশ থেকে,
কিন্তু এই দূরত্বটুকু পেরিয়ে
তোমার কাছে পৌঁছোনোর যে ইচ্ছে —
সে তো বৃষ্টির মতোই, অবিরাম।
আজ তাই বৃষ্টি ভালো লাগছে,
ভীষণ ভালো লাগছে —
শুধু তুমি পাশে নেই বলে
এই সুন্দর সকালটাও
একটু বেশি তোমার হয়ে আছে।
পাগল প্রেমিক
অরবিন্দ নাহা
ভোরের আলো ফোঁটার আগে
আলো-আঁধারি রাতে দিগন্ত পেড়িয়ে
আমরা পালাচ্ছিলাম...
পাশাপাশি বসে দু'জন জানালার ধারে।
অবিরাম অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে ঝরে,
বন্ধ জানালার ভাঙা কাঁচের ফাঁক দিয়ে
বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছিল
আমাদের দু'জনকে।
তোমার মাথা আমার ডান কাঁধে,
আমার হাতে বৃষ্টি ভেজা হাত তোমার,
তাতে ছিল উষ্ণতার স্পর্শ —
ছিল ভালোবাসা-ভরসার ইঙ্গিত।
আবেশে বিভোর আমি
দু'চোখের মুগ্ধতা নিয়ে
তোমায় দেখছিলাম বারংবার।
মনে পড়ছিল —
প্রথম যেদিন দেখেছিলাম,
তারপর থেকে নির্দিষ্ট সময়ে
একই জায়গায়
তোমারই প্রতীক্ষায়...
এমনই এক বৃষ্টি ভেজা দিনে
ছাতা ধরে ছিলে তুমি মাথার উপরে।
মৃদু, দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলেছিলে,
"চলুন।"
সেই প্রথম একসাথে চলা —
তারপর থেকে অজস্রবার
পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছি তোমাকে ঘিরে।
কথা ছিল বাঁচবো একসাথে
এবং... একসাথে।
অথচ আজ তুমি আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
এখন বৃষ্টি ভেজা দিনে
দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকি,
ঘরের এক কোণে,দু' হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে।
কেউ কেউ বলে — আমি নাকি পাগল!
তুমি তো সব দেখতে পাও।
আচ্ছা, তুমি বলো —
আমি কি পাগল?!
লেখক জন্মগ্রহণ করেন ৩ জুন, ১৯৫২ সালে। সাহিত্যচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই তাঁর নাট্যকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ। নিজস্ব নাট্যদল "আবিষ্কার"-এর জন্য তিনি ছদ্মনামে নাটক রচনা ও পরিচালনা করেছেন। তাঁর চারটি নাটক আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের "সাহা বুক স্টল" থেকে "বিকর্ণ সেন" ছদ্মনামে তাঁর দশটি নাটকের বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া "এস চক্রবর্তী" প্রকাশনা সংস্থা থেকে তাঁর স্বনামে একটি কবিতার বইও প্রকাশিত হয়েছে। নাটক তাঁর সৃষ্টির প্রধান ক্ষেত্র হলেও, কবিতা তাঁর অন্তরের ভালোবাসা।