১
গড়িয়াহাটের সেই পুরোনো ভাঙাচোরা লেনটা এখন আর আগের মতো ভয়ংকর নেই। ফ্ল্যাট উঠেছে, দোকানঘর জেগেছে, আধুনিকতা এসে মুখটাকে পালিশ করে দিয়েছে। কিন্তু তার ঠিক পাশেই এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা সিঁদুরে রঙের দেওয়াল ঘেঁষে যে খুপরি ঘরটা, সেটাই এখনও সময়কে এক ঘাটে হার মানায়। আর সেখানেই থাকে স্বপন, লোকে যাকে বলে “গালকাটা স্বপন”। বয়সটা তার শরীরে চেপে বসেছে ঠিকই, তবে চোখ দুটো যেন অনেক কথা জমিয়ে রেখেছে — যেন একা বসে বসে সেগুলোকে চুপি চুপি গুনছে।
আগে এই স্বপনের নাম শুনলেই গৃহবধূদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ত, আর বাজারের মুদি দোকানদাররা দু’টাকার মাল দশ টাকায় লিখে দিত। সুদের টাকায় সংসার চলত তার, আর গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে যে কিশোরগুলো র্যাম্বো সাজার স্বপ্ন দেখত, তাদের ভরসার দেবতা ছিলেন স্বপনদা। তবে সময় বড় চতুর — সে ধীরে ধীরে গালকাটা দাগের পাশে একরাশ ক্লান্তি বসিয়ে দিয়ে গেল।
এখন এই স্বপন সকালে ঘুম ভাঙতেই কেটলি বসান, আর চা ঠোঁটে নিয়েই রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত শুনতে বসেন। “বাহ্, আজ আবার ‘মোর রাঙাতে লেগেছে’ দিয়েই শুরু!” — বলে নিজেই হেসে ওঠেন। মোচড় দেওয়া হাসি, মুখের ডানদিকের দাগটাও যেন সঙ্গে সঙ্গে টান মারে।
গলির একেবারে শেষ মাথায় একটা পুরোনো মুদিখানার দোকানে বিকেলবেলা গিয়ে বসেন। আজকাল আর কেউ ভয় পায় না, বরং দোকানদার বলেই, “স্বপনদা, এক কাপ চা দেব? সঙ্গে বিস্কুট, সুদ ছাড়াই!”
এই শুনে স্বপন বলেন, “এখন শুধু চিনিতে সুদ লাগে রে ভাই! ডাক্তার বলেছে — ‘ডায়াবেটিস বেড়েছে’, আর আমি বললাম — ‘ভাই, সুদটা মাফ করে দাও’!”
লোকজনের মধ্যে এখন ওঁর একটা আলাদা গ্রহণযোগ্যতা আছে। এককালে যে হাত ছুরিতে পাকা ছিল, সেই হাত আজকাল কাঁথা সেলাই করে! পাশের পাড়ার এক বিধবা পিসিমার ছেঁড়া শাড়ি জোড়া লাগিয়ে দিয়ে বলেন, “এই কাজ করতে করতে হয়তো পুরোনো পাপও একটু একটু করে সেলাই হয়ে যাবে।”
স্বপনের জীবনের নাটকটা যেন এক অদ্ভুত মোড় নিয়েছে। এখন সে পাড়ার ছেলেমেয়েদের গল্প বলে, নিজের সময়ের লড়াই শোনায়, আর কখনো কখনো হেসে বলে, “তোর বাপ তো আমার থেকে পাঁচ টাকা সুদে ধার নিয়ে প্রেম করেছিল রে!”
ছেলেমেয়েরা হেসে গড়াগড়ি খায় — কেউ ভাবতেও পারে না এই লোকটাই একদিন রাতের আঁধারে শ্যামবাজার পর্যন্ত কাঁপিয়ে রেখেছিল।
২
স্বপন ওই দিন সকালে রেডিওতে “আমার পরান যাহা চায়” শুনছিল আর হাতে একটা আধসেদ্ধ ডিমের গায়ে নুন ছড়াচ্ছিল। এমন সময় চোখ গেল সামনের গলির কোণে — একটা ভাঙাচোরা বারান্দার নিচে একটা ঘর্মাক্ত চেহারা, মাথায় ওড়না বাঁধা, কোমরে গামছা — রেখা। পাড়ার একমাত্র মহিলা টাইলস বসানো মিস্ত্রি। বিধবা। কাঁধে দশ বছরের ছেলে রনো, স্কুলব্যাগ ঝোলানো; মায়ের কাজ দেখতে দেখতে মুখে ধুলো মেখে সেদিনের হোমওয়ার্কে কষে লাইন টানছে।
রেখাকে ও তো আগেও দেখেছে, কিন্তু এভাবে কখনও চোখ আটকে যায়নি। গালে ঘাম, হাতে দস্তানা, পায়ের পাতা ধুলোর মাঝে সাদা সিমেন্টে ডোবানো — তবু চোখেমুখে একরকম গর্বের ছাপ। গায়ের জোরে আর গলার টানে কত পুরুষ মিস্ত্রিকে হার মানায়। পাশের বাড়ির মুরগিওলা হরিদাস বলে, “রেখা না থাকলে বাথরুমের কাজ এখনও অপূর্ণ থাকত!”
স্বপনের মনে হলো, এ পাড়ায় মানুষ গাছ লাগায় না, শুধু ছায়া চায়। রেখার মতো একজন দিনরাত খেটে যায়, অথচ কেউ বলে না — “এক গেলাস জল খাবেন?” বা “দিদি, রনোর স্কুলের খরচ কেমন চলছে?”
চা-টা ঠান্ডা হয়ে গেছিল ততক্ষণে। স্বপন দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। একটু ইতস্তত করে বলল, “এই যে শুনুন, দুপুরে একটু বিরতি নেবেন তো? আমার বাড়ির উঠোনে একটা ছায়া আছে, গামছা বিছিয়ে রাখব, আপনার ছেলেটাও একটু বিশ্রাম নিক।”
রেখা মুখ তুলে তাকাল। এক মুহূর্ত যেন সময় থেমে গেল। তারপরে একচিলতে হাসি — চোখে জল নেই, কিন্তু কৃতজ্ঞতার একটা মৃদু ঝিলিক।
রনো তখন টুক করে বলে ফেলল, “কাকা, আপনাদের বাড়িতে কি বই আছে? আমি গল্পের বই পড়তে ভালোবাসি।”
স্বপন হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, “আছে রে বাপু, তোকে ফেলুদা পড়াব, আর তোর মাকে লেবুজল দেব। ব্যস, সেটাই আমার ইনভেস্টমেন্ট। সুদ চাই না।”
সেই দিনের পরে, স্বপনের উঠোনে দুপুরবেলা একটা ছায়া পড়ে — তাতে কাঁথা বিছানো থাকে, একটা গ্লাসে লেবুজল, আর পাশে একটা পুরোনো গল্পের বই খোলা। রেখা আর রনো যেন হয়ে উঠেছে সেই লেনটার নতুন গল্প — যেখানে দাগও আছে, কিন্তু তার নিচে পলিমাটির মতো ভালোবাসাও।
৩
স্বপনের অতীতের জন্য এলাকার মানুষ আজও তাকে ভয় পায়। যদিও গত তিন বছর সে গলির মোড়ে বসে চা খায় আর পাখিদের খাবার দেয়, তবুও তাকে কেউ সহজে “মানুষ” ভেবে উঠতে পারে না।
গড়িয়াহাটের গলিটা সন্ধ্যার দিকে বড়ো নিঃসঙ্গ লাগে — বাতিগুলো হলুদ আলো ছড়ায় ঠিকই, কিন্তু যেন তার গভীরে জমে থাকে অনেক না-বলা কথা। সেইরকম এক সন্ধ্যায় স্বপনের চোখে পড়ে — রনো, রেখার ছেলে, পিচঢালা রাস্তায় হাঁটু ছড়ে পড়ে গেছে। পাজামার হাঁটুর কাছে কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, আর ছেলেটা ফুঁপিয়ে কাঁদছে।
চারপাশে লোক আছে ঠিকই — মোবাইল স্ক্রল করতে করতে হাঁটছে, কেউ কেউ মুখ ফিরিয়ে কুকুরকে বিস্কুট দিচ্ছে, কিন্তু ছোট্ট রনোকে কেউ তোলে না। স্বপনের ছায়া তখন দূর থেকে এগিয়ে আসছে, যেন তার সেই পুরোনো নামটাই সবাইকে চুপ করিয়ে রেখেছে — “গালকাটা স্বপন”। লোকে দাঁড়িয়ে থাকে, কেউ কিছু বলে না, কেউ চোখে চোখ রাখে না; কিন্তু স্বপন তখন ব্যস্ত — সে ছুটে গিয়ে রনোকে কোলে তুলে নেয়, বলেই, “আরে ব্যাটা, এত মাটির বন্ধু করলি কবে?”
রনো কিছু বলতে পারে না, শুধু কাঁদতে কাঁদতে স্বপনের কাঁধে মাথা রাখে। গা থেকে ঘামের গন্ধ, পুরোনো গলির ধুলো, আর কিছুটা নিরাপত্তার হাওয়া।
সেদিন রাতেই রেখা প্রথমে একটু কুণ্ঠিত মুখে স্বপনের বাড়িতে আসে — ধন্যবাদ বলতে নয়, বরং কিছু বলেই ফেললে যদি কিছু মনে না করে, সেই ভয়ে। কিন্তু স্বপনের চোখে তখন ঠান্ডা আলো।
সে বলে, “তোমার ছেলেটা একদম বাঘ, একবার কাঁদলেও পরে আবার হেসে দিয়েছে। তুমি যদি চাও, আমি এক শিক্ষককে চিনি — আমার ছোটবেলায় মার খেয়েও যার কাছে পড়তাম — তাকে বলি?”
রেখার মুখে কিছু কথা আটকে যায়। নরম গলায় শুধু বলে, “আপনি থাকলে, ভয় কম লাগে।”
৪
একটা দাগেরও ইতিহাস থাকে, সেটা কেবল দাগের মালিক জানে — এমনই এক রক্তমাখা সন্ধ্যায় স্বপনের গালে ছুরির দাগ পড়েছিল। বন্ধুর প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সে, কিন্তু পুলিশ এসে যাকে ধরেছিল, সে-ই স্বপন। তখন কেউ প্রশ্ন করেনি, কেউ শুনতে চায়নি; এমনকি যার জন্য কাটা দাগটা — সেও গা ঢাকা দিয়েছিল।
স্বপন তখন থেকে নিজেকে সমাজের বাইরে ফেলেই রেখেছিল। চায়ের কাপে চিনি কম দিত, যেন জীবনের স্বাদটাই কম খাওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়েছে। দোকানিরা সম্মান করত ঠিকই, কিন্তু দূরত্বটা বজায় রেখেই। “গালকাটা লোকটা” — এই নামেই পরিচিতি, যেন আর কোনো নাম তার প্রাপ্য নয়।
এলাকার স্কুলে এক অভিভাবক সভা বসেছিল। আলোচনার মূল বিষয় ছিল — “পাড়ার পরিবেশের প্রভাব শিশুর মনে কেমন পড়ে।” সভায় হঠাৎ এক অভিভাবক বলে উঠল, “ওই স্বপন নামে এক লোক আছে, সাবধান থাকবেন সবাই। এমন লোকের আশেপাশে ছেলেমেয়ে থাকলে শিক্ষা তো দূর, চরিত্রও হারিয়ে যাবে।”
কথাটা তিরের মতো গিয়ে বিঁধল স্বপনের বুকে। সে পাশে দাঁড়িয়েছিল, ঝোলানো জানালার ছায়ায়। চোখে জল চলে এল, কিন্তু মুখে কথা এল না। শুধু চুপচাপ পেছন ঘুরে ধীর পায়ে হাঁটা শুরু করল, যেন পুরোনো দাগটা আজ নতুন করে পুড়ল।
ঠিক তখনই একটানা চুপ থাকা রেখা উঠে দাঁড়াল। কণ্ঠস্বর থমথমে, চোখে নির্ভীক আগুন। সে বলে, “অভিযোগ যার, প্রমাণ তাকেই করতে হয়। আমি জানি স্বপনদা কে। আমার ছেলের স্কুলে ভর্তির দিন থেকে আজ অবধি আমি ওঁর মতো মানুষ দেখিনি। আপনি যদি আপনার সন্তানকে মানুষের সংস্পর্শে রাখতে চান, তাহলে স্বপনের থেকে ভালো কেউ নেই।”
ঘরে তখন পিন পড়লেও শব্দ শোনা যেত। কেউ কিছু বলল না। হয়তো কারও বলার ছিল না, হয়তো সাহসের অভাব, বা হয়তো লজ্জা।
সেই একটা বাক্য, “আমি জানি স্বপনদা কে” — শুধু স্বপনের কানেই নয়, তার মনের দাগের গহীনে গিয়ে বেজে উঠল। যেন পুরোনো জীবনের একটা তালা খুলে গেল, ভেতর থেকে একটু আলো বেরোতে শুরু করল।
সেই দিন রাতে স্বপন আকাশের দিকে তাকিয়ে রনোকে বলে, “আকাশে যত তারা আছে রে ভাই, তার একটার নাম রেখা রাখলে কেমন হয়? আলো তো দেয় ঠিক সময়ে।”
রনো হেসে বলে, “আর আমার নামের তারা?”
স্বপন কাঁধে হাত রেখে বলে, “তুই তো চাঁদ রে। আলো ধার নিস না, নিজেই উজ্জ্বল।”
৫
২৫ ডিসেম্বরের সন্ধেটা অন্য বছরের মতোই শুরু হয়েছিল — মহল্লার ক্লাবের আলো-ঝলমলে চত্বর, উল্টোদিকের ফুচকার দোকানে লাইন, আর মঞ্চে কেউ ‘জিঙ্গল বেল’ গাইছে রিদমিক তালে। বাচ্চারা ঘোরাঘুরি করছে, কেউ কাউকে সান্তা সাজিয়ে ছবি তুলছে। হঠাৎ ঠিক এমন সময়েই বিকট আওয়াজে একটা বাজি ফাটল, আর সঙ্গে সঙ্গে এক কোণে ভেঙে পড়ল ছোট্ট একটা মেয়ে — দুই হাতে কান চেপে ধরে কাঁদছে সে, চোখে ভয়ের আঁচড়।
চারপাশে লোকজন জমল, অনেকে বলে উঠল — “কে বাজি ফাটাল?” “এটা তো বাচ্চাদের জায়গা!” কেউ মোবাইল অন করল, কেউ ঠোঁট বাঁকাল, কিন্তু কেউ মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল না।
হাসপাতালে পৌঁছে নিজেই নার্স ডেকে মেয়েটার কানে ব্যান্ডেজ করাল, চোখে ড্রপ দিল। সে কিছু বলেনি, শুধু হাতে ধরে ছিল মেয়েটার ছোট্ট আঙুলটা — আঁকড়ে ধরা সেই ভয়।
পরদিন সকালে পাড়ায় ভিডিও ভাইরাল। ক্লাবের কেউ একজন তুলেছিল — ‘গালকাটা স্বপন বাঁচাল শিশুকে’। লোকের মুখে মুখে — “ভাবা যায়!” “ওই যে, আগের সুদখোর লোকটা এখন সমাজসেবী?” “নাটক করছে না তো?”
কেউ স্যালুট দিল, কেউ সন্দেহ করল, কেউ হাসল, কেউ পিঠ চাপড়াল।
স্বপন কিছু বলল না, কোনো প্রেসে গেল না, ভিডিওটা শেয়ার করল না। শুধু হাসপাতালের রেজিস্টারে মেয়েটার নাম আর কেবিন নম্বরটা দেখে রাখল। রাতে একবার ফোন করল, “বাচ্চার এখন কেমন?”
ওপাশ থেকে কণ্ঠস্বর, “ভালো আছে, আপনার জন্যই...”
ঠিক সেই রাতেই রেখা এল, চুপচাপ। হাতে একটা পাটের ব্যাগ, ভেতর থেকে বের করল একটা গরম সোয়েটার — সবুজের মাঝে লাল পাড়।
স্বপনের দিকে না তাকিয়ে বলল, “এইটা রনোর বাবার জন্য বুনেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর দেওয়া হয়নি। এখন তোমারই প্রাপ্য মনে হলো।”
স্বপন একটু থমকে গেল। কিছু বলল না, কিন্তু সোয়েটারটা হাতে নিল — যেন সেই উষ্ণতার ভেতর আরেকটা জীবনের নিঃশব্দ অনুরাগ ঢুকে গেল।
ওর গালের পুরোনো দাগটার পাশে যেন নতুন একটা রেখা তৈরি হলো — এবার আর কাটা নয়, একটা নরম ছোঁয়ার রেখা।
৬
গড়িয়াহাটের সেই পুরোনো গলিটা এখন আর আগের মতো ভাঙাচোরা নয়। ইটের ফাঁকগুলোয় আগাছা কম, আর মানুষের মুখে ‘গালকাটা’ শব্দটার বদলে এখন একটা নতুন নাম ঘোরে — “স্বপনদা।” মোড়ের মাথায় একটা ছোট্ট টিনের ছাউনি দেওয়া দোকান, কাঠের বেঞ্চ, ধোঁয়া ওঠা কেটলি আর টুলে বসে থাকা দু’চারজন আড্ডাপ্রেমী। দোকানের নাম — “স্বপনদার টি-স্টলে ভালোবাসার চা”।
ওখানে এখন আর শুধু চা নয়, ভরসাও মেলে। টেবিলের কোণে একটা নোটবুক — যেখানে কেউ লিখে রেখে যায়, “আজকের জন্য একটা বাড়তি বিস্কুট দিয়েছিলেন, স্বপনদা, ধন্যবাদ।” পাশে কখনও রাখা থাকে কয়েকটা গল্পের বই, পুরোনো বাংলা পত্রিকা, আর একটা প্লাস্টিকের ডালা — সেখানে থাকে রনোর আঁকা ছবিগুলো।
রেখা মাঝে মাঝে এসে চায়ের কাপ ধুয়ে দেয়, কেটলি নামায়, আবার হাসিমুখে বলে, “চিনি একটু কম হলে কিন্তু মিষ্টি বেশি টের পাওয়া যায়।” ওর কথা শুনে কেউ আর তর্ক করে না, কারণ এই দোকানের চায়ের সঙ্গে মেশানো থাকে আরও কিছু — সময়ের ভাঙা অভিমান আর চুপ করে ভালোবাসার একটা ঈষৎ উষ্ণ স্পর্শ।
বছরে একবার হয় “স্নেহ উৎসব” — এই পাড়ার নতুন গর্ব। ক্লাবের মাঠে ছোট ছোট শিশুদের জন্য নতুন জামা, বই, রংতুলি বিতরণ করা হয়। উদ্যোক্তা স্বপন আর রেখা। কেউ কখনও তাদের নামে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি, কিন্তু সেদিন যারা লাইনে দাঁড়িয়ে একটা জামা পায়, তারা জানে — এই লোকটাই আসল।
সেই বছর অনুষ্ঠান শেষে পাশের থানার ওসি এসে নিজে হাত বাড়িয়ে বলল, “আপনার মতো লোক পাড়ায় থাকলে আর কিছু চাই না।” স্বপন চোখ নামিয়ে মৃদু হেসে বলল, “আমি শুধু ভুলগুলো ঠিক করতে চাইছি, আর কিছু না।”
আলো নিভে আসা ক্লাবের আলোয় সেদিন মোড়ের চায়ের স্টলটা একটু বেশি উজ্জ্বল দেখায়। আর তার গায়ে ঝোলানো ছোট্ট একটা পোস্টার — “যদি কেউ মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমরা তাকে ফিরে তাকাতে শিখিয়ে দিই।”
৭
একটা ভোরের আগে-পরে, যখন গড়িয়াহাটের গলিগুলো ঘুমিয়ে থাকে আর কাকেরা কেবলমাত্র তাদের পালা শুরু করে, স্বপন চুপচাপ এসে একটা চিঠি গুঁজে দেয় রেখার দরজার ফাঁকে। তার কাঁধে পুরোনো সোয়েটার, চোখে একটা আলগা দ্বিধা। চিঠিটার ভাঁজ অনেকবার খোলা-বন্ধ হয়েছে, কালি কিছুটা ছড়িয়ে গেছে, কিন্তু কথাগুলো একেবারে সোজাসাপটা — “তুমি চাও না বললে, আমি কোনো দিন কিছু বলব না। শুধু জানি, তোমার চোখে আমি প্রথম মানুষ হয়েছিলাম।”
রেখা দরজা খুলে কাউকে দেখতে পায় না, কে রেখে গেছে; কিন্তু হাতের ছাপ, কাগজের গন্ধ, শব্দের ওজন — সবই চেনা। চিঠিটা হাতে নিয়ে প্রথমে সে একটু হেসে ফেলে, তারপর আর চোখের জলটা আটকে রাখতে পারে না। রান্নাঘরে গিয়ে চালের কৌটো খুলে, আজ অজান্তেই দু’মুঠো বেশি চাল ফেলে দেয় হাঁড়িতে। কী জানি, হয়তো আজ বাড়ির মানুষ একজন বাড়বে — হয়তো নয়ও। কিন্তু রান্নার ছন্দে একটা ছোট্ট বদল ঘটে যায়।
লেখক ২২ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৫৫ সালে দমদম রবীন্দ্রনগরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতার একজন পরিচিত সাহিত্যিক, কবি ও প্রাবন্ধিক। মধ্যবিত্ত সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের সূক্ষ্ম সমীকরণ এবং সামাজিক বাস্তবতার নানা অসঙ্গতি তাঁর লেখার মূল উপজীব্য। ছোটগল্প ও মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান রচনায় বিশেষভাবে সক্রিয় এবং নিয়মিত সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘নবুর কলমে’ (২০২৫) ও ‘মা-কে বড্ড মনে পড়ে’ পাঠকমহলে সমাদৃত হয়েছে।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।