“হাই, আমি সুনীত। আমি কিছু বলতে চাই, মানে আমি নিজেকে প্রকাশ করতে চাই।” আমি মরিয়া হয়ে বলে উঠি।
“হ্যাঁ, তো প্রকাশ করুন না, কে বাগড়া দিয়েছে?” — বলে পত্রিকা অফিসের সেই কর্মী ভদ্রলোক নিজের কাজে মন দিলেন কিছুটা ব্যাজার মুখে।
“না মানে... আমি গল্প লিখেছি, সেটা আপনাদের যে পাক্ষিক পত্রিকা, সেখানে...”
“ধ্যার মশাই, রাঘব বোয়ালদের গল্প, কবিতা ছেপে দশ হাজার কপি বিক্রি হচ্ছে না, আর আপনি এসেছেন! বলি, কে চেনে আপনাকে?”
একটু থেমে বললেন, “তাছাড়া আপনার লেখা কেন পড়বে? আপনি কি শরৎচন্দ্র না শৈলজানন্দ?”
“ছিঃ ছিঃ, তা কেন? ওনারা নমস্য ব্যক্তি। রাঘব বোয়ালদের জায়গা দিয়েও তো আরও কিছু লেখা আপনাদের ছাপতে হয়। মানে...”
“মানে-মালে কেটে পড়ুন। অফিস খোলার সঙ্গে সঙ্গে উটকো ঝামেলা। সোশ্যাল মিডিয়া আছে, আপনার ফেসবুক আছে, সেখানে লিখুন না মশাই।”
“দেখুন, সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক এগুলোর কথা শুনতে পাই বটে, তবে আমি তো ফোন ব্যবহার করি না। তাছাড়া আমার সেই সামর্থ্যও নেই।” — বলে আমি লজ্জা আর অপরাধবোধে মাথা নিচু করলাম।
“এই দাঁড়ান, দাঁড়ান। তো, আপনি আসছেন কোথা থেকে বলুন তো? কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ আসছে। আপনি কী কোনো ভিখারি, বস্তি থেকে উঠে আসছেন না তো?”
“আপনি যথার্থই বলেছেন।”
“তার মানে? আপনি...”
“হ্যাঁ, আমি এতকাল তালপুকুর বস্তিতেই থাকতাম, ভিক্ষাও করেছি, তবে কিনা...”
“ব্যস ব্যস... এক মিনিট!” — বলে তিনি উত্তেজনায় বেল বাজালেন। অফিসের একজন পিয়ন এলে তাকে বললেন, “একবার এ ঘরে একটু রুম ফ্রেশনারটা দিয়ে যাবে, আর...” — বলে আমার দিকে তাকালেন, চোখের একরকম ভঙ্গি করে বললেন, “চা না কফি? কিছু নোনতা আনাই, নাকি মিষ্টি?”
আমি হাঁ করে আছি, কিছু না বুঝতে পেরে। তিনি আমার মতামতের অপেক্ষা না করে চা আর কিছু নোনতা আনতে বললেন।
পিয়ন চলে গেল।
প্রতিভা থাকলে, নিজের মধ্যে মালমশলা থাকলে একদিন ঠিকই হবে। সত্যজিৎ কত পরে কলম তুলে নিয়েছেন বলুন, আর এই অনীক দত্ত, প্রদীপ সরকার — আরে, যিনি ‘পরিণীতা’ বানিয়ে ছিলেন বিদ্যা বালানকে নিয়ে। কত বছর বয়সে ফিল্মের ডিরেক্টর হলেন বলুন! যাক সে সব কথা।” — বলে আমার মুখ আরও ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন।
তারপর বললেন, “আপনার কী নাম বললেন, সু...”
আমি তাঁর আচরণে একটু অবাক হয়েই বললাম, “সুনীত ঘটক।”
“কিছু মনে করবেন না, মানে আমিই এ অফিসের... মালিক আমাকেই ভরসা করে দায়িত্ব দিয়েছেন তো। ফ্র্যাঙ্কলি স্পিকিং... আপনার কথা শুনে আমার লেখক জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কথা মনে পড়ে গেল। শুনেছিলাম, তাঁর ‘বারো ঘর এক উঠোন’ উপন্যাসের জন্য নাকি তিনি কয়েক মাস না বছর বস্তিতে কাটিয়েছিলেন। আপনার নামটাও যেমন শোনা শোনা ঠেকছে...”
“সেকথা মনে থাকার কথাও না।” — আমি নির্লিপ্তভাবে বললাম, “জীবনে একটা উপন্যাসই তো লিখেছিলাম — ‘হারিয়ে যেও না, মমতা’। উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তিবিশেষের নামে কিছু মিল থাকায় অনেক হইচই হয়েছিল, সেই হাইপে অনেক বইও কাটতি হয়েছিল।”
কোনো এক অখ্যাত পুরস্কারও দেওয়া হয়েছিল লেখককে। অনেক প্রকাশক ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেই লেখকের পরের উপন্যাসের জন্য। তারপর হঠাৎই একদিন শোনা গেল, সেই লেখক অদৃশ্য হয়ে গেছেন। সে নিয়ে পত্রিকায় লেখালিখি কম হয়নি। সব মনে পড়ে গেল পত্রিকা অফিসের জ্ঞানেশবাবুর।
তিনি নিজের ভেতরকার উত্তেজনা দমন করে বললেন, “আরে, আপনিই সেই... সে তো প্রায় তিরিশ-বত্রিশ বছর আগের ঘটনা। তখন এত মিডিয়াও ছিল না, না হলে হয়তো আপনার ছবি দেখলে মনে থাকত।”
“মা যেমন শিশুকে জন্ম না দিয়ে পারে না, স্রষ্টাও তেমনি সৃষ্টির প্রসবযন্ত্রণা নিয়ে অপেক্ষা করে, কেউ তাকে সুযোগ দেবে।” আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।
এর মধ্যে চা, কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে একজন হাজির হলো। আমি তা থেকে শুধু চায়ের কাপটুকু নিলাম। এর মধ্যে আমার থেকে গল্পের পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে এক নিশ্বাসে কয়েক পৃষ্ঠা পড়েও ফেললেন। মাঝে মাঝে চায়ে চুমুকের ফাঁকে আমার চোখ পড়েছিল তাঁর মুখের ওপর। তাঁর চোখ দুটো চকচক করছিল, কী এক অপার্থিব আনন্দে মুখখানি ভরে উঠছিল।
জ্ঞানেশবাবু টেবিলে একটা হালকা তুড়ি মেরে বললেন, “কী ব্রাভো! চমৎকার! ঘটকবাবু, প্লিজ এটাকে গল্প না রেখে একটা উপন্যাস বা সিরিজ লিখুন। বিশ্বসাহিত্যে এ জিনিস বিরল।”
তারপর একেবারে লেখার শেষে চোখ পড়তেই বললেন, “কিন্তু এ কী! লেখকের নাম দিয়েছেন স্বপন প্রামাণিক! এ কে? এটা কী আপনার ছদ্মনাম? না, না, আমরা আপনার স্বনামেই এ লেখা ছাপব কিন্তু! যা সেনসেশন হবে না! এবার আমার গুপ্ত পাবলিশার্স আর গুপ্ত থাকবে না। ওহ! ভাবতেই যা রোমাঞ্চ হচ্ছে...”
আমি বললাম, “তা তো হওয়ার নয়, আপনাকে ওই নামেই ছাপতে হবে।”
জ্ঞানেশবাবু ফাঁপড়ে পড়েন। বলেন, “এটা কী আপনার ছদ্মনাম? মানে আপনার ছদ্মনাম হিসাবে ব্যবহার করা যাবে, তবে এখনই...”
আমি ধীরে ধীরে গল্পের পাণ্ডুলিপিটা তুলে নিলাম।
তা দেখে জ্ঞানেশবাবু বললেন, “দেখুন, টাকা-পয়সা নিয়ে সমস্যা হবে না। বোঝেনই তো, মানুষ প্রথমে নামটা খায়, পরে গল্পটা।”
জ্ঞানেশবাবু মাথা নাড়েন।
আমি নমস্কার করে বেরিয়ে এলাম। তালপুকুর বস্তির দিকে ধীরে ধীরে পা ফেলে এগোতে লাগলাম।
জানি, ‘নাম না থাকলেও গল্প বেঁচে থাকে।’
লেখক জন্মগ্রহণ করেন ২৮ ডিসেম্বর, ১৯৭২ সালে। ১৯৯৩ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে রুরাল ডেভেলপমেন্ট, সমাজতত্ত্ব ও ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। ২০২৪ সালে নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ক্যুইজে দুবার জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর লেখালেখির শুরু; লেখা প্রকাশিত হয়েছে স্কুল পত্রিকা ও বিভিন্ন স্থানীয় লিটল ম্যাগাজিনে। বর্তমানে নিজগৃহে শিক্ষকতা করেন। অবসর কাটে পড়াশোনা ও লেখালেখির সঙ্গেই।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।