“আরতি দ্যাখো, টেবিলে কাজুবাদাম, পোস্ত, আদা কুচানো, পেঁয়াজ কুচি, রসুন সব গুছিয়ে রেখেছি, ভালো করে মিক্সিতে পিষে দাও। তার আগে ফ্রিজ থেকে টকদইটা বের করে রাখো।”
দুপুরে খাওয়ার টমেটো, পেঁপে দিয়ে মুসুরির ডালে কালোজিরে ফোড়ন দিতে দিতে ঘাড়টা একটু নাড়ে আরতি, ওড়নাটা কাঁধে গুছিয়ে নেয়।
“মশলাটা ভালো করে পিষে টকদইয়ের মধ্যে মিশিয়ে আমাকে দিও, মাটনটাতে আমি মশলা মাখাব। তুমি পারবে না।”
ডালটাকে এবার পাত্রে নামিয়ে রাখে আরতি। বৌদির সেই এক কথা — তুমি পারবে না। কাজরী বৌদি যে এসব কথা কেন শোনায়! ওদের গরিবঘরে শৌখিন রান্নার চল নেই, বৌদিরা যেরকমভাবে রোজের রান্না খায়, সেরকম রান্নাও ওরা চেখে দেখেনি। তবে হুল-বেঁধানো কথাগুলো হজম করা ছাড়া সত্যি কিছু করার নেই, তিন হাজার টাকা মাস গেলে হাতে পায় এখানে।
মিক্সির আওয়াজ ছাপিয়ে হলঘর থেকে কানে আসছে দাদা আর বাচ্চাদের হুল্লোড়ের শব্দ। আজ দাদা-বৌদির পনেরো বছরের বিবাহবার্ষিকী। এসে থেকে বৌদি আর বৌদির শাশুড়ির মুখে শুনছে পনেরো বছর আগের সেই সন্ধ্যায় কলকাতা ভাসানো বৃষ্টির গল্প। আজও আকাশে কালোপানা মেঘ থমকে আছে, যেকোনো মুহূর্তে ঢালবে। আরতি মশলাগুলো দইতে মেশাতে মেশাতে অস্ফুটে বলে, “আজ যেন বৃষ্টি না হয় ঠাকুর, বেচারাদের সব আনন্দ মাটি হবে।”
আরতিদের জীবনে শুধু বিয়েটাই আছে। সবাই মিলে হৈচৈ, আনন্দ কী জিনিস, এ জন্মে তো শেখা হলো না।
“আরতি, এক কাপ চা দেবে প্লিজ?”
দাদা এত সুন্দর করে কথা বলেন, আরতির খুব ভালো লাগে। ওর বাপ, বর, ভাসুরদের পাশে কত অন্যরকমের পুরুষ দাদা। মশলার বাটিটা বৌদির হাতে দিয়ে চায়ের জলটা গরম করতে দেয়। চা-টা দিয়ে এসে টমেটো-ড্রাই ফ্রুটসের চাটনিটা ফ্রিজে ঢোকায় আরতি। জেলির মতো এই চাটনি ঠান্ডা না হলে বৌদি বকবে। আরতি এখন মনোযোগী কর্মী, দাদার সামনে বৌদির হুল-বেঁধা কথা ও শুনতে চায় না।
রান্নাঘর থেকে চোখে পড়ে, দাদা গোটা হলঘরটাকে ফুল, রঙিন শিকলি আর বেলুন দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছে। মাসিমা আজ আর দুপুরে ঘুমাননি, একটা ফুলদানিতে কিছু গোলাপ, লম্বা লম্বা ডাঁটিওয়ালা হলুদ-কমলা রঙের ফুল সাজাচ্ছেন। কোথায় রাখবে কে জানে? আরতির ধারণা ছিল, বিয়েতেই ফুল লাগে। ভাগ্যিস শহরে এসেছিল।
কাজুবাদাম, কিশমিশগুলো ঘিয়ে ভাজতে গিয়ে নিজের খেয়ালেই ডুবে যায় আরতি।
“আরে, এগুলো পুড়িয়ে ফেলছ তো! উফফ, তোমাকে শিখিয়েছিলাম না বাসন্তী পোলাও করতে, এর মধ্যেই ভুলে গেলে! এই না কাজে লাগার সময় বললে তুমি রান্না জানো।”
গোবিন্দভোগ চালটা কড়াইতে নাড়াচাড়া করতে করতে মনে হয়, এইরকম সুগন্ধে ভরা যদি জীবনটা হতো! সেই কোন ছোটবেলা থেকে খেটে যাচ্ছে। ক্লাস ফোর অবধি পড়াশোনা করে ইস্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো। আরও একটু বড় হতে শুরু হলো বাপের সঙ্গে মাঠের কাজে যাওয়া। তারপর আলু-ভেন্ডি-আগাছা-পোকার খেয়াল রাখতে রাখতে কখন যেন বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। এক গরিববাড়ি থেকে আরেক গরিব, খেটে খাওয়া বাড়ি। জায়গাটা পাল্টেছে, আরতির কপাল না। সুন্দরী, বড়লোকের মেয়ে-বৌ কাজরী বৌদি আর বুঝবে কী!
বাসন্তী পোলাও শেষের পথে, ভালো করে এবার ঘিটা দেবে। এই ঘি বৌদির শাশুড়ির করা। কালচে তরলটার কী সুবাস! মেসোমশাই বাড়ির ঘি ছাড়া খায় না। হবেই তো, ওদের তো সবকিছুর মধ্যেই সুবাস। আরতিদের মতো ঘেমো গুমোট গন্ধ নেই।
বৌদির আর তর সইছে না। আগেভাগে এসে গ্যাসে আরেকটা কড়াই বসিয়ে দিয়ে আরতিকে বলল, “সাদা তেলে করবে রান্নাটা বুঝলে, তেল গরম হলে গোটা মশলা আর কাটা পেঁয়াজগুলো দেবে। তোমার মনে আছে তো কীভাবে শিখিয়েছিলাম? আজ তোমার পরীক্ষা। দেখো, লোকে খেয়ে যেন নিন্দে না করে।”
একটু ভয় ধরিয়ে দিয়ে বৌদি হলঘরের দিকে চলল কুশন কভারগুলো পাল্টাতে। এই বাড়িতে মাস ছয়েকের বেশিই হলো কাজে লেগেছে। সাত বছরের মেয়েটাকে মেজো জা, শাশুড়ি আর ছোট ননদের কাছে রেখে শহরে বছরখানেক আগে বরের সঙ্গে চলে এসেছে। আগে থেকে পঞ্চাননতলার বস্তিতে বড়জা আর ভাসুর থাকে। বড়জাও ভালোই কামায়, ভাসুর একটা কারখানায় কাজ করে। বছর সাতেক হলো এখানে আছে। আরতির বরও এখন ভাসুরের সঙ্গে কাজে যায়, বড়জা আরতিকে ওর কাজগুলো জুটিয়ে দিয়েছে। বড়জা বলেছিল, “রান্নার কাজে বেশি টাকা। তাই দুটো রান্নার কাজ নিয়েছি, ঘর মোছার কাজ ওই একটা। তুইও আমার মতো রান্নার কাজই কর।”
আরতির রান্না বলতে তো ডাল, গেঁড়ি-গুগলির ঝোল কি মাছের একটা যেমন-তেমন ঝোল। শ্বশুরবাড়িতে আরতি বাদে সবাই মোটামুটি রান্না করতে পারে। তাই কাজের বাড়িতে রান্নার কথা শুনে আরতির ঘুম ছুটে গিয়েছিল। বড়জা বুদ্ধি দিয়েছিল, “চোখ-কান খোলা রাখবি আর সব সময় বৌদি কি মাসিমাকে ওরা কীভাবে খায় কায়দা করে জেনে নিয়ে রান্না করে যাবি। ব্যস।”
সে যাক, এবার কড়াইতে মশলা মাখানো মাংসটা আরতি খুব সাবধানে ঢেলে দেয়।
“আরতি, গ্যাসের আগুনটা কমিয়ে ঢাকা দিয়ে দাও কড়াইটাতে। ধীরে ধীরে হতে থাকুক ওটা।” হলঘরের সোফায় বসে ফোন দেখতে দেখতে বলে বৌদি।
উফফ, এতক্ষণ টানা দাঁড়িয়ে থেকে পা দুটো গেছে, বসলে হয়।
“ও আরতি, বৃষ্টি নামল গো, জামাকাপড়গুলো ব্যালকনি থেকে তুলে নাও না গো।” মাসিমাও সোফায় শুয়ে পড়েছেন। আরতির আর বসা হয় না।
চারতলার খোলা ব্যালকনি থেকে অনেকটা আকাশ দেখা যায়। শ্রাবণের বৃষ্টি সোজা তীব্র বেগে মাটিতে আছড়ে পড়ছে। গ্রামে থাকার সময় আরতি মাঠ, বাইরের কাজগুলোই করত। খোলামেলা থাকতে থাকতে এখন ওই বস্তির এক কামরার ঘরে থাকতে দম বন্ধ হয়ে যায়। উপায় নেই ফিরে যাওয়ার। এত বড় পরিবার মাঠ আর ইটভাটার রোজগারের ভরসায় টানা অসম্ভব হয়ে উঠছিল। অন্য কাজের বাড়ি থেকে কাজরী বৌদিদের এই খোলামেলা ফ্ল্যাটে কাজ করতে বড্ড ভালো লাগে। কায়দার রান্নাঘর, বাসনপত্রের মধ্যে নিজের ওই একফালি ঘরের মধ্যে কোনোমতে আঁটানো রান্নাঘরে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে কাজ করার বিরক্তিকে ভুলেই যায়। আহ্, এখানে দাঁড়িয়ে সত্যিই ভালো লাগছে...
“আরতি দ্যাখো, মাটনটায় বোধহয় পোড়া লাগল।” বৌদি ফোনটা সোফায় ছুড়ে দিয়ে দৌড়ে যায় রান্নাঘরে। আরতিও দৌড়ায়। ইসস, খেয়ালই ছিল না রান্নাটার কথা।
“মন কোথায় থাকে বল তো? এটা যদি পুড়ে যেত! এতগুলো টাকার জিনিস বরবাদ, আর ‘গেস্ট’-দেরই বা কী খাওয়াতাম?” কী অসম্ভব বিরক্ত বৌদি। আরতির খুব লজ্জা লাগে। এই ভুলের জন্য যদি কাজটা চলে যেত... তিন হাজার টাকা মাস গেলে।
“যাও, প্রেশার কুকারটা নিয়ে এসো, আমি ভালো করে উল্টেপাল্টে নেড়ে দিয়েছি। মাটন নরম হয়ে গেছে, চারটে সিটি দেবে কুকারের।”
চারটে সিটি শেষ। আরতি গ্যাসটা বন্ধ করে খাবারের থালাটা রান্নার স্ল্যাবের ওপর রাখে। এমনিতে ও কোনো কাজের বাড়িতে খায় না বা খাবার বাড়িতে নিয়ে যায় না। মাইনের বিনিময়ে কাজ, খাবার নিয়ে যেতে কেমন যেন অসম্মান লাগে। তবে আজ ব্যতিক্রম। অনেকটা সময় এখানে থাকতে হবে, তাই দুপুরের খাওয়াটা এখানেই খেতে বলেছিল বৌদি। সেই মুসুরির ডাল পেঁপে-টমেটো দিয়ে, মাছভাজা আর গতকালের রান্না শুক্তোটা মাইক্রোওয়েভে গরম করে বৌদি আবার মাসিমার করা ঘিটা দিয়েছে। খাওয়ার গ্রাসটা মুখে দিয়ে মনে হলো, জব্বর খিদে পেয়েছিল। হবেই তো, চারটে বাজতে যায়...
“কী গো, তুমি তো প্রেশার কুকারের সামনে জমে গেলে! সরো দেখি। আর হ্যাঁ, এই দুটো বড় সাদা পাত্রে ভাগ করে ঢেলে রাখো।”
বৌদি নির্ঘাত আরতিকে লোভী ভেবেছে। কেন যে আজ এত বোকামি করছে! আরতির চোখে প্রায় জল চলে আসছে। রান্নাঘরের সিঙ্কে এঁটো বাসনগুলো বৌদি আজ মেজে দিয়ে যেতে বলেছে। অতিথিদের চোখের সামনে নোংরা-এঁটো থাকা ঠিক না। আরতি ঘষে ঘষে রান্নাঘর পরিষ্কার করতে থাকে, চোখের জলটা দ্রুত মুছে নেয়। শহরে এসে প্রতিপদে চোখে পড়ছে কত তফাত বৌদিদের সঙ্গে আরতির। আরতির ছোট ছোট ভুলভাল আচরণে নিজেকে বোকা প্রমাণ করে চলছিল ছ’মাস ধরে, আজ হয়তো বৌদি লোভী ভাবল। ছিঃ।
“আরতি, হাতের কাজ গুছিয়ে মাংসটা খেয়ে দেখো, কেমন রান্না করলে?” কাজরী হাসতে হাসতে বলল।
সাদা রঙের বাটিটা থেকে কী সুন্দর গন্ধ বেরিয়েছে। আরতির খুব ইচ্ছে করছে আঙুলটা ডোবাতে। বৌদি তো খেতেই বলল...
“না গো বৌদি, এই মাটনটা খাব না, ডাক্তারের বারণ আছে আমার। পেটে ব্যথা হয় গো।”
বৌদিরা রান্নাঘরে আবার গাছ রাখে। টবটা ভালো করে মুছে জানলার ধাপে পাতাবাহারের টবটা রেখে দেয় ও। চকচকে ঝকঝকে রান্নাঘর, দেখেও শান্তি।
“বৌদি, হয়ে গেছে।”
“আচ্ছা, তুমি একটু ব্যালকনিতে গিয়ে বসো, আমি আসছি।”
শ্রাবণের বিকেল। বৃষ্টিভেজা রাস্তায় গাড়ি চলছে, মানুষগুলো ছোট্ট ছোট্ট...
“আরতি, এটা নাও। আজ এক্সট্রা কাজ করলে তো, তাই।”
বৌদি পাঁচশো টাকা আরতির হাতে তুলে দেয়। মাসের প্রায় দিন দশেক বাকি, এতগুলো টাকা বড় কাজে আসবে। আজ বরং একটু মাছ কিনে নিয়ে চলে যাবে। আনন্দে শ্যামলা মুখে হলুদ আলো এসে পড়ে যেন।
“আর এটা ধরো, পোলাও, মাংস আর চাটনিটা দিলাম, তিনটে টিফিন বক্সে। ফিশ ফ্রাই আর পনির বাটার মশলাটা তো জানো দোকান থেকে আনাব, ওটা দিতে পারলাম না গো। তবে কাল এসে কেক আর মিষ্টি খেয়ো।”
বৌদি তো আরতিকে নেমন্তন্ন করে খাওয়াল। গেটের কাছে এসে টাকা আর টিফিন বক্সগুলোর দিকে তাকায় আরতি। শুধু হাতে কি কেউ নেমন্তন্ন খায়? আবারও সেই লজ্জা এসে আঁকড়ে ধরল আরতিকে।
ওই বড় রাস্তার কাছে এসে গিফটের দোকানটা দেখে খুলে গেছে। হাতের মুঠোয় ধরা টাকাটা দেখে ছোট্ট একটা হাসি খেলে যায় ঠোঁটে। আরতি ঠিক করে, একটা হলুদ রঙের ফুলদানি কিনবে, সঙ্গে কিছু সত্যিকারের ফুল। রজনীগন্ধা? হ্যাঁ, রজনীগন্ধাই ভালো হবে। আর নেমন্তন্ন বাড়িতে মিষ্টির বাক্স না নিয়ে গেলে হয়? আরতি রসগোল্লা কিনবে দশটা মতো।
সন্ধ্যা নামছে। পাখিদের ঘরে ফেরার আনন্দে গোটা আকাশ মুখরিত। আরতিও ছোট্ট পাখি হয়ে উপহারগুলো নিয়ে কাজরী বৌদির বাড়িতে উড়ে চলল, আর ওর মনে কোনো লজ্জা নেই।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।