মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার রাতগুলো বড্ড অদ্ভুত। দিনের বেলায় যে কংক্রিটে লাখো মানুষের জুতোর তলায় পিষে যায় শতকোটি টাকার হিসাবনিকাশ, রাত বারোটার পর সেই ফুটপাতই হয়ে ওঠে বিশাল এক ছাদহীন সরাইখানা।
মকবুলের বয়স বাষট্টি ছুঁয়েছে। গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে থাকা ফুটপাতের ঠিক আট বাই ছয় ফুট জায়গাটা তার দখলে। এই আটচল্লিশ বর্গফুটের ওপর তার কোনো দলিলের অধিকার নেই, কিন্তু তার নিজস্ব একটা মানচিত্র আছে।
প্রতিদিন রাত এগারোটায় ফুটপাতের চায়ের দোকানগুলো ঝাঁপ ফেললে মকবুল পকেট থেকে এক টুকরো সাদা চক বের করে। অত্যন্ত নিপুণ হাতে কংক্রিটের ওপর টানে কয়েকটা রেখা। মানুষের চোখে রেখাগুলো অদৃশ্য হলেও মকবুলের কাছে তা অলঙ্ঘনীয় সীমানা। একটা রেখার ভেতরে তার ঘুমানোর জায়গা — ওর ভাষায় ‘বেডরুম’। ঠিক ডানপাশে চকের আরেকটা ছোট বৃত্ত, সেখানে থাকে ছেঁড়া চটের ব্যাগ আর পানির বোতল — ওটা তার ‘সিন্দুক’। আর দেয়াল ঘেঁষে নিয়ন আলোর সরু ফালি যেখানে এসে পড়ে, ওটা হলো তার ‘বারান্দা’। মাঝরাতে সেখানে বসে সে বিড়ি টানে আর আকাশ দেখে।
মকবুল বিশ্বাস করে, নিজের বলতে একটা মানচিত্র না থাকলে মানুষ আর রাস্তার কুকুরের ভেতর কোনো তফাত থাকে না।
সেদিন রাতে চকের দাগগুলো গাঢ় করার সময় একটা ছোট ছেলে এসে দাঁড়াল তার ‘বারান্দা’র সীমানায়। বয়স বড়জোর নয় কি দশ। গায়ে ময়লা, হাঁটু-ঝুল ওভারসাইজড লাল টি-শার্ট। পায়ে জুতো নেই। শীতের হিমেল বাতাসে ঠকঠক করে কাঁপছে ছেলেটা, এক হাতে ধরা পলিথিনের ভেতর কয়েকটা পুরোনো রুটি।
“কী রে? খাড়াইয়া আছস ক্যান? রাস্তা মাপ!” — মকবুল ভুরু কুঁচকে ধমক দিল।
ছেলেটা দমল না। চকের দাগটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এইহানে দাগ কাটছেন ক্যান? রাস্তা কি আপনার বাপের?”
মকবুল রেগেমেগে উঠে দাঁড়াল। “হ, আমার বাপের! এইটা আমার জায়গা। ওই দ্যাখ, কাল্লু মিয়ার জায়গা, তার ওইপারে ছমিরনের। এই ফুটপাতের নিয়ম আছে। যার যার সীমানায় সে থাকব। তুই নতুন আইছস, তুই ওই ডাস্টবিনের ওইপার গিয়া জায়গা খোঁজ। যা, ভাগ!”
ছেলেটা এক পা-ও নড়ল না। হঠাৎ মকবুলের ‘বেডরুম’-এর সীমানার ঠিক মাঝখানে বসে পড়ে পলিথিন থেকে একটা শুকনো রুটি বের করে চিবোতে শুরু করল।
“নাম কী তোর?” — গলাটা খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল মকবুল।
“সাগর।” — রুটি চিবোতে চিবোতেই উত্তর।
“আইছস কই থেইকা?”
“কমলাপুর থেইকা। ওইহানে একটা লোক আমারে মারতো। তাই পলাইয়া আইছি।”
মকবুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই শহরটা প্রতিদিন এমন কত সাগরকে যে গিলে খায়, তার হিসাব নেই। সে তার ছেঁড়া চটের বস্তাটা বিছিয়ে দিল চকের দাগের ভেতর।
“আইজকার রাইতটা থাক। কাইল সকালে নিজের রাস্তা দেখবি। আর খবরদার, দাগের বাইরে পা দিবি না!”
সাগর কথা না বাড়িয়ে বস্তার এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার ভারী শ্বাসের শব্দ শোনা গেল। মকবুল ‘বারান্দায়’ বসে বিড়ি ধরাল। পনেরো বছর পর আজ তার আঁকা মানচিত্রে অন্য কেউ প্রবেশ করেছে। অনুভূতিটা বড় অস্বস্তিকর।
পরদিন সকালে সাগর গেল না। দুপুরে সস্তা ভাতের হোটেল থেকে খেয়ে ফিরে মকবুল দেখল, ছেলেটা তার সাদা চকটা দিয়ে ফুটপাতের ওপর আঁকিবুঁকি করছে।
“এই হারামজাদা! তুই আমার চক নিছস ক্যান?” — মকবুল ধমক দিয়ে উঠল।
সাগর হাসিমুখে তাকাল, “দ্যাখেন দাদু, আমি আপনার মানচিত্রটা ঠিক কইরা দিছি।”
মকবুল অবাক হয়ে দেখল, তার চকের দাগগুলোর পাশে সাগর আরও কিছু দাগ টেনেছে। ‘বেডরুম’-এর ঠিক পাশেই একটা ছোট ঘর, ঘরের চালে একটা পাখি। আর ‘বারান্দা’র পাশে একটা গাছ।
“এইগুলা কী?”
“এইটা আমার ঘর,” — সাগর চকের ঘরটার ওপর আঙুল রেখে বলল। “আমার তো কোনো ঘর নাই, তাই আইঁকা নিলাম। রাইতে এই ঘরের ভেতর ঘুমামু। আর এই গাছটার নিচে বইসা আপনে বিড়ি খাইবেন। রোদ লাগব না।”
মকবুলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। পনেরো বছর আগে, মেঘনা নদী যখন তার আস্ত গ্রামটাকে গিলে খেয়েছিল, তখন তারও একটা ছনের ঘর ছিল, ঘরের পাশে একটা পেয়ারা গাছ ছিল। নদীভাঙনে ভিটেমাটি আর বউ-বাচ্চা হারিয়ে মকবুল এই শহরে এসেছিল। তারপর থেকে সে কেবল কংক্রিটের ওপর চকের দাগ কেটে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে। অথচ এই ছোট্ট ছেলেটা একটা ভাঙা চক দিয়ে এক মুহূর্তে মকবুলের হারিয়ে যাওয়া গ্রামটাকে ফুটপাতের বুকে ফিরিয়ে এনেছে।
সেই থেকে সাগর আর মকবুলের অদ্ভুত এক সংসার শুরু হলো। সারাদিন প্লাস্টিকের বোতল কুড়াতো সাগর, আর সন্ধ্যায় এসে ঢুকে পড়ত মকবুলের মানচিত্রের ভেতর। মকবুল তাকে নিজের ভাতের ভাগ দিত। রাতের বেলা দুজনে চকের দাগের ভেতর শুয়ে আকাশ দেখত। মকবুল তাকে শোনাত মেঘনার গল্প, আর সাগর শোনাত কমলাপুর স্টেশনের ট্রেনের গল্প।
মকবুলের মনে হতো, এই পনেরো বছরে সে আসলে কোনো মানচিত্র আঁকতে পারেনি; সে শুধু একটা খাঁচা এঁকেছিল। সাগর এসে সেই খাঁচার দরজাটা খুলে দিয়েছে।
শীতের শেষে হঠাৎ করেই শহরজুড়ে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলো। সিটি কর্পোরেশনের লোকজনের সাথে পুলিশ।
সেদিন বিকেলে মকবুল আর সাগর যখন ফুটপাতে বসে মুড়ি খাচ্ছিল, হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি আর বুলডোজার এসে থামল।
“উইঠা পড়! সব উইঠা পড়! ফুটপাতে কোনো দোকানপাট, বস্তা কিচ্ছু থাকব না!” — মাইকে কর্কশ ঘোষণা ভেসে এল।
ফুটপাতজুড়ে হাহাকার আর হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। কেউ চায়ের কেটলি গোছাচ্ছে, কেউ পলিথিনের তাবু গোটাচ্ছে। পুলিশের লাঠিপেটায় হুড়োহুড়ির মাত্রা আরও বেড়ে গেল।
“দাদু! আমারে ধরো!” — সাগর ভয়ে মকবুলের হাত জাপটে ধরল।
“ভয় নাই বাপ। আমি আছি।” — মকবুল এক হাতে ছেঁড়া চটের ব্যাগটা নিল, অন্য হাতে সাগরের হাত শক্ত করে ধরল।
দৌড়াতে শুরু করল তারা। কিন্তু মানুষের বাঁধভাঙা ভিড় আর ধাক্কাধাক্কিতে হঠাৎ সাগরের হাতটা ফসকে গেল।
“সাগর!” — চিৎকার করে উঠল মকবুল।
কিন্তু ভিড়ের স্রোতে হারিয়ে গেল ছেলেটা। পুলিশের একটা বুটের ধাক্কায় মকবুল ছিটকে গিয়ে পড়ল ফুটপাতের একপাশে। বিশাল বুলডোজার আর পানির তীব্র পাইপ দিয়ে ফুটপাতের ওপর জমে থাকা সব আবর্জনা ধুয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে।
কংক্রিটের ফুটপাতটা আবার চকচকে, কালো আর নিখুঁত হয়ে গেল। কিন্তু মকবুলের মনে হলো, কেউ যেন তার বুকটা চিরে কলিজাটা উপড়ে নিয়েছে। তার মানচিত্রটা আজ চিরতরে মুছে গেছে।
রাত তখন দুটো। পুরো ফুটপাত পরিষ্কার, শুনশান। কোথাও কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। মকবুল একা বসে আছে দেয়াল ঘেঁষে। তার চোখে জল নেই, কেবল দৃষ্টিতে এক ভয়ংকর শূন্যতা।
হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ছোট ছায়া গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল।
“দাদু...”
মকবুল চমকে মাথা তুলল। সাগর। ছেলেটার লাল টি-শার্টটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, হাঁটুতে কালশিটে। কিন্তু সে ফিরে এসেছে। মকবুল পাগলের মতো দু'হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। বাষট্টি বছর বয়সী রুক্ষ মানুষটা ডুকরে কেঁদে উঠল দশ বছরের এক পথশিশুর কাঁধে মাথা রেখে।
“তুই কই গেছিলি রে বাপ? আমি তো ভাবছিলাম তুই আর ফিরবি না!”
সাগর মকবুলের বুক থেকে মাথা তুলে ফুটপাতের সেই পরিষ্কার, কালো কংক্রিটটার দিকে তাকাল। সেখানে কোনো চকের দাগ নেই।
“দাদু, আমাগো ঘরটা তো তারা ধুইয়া দিছে। এহন আমরা কই ঘুমামু?” — সাগরের গলায় চাপা কান্না।
মকবুল নিজের ফতুয়ার হাতা দিয়ে সাগরের চোখের জল মুছে দিল। খুব শান্ত গলায় বলল, “ঘর ধুইয়া দিছে তো কী হইছে বাপ? চক দিয়া কি আর ঘর বানানো যায়? মানচিত্র তো মাটির উপরে থাকে না রে বাপ, মানচিত্র থাকে বুকের ভেতর।”
মকবুল তার হাতটা সাগরের বুকের বাঁ-পাশে রাখল, যেখানে ছোট্ট হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করছে।
“এই যে, এইটা হইলো আমার ঘর। আর আমার বুকের ভেতর যেইটা ধুকপুক করতাছে, ওইটা হইলো তোর ঘর। পুলিশ ফুটপাত ধুইতে পারে, কিন্তু মানুষের বুকের ভেতরের দাগ মুছব কেমনে?”
সাগর হাসল। সেই হাসিতে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো ভয় নেই।
শীতের সেই রাতে, ঢাকা শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত ফুটপাতের ওপর দুজন শেকড়হীন মানুষ কোনো চকের দাগ ছাড়াই একটা নতুন মানচিত্র তৈরি করে ফেলল। যে মানচিত্রে কোনো সীমানা নেই, কোনো দেয়াল নেই; আছে কেবল একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের চরম নিঃস্বার্থ এক অস্তিত্বের বুনন।
মানুষ হওয়ার আগে এভাবেই হয়তো কখনো কখনো নিজের সব অধিকার মুছে ফেলে, কংক্রিটের বদলে অন্য একজন মানুষের ভেতর নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নিতে হয়।
লেখক একজন নবীন কবি ও সাহিত্যস্রষ্টা। মানুষের অনুভূতি, জীবনবোধ, বিষাদ, প্রকৃতি এবং অন্তর্জগতের নানা অনুষঙ্গ তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য। দীর্ঘদিন ধরে কবিতা ও গল্পচর্চার মাধ্যমে নিজস্ব সাহিত্যভাষা নির্মাণে তিনি নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। পাঠকের হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনুরণন সৃষ্টি করাই তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল লক্ষ্য।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।