১৮৫৭ সালের ঝাঁসি দুর্গের প্রতিটি পাথরে, প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে এক এমন রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, যা শুনলে আজও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে আমরা ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের বীরত্বের কথা বারবার পড়ি, কিন্তু সেই রানীর ছায়াসঙ্গী হয়ে তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে কজন নারী নিজের বুক পেতে ব্রিটিশদের বুলেট সামলেছিলেন, তাঁদের মধ্যে বীরাঙ্গনা মালতী বাঈ লোধী ছিলেন এক অনন্য নাম।
মালতী বাঈ এবং মণিকর্ণিকা, যিনি পরবর্তীতে ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ হিসেবে পরিচিত হন, তাঁদের সম্পর্কটি কেবল রানী আর সেনাপতির ছিল না। লোকগাথা এবং বুন্দেলখণ্ডের ইতিহাস বলে, তাঁরা ছিলেন শৈশবের খেলার সাথী, একে অপরের পরম সখী এবং আত্মার বন্ধনে বাঁধা দুই নারী। রাজপ্রাসাদের আঙিনায় যখন তলোয়ার চালনা, ঘোড়সওয়ারি বা ধনুর্বিদ্যার অনুশীলন হতো, তখন মণিকর্ণিকার পাশে সমান বিক্রমে দাঁড়িয়ে থাকতেন মালতী বাঈ। রানীর প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি জেদ আর সাহসের প্রথম সাক্ষী ছিলেন তিনি। তাই রানী যখন ঝাঁসির সিংহাসনে বসলেন, মালতী বাঈ রাজকীয় আরাম-আয়েশ ছেড়ে রানীর জীবন রক্ষার এক কঠিন ব্রত নিলেন; তিনি হয়ে উঠলেন রানীর প্রধান অঙ্গরক্ষিকা।
ব্রিটিশরা যখন ঝাঁসি কেড়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র শুরু করল, তখন রানী লক্ষ্মীবাঈ এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন — তিনি নারীদের নিয়ে এক অপরাজেয় সামরিক বাহিনী গড়ে তুলবেন, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘দুর্গা দল’। আর এই দুর্গা দলের আসল মেরুদণ্ড ছিলেন মালতী বাঈ লোধী। তিনি বুন্দেলখণ্ডের ঘরে ঘরে গেছেন, কৃষক, মজুর আর পিছিয়ে পড়া শ্রেণির সাধারণ মেয়েদের বুক থেকে ভয়ের জড়তা ঝেড়ে ফেলে তাদের ভেতরে দেশের জন্য মরার আগুন জ্বালিয়েছেন। তাঁর ছোঁয়াতেই ঝাঁসির সাধারণ গৃহবধূরা হাতের খুন্তি আর কাস্তে ফেলে তুলে নিয়েছিল ধারালো তলোয়ার। তিনি শুধু তাদের অস্ত্র চালানোই শেখাননি, শিখিয়েছিলেন কীভাবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও মাথা উঁচু করে হাসতে হয়। যুদ্ধের দিনগুলোতে বহুবার নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাঁসির রানীকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে এনেছেন মালতী বাঈ। রানীর দিকে ধেয়ে আসা প্রতিটি ধারালো অস্ত্র আর তীরের সামনে প্রথম লোহার দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন এই বীরাঙ্গনা।
১৮৫৮ সালের সেই অভিশপ্ত দিনগুলোতে যখন জেনারেল হিউ রোজের বিশাল ব্রিটিশ বাহিনী ঝাঁসি দুর্গ অবরুদ্ধ করে ফেলে, তখন দুর্গের ভেতরে যে প্রলয়ংকর যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তাতে মালতী বাঈ এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিলেন। একদিকে ব্রিটিশদের অবিরাম কামানের গোলাবর্ষণ, অন্যদিকে দুর্গের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্ত — সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যখন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছিল, তখন মালতী বাঈ নিজের বুদ্ধিমত্তা ও গেরিলা যুদ্ধের কৌশলকে কাজে লাগান।
যুদ্ধের শেষ অঙ্কটা ছিল সবচেয়ে বেশি বুক কাঁপানো এবং হৃদয়বিদারক। দুর্গের পতন যখন অনিবার্য হয়ে উঠল, তখন ঝাঁসির ভবিষ্যৎ এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য রানী লক্ষ্মীবাঈয়ের জীবিত থাকা অত্যন্ত জরুরি ছিল। রানী যাতে তাঁর ছোট সন্তান দামোদর রাওকে পিঠে বেঁধে নিরাপদে দুর্গ থেকে বেরিয়ে কাল্পির দিকে চলে যেতে পারেন, তার জন্য এক আত্মঘাতী পরিকল্পনা করা হলো। আর এই পরিকল্পনার প্রধান রক্ষাকবচ হলেন মালতী বাঈ। রানী যখন পেছনের গোপন পথ দিয়ে দুর্গ ছাড়ছিলেন, ব্রিটিশ সেনারা যাতে তা বুঝতে না পারে, তার জন্য মালতী বাঈ একদল নারী সৈন্য নিয়ে কালভৈরবীর মতো ব্রিটিশ বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। উদ্দেশ্য একটাই — যেকোনো মূল্যে ব্রিটিশদের আটকে রাখা, যেন তারা রানীর পিছু ধাওয়া করার সময় না পায়।
শুরু হলো এক অসম, রক্তক্ষয়ী সম্মুখযুদ্ধ। একা মালতী বাঈয়ের তলোয়ারের কোপে একের পর এক ব্রিটিশ সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল। তাঁর সারা শরীর রক্তে ভিজে গিয়েছিল, শত্রুর তলোয়ারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল চামড়া, কিন্তু যতক্ষণ দেহে শেষ নিঃশ্বাস ছিল, একটা ব্রিটিশ সৈন্যকেও তিনি রানীর পথের দিকে এগোতে দেননি। ঠিক এই তীব্র লড়াইয়ের মাঝেই এক ব্রিটিশ অফিসারের বন্দুক থেকে ছুটে আসা একটি নির্মম বুলেট মালতী বাঈয়ের পিঠ ফুঁড়ে চলে যায়। তীব্র যন্ত্রণায় শরীর ভেঙে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু দেশের প্রতি এবং সখীর প্রতি তাঁর যে অলিখিত প্রতিশ্রুতি ছিল, তা তাঁকে পড়তে দেয়নি। মুখ দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকা অবস্থাতেও তিনি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে তলোয়ার চালিয়ে গেলেন। তিনি ব্রিটিশদের এতটাই ব্যস্ত রেখেছিলেন যে, তারা বুঝতেই পারেনি কখন রানী লক্ষ্মীবাঈ দুর্গ থেকে বহু দূরে চলে গেছেন।
রানীকে নিরাপদে বের করে দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করেছিলেন এই লোধী কন্যা, কিন্তু তার বদলে এই বীরাঙ্গনাকে দিতে হয়েছিল নিজের জীবনের চরম মূল্য। চারপাশ থেকে শত্রুর বেয়নেট আর তলোয়ার যখন তাঁর শরীর ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিল, তখনও তাঁর হাত থেকে তরবারি খসে পড়েনি। দেশের মাটিকে নিজের বুকের তাজা রক্তে স্নান করিয়ে ঝাঁসির দুর্গের ভেতরেই বীরের মতো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন মালতী বাঈ লোধী।
রানী লক্ষ্মীবাঈ যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হওয়ার ঠিক কিছু মুহূর্ত আগে, স্বাধীন ভারতের বলিবেদীতে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে যান তিনি। ইতিহাসের মোটা বইগুলো হয়তো এই নিঃস্বার্থ বীরাঙ্গনার নাম অনেকখানি আড়ালে রেখে দিয়েছে, কিন্তু বুন্দেলখণ্ডের প্রতিটা ধূলিকণায়, ওখানকার লোকগাথায় আর মানুষের হৃদয়ে মালতী বাঈ লোধী আজও এক জ্বলন্ত মশাল হয়ে বেঁচে আছেন। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, দেশের জন্য লড়তে কোনো রাজমুকুটের প্রয়োজন হয় না; একটা সাধারণ বুক আর দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসাই একজন সাধারণ নারীকে বীরাঙ্গনা বানিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।