যদি প্রশ্ন করি উত্তম কুমার আর অমিতাভ বচ্চনের মধ্যে মিল কোথায়?
প্রথমেই হয়তো মনে হবে, দু’জনেই নিজের সময়ের বাংলা ও হিন্দি ছবির জগতকে প্রায় এককভাবে শাসন করেছেন। কিন্তু আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল আছে। সাফল্য তাঁদের দু’জনকেই কেউ সোনার থালায় সাজিয়ে দেয়নি। দু’জনেরই ক্যারিয়ারের শুরুতে ছিল একের পর এক ব্যর্থতা। ছবি চলেনি, প্রত্যাখ্যান এসেছে, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ এসেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। তবু তাঁরা থামেননি। প্রতিভার পাশাপাশি তাঁদের সেই জেদ, অধ্যবসায় এবং নিজেকে ক্রমাগত তৈরি করে যাওয়ার ক্ষমতার সামনে ভাগ্যদেবীকেও প্রসন্ন হতে হয়েছিল।
উত্তম কুমারের চলার পথটা ছিল বিশেষভাবে নাটকীয়। আজ তাঁর ছবি দেখলে যে অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, পরিমিত হাসি, সংলাপ বলার স্বাভাবিক ছন্দ কিংবা পর্দায় যেকোনো দৃশ্যকে অনায়াসে বহন করার ক্ষমতা চোখে পড়ে, তা দেখে মনে হতে পারে — যে মানুষটি জন্মেছিলেন নায়ক হওয়ার জন্য, তাঁর নায়ক হয়ে ওঠাও বুঝি শুধু সময়ের অপেক্ষাই ছিল। কিন্তু আদতে অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায় থেকে ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমার হয়ে ওঠার সেই দীর্ঘ পথটা খুব সহজ ছিল না।
তবে এই ‘মহানায়ক’ শব্দের মধ্যে তাঁর পরিচয়টি পুরো ধরা পড়ে না। কারণ মহানায়ককে আমরা চিনি তাঁর সাফল্যের পর থেকে। আর অরুণকুমারকে চিনলে জানা যায় তাঁর গড়ে ওঠার গল্প — যা সম্ভবত আরও বেশি আকর্ষণীয়। তাঁর জন্মের একশো বছর পূর্ণ হয়েছে ২০২৬ সালে। আসুন, শতবর্ষে ফিরে তাকানো যাক সেই অরুণকুমারের দিকে, যিনি ভবিষ্যতে বাঙালির হৃদয়সম্রাট হয়ে উঠবেন।
১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্ম হয় অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়ের। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় ছিলেন মেট্রো সিনেমার চিফ প্রজেকশন অপারেটর। ফলে ছোটবেলা থেকেই সিনেমা দেখার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন। এছাড়া সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়ের ‘সুহৃদ সমাজ’ নামে একটি অপেশাদার নাট্যদলও ছিল। উত্তম সেই দলের প্রযোজনাগুলিতে অংশ নিতেন। কিন্তু তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্র পরিবারের সন্তান ছিলেন না। অভিনয়ের জগতে ঢোকার জন্য কোনো রেড কার্পেট তাঁর সামনে বিছানো ছিল না।
মধ্যবিত্ত জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতার মধ্যেই বড় হন তিনি। বি.কম পাশ করে কলকাতা পোর্ট কমিশনার্সে কেরানির চাকরি করতেন। পাশাপাশি সংসারের আয় বাড়াতে গানও শেখাতেন। আর সে সব সামলিয়েই সুযোগ খুঁজতেন অভিনয়ের।
অর্থাৎ যে মানুষটির নাম কয়েক বছরের মধ্যে বাংলা সিনেমার পোস্টারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়ে উঠবে, তাঁর শুরুটা হয়েছিল প্রায় নামহীন অবস্থায়।
এরপর তাঁর একটার পর একটা ছবি ব্যর্থ হতে লাগল। ভাগ্য বদলাতে তিনি বারবার পর্দায় নাম বদলেছেন — কখনও অরুণকুমার, কখনও অরুণ চট্টোপাধ্যায়, কখনও উত্তম চট্টোপাধ্যায়, কখনও অরূপকুমার। এমনকি চলচ্চিত্র মহল তাঁকে একটা নির্মম নামও দিয়েছিল — ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’।
পরবর্তী সময়ে তাঁকে নিয়ে লেখা বিভিন্ন স্মৃতিচারণে একটা বিষয় বারবার ফিরে আসে — উত্তম কুমার নিজেকে তৈরি করেছিলেন। শুধু অভিনয় নয়, নিজের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ, শরীরী ভাষা, সংগীতচর্চা, মঞ্চাভিনয় — সবকিছু নিয়েই কাজ করেছিলেন। যে অনায়াস ব্যক্তিত্ব পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য বলে মনে হয়, তার পিছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি। মঞ্চও ছিল তাঁর সেই প্রস্তুতির বড় জায়গা।
১৯৫৩ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে স্টার থিয়েটারে ‘শ্যামলী’ নাটকে অনিলের ভূমিকায় অভিনয় শুরু করেন তিনি। নাটকটি চলেছিল একটানা ৪৮৪ রাত্রি। সরযূবালা দেবী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, জহর গঙ্গোপাধ্যায়, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিল্পীদের সঙ্গে একই মঞ্চে অভিনয় করেছিলেন উত্তম। এমনকি ইংল্যান্ডের বিখ্যাত অভিনেতা দম্পতি স্যর লুইস কেসন ও ডেম সিবিল থর্নডাইকও নাটকটি দেখে তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা করেছিলেন।
চলচ্চিত্রের জগতে মোড় ঘুরতে শুরু করে পঞ্চাশের দশকের গোড়ায়। ‘বসু পরিবার’-এর পর ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ এবং ১৯৫৪ সালে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ তাঁকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। সুচিত্রা সেনের সঙ্গে তাঁর রোম্যান্টিক জুটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়।
কিন্তু উত্তম কুমারকে শুধু রোম্যান্টিক নায়ক হিসেবে দেখলে তাঁর কাজের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। ‘নায়ক’-এর অরিন্দম মুখোপাধ্যায়, ‘চিড়িয়াখানা’-র ব্যোমকেশ, ‘বিচারক’-এর বিচারপতি, ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-র অ্যান্টনি — একই অভিনেতার মধ্যে কত ভিন্ন চরিত্র সম্ভব, তার উদাহরণ ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর কর্মজীবন জুড়ে।
এ প্রসঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’ আলাদা করে উল্লেখযোগ্য। সেখানে দেশের সবচেয়ে বড় বাঙালি চলচ্চিত্র তারকাকেই সত্যজিৎ রায় অভিনয় করালেন এক বিরাট চলচ্চিত্র তারকার চরিত্রে — এমন একজন মানুষ, যার খ্যাতির আড়ালে রয়েছে ভয়, আপস, অপরাধবোধ এবং আত্মসংশয়। উত্তম কুমারের তারকা-সত্তাকে ব্যবহার করেই যেন তারকাখ্যাতির অন্তরালের মানুষটিকে খুঁজেছিলেন সত্যজিৎ।
উত্তমের জনপ্রিয়তা কতটা ব্যাপক ছিল, তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও হয়েছিল সত্যজিতের। ‘নায়ক’-এর একটি প্রিমিয়ারে ভিড় এতটাই উন্মত্ত হয়ে ওঠে যে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়। ভক্তদের টানাটানিতে উত্তম কুমারের পোশাকও ছিঁড়ে যায়।
‘নায়ক’ ছবির বহু বছর আগেই যদিও সত্যজিৎ রায় উত্তম কুমারকে তাঁর পরিকল্পিত ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে সন্দীপের ভূমিকায় বিবেচনা করেছিলেন। শোনা যায় উত্তম কুমার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তাঁর মনে হয়েছিল যে চরিত্রটি আরও প্রতিষ্ঠিত কোনো অভিনেতার জন্য বেশি উপযুক্ত হবে। পরবর্তীকালে উত্তম কুমারকে মাথায় রেখেই সত্যজিৎ ‘নায়ক’ ছবিটি লিখেছিলেন।
অর্থাৎ যে অভিনেতাকে একসময় ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বলা হয়েছিল, তিনিই ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ইতিহাসে প্রথম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হন।
পর্দায় জনপ্রিয় মুখ হয়ে থাকার বাইরে তিনি চলচ্চিত্র ও নাটকের নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। ‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’, ‘গৃহদাহ’-র মতো একাধিক ছবির প্রযোজনার সঙ্গে ছিলেন, পরিচালনা করেছেন ‘বনপলাশীর পদাবলী’ বা ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’-র মতো ছবি, এমনকি ‘কাল তুমি আলেয়া’ ছবির সংগীত পরিচালনাও করেছেন।
তবে তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তারও একটা সীমা ছিল।
এ প্রসঙ্গে ‘ছোটি সি মুলাকাত’-এর ব্যর্থতাকে সন্তর্পণে এড়িয়ে যাবো, কারণ সেই ছবির ব্যর্থতার কারণ নিয়েই আলাদা একটি লেখা হয়ে যেতে পারে। শুধু এটুকু বলা যায়, পরবর্তীকালে হিন্দি ও বাংলা — দুই ভাষাতেই নির্মিত ‘অমানুষ’-এর বিরাট সাফল্য অন্তত প্রমাণ করে যে হিন্দিভাষী দর্শকের কাছে উত্তম কুমারের গ্রহণযোগ্যতার অভাব ছিল না।
১৯৭৬ সালের মহালয়ায় আকাশবাণীতে প্রচলিত ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র পরিবর্তে সম্প্রচারিত হয় নতুন অনুষ্ঠান ‘দেবীং দুর্গতিহারিণীম্’। সেখানে ভাষ্যপাঠের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ ছিলেন উত্তম কুমার। অন্যান্য তারকার তালিকাও ছিল অবিশ্বাস্য — হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়সহ বহু বিখ্যাত শিল্পী। তবু বাঙালি গ্রহণ করল না।
বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠ এবং ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র সঙ্গে যে সাংস্কৃতিক অভ্যাস তৈরি হয়েছিল, তার জায়গা মহানায়কের জনপ্রিয়তাও নিতে পারেনি। প্রতিবাদ এত তীব্র হয়েছিল যে আকাশবাণীকে দ্রুত পুরনো অনুষ্ঠান ফিরিয়ে আনতে হয়।
তবে ঘটনাটি উত্তম কুমারের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার চেয়ে সম্ভবত অন্যভাবে দেখা বেশি বাঞ্ছনীয়। আসলে একজন মানুষের তারকাখ্যাতি যত বড়ই হোক, কিছু সাংস্কৃতিক স্মৃতি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা নতুন কিছু করার প্রচেষ্টার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে ঐতিহ্যে পরিণত হয়। উত্তম কুমারের অভিনীত সিনেমা দেখাও বোধ হয় আজ বাঙালির সেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই অংশ।
সিনেমা তাঁর জীবন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত আলাদা হয়নি। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র শুটিং চলাকালীনই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ১৯৮০ সালের ২৪ জুলাই, মাত্র ৫৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমায় যে মানুষটির নামোল্লেখ পর্যন্ত করা হয়নি, শেষ পর্যন্ত তাঁর নামটাই বাংলা সিনেমায় অদ্বিতীয় হয়ে রইল।
লেখক ১৯৭১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। কর্মসূত্রে প্রবাসী বাঙালি। পেশায় প্রযুক্তিবিদ। মাঝেমধ্যে একটু আধটু লিখতে ভালোবাসলেও লেখালেখি তাঁর পেশা বা নেশা কোনোটাই নয়। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে সিঙ্গেল স্ক্রিনে সিনেমা দেখতে যেতেন; আর তখন থেকেই তিনি সিনেমার পোকা। সিনেমা নিয়ে লেখা পড়তেও খুব ভালোবাসেন। তবে গসিপ কলাম নয়; তথ্য, ইতিহাস, জীবনী ইত্যাদি।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।