“মিস শেফালির সাক্ষাৎকার চাই? পাবেন, কিন্তু ফ্রি-তে হবে না। তাঁর সময়ের দাম দিতে হবে।”
ষাট-সত্তরের দশকে বাংলার মহিলা বিনোদনশিল্পীদের মধ্যে এমন শর্ত প্রায় শোনাই যেত না। তাও কিনা আবার ক্যাবারে শিল্পী!
কিন্তু মিস শেফালি জানতেন, তাঁর নাচের মতো তাঁর নামেরও বাজার আছে। সেই নাম ব্যবহার করে ব্যবসা করবেন? বিনা পয়সায় হবে না। তাই অধিকাংশ সাক্ষাৎকারের অনুরোধ তিনি মঞ্জুর করতেন সম্মানীর বিনিময়ে। যে শহর তাঁকে দেখার জন্য টাকা খরচ করত, সেই শহরকে তিনি নিজের কথা শোনার জন্যও সম্মানী দিতে শিখিয়েছিলেন।
সেই শহরের মহানায়ককেও একদিন তিনি নাচিয়ে ছেড়েছিলেন। হাওয়াইয়ান নাচের একটি পর্বে দর্শকের গলায় মালা পরানোর রীতি। সামনে বসে উত্তমকুমার। শেফালি মালা পরিয়ে তাঁর হাত ধরে নাচতে টেনে আনলেন। সেই সময় সকলের হৃদয়ে রাজত্ব করছেন উত্তমকুমার, কিন্তু ওই মুহূর্তে ডান্স ফ্লোরের কর্ত্রী কে, তা নিয়ে কোনও সংশয় ছিল না। নিয়মিত তাঁর অনুষ্ঠান দেখতে আসা উত্তমের সঙ্গে পরে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে তাঁদের মধ্যে আন্তরিক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।
ষাট-সত্তরের পার্ক স্ট্রিটকে আজকের রেস্তরাঁর সারি দিয়ে বোঝা যাবে না। জ্যাজ, সিগারেটের ধোঁয়া, বার, বিদেশি নাচের ছন্দ, রাত বাড়ার সঙ্গে বদলে যাওয়া আলো — কলকাতার ভিতরেই যেন আর-এক কলকাতা। সে সময় ফিরপো’জের লিডো রুম আর ওবেরয় গ্র্যান্ডের ফ্লোর কাঁপাতেন প্রখ্যাত ক্যাবারে তারকা মিস শেফালি। অথচ তাঁর নিজের কাছে এই জৌলুসের অর্থ ছিল খুব সোজা: বাড়িতে টাকা পাঠাতে হবে। মা-বাবাকে একটু ভালো রাখতে হবে।
এই হিসেবের গোড়ায় যদিও মিস শেফালি নন, ছিলেন দেশভাগের পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে আহিরীটোলায় চলে আসা একটি অভাবী পরিবারের মেয়ে আরতি দাস। মাত্র এগারো বছর বয়সে তাঁকে চাঁদনি চকের একটি অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান বাড়িতে পরিচারিকার কাজ নিতে হয়। সে বাড়িতে পার্টি হতো, অতিথিরা নাচতেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পর্দার আড়াল থেকে আরতি সেই নাচ দেখে পরে নিজেই স্টেপগুলো তুলতেন। মোক্যাম্বোর গায়ক ভিভিয়ান হ্যানসন ওই বাড়িতে আসতেন। আরতি তাঁর সাহায্য চেয়েছিলেন আরও ভালো একটা কাজের জন্য। নাচ জানেন কি না, প্রশ্ন উঠতেই সম্মতি। ভিভিয়ানের হাত ধরেই ফিরপো’জে পৌঁছনো।
তাঁর নামটা অবশ্য কর্তৃপক্ষের পছন্দ হয়নি। আরতি দাস তাই বদলে গেলেন শেফালিতে।
গ্রেট ইস্টার্নের পিছনে একটি বাংলোয় থাকার ব্যবস্থা হলো। সেখানে বিদেশি নৃত্যশিক্ষকের কাছে তালিম, সঙ্গে হিন্দি শেখাও শুরু হলো। পর্দার আড়াল থেকে নাচ নকল করা মেয়েটা ফিরপো’জে পেশাদার ক্যাবারে ডান্সার হলো।
পরবর্তীকালে গ্র্যান্ডে যোগ দেওয়ার সময় তাঁর মাসিক মাইনে হয় ৩,০০০ টাকা। সত্তরের দশকে থিয়েটার ও হোটেল মিলিয়ে মাসিক আয় ৩৫,০০০ টাকায় পৌঁছেছিল বলে জানা যায়। হোটেলে তাঁর জন্য ঘর ছিল, রেস্তরাঁয় সই করে খাওয়ার সুবিধাও ছিল।
তবে নাম বদলালেই তো মানুষ বদলে যায় না। সাহেবি পরিবেশে অভ্যস্ত মিস শেফালির ভিতর থেকে নারায়ণগঞ্জের আরতিকে সরিয়ে দেওয়া যায়নি। বিশ্বরূপার গ্রিনরুমে বসে দিব্যি শুঁটকি মাছ খেতেন। বরুণ চন্দের বাঙাল ভাষা শুনে খুব হেসেছিলেন।
দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে মরিয়া আরতি দাস নাচের লাইসেন্স নিতে লালবাজারে গিয়ে মিথ্যা গল্প ফেঁদেছিলেন — তিনি অনাথ, কাকার পরিবারে থাকেন, সেখানে অত্যাচার সহ্য করতে হয়। সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি ঘরের মেয়ের হোটেলে নাচা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায়। বলা হয়, এর চেয়ে পরিচারিকার কাজটাই বেশি সম্মানজনক। আরতি দাস সেই পুলিশ অফিসারকে প্রশ্ন করেন যে অফিসার যখন তাঁর ভরণপোষণের খরচ জোগাচ্ছেন না, তখন তিনি কেন তাঁকে জবাবদিহি করতে যাবেন?
ওই টুকু মেয়ের ওরকম মুখেমুখে জবাব দেওয়ার ফলাফল? সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে তিন মাসের একটি অস্থায়ী লাইসেন্স দিয়ে দেওয়া হয়। পরের জীবনেও নিজের পেশার জন্য ক্ষমা চাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়নি তাঁর।
দর্শকের মুগ্ধতা নিয়েও তাঁর স্পষ্ট অবস্থান ছিল। মঞ্চের আকর্ষণ ব্যক্তিগত জীবনে ঢোকার অনুমতি দেয় না। ক্যাবারে নাচেন বলে কারও যৌন দাবি মেনে নেওয়ার দায় তাঁর নেই। নিজের পেশা, নিজের শরীর, নিজের সম্পর্ক — সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁরই। ক্যাবারে ডান্সারের এই আত্মমর্যাদাবোধ অনেকের কাছে খোলামেলা নাচের পোশাকের চেয়েও বেশি অস্বস্তিকর ছিল। হাওয়াইয়ান হুলা, চার্লস্টন, ক্যান-ক্যান, বেলি ডান্সের পাশাপাশি তাঁর প্রশিক্ষণের তালিকায় ছিল কথক ও ভরতনাট্যমও। অথচ ক্যাবারে শব্দটির সঙ্গে বাঙালি এমনভাবে পোশাকের স্বল্পতাকে জুড়ে রেখেছিল যে শিল্পটা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যেত।
পর্দায় তাঁর অভিনয়ের সুযোগ আর তাঁর পরিচিতির ব্যাপ্তি সমান হয়নি। যে মুখ দেখিয়ে হোটেল ও থিয়েটার ব্যবসা করতে পারে, সেই মুখকে নানা ধরনের চরিত্রে ভাবার উৎসাহ সিনেমায় ততটা ছিল না। তবে ব্যতিক্রমও ছিল!
সেই ব্যতিক্রমী ফোন পেয়ে প্রথমে বিরক্তই হয়েছিলেন মিস শেফালি। বারবার ফোন আসছে; কে? কী চাইছেন? ওপার থেকে পরিচয় দেওয়া হলো। সত্যজিৎ রায়!
পরে বাড়িতে ডেকে চরিত্র বুঝিয়ে দেন সত্যজিৎ। পোশাক খোলার দৃশ্যে আপত্তি আছে কি না, ধূমপান করেন কি না, সেসব কথাও হয়। সংলাপ শেখার জন্য লোক পাঠানোর অনুরোধ করেন শেফালি। সন্দীপ রায় একবার বলেছিলেন যে তাঁর বাবা শেফালিকে দেখে এতটাই নিশ্চিত হয়েছিলেন যে স্ক্রিনটেস্টেরও প্রয়োজন হয়নি।
‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র লতিকা একজন নার্স, পাশাপাশি যৌনকর্মও করেন। এই চরিত্র এবং তার উপস্থাপনা নিয়ে নার্সদের সংগঠন আপত্তি তুলেছিল। সত্যজিৎ রায় সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেন — একটি নার্সের নেতিবাচক চরিত্রায়ণ গোটা পেশার চরিত্রায়ণ নয়। ছবির প্রদর্শন বন্ধ করার দাবিতে মিছিলের পরিকল্পনা ছিল। সত্যজিৎ সংগঠনের সঙ্গে কথা বলার পরে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়।
সত্যজিৎ রায়ের Calcutta Trilogy-র প্রথম ছবি ছিল ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’। দ্বিতীয় ছবি ‘সীমাবদ্ধ’তে মিস শেফালীকে দেখা যায় গ্র্যান্ড হোটেলের একজন হাওয়াইয়ান ক্যাবারে ডান্সার হিসেবে — অর্থাৎ বলা যায়, আবার নিজের চরিত্রেই।
উত্তমের ছবি দিয়ে বাংলা ছবিতে আসা, আর থিয়েটারে তাঁকে নিয়ে আসেন তরুণকুমার। থিয়েটারে আসার পরে শেফালির দর্শকবৃত্তই বদলে গেল। দামি হোটেলে ঢোকার সামর্থ্য যাঁদের নেই, তাঁরাও এবার তাঁকে দেখতে পেলেন। ‘সম্রাট ও সুন্দরী’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘অশ্লীল’ — তাঁর নাম জড়িয়ে গেল অনেকগুলি সফল নাটকের সঙ্গে। ‘সম্রাট ও সুন্দরী’-র ১২০০ রজনী চলার তথ্যও আছে! নৈশক্লাবের আলো থেকে রঙ্গমঞ্চের আলোয় আসা তাঁর ক্ষেত্রে নিছক শেষবেলার আশ্রয় ছিল না; সেখানে নতুন করে দর্শক জয় করেছিলেন তিনি। মিস শেফালিকে দেখতে নাকি সাহেব-মেমরাও বিশ্বরূপায় আসতেন!
তবে দর্শক তাঁকে চাইলেও সহকর্মীদের সবাই যে সমান স্বচ্ছন্দ ছিলেন, তা নয়। তাঁর আত্মকথায় উঠে এসেছে পোস্টারে তাঁর সঙ্গে নাম বা ছবি থাকা নিয়ে আপত্তির অভিজ্ঞতা।
নিজের প্রাপ্য নিয়ে চিরকালই কঠিন ছিলেন তিনি। মঞ্চে উঠে শুধু মুখ দেখাতেও পারিশ্রমিক নিতেন। অথচ অভাবী মানুষের জন্য খরচের সময় সেই হিসেববোধ থাকত না। দুই হাতে রোজগার করেও তাই সারাজীবনের আর্থিক নিরাপত্তা ছিল না। শেষ জীবনে অর্থকষ্ট তাঁকেও ধরেছিল। নাচের এত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও টেলিভিশনের নাচের প্রতিযোগিতায় নিয়মিত বিচারক হওয়ার ডাক না পাওয়া নিয়ে তাঁর আক্ষেপ ছিল বলে তাঁর ভাইঝি জানিয়েছিলেন।
‘সন্ধ্যারাতের শেফালি’ আত্মজীবনীতে অনেক স্মৃতি রেখে গিয়েছেন তিনি। ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সোদপুরের বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়। খবরের কাগজে আবার ফিরেছিল পুরোনো ছবি, ক্যাবারে কুইনের পরিচয়, তারকাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।
তাঁর গল্পটা তাই কোনও অভাবী মেয়ের ক্যাবারে ডান্সার হতে বাধ্য হওয়ার দুর্ভাগ্যের গল্প নয়, বরং একটা তেরো বছরের মেয়ের মুখ থেকে কাজের শর্ত বেরিয়ে আসার আত্মবিশ্বাসের গল্প: মাইনে দিতে হবে, থাকতে দিতে হবে, খেতে দিতে হবে। জীবনে সম্পর্ক আসবে কি না, সম্পর্কের পূর্ণতা কোথায় — সেই মেয়েটাই ঠিক করবে। কলকাতা তাকে দেখবে — সেই দেখার শর্তও মেয়েটাই ঠিক করবে।
দ্রষ্টব্য: লেখায় ব্যবহৃত ছবিগুলি সীমাবদ্ধ (১৯৭১), চৌরঙ্গী (১৯৬৮) ও প্রতিদ্বন্দ্বী (১৯৭০) চলচ্চিত্র থেকে সংগৃহিত। বাঙালি নেটওয়ার্ক এবং উদ্যোগ ওয়েব ম্যাগাজিন উক্ত ছবিগুলির কোনো স্বত্ব দাবি করে না।
লেখক ১৯৭১ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। কর্মসূত্রে প্রবাসী বাঙালি। পেশায় প্রযুক্তিবিদ। মাঝেমধ্যে একটু আধটু লিখতে ভালোবাসলেও লেখালেখি তাঁর পেশা বা নেশা কোনোটাই নয়। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে সিঙ্গেল স্ক্রিনে সিনেমা দেখতে যেতেন; আর তখন থেকেই তিনি সিনেমার পোকা। সিনেমা নিয়ে লেখা পড়তেও খুব ভালোবাসেন। তবে গসিপ কলাম নয়; তথ্য, ইতিহাস, জীবনী ইত্যাদি।
আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম
আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।