About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
ফুটপাতের নিজস্ব মানচিত্র
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

ফুটপাতের নিজস্ব মানচিত্র

মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকার রাতগুলো বড্ড অদ্ভুত। দিনের বেলায় যে কংক্রিটে লাখো মানুষের জুতোর তলায় পিষে যায় শতকোটি টাকার হিসাবনিকাশ, রাত বারোটার পর সেই ফুটপাতই হয়ে ওঠে বিশাল এক ছাদহীন সরাইখানা।

মকবুলের বয়স বাষট্টি ছুঁয়েছে। গত পনেরো বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে থাকা ফুটপাতের ঠিক আট বাই ছয় ফুট জায়গাটা তার দখলে। এই আটচল্লিশ বর্গফুটের ওপর তার কোনো দলিলের অধিকার নেই, কিন্তু তার নিজস্ব একটা মানচিত্র আছে।

প্রতিদিন রাত এগারোটায় ফুটপাতের চায়ের দোকানগুলো ঝাঁপ ফেললে মকবুল পকেট থেকে এক টুকরো সাদা চক বের করে। অত্যন্ত নিপুণ হাতে কংক্রিটের ওপর টানে কয়েকটা রেখা। মানুষের চোখে রেখাগুলো অদৃশ্য হলেও মকবুলের কাছে তা অলঙ্ঘনীয় সীমানা। একটা রেখার ভেতরে তার ঘুমানোর জায়গা — ওর ভাষায় ‘বেডরুম’। ঠিক ডানপাশে চকের আরেকটা ছোট বৃত্ত, সেখানে থাকে ছেঁড়া চটের ব্যাগ আর পানির বোতল — ওটা তার ‘সিন্দুক’। আর দেয়াল ঘেঁষে নিয়ন আলোর সরু ফালি যেখানে এসে পড়ে, ওটা হলো তার ‘বারান্দা’। মাঝরাতে সেখানে বসে সে বিড়ি টানে আর আকাশ দেখে।

মকবুল বিশ্বাস করে, নিজের বলতে একটা মানচিত্র না থাকলে মানুষ আর রাস্তার কুকুরের ভেতর কোনো তফাত থাকে না।

সেদিন রাতে চকের দাগগুলো গাঢ় করার সময় একটা ছোট ছেলে এসে দাঁড়াল তার ‘বারান্দা’র সীমানায়। বয়স বড়জোর নয় কি দশ। গায়ে ময়লা, হাঁটু-ঝুল ওভারসাইজড লাল টি-শার্ট। পায়ে জুতো নেই। শীতের হিমেল বাতাসে ঠকঠক করে কাঁপছে ছেলেটা, এক হাতে ধরা পলিথিনের ভেতর কয়েকটা পুরোনো রুটি।

“কী রে? খাড়াইয়া আছস ক্যান? রাস্তা মাপ!” — মকবুল ভুরু কুঁচকে ধমক দিল।

ছেলেটা দমল না। চকের দাগটার দিকে তাকিয়ে বলল, “এইহানে দাগ কাটছেন ক্যান? রাস্তা কি আপনার বাপের?”

মকবুল রেগেমেগে উঠে দাঁড়াল। “হ, আমার বাপের! এইটা আমার জায়গা। ওই দ্যাখ, কাল্লু মিয়ার জায়গা, তার ওইপারে ছমিরনের। এই ফুটপাতের নিয়ম আছে। যার যার সীমানায় সে থাকব। তুই নতুন আইছস, তুই ওই ডাস্টবিনের ওইপার গিয়া জায়গা খোঁজ। যা, ভাগ!”

ছেলেটা এক পা-ও নড়ল না। হঠাৎ মকবুলের ‘বেডরুম’-এর সীমানার ঠিক মাঝখানে বসে পড়ে পলিথিন থেকে একটা শুকনো রুটি বের করে চিবোতে শুরু করল।

রাগে গজগজ করতে করতে কলার ধরতে গিয়েও থমকে গেল মকবুল। নিয়ন আলোয় ছেলেটার মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ডান চোখের নিচে কালচে ছোপ, কেউ খুব জোরে মেরেছে। চোখের দৃষ্টিতে এমন এক আদিম ক্ষুধা ও ক্লান্তি, যা মকবুলের কাঠিন্যকে এক মুহূর্তের জন্য গলিয়ে দিল।

“নাম কী তোর?” — গলাটা খাদে নামিয়ে জিজ্ঞেস করল মকবুল।
“সাগর।” — রুটি চিবোতে চিবোতেই উত্তর।
“আইছস কই থেইকা?”
“কমলাপুর থেইকা। ওইহানে একটা লোক আমারে মারতো। তাই পলাইয়া আইছি।”

মকবুল দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই শহরটা প্রতিদিন এমন কত সাগরকে যে গিলে খায়, তার হিসাব নেই। সে তার ছেঁড়া চটের বস্তাটা বিছিয়ে দিল চকের দাগের ভেতর।

“আইজকার রাইতটা থাক। কাইল সকালে নিজের রাস্তা দেখবি। আর খবরদার, দাগের বাইরে পা দিবি না!”

সাগর কথা না বাড়িয়ে বস্তার এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার ভারী শ্বাসের শব্দ শোনা গেল। মকবুল ‘বারান্দায়’ বসে বিড়ি ধরাল। পনেরো বছর পর আজ তার আঁকা মানচিত্রে অন্য কেউ প্রবেশ করেছে। অনুভূতিটা বড় অস্বস্তিকর।

পরদিন সকালে সাগর গেল না। দুপুরে সস্তা ভাতের হোটেল থেকে খেয়ে ফিরে মকবুল দেখল, ছেলেটা তার সাদা চকটা দিয়ে ফুটপাতের ওপর আঁকিবুঁকি করছে।

“এই হারামজাদা! তুই আমার চক নিছস ক্যান?” — মকবুল ধমক দিয়ে উঠল।
সাগর হাসিমুখে তাকাল, “দ্যাখেন দাদু, আমি আপনার মানচিত্রটা ঠিক কইরা দিছি।”

মকবুল অবাক হয়ে দেখল, তার চকের দাগগুলোর পাশে সাগর আরও কিছু দাগ টেনেছে। ‘বেডরুম’-এর ঠিক পাশেই একটা ছোট ঘর, ঘরের চালে একটা পাখি। আর ‘বারান্দা’র পাশে একটা গাছ।

“এইগুলা কী?”
“এইটা আমার ঘর,” — সাগর চকের ঘরটার ওপর আঙুল রেখে বলল। “আমার তো কোনো ঘর নাই, তাই আইঁকা নিলাম। রাইতে এই ঘরের ভেতর ঘুমামু। আর এই গাছটার নিচে বইসা আপনে বিড়ি খাইবেন। রোদ লাগব না।”

মকবুলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। পনেরো বছর আগে, মেঘনা নদী যখন তার আস্ত গ্রামটাকে গিলে খেয়েছিল, তখন তারও একটা ছনের ঘর ছিল, ঘরের পাশে একটা পেয়ারা গাছ ছিল। নদীভাঙনে ভিটেমাটি আর বউ-বাচ্চা হারিয়ে মকবুল এই শহরে এসেছিল। তারপর থেকে সে কেবল কংক্রিটের ওপর চকের দাগ কেটে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে। অথচ এই ছোট্ট ছেলেটা একটা ভাঙা চক দিয়ে এক মুহূর্তে মকবুলের হারিয়ে যাওয়া গ্রামটাকে ফুটপাতের বুকে ফিরিয়ে এনেছে।

সেই থেকে সাগর আর মকবুলের অদ্ভুত এক সংসার শুরু হলো। সারাদিন প্লাস্টিকের বোতল কুড়াতো সাগর, আর সন্ধ্যায় এসে ঢুকে পড়ত মকবুলের মানচিত্রের ভেতর। মকবুল তাকে নিজের ভাতের ভাগ দিত। রাতের বেলা দুজনে চকের দাগের ভেতর শুয়ে আকাশ দেখত। মকবুল তাকে শোনাত মেঘনার গল্প, আর সাগর শোনাত কমলাপুর স্টেশনের ট্রেনের গল্প।

মকবুলের মনে হতো, এই পনেরো বছরে সে আসলে কোনো মানচিত্র আঁকতে পারেনি; সে শুধু একটা খাঁচা এঁকেছিল। সাগর এসে সেই খাঁচার দরজাটা খুলে দিয়েছে।

শীতের শেষে হঠাৎ করেই শহরজুড়ে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হলো। সিটি কর্পোরেশনের লোকজনের সাথে পুলিশ।

সেদিন বিকেলে মকবুল আর সাগর যখন ফুটপাতে বসে মুড়ি খাচ্ছিল, হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে পুলিশের গাড়ি আর বুলডোজার এসে থামল।

“উইঠা পড়! সব উইঠা পড়! ফুটপাতে কোনো দোকানপাট, বস্তা কিচ্ছু থাকব না!” — মাইকে কর্কশ ঘোষণা ভেসে এল।

ফুটপাতজুড়ে হাহাকার আর হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। কেউ চায়ের কেটলি গোছাচ্ছে, কেউ পলিথিনের তাবু গোটাচ্ছে। পুলিশের লাঠিপেটায় হুড়োহুড়ির মাত্রা আরও বেড়ে গেল।

“দাদু! আমারে ধরো!” — সাগর ভয়ে মকবুলের হাত জাপটে ধরল।
“ভয় নাই বাপ। আমি আছি।” — মকবুল এক হাতে ছেঁড়া চটের ব্যাগটা নিল, অন্য হাতে সাগরের হাত শক্ত করে ধরল।

দৌড়াতে শুরু করল তারা। কিন্তু মানুষের বাঁধভাঙা ভিড় আর ধাক্কাধাক্কিতে হঠাৎ সাগরের হাতটা ফসকে গেল।

“সাগর!” — চিৎকার করে উঠল মকবুল।

কিন্তু ভিড়ের স্রোতে হারিয়ে গেল ছেলেটা। পুলিশের একটা বুটের ধাক্কায় মকবুল ছিটকে গিয়ে পড়ল ফুটপাতের একপাশে। বিশাল বুলডোজার আর পানির তীব্র পাইপ দিয়ে ফুটপাতের ওপর জমে থাকা সব আবর্জনা ধুয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে।

মকবুল ফ্যালফ্যাল করে দেখল, পনেরো বছর আগে মেঘনার জল যেভাবে তার বাস্তুভিটা কেড়ে নিয়েছিল, ঠিক সেভাবেই আজ কর্পোরেশনের পানির তোড়ে ফুটপাতের ওপর সাগরের আঁকা ঘর, গাছ আর নিজের আঁকা বেডরুমের দাগগুলো ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে।

কংক্রিটের ফুটপাতটা আবার চকচকে, কালো আর নিখুঁত হয়ে গেল। কিন্তু মকবুলের মনে হলো, কেউ যেন তার বুকটা চিরে কলিজাটা উপড়ে নিয়েছে। তার মানচিত্রটা আজ চিরতরে মুছে গেছে।

রাত তখন দুটো। পুরো ফুটপাত পরিষ্কার, শুনশান। কোথাও কোনো মানুষের চিহ্ন নেই। মকবুল একা বসে আছে দেয়াল ঘেঁষে। তার চোখে জল নেই, কেবল দৃষ্টিতে এক ভয়ংকর শূন্যতা।

হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ছোট ছায়া গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এল।

“দাদু...”

মকবুল চমকে মাথা তুলল। সাগর। ছেলেটার লাল টি-শার্টটা জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে, হাঁটুতে কালশিটে। কিন্তু সে ফিরে এসেছে। মকবুল পাগলের মতো দু'হাত বাড়িয়ে ছেলেটাকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিল। বাষট্টি বছর বয়সী রুক্ষ মানুষটা ডুকরে কেঁদে উঠল দশ বছরের এক পথশিশুর কাঁধে মাথা রেখে।

“তুই কই গেছিলি রে বাপ? আমি তো ভাবছিলাম তুই আর ফিরবি না!”

সাগর মকবুলের বুক থেকে মাথা তুলে ফুটপাতের সেই পরিষ্কার, কালো কংক্রিটটার দিকে তাকাল। সেখানে কোনো চকের দাগ নেই।

“দাদু, আমাগো ঘরটা তো তারা ধুইয়া দিছে। এহন আমরা কই ঘুমামু?” — সাগরের গলায় চাপা কান্না।

মকবুল নিজের ফতুয়ার হাতা দিয়ে সাগরের চোখের জল মুছে দিল। খুব শান্ত গলায় বলল, “ঘর ধুইয়া দিছে তো কী হইছে বাপ? চক দিয়া কি আর ঘর বানানো যায়? মানচিত্র তো মাটির উপরে থাকে না রে বাপ, মানচিত্র থাকে বুকের ভেতর।”

মকবুল তার হাতটা সাগরের বুকের বাঁ-পাশে রাখল, যেখানে ছোট্ট হৃৎপিণ্ডটা ধুকপুক করছে।

“এই যে, এইটা হইলো আমার ঘর। আর আমার বুকের ভেতর যেইটা ধুকপুক করতাছে, ওইটা হইলো তোর ঘর। পুলিশ ফুটপাত ধুইতে পারে, কিন্তু মানুষের বুকের ভেতরের দাগ মুছব কেমনে?”

সাগর হাসল। সেই হাসিতে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো ভয় নেই।

শীতের সেই রাতে, ঢাকা শহরের সবচেয়ে ব্যস্ত ফুটপাতের ওপর দুজন শেকড়হীন মানুষ কোনো চকের দাগ ছাড়াই একটা নতুন মানচিত্র তৈরি করে ফেলল। যে মানচিত্রে কোনো সীমানা নেই, কোনো দেয়াল নেই; আছে কেবল একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের চরম নিঃস্বার্থ এক অস্তিত্বের বুনন।

মানুষ হওয়ার আগে এভাবেই হয়তো কখনো কখনো নিজের সব অধিকার মুছে ফেলে, কংক্রিটের বদলে অন্য একজন মানুষের ভেতর নিজের স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নিতে হয়।




আপনার প্রতিক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

প্রতিক্রিয়া দেওয়ার নিয়ম

আপনি এই সংখ্যায় আপনার পছন্দের সব লেখাতেই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন। তবে একটি লেখায় সর্বোচ্চ ২টি ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেওয়া যাবে। একই লেখায় তৃতীয় প্রতিক্রিয়া নির্বাচন করলে, প্রথমে নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং নতুন প্রতিক্রিয়াটি গণ্য হবে। আপনার প্রতিটি প্রতিক্রিয়া লেখকদের অনুপ্রেরণা জোগায় এবং বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি আপনার সমর্থনকে তুলে ধরে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের কার্তিক ১৪৩৩ সংখ্যাটি ১ নভেম্বর ২০২৬ (১৪ই কার্তিক) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ অক্টোবরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
গঠনমূলক পরামর্শ দিন
মন্তব্যে আপনার মতামত জানান
0 0 ভোট
স্টার
guest
5 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
Scroll to Top

‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।