পাড়ার বাপনের বয়সী ছেলেরা যখন পরিবারের পাঁচশ টাকার নোট জমা করতে ব্যাংকে লাইন দিচ্ছে, বাপন তখন মশকরা করে ওদের একজনকে বলছে, "তোর বাবারও কালো টাকা আছে?" মদনের ফুরসত নেই তার কাছে থাকা বাতিল নোট জমা দেওয়ার। তার কাছে তিনটি পাঁচশ টাকার নোট আছে। নিতার কাছে পাড়ার ছেলেদের কথা শুনে মদন ছেলেকে বলে, "বাবা, তুই আমার কাছে থাকা পাঁচশ টাকার নোটগুলো জমা দিয়ে আসবি?" উত্তরে বাপন বলে, "তোমারও কালো টাকা আছে?" মদন গলা চড়িয়ে বলে, "হারামজাদা, জানিস এই টাকা রোজগার করতে কতটা শ্রম দিতে হয়?" মা নিতা বলে, "তুমি একদম মুখ খারাপ করবে না বলে দিচ্ছি।"
পড়াশোনায় মন বসেনি বাপনের। কোনোরকমে উচ্চমাধ্যমিক পাস দিয়ে সে রণেভঙ্গ দিয়েছে। সময় বয়ে যাচ্ছে নদীর মতো। পাড়ার ওর বয়সী অনেকে যখন পরিবারের অভাব মেটাতে কিছু না কিছু করছে, অকর্মণ্য বাপন তখন বন্ধুদের ঠেস মারা কথা সামলাচ্ছে। বন্ধুরা জানতে চাইছে, "তোর ফুটানির টাকা আসছে কোথা থেকে? আমাদের কালো টাকা কি তোদের ঘরে ঢুকেছে?"
বাপন ভাবতে শুরু করে, তার কিছু করা উচিত। কিন্তু কী করা উচিত ভাবতে গেলেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বাবা মদন অ্যাপ ট্যাক্সির যুগে আজও হলুদ ট্যাক্সি নিয়ে যুঝে চলেছে। বাবার কাছে সে শুনেছে, হলুদ ট্যাক্সি চালাতে ছিপ ফেলে বসার অটুট ধৈর্য লাগে। পরের পুকুরে চুরি করে বসলে গালমন্দ খেতে হতে পারে, টাকার খেসারত দিতে হবে না। স্টিয়ারিং হাতে দেখতে হয় কখন পুলিশ কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে। জায়গামতো অপেক্ষা করে যাত্রী তুলতে হবে। এক-একটা সওদা মানে লটারি লাগার সুখ। তার ওপর আছে পাবলিকের কটু ভাষ্য।
বাপন চায় সম্মানের কাজ, সঙ্গে চটজলদি রোজগার। ট্যাক্সি চালানোর হ্যাপা তার পোষাবে না। মদনের কাছ থেকে ইদানীং হাতখরচের টাকা নিতে তার বাধছে। বহু মানসিক বাধা কাটিয়ে বাপন হাজির হয় বাবার কাছে। মদনের সঙ্গে শলা করে সে ড্রাইভিং শেখে। কিছুদিনের মধ্যে বাবা তাকে একটা হলুদ ট্যাক্সিও জুটিয়ে দেয়। কিন্তু মুন্সিয়ানার অভাবে, দিনে যা কাজ হয়, মালিককে চোকাতেই তা প্রায় শেষ হয়ে যায়। ঘরে কিছু ঢোকে না।
সংসারে টাকা না ঢুকলেও বাপন আর বাবার কাছে হাত পাতে না। ভাবলে এটুকুই মদনের শান্তি। কিছুদিনের মধ্যে মদন বুঝতে পারে, হলুদ ট্যাক্সি চালানো বাপনের কাম নয়। কোনো এক যাত্রীর সঙ্গে ঝামেলা, মারামারি করে কোর্টে উঠতে হয় বাপনকে। এত বছরে এমন ঘটনার মুখোমুখি মদনকে কোনোদিন হতে হয়নি।
মদনের এই লাইনে সুনাম আছে। সে সময়ের মূল্য দিতে জানে। সে নম্র, মহল্লার লোক দরকারে তাকেই ডাকে। তাই এই অ্যাপভিত্তিক বাজারে সে টিকে গেছে। মদন খোঁজ করতে থাকে। বাপনকে সে সৎ পথে উপার্জনের রাস্তা দেখাতে চায়। খুলে যায় সিমসিম। মদনের পরিচিতি হঠাৎ করে বাপনের জীবনের নতুন রাস্তা খুলে দেয়।
একটি এনজিও মদনের কাছে অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভারের সন্ধান চাওয়ায় মদন নিজের ছেলের কথা বলে। ওরা বাপনের সঙ্গে কথা বলে ড্রাইভার হিসেবে বাপনকে নিতে রাজি হয়। যদিও ওরা বাপনকে মনে করায়, "মদনদার কথা রাখতেই তোমাকে নেওয়া। আশা করি তুমি বাবার মান রাখবে।"
রোজের অর্জিত ভাড়ার ৩০ শতাংশ বাপন পাবে। ভাড়া মিললে বাপন খুশি হয়, টাকা না মিললে দুপক্ষেরই ভাঁড়ার শূন্য। এখন আর এখানে-ওখানে ঝুঁকি নিয়ে বসে থাকতে হয় না তাকে। একটা হ্যাপা শুধু রয়ে গেল — ট্রলি নিয়ে রোগী নামানো-ওঠানো করা। কী আর করবে? মন দিয়ে কাজ করে যাওয়াই শ্রেয় ধরে নেয় সে।
বাপনকে এখন এনজিওর অফিসে বসে থাকতে হয়। দূরত্ব অনুসারে ভাড়ার হিসাব চার্টে দেওয়া আছে। ওয়েটিং চার্জ আলাদা। বাপনের ভালোই আমদানি হতে থাকে। মদনের পারিবারিক খাবারের জোগানে এখন কমদামি ভোলা-ভেটকির বদলে ভেটকি, পাবদা জুটছে মাঝেমধ্যে। বছরে কম করে এখন দুবার মাটন আসে। মায়ের খোঁটায় বাপ মদন বিদ্ধ হয় — "তোমার মুরোদে কোনোদিন পাঁঠার মাংস ঘরে ঢোকেনি।" মদন হাসে, কিন্তু কিছু বলে না।
ছুটছে অ্যাম্বুলেন্স পিজি, মেডিক্যাল, আরজিকর। অসহায় রোগীর পরিবার। গাড়ি যত দৌড়াবে, বাপনের পকেট তত ভরবে। কলকাতার অলিগলি বাপনের এখন আর অচেনা নয়। কখনও সখনও বাপনকে প্রাইভেট নার্সিংহোম বা হাসপাতালেও যেতে হত। কিন্তু মফস্বলের প্রান্তে থাকা গ্রামবাসীর হাতে টাকা কোথায়? প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে তারা ফতুর হয়ে যাবে।
রোগীদের প্রয়োজনেই বাপনকে আঁতাত করতে হয় সরকারি হাসপাতালের দালালদের সঙ্গে। রোগীকে ফিরতে হয় না। এতে উভয়েরই ভালো। কিছু টাকা দালালকে দিলে নিখরচায় চিকিৎসা পাওয়া যায়। বাপনেরও কিছু হয়। বাপন বেশ ফুর্তিতে আছে। বেশি বেশি কাজ মানে বেশি বেশি টাকা। রাতে কাজ এলে চার্টের বাইরে গিয়ে উপরি রোজগার। এই টাকায় চালকের বেশি অধিকার। সংস্থাকে কম টাকা দিতে হয়। ডাক আসতেই থাকে, বাপন কাউকে ফেরায় না।
অন্যের সর্বনাশের মূল্যে নিতার ঘরে পৌষমাস এসেছে। বাপনের মা নিতা আর দেরি করতে চায় না। সে চায় বাপনের বিয়ে দিতে। বাপনও রাজি হয়ে যায়। ঘরের লক্ষীমন্ত বউ আসে, নাম তার সুলতা।
বছর খানেকের মধ্যে মদন দাদু হয়। বাপনের ছেলে দুনিয়ায় আসতে বাপনের পকেট থেকে প্রায় কিছুই খরচা হয়নি। জননী সুরক্ষা যোজনায় রিকবাবু, বাবার সঙ্গে মায়ের কোলে চেপে ঘরে এসেছেন সরকারি গাড়িতে। আজ জন্মের ষষ্ঠ দিন এবং ঘটনাচক্রে আজ বুধবার। বাপনের মতে, বৃহস্পতিবার রিক জন্মেছে। বৃহস্পতিবার বাড়িতে ধুমধাম করে ষষ্ঠীপুজো হয়। মা ষষ্ঠীর কৃপা পেতে শঙ্খ, কাঁসর-ঘণ্টা এবং উলুধ্বনিতে মেতে ওঠে ঘর। যার মঙ্গলে এতসব, সে বেচারা কেঁদে কেটে সারা।
বাপন বেশ ফুলেফেঁপে উঠছে। ওদিকে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পের কৃপায় এখন জনগণ ভাবছে, বছরে তাদের নামে পাঁচ লক্ষ টাকা নগদ জমা আছে সরকারের ঘরে। কোনো চিন্তা নেই। বড় বড় হাসপাতাল এই প্রকল্পে যোগ দিয়েছে। মানুষের অনেক দিনের সাধ — হোটেলের মতো ঝকঝকে হাসপাতালে পরিজনকে নিয়ে গিয়ে সুস্থ করে ঘরে ফেরানো।
মদনের বন্ধু রমেন একদিন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। রমেনবাবুর ছেলে বাবুয়া ইন্টারনেট দেখে বিখ্যাত কার্ডিয়োলজিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। বাপনের গাড়ি ছোটে বাইপাসের দিকে। বাপন বলে, "তোরা আমার সাহায্য নিতে কুণ্ঠিত বোধ করিস না। আমি যে কোনো সরকারি হাসপাতালে কাকাকে ভর্তি করিয়ে দিতে পারি।"
অর্ধেক টাকার পরিমাণ জেনে বাবুয়া ভাবে, শালা স্বাস্থ্যসাথী কার্ড থাকলেও এখানে চিকিৎসা করানো অসম্ভব ছিল। সে তাকায় বাপনের দিকে। বাপন বলে, "ডরো মাত দোস্ত।" গাড়ি ছুটতে থাকে উত্তরপাড়ার এক নার্সিংহোমের উদ্দেশ্যে। বাপন জানে, ঘাম ঝরানো রক্ত এরাও চোষে, তবে তা পরিমাণে কম। এখানে ভালো ডাক্তারও আছে।
ভর্তি হয়ে যান রমেনবাবু। ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে বাবুয়া আশ্বস্ত হয়ে বিড়িতে দম দেয়। বাপন বলে, "ঘর চল, আর এখানে থাকার দরকার নেই।" ঠিক সেই সময় হাসপাতালের সিকিউরিটি এসে বাপনকে ডেকে নিয়ে যায়। বাবুয়ার টেনশন বেড়ে যায়। বাবুয়া আরও একটা বিড়ি ধরায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাপন ফিরে আসে।
বাবুয়া জিজ্ঞেস করে, "কী এমন হলো, তেমন ভয়ের কারণ নেই তো?"
বাপন "তেমন কিছু নয়" বলে এড়িয়ে যায়। লেখাপড়া শিখেও আজ অবধি বাবুয়ার কপালে জুতসই চাকরি জোটেনি। শেষমেশ প্রাইভেট টিউশনিকেই সে জীবিকা হিসেবে বেছে নিয়েছে। রোজগার সামান্যই। আজ হাসপাতালে দশ হাজার টাকা জমা দিতে হয়েছে। কাল তাকে আরও বিশ হাজার টাকা জমা করতে হবে।
বাবুয়া ভাবে, শালা, বাপনের কথা শুনলেই হয়তো ভালো হতো। বাবুয়া বলে, "দেখিস একটু কমসম যাতে হয়।"
একটু ভাব নিয়ে বাপন বলে, "শালা, বাড়িতে বসে কী ছিঁড়িস? একটা স্বাস্থ্যসাথী কার্ড করাতে পারিসনি?"
বাবুয়া এমন ভঙ্গি করে যেন এই কার্ড করা অগণতান্ত্রিক কোনো কাজ। বাপন বলে, "এটা সরকারি প্রকল্প, কোনো দলের সম্পত্তি নয়।"
এই কথার উত্তরে অনেক রাজনৈতিক কথা বাবুয়া বলে চলে। বাপন আনমনা, সে কিছুই শোনে না। বাবুয়া বলে, "চুপ মেরে গেলি যে বড়? উত্তর দে।"
উত্তর দেবে কী, বাপন এই প্রথম কাকের মাংস খেল। তার হজম হতে সময় লাগছে। গাড়ি থেকে নামার সময় বাপন বলে, "সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা তোরা কেউ নিলি না, অথচ দেখ, ওরা কেমন ভরসা করে লেগে থেকে কাজ আদায় করে নেয়।"
"ওরা কারা?" বুঝতে না পেরে বাবুয়া জিজ্ঞেস করে।
বাপন বলে, "নাঃ, আমরা ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখতে পারলাম না। আমার মনে হয় প্রকৃত হিন্দু হওয়া খুব জরুরি।"
বাবুয়া বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করে, "কী হিজিবিজি বলছিস?"
বাপন জিজ্ঞেস করে, "তুই ঈশ্বরে বিশ্বাস করিস?"
বাবুয়া ঘাড় নেড়ে সমর্থন জানায়। বাপন বলে, "তাহলে পারলি কই কাকুকে বিশ্বাস করে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করতে? মুসলমানদের কিন্তু আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস আছে। হিন্দুরা বেইমান।"
বাবুয়া ভাবে, মদন কাকু একজন বামপন্থী কর্মী, এ কি তার ছেলে! কী জানি বাবা, কোন ভূত কখন কার ঘাড়ে চাপে, কেউ জানে না।
রিক স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে। সুলতার ইচ্ছে, রিক লেখাপড়া শিখে মানুষ হোক। বাপের মতো ট্রলি ঠেলা অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার যেন না হতে হয়। বাপন শুনে কষ্ট পায়। তবে সেও চায় রিককে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতে। এখন আর স্কুলে বাপ-মায়ের সাক্ষাৎকার ইংরেজিতে নেওয়া হয় না। পারিবারিক বার্ষিক আয় জানতে পারলেই রেক্টর খুশি।
বাপনকে ব্যাংকের পাসবই দেখাতে হয়। এখন একজন অ্যাম্বুলেন্স চালকও ইউপিআই, কিউআর কোডে টাকা নেয়। বাপনের মাসের কমিশন আসে অনলাইনে। উন্নয়নের এই জোয়ার বাপনের ভালো লাগে। শুধুমাত্র মোবাইলে উড়ে যাবে, আসবে টাকা। এই তো সেদিন ছেলের জন্য বিখ্যাত এসএস ক্রিকেট ব্যাট এল উড়ে যাওয়া টাকায় ভর করে।
বাপন ছেলে-বউ নিয়ে মাঝেমধ্যেই আজকাল বেড়াতে যাচ্ছে। নিতা মদনকে ঠেস মারে, "তুমি, বাপন — দুজনেই ড্রাইভার, অথচ মুরোদে কত তফাত। তুমি আজ অবধি একবার পুরী ছাড়া আমাকে কোথাও নিয়ে যাওনি। আর ওদের কাশ্মীর, সিমলা সব ঘোরা হয়ে গেল।"
মুখ খুলতে বাধ্য হয় মদন। সে বলে, "এক পরিবারে আমাদের বাস। বাপ-মাকে এক-আধবার সঙ্গে নেওয়া ছেলের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।"
কথা বাড়তে পারে ভেবে মদন রাস্তায় বেরিয়ে যায়। কাশ্মীর থেকে ছেলে ফিরে মদনের হাতে একটা কাঠের চাবির রিং তুলে দেয়।
"এটা কী হবে?" জিজ্ঞেস করলে বাপন বলে, "তোমাকে কোনো না কোনোদিন একটা গাড়ি আমি কিনে দেব।"
মদন বুঝেই উঠতে পারে না, একজন অ্যাম্বুলেন্স চালক কী করে এমন কথা উচ্চারণ করতে পারে।
ফের ছুটতে থাকে বাপনের অ্যাম্বুলেন্স। টুংটাং শব্দ মোবাইলে আসতে থাকে। বাপনের রোজগার বাড়ছে ভাটাহীন জোয়ারের টানে। তাকে আর সরকারি হাসপাতালের পথ বড় একটা মাড়াতে হয় না। একান্ত পকেটমড়ারা ছোটে সরকারি হাসপাতালে। যাদের দু-পয়সা আছে, তারা এখন নার্সিংহোমে যায়। বড় প্রাইভেট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ হারামির হাড়। সরকারি আমলাদের পয়সা খাইয়ে তারা লম্বা-চওড়া বিল পাশ করায়, আবার কাস্টমারেরও গাঁট কাটে।
বাপন জানে কোন কায়দায় নামীদামি ডাক্তাররা টাকা খ্যাঁচে। খুব পরিচিত রোগী পরিবার হলে সে বলে, "সাবধানে ডিল করবে। ডাক্তার প্রথমেই বলবেন, আমি স্বাস্থ্যসাথী স্কিমে অপারেশন করি না। আমি অপারেশন করলে হাসপাতাল খরচের বাইরে ষাট-সত্তর হাজার টাকা নগদ দিতে হবে। তোমরা ঘাবড়াবে না, বলবে আমরা এই টাকা দিতে পারব না।"
কেউ বাপনের অভিজ্ঞতার মূল্য দেয়, কেউ সাধ্য মতো সমর্পণ করে কর্তৃপক্ষের বাকচাতুর্যে। কাঁচা নগদ টাকা আয় বাপনের অপছন্দের বিষয়। সে চায় সব টাকায় ব্যাংকের অনুশাসন।
বাপনকে সুলতার বাবা বলেছেন, "এবার একটা অ্যাম্বুলেন্স কেন। নিজের অ্যাম্বুলেন্স হলে একশ শতাংশ লভ্যাংশ তোমারই থাকবে।"
বাপন বলে, "না, সংস্থা একটা থেকে দুটো অ্যাম্বুলেন্স কিনুক। সব ঝুঁকি ওদের, আমার নাগড়িতে শুধু নিট লাভের গুড় জমবে। তবে আমি একটা BMW বাইক কিনব। আমার বহুদিনের সাধ।"
শ্বশুর জামাইয়ের বৈষয়িক বুদ্ধিতে খুশি হয়। ব্যাংক থেকে ধার করা টাকায় BMW এসে পড়ে বাড়িতে। অ্যাম্বুলেন্স গ্যারেজেই বাইক থাকে। খোলা আকাশের নিচে বাপন তার সাধের গাড়ি রাখবে না।
নিতার দিল আজ খুশ। বাইকে এক চক্কর দিয়ে সে তৃপ্ত। সে ভাবতেই পারে না, তার ভাগ্যে এত কিছু লেখা ছিল। নিতার মনের রং আজ মদনকে ঠেস দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। সে বলে, "ভেবে দেখো, জীবনে তুমি আমায় কী দিতে পেরেছ?"
মদন উত্তর করে না। সে শুধু বুঝে উঠতে চায় ছেলের শ্রীবৃদ্ধির রসায়ন।
আজ রিকের পরীক্ষা। তাড়াতাড়ি রিককে পৌঁছে দিয়ে গ্যারেজে যাবে বাপন। তাড়াহুড়োর মধ্যে দুবার ফোন বেজে গেছে। বাপন শুনতে পায়নি। বাপন গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বাঁকের মুখে বড় রাস্তায় ওঠার আগে ফোনটা ফের বেজে ওঠে। বাপন দাঁড়িয়ে ফোনটা নেয়। পার্টি এখুনি চাইছে তাকে। বাপন বলে, "কম করে আধঘণ্টা লাগবে।"
পার্টি নাচার, ওদের বাপনকেই লাগবে। ফোন রেখে বাপন তার ECU এক্সিলেটারকে বলে ছুটতে। শক্তিশালী ইঞ্জিন রকেটের মতো বড় রাস্তায় উঠে আসে। একটা সাদা হাতি ছুটে আসছিল তীরবেগে। টাল সামলাতে না পেরে হাতিগাড়ি আছড়ে পড়ে বাইকের ঘাড়ে। রিক এবং বাপন উভয়েই ছিটকে পড়ে।
বাপন লাফিয়ে উঠে দেখে, রিকের মাথা ফেটে অঝোরে রক্ত বের হচ্ছে। রিককে তুলে, একটা টোটো জোগাড় করে গ্যারেজে পৌঁছে যায় বাপন। সুলতা বাপনের ফোন পেয়ে আলুথালু অবস্থায় গ্যারেজে এসে হাজির হয়।
সুলতার ভর্ৎসনায় বিদ্ধ হওয়ার আগেই বাপন একেবারে চুপ মেরে গেছে। তার লক্ষ্য তাড়াতাড়ি ছেলেকে চিকিৎসা দেওয়া। অ্যাম্বুলেন্স এক দৌড়ে বিখ্যাত এক কর্পোরেট নিউরো হাসপাতালে পৌঁছে যায়। এই হাসপাতালে বাপন কোনোদিন আসেনি। এখানকার নিউরো সার্জনরা কলকাতার মুখ, যাদের টানে বাংলাদেশ থেকেও রোগী আসে।
রিক বাপ-মায়ের সম্পদ। প্রয়োজনে নতুন BMW বেচে দেবে বাপন। এতদিনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ বাপন ভিতরে ভিতরে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তার মনে হচ্ছে অভিশপ্ত BMW গাড়িটা লাথি মেরে ভেঙে ফেলি।
সুলতা ছেলেকে এমার্জেন্সিতে নিয়ে গেছে। সেখানে নেমে এসেছেন বিখ্যাত ডাক্তার অনির্বাণ সাহা। তিনি রোগীকে এমআরআই করতে পাঠিয়ে ওটি রেডি করতে বলেন। তিনি আরও বলেন, "এই অপারেশনের খরচ প্রায় চার লক্ষ টাকা। ডাক্তারের চার্জ আলাদা। স্বাস্থ্যসাথী থাকলেও ডাক্তার, অ্যানেস্থেটিস্টের চার্জ দিতে হবে নগদে, পরিমাণ এক লক্ষ টাকা। আর হাসপাতাল নেবে দু'লক্ষ, যার জন্য হেল্প ডেস্কে যেতে হবে।"
তাড়াহুড়োয় সুলতা মোবাইল আনতে ভুলে গেছে। সে বাপনের মোবাইল তার সঙ্গে নিয়েছে। রিক জ্ঞান হারিয়ে কথা বলতে পারছে না। রিকের অপারেশন হবে শুনে যন্ত্রণাহত বাপন দূরে অ্যাম্বুলেন্সে বসে আছে। অনর্গল ফোন আসছে অচেনা নম্বর থেকে। সম্ভবত রোগীপক্ষের তরফ থেকে অ্যাম্বুলেন্স সহায়তার অনুরোধ আসছে।
বিরক্ত সুলতা অচেতন রিককে অপারেশন থিয়েটারে পাঠিয়ে ফোন মিউট করে হেল্প ডেস্কে পৌঁছায়। সেখানে এক্সিডেন্ট রিপোর্ট লিখছেন আরএমও। কোথায়, কখন, কীভাবে দুর্ঘটনা ঘটেছিল তার বিবরণ দিতে হয় সুলতাকে। ডেস্কের একজন জিজ্ঞেস করেন, অ্যাম্বুলেন্স নম্বর, ড্রাইভারের ফোন নম্বর। সুলতা উগরে দেয় সব তথ্য। অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার যে ছেলের বাবা, তা জানাবার প্রয়োজন বোধ করে না সে।
তার আশু কাজ হলো আজকের মধ্যে ডাক্তারের এক লক্ষ নগদ টাকা জমা করা। সুলতাকে হাসপাতালে রেখে ব্যাংকে ছোটে বাপন। ডাক্তার নগদ টাকা নেবে। বাড়ি ঢুকতেই বাপ-মায়ের হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হয় বাপন। মদন বলে, "আমি জানতাম।"
ক্ষুব্ধ নিতা মুখ ঝামটা দিয়ে বলে, "কী জানতে?"
অসহ্য পরিবেশ ছেড়ে চেকবই নিয়ে বাপন রওনা দেয়।
ওদিকে ডাক্তার ওটি থেকে বেরিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, অপারেশন সফল। তবে বাহাত্তর ঘণ্টা না কাটলে রোগী ফিরবে কিনা বলা যাচ্ছে না। ফোন সুলতার কাছে। সে ভেবে পায় না, কীভাবে সে বাপনকে খবর দেবে? কথার ফাঁকে টাকার কথাও জানিয়েছেন ডাক্তার। সে নিয়ে সুলতার কোনো চিন্তা নেই।
দশদিন পার হয়ে গেছে। রিকের শরীরের খুব যে উন্নতি হয়েছে, তা বলা যায় না। সুলতা একদম ভেঙে পড়েছে। ডাক্তারের বলা টাকার গণ্ডি পার হয়ে বাপনের ব্যাংক ফেল হওয়ার জোগাড়। টাকার প্রয়োজন হলে বাপন আর দিতে পারবে না। সে ভাবে, বাবাকে বলে দেখতে হবে।
ডেস্কে থাকা মানুষটি বলেন, "কিছু বলবেন?"
বাপন ফোনটা বাড়িয়ে দেয় ভদ্রলোকের হাতে। মুখে বলে, "আমি আগামীকাল একসাথে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে দেব। দেখুন, আমার ব্যাংকে আমার কোনো শুভানুধ্যায়ী ক্রেডিট করেছে সাতাশ হাজার আটশো টাকা।"
ভদ্রলোক দেখেন:
"Greetings from NSBC Hospital.
Here are your calculations:
1. 2% for Swasthya Sathi scheme, i.e., Rs 7800
2. 10% commission with extra charges, i.e., Rs 20,000/-
A total of Rs 27,800 has been credited to your account via Google Pay."
ভদ্রলোক বুঝে নেন, এই ব্যাংক ট্রান্সফার কিছুক্ষণ আগে তিনিই করেছেন। অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের বরাদ্দ কমিশনের হিসেব। ফ্যালফ্যাল করে বাপনের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন তিনি।
বাপন জিজ্ঞেস করে, "বলুন না, কী হয়েছে? আমার ছেলে বেঁচে আছে তো?"
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।