যে জঙ্গলের নামের সঙ্গেই 'টাইগার রিজার্ভ' শব্দ দুটি জড়িয়ে আছে, সেই জঙ্গলের মাঝখান দিয়েই যখন গাড়ি চলছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভেতর বসে থাকা যাত্রীদের সবার মনে একটাই আশা থাকবে — হয়তো একটা বাঘ দেখা যেতে পারে।
উটি থেকে মাইসোর যাওয়ার পথে মুদুমালাই টাইগার রিজার্ভে প্রবেশ করার পর আমাদের অবস্থাও হয়েছিল ঠিক তেমনই। অবশ্য গত বছরেই কানহা টাইগার রিজার্ভে বাঘ দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। তবে ওই ভয়ঙ্কর সুন্দর ডোরাকাটা বেড়ালটা আরেকবার দেখার আশা নিয়েই মুদুমালাইএর রাস্তা ধরা।
দুপাশে ঘন অরণ্য, মাঝখান দিয়ে পিচঢালা পথ। রাস্তা যেন জঙ্গলের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। মানুষ এখানে অতিথি; আসল অধিকার অন্য কারও।
ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে একবার এই পথ দিয়ে গিয়েছিলাম। সেই সফরের 'অরণ্যের দিনরাত্রি' আজ আর স্পষ্ট মনে নেই, কিন্তু মুদুমালাই জঙ্গলের রহস্যময় পরিবেশ আর বন্যপ্রাণী দেখার উত্তেজনা মনে রয়ে গিয়েছিল।
গাড়ি এগোচ্ছিল মাঝারি গতিতে। কোথাও হরিণের দল বিশ্রাম নিচ্ছে, কোথাও রাস্তার ধারে আমরা বানরের দলকে দেখে মজা পাচ্ছি, আর বানরের দল আরও বেশি কৌতুকভরে আমাদের দেখছে। মাঝেমধ্যে নানা রঙের পাখিও চোখে পড়ছিল। কিন্তু আমরা সবাই মনে মনে অরণ্যের অন্য এক বাসিন্দার অপেক্ষায় ছিলাম। কারণ ওই একটাই — শেষ পর্যন্ত এটি তো একটি টাইগার রিজার্ভ।
আমার মেয়ে মিশকাও বারবার প্রশ্ন করছিল, “বাঘ কই মা?”
আমি হলাম 'গ্লাস অর্ধেক ভরা' দলের সদস্য। মানে খুবই আশাবাদী। জঙ্গলের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি ঝোপ, প্রতিটি খোলা জায়গা আমার কাছে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে সামনে আসছিল। কিন্তু সময় যত এগোতে লাগল, বাঘ দেখার আশা ততই ক্ষীণ হতে শুরু করল।
ঠিক তখনই হঠাৎ মিশকার চিৎকার। “ওটা কী?”
গাড়ির ভেতরে সবাই একসঙ্গে জানালার দিকে ঝুঁকে পড়লাম। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, এ কি তবে সেই প্রতীক্ষিত বাঘ?
না। বাঘ তো আকারে অত বড় হবে না! তার ওপর ধূসর রঙের!
গাড়িটা একটু এগিয়ে যেতেই পরিষ্কার হলো — রাস্তা থেকে মাত্র কিছুটা দূরেই জঙ্গলে দাঁড়িয়ে একটি হাতি।
কিন্তু বিস্ময় এখানেই শেষ হয়নি।
গাড়ি আরও কাছাকাছি যেতেই দেখা গেল, হাতিটা একা নয়। তার পাশে আরও কয়েকটি হাতি। তারপর আরও। তারপর ছোট ছোট শাবক। মুহূর্তের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল, আমরা একটি পুরো হাতির দলের সামনে এসে পড়েছি।
বাঁক ঘুরতেই বোঝা গেলো, হাতিগুলো আসলে রাস্তার বেশ পাশেই। ছোট ছোট চারাগাছ আর ঘাস ছিড়ে খাচ্ছে। শাবকগুলো মায়েদের আড়াল থেকে কৌতূহলী চোখে আমাদের দেখছে। এত কাছ থেকে তাদের স্বাভাবিক আচরণ দেখার সুযোগ সত্যিই বিরল।
মিশকার মুখের অভিব্যক্তি দেখার মতো ছিল। বড় বড় চোখ করে প্রাণভরে সেই দৃশ্যটাকে মনে গেঁথে নেওয়ার চেষ্টা আর একের পর এক প্রশ্ন — সব মিলিয়ে যেন বহু বছর আগের নিজেরই একটি প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছিলাম।
হয়তো এ কারণেই কিছু ভ্রমণ শুধু জায়গা দেখার জন্য মনে থাকে না। মনে থাকে কারণ তারা সময়কে এক অদ্ভুত বৃত্তে বেঁধে দেয়। একদিন যে শিশু এই জঙ্গলের মধ্যে বিস্ময়ে বন্যপ্রাণী দেখেছিল, বহু বছর পরে সে-ই আবার নিজের সন্তানের চোখে সেই একই বিস্ময় দেখতে পায়। আর তখন বোঝা যায়, সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলো কখনও সত্যিই হারিয়ে যায় না; তারা শুধু নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়।
তবু মুদুমালাইয়ের সেই বিকেলের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সেসবের তুলনা চলে না। কারণ এখানে হাতিগুলো কোনো প্রদর্শনীর অংশ ছিল না। তারা আমাদের দেখানোর জন্য কিছু করছিল না। তারা ছিল নিজেদের জগতে, নিজেদের নিয়মে। আমরা শুধু দূর থেকে সেই জগতের সাক্ষী হওয়ার সৌভাগ্যলাভ করেছিলাম।
না, এ যাত্রায় বাঘ দেখা হয় নি। কিন্তু বাঘ না দেখার আক্ষেপটাও মনে রইল না। বরং মনে হল, প্রকৃতি নিজের মতো করে আমাদের জন্য অন্য এক উপহার তুলে রেখেছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বি এ এবং হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে এম বি এ ডিগ্রির অধিকারী বিনীতা পন্ডিত তাঁর স্কুলজীবন থেকেই পারিবারিক ব্যবসার সাথে যুক্ত। কন্সালটেন্সি, মিডিয়া, এডুকেশন সংক্রান্ত বিভিন্ন কোম্পানির তিনি ডিরেক্টর। ভালোবাসেন পরিবারের সাথে ট্যুরে যেতে। সুইজারল্যান্ড থেকে কাশ্মীর, ঘোরা আছে প্রায় সারা পৃথিবী।