বিক্ষিপ্ত মনটাকে শান্ত করতে সমুদ্র-সৈকতে বসেছিলাম। কতক্ষণ, কে জানি! সহসা যন্ত্রণা-মুখর আর্তনাদ ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্র ক্ষোভ-গর্জনে চেতনা ফিরল। সামনে দাঁড়িয়ে এক অপূর্ব-দর্শন নারী! অসহায় গলায় বলল, "আমি সমুদ্র। এক ভয়াবহ যন্ত্রণায় আমার সর্বাঙ্গ অস্থির! সভ্য সমাজের শিক্ষিত নাগরিকবৃন্দ, তোমরা নীরব দর্শক হয়ে থেকো না!"
বোবা আমি, তাকিয়ে রইলাম সেই মূর্তির দিকে।
সে বলল, "আহা! আজ তো আবার তোমাদের বিশ্ব পরিবেশ দিবস! সারা পৃথিবী জুড়ে লোক-দেখানি গালভরা সংলাপ, সিনেমা-থিয়েটারের ডায়ালগ! চারিদিকে বড় বড় শপথ, শুধু হাততালি কুড়োবার ফন্দি।
দূরে, ওই দেখো। প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে মাথায় পলিথিন দিয়ে একজন পথচারী। ছবিটা দেখতে ওপর থেকে বেশ ভালো, কিন্তু আমার যন্ত্রণার শুরু ওই প্লাস্টিকের আবিষ্কার থেকেই। পলিথিন তৈরির সময় তোমাদের বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন — এ এক অতি সুফলদায়ী বস্তু; হালকা, সস্তা, জলে ভেজে না — আরও কত গুণ! প্লাস্টিকের তৈরি একটি ঢাকনা ৫০ বছর, জলের বোতল প্রায় ৫০০ বছর, মাছ ধরার নাইলনের সুতো ৬০০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। কিন্তু এর পিছনের মূল্যটা কি কখনও ভেবেছ?
আসলে তোমরা যে কোনো সুবিধাজনক জিনিস পেলেই তার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কথা ভুলে যাও। এখন বাজারে গেলে হাতে কাপড়ের ব্যাগ থাকে না। দোকানদাররা পলিথিনের ব্যাগ ধরিয়ে দেয়, ক্রেতারাও নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে যায়। কিন্তু সেই সুবিধার আড়ালেই লুকিয়ে থাকে সর্বনাশ। পলিথিনের জঞ্জালে রাস্তাঘাট ছয়লাপ হয়ে যাচ্ছে, সেগুলো নর্দমায় জমে শহরের জলনিকাশি ব্যবস্থা পঙ্গু করে দিচ্ছে। কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, দিল্লি — কোনো শহরই আর জলাবদ্ধতা ও নগর-বন্যার ভয় থেকে মুক্ত নয়।
অশুভ দিকগুলোর কথা ভেবেই সরকার বিভিন্ন জায়গায় প্লাস্টিক প্যাকেট, থার্মোকলের বাসনপত্র কিংবা অনুষ্ঠান-উৎসবে বেলুন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করছে। পেট্রোলিয়ামের উপজাত পলিয়েস্টার ও নাইলনজাতীয় বহু উপাদান পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু আইন কে মানে?
আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক হুঁশিয়ারি শুনবে? প্রতি মিনিটে প্রায় এক ট্রাকভর্তি প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে এসে পড়ছে। এই প্রবণতা চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যেই ওজনের দিক থেকে সমুদ্রে থাকা প্লাস্টিকের পরিমাণ সমস্ত মাছের সম্মিলিত ওজনকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। তখন নীল সমুদ্র নয়, থাকবে প্লাস্টিকের মহাসমুদ্র।
আচ্ছা, এই সেদিন স্পেনের কাবো দে পালোস উপকূলে যে অপ্রাপ্তবয়স্ক স্পার্ম হোয়েলটির মৃত্যু সারা পৃথিবীর টনক নড়িয়েছিল, জানো তার পাকস্থলী ও অন্ত্র থেকে প্রায় ২৯ কিলোগ্রাম প্লাস্টিক উদ্ধার করা হয়েছিল? বেচারা সেই প্লাস্টিক হজম করতে না পেরে মারা যায়। আর ইতালির সার্ডিনিয়া উপকূলে ভেসে ওঠা সেই মৃত গর্ভবতী স্পার্ম হোয়েলটির কথা শুনেছিলে? তার পাকস্থলী থেকে প্রায় ২২ কিলোগ্রাম প্লাস্টিক উদ্ধার করা হয়েছিল! ভাবতে পারছো? নিজের সঙ্গে সঙ্গে সে তার অনাগত সন্তানকেও বাঁচাতে পারেনি।
তবে শুধু কিন্তু তিমি নয়, জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির হিসাব বলছে — প্রতি বছর প্রায় এক লক্ষ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং দশ লক্ষেরও বেশি সামুদ্রিক পাখি প্লাস্টিক দূষণের শিকার হয়ে মারা যায়।
তোমাদের বিজ্ঞানীরা আরও জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে পাঁচ লক্ষ কোটিরও বেশি প্লাস্টিকজাত বস্তু সাগর-মহাসাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে গড়ে উঠেছে ‘গ্রেট প্যাসিফিক গার্বেজ প্যাচ’—প্লাস্টিক বর্জ্যের এক বিশাল ভাসমান স্তূপ, যার আয়তন প্রায় ১৬ লক্ষ বর্গকিলোমিটার। ভাবতে পারছ? একটি দেশের সমান আয়তনের প্লাস্টিকের নরক!
আর তোমরা যারা ভাবছো সমুদ্রের এই কান্না শুধু আমার একার, তারা ভুল করছো। প্লাস্টিক আজ খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে চক্রাকারে তোমাদের শরীরেই ফিরে আসছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় মানুষের ফুসফুস, যকৃত, রক্তপ্রবাহ, এমনকি গর্ভস্থ শিশুর প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তোমরা প্রকৃতিতে যে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছো, তা-ই খাবার আর নিঃশ্বাসের সঙ্গে আবার তোমাদের শরীরে ফিরে আসছে। এখনও বুকে হাত রেখে ভাবো, পৃথিবীকে তোমরা কোন রসাতলে নিয়ে যাচ্ছো!
ভালো কাজ সবাই একসঙ্গে কোনোদিন করেনি, করবেও না। তোমাদের রবীন্দ্রনাথ এক অসাধারণ সাহসিকতার বাণী দিয়ে গেছেন —
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে,
তবে একলা চলো রে।
সেই বাণীকে মাথায় রেখে যদি এখনই পৃথিবীকে বাঁচানোর পথ না খোঁজো, তবে একদিন এই গ্রহ তোমাদেরও বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে।"
পরমুহূর্তে এক বিশাল ঢেউ এসে তীর ভিজিয়ে দিয়ে ফিরে গেল। আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম, আর দূরে সমুদ্রের গর্জনের মধ্যে যেন শুনতে পেলাম তার শেষ আর্তনাদ।
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।