১
নিশিবালাদেবী শাড়ির আঁচলটা বাঁ-কাঁধ থেকে টেনে ডান-কাঁধ হয়ে বুকে ঢেকে নিলেন। একটু শীত শীত করছে তাঁর। বসন্তের এই শুরুর সময়টায় একটু শীত করে বৈকি! তার ওপর সকালেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে।
সুকান্তবাবু সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে সামনের দিকে ছুড়ে ফেলে বললেন, "শীত করছে বুঝি?"
নিশিবালাদেবী মুখ থেকে একবার "হুম" শব্দ করে ডান হাত দিয়ে হাঁটুটা চেপে ধরে বেঞ্চিটাতে বসলেন। লাঠিটা বেঞ্চির গায়ে হেলান দিয়ে রেখে সামনের দিকে তাকালেন। শেষ বিকেলের চুরি যাওয়া আলোয় লেকের জল টলটল করছে। লেকের মাঝের গাছটায় পাখিদের সে কী ভীষণ কিচিরমিচির, তাদের বাড়ি ফেরার আনন্দটা তিনিও উপভোগ করছেন বোধহয়!
সুকান্তবাবু তাঁর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, "ছেলের সঙ্গে সমস্যা মিটেছে? রাগ কমেছে বাবুর?"
নিশিবালাদেবী সামনের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলেন, "নাহ, বরং আমার প্রতি বাবুর রাগ আরও দৃঢ় হয়েছে। কিন্তু তবুও এই ব্যাপারে আমি কোনো আপস করব না। আর আমি একটা কথা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। তুমি ওর মাথায় এই ভূতটা ঢোকালে কী করে? কেন?"
সুকান্তবাবু নিরীহ দৃষ্টিতে তাকালেন নিশিবালাদেবীর দিকে। তারপর খুব শান্ত স্বরে বললেন, "আপস করতে বলছি না। তবে ছেলের ভবিষ্যতের কথাটা একবার ভাববে তো! ও যে সুযোগটা পেয়েছে, সেটা আর ক'জন পায় বলো দিকি?"
কথাগুলো শুনে নিশিবালাদেবীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এসে পড়ল সুকান্তবাবুর ওপর। ধূসর হয়ে আসা চোখজোড়ার সেই দৃষ্টি মোটা ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়েও সুকান্তবাবুর ভিতরে আলোড়ন সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট।
মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলেন সুকান্তবাবু। অপরাধীর মতো মাথাটা নিচু করে নিলেন। জীবনের এই পঞ্চান্নটা বসন্ত কাটিয়ে আজকে তিনি এই জায়গায় এসে উপস্থিত হয়েছেন। নিজের কর্মের মাধ্যমে নাম, যশ সব কামিয়েছেন, কিন্তু তাঁর প্রতি নিশিবালাদেবীর যে অভিমান, সেটা শেষ করতে পারেননি। একরাশ হতাশা এসে গ্রাস করল তাঁকে। কিন্তু দোষটা কি তাঁর একার? সমস্ত অপরাধের ভাগীদার কি তিনি একাই?
অবশ্য এ প্রশ্নের উত্তর আজ তাঁর পাশে বসা নিশিকে তিনি জিজ্ঞাসা করতে পারবেন না। কারণ, তিনি জানেন, সত্যিই হয়তো পরিস্থিতি মানুষকে নিজের অজান্তেই অনেক অপরাধ করতে বাধ্য করে।
নিশিবালাদেবী চশমাটা খুলে শাড়ির আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর একটু নরম হয়ে বললেন, "কতদিন আছ এখানে? আর কী জন্য এখানে এসেছিলে বললে না তো! তোমাদের জমিজায়গা তো সব বিক্রি করে দিয়েছ শুনেছি।"
সুকান্তবাবু কিছু একটা উত্তর দেওয়ার আগেই সামনের লাল ইটের রাস্তা দিয়ে এক যুগল হাত ধরাধরি করে হেঁটে এগিয়ে গেল। খুব চেনা চেনা লাগছে কি এই যুগলকে? তিনি ভালো করে দেখলেন। হ্যাঁ, এই যুগলটি তো তাঁর খুব চেনা। এক ফেলে আসা অতীতের পাতা থেকে উঠে এসেছে তারা। বসন্তের বিকেল, লেকের ধার আর দুটি ছেলে-মেয়ের সদ্য প্রেমে পড়া এক মধুর অতীত। কলেজ থেকে বেরিয়ে সপ্তাহে অন্তত দুটো দিন নিজেদের জন্য দুটো ঘণ্টা বের করা। সেই ট্রেন লাইনের ধার থেকে ছিঁড়ে আনা সাদা বোগেনভেলিয়ার থোকা, সেই ত্রিকোণ কাগজে মোড়া ধোঁয়া ওঠা ঘটি-গরম, সেই চারমিনারে পুড়তে থাকা সদ্য যুবকের ঠোঁট — সবটাই ভীষণ চেনা সুকান্তবাবুর।
এইসব ভাবতে ভাবতেই কেমন যেন অতীতের দিনগুলিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন সুকান্তবাবু। নিশিবালাদেবীর পুনরায় প্রশ্নে ঘোরটা কাটল তাঁর। "কী হলো, উত্তর দিলে না যে! মনে মনে আবার কোনো ফন্দি আঁটছ বুঝি? নাকি আবার আমার মন ভোলানো কোনো মিথ্যের আশ্রয় নিতে চাইছ?"
সুকান্তবাবু খানিকটা বিরক্ত হলেন নিশিবালাদেবীর এরূপ প্রশ্নে। কিন্তু তিনি জানেন, তাঁর পাশে বসা এই মহিলাটিকে তিনি কোনোভাবেই আর আঘাত দিতে অথবা কড়া ভাষায় জবাব দিতে পারবেন না। সেই পথটা তিনি নিজেই বন্ধ করে দিয়েছেন। মানুষ বাইরে নিজেকে যতই সত্যবাদী অথবা নিরপরাধী দেখাক, নিজের বিবেকের কাছে তার অপরাধ কখনো চাপা থাকে না।
সুকান্তবাবু কিছু একটা বলতে যাবেন, ঠিক সেই সময় তাঁদের সামনে এসে উপস্থিত হলো একটি আইসক্রিমওয়ালা। তাঁদের দিকে তাকিয়ে বলল, "বাবু, আইসক্রিম দেব নাকি?" সুকান্তবাবু তাকালেন নিশিবালাদেবীর মুখের দিকে।
২
হাতে বোগেনভেলিয়ার একটা থোকা নিয়ে সুকান্ত হাসিমুখে এসে দাঁড়াল নিশির সামনে। সুকান্তকে এতটা খুশি অনেকদিন বাদেই দেখল নিশি। সেও হাসিমুখে কাগজ-ফুলের থোকাটা নিয়ে বলল, "মনে হচ্ছে খুব খুশি আজ, কী ব্যাপার?"
সুকান্ত ব্যাগের চেন খুলে একটা কাগজের মতো কিছু বের করে নিশির হাতে দিয়ে বলল, "এটা তোর জন্য, খুলে দেখ।"
নিশি কাগজটা উল্টে-পাল্টে দেখতেই তার মুখের অবয়ব পরিবর্তন হয়ে গেল। চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠল। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো, এবার আর সে নিজের ভালোবাসাকে নিজের কাছে আটকে রাখতে পারবে না। তবুও নিজেকে সামলে সে হাসিমুখে বলল, "যাক, তোর বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন তাহলে সফল হতে চলেছে!"
সুকান্ত নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরল নিশিকে। তার শক্ত বাহুবন্ধনে নিজেকে এতদিন সুরক্ষিত মনে করত নিশি; কিন্তু আজ যেন এই বাহুবন্ধন তার কাছে অজগর সাপের বেড়ের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে, তার সমস্ত শক্তি দিয়ে সে এই বন্ধন থেকে মুক্তি নিতে চায়। কিন্তু না, সে এ কাজ করতে পারে না। এখন এই কাজ করলে সুকান্তর মনোবল ভেঙে যাবে। ছেলেটা দিন-রাত এক করে দিয়েছিল বিদেশে পড়াশোনা করতে যাবে বলে। আর আজ যখন সেই স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে, তখন সে এতটা স্বার্থপর কী করে হবে? না না, এ কাজ করতে পারবে না সে। কিছুতেই না।
কিছুক্ষণ পর সুকান্তর বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিশি বলল, "তুই ফিরে আসবি তো? আমি কিন্তু অপেক্ষা করব তোর জন্য।"
নিশির এই প্রশ্নের কোনো উত্তর সেইদিন দেয়নি সুকান্ত। কেবল তার ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে একটা চুমু খেয়েছিল। দু-চোখভরা বিশ্বাস নিয়ে তাকিয়েছিল নিশির দিকে। সুকান্তের সেই দৃষ্টিতে নিশি অনেকটা বেশি বিশ্বাস দেখেছিল আর দেখেছিল ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।
৩
দুজনের তরফেই কোনো উত্তর না পেয়ে আইসক্রিমওয়ালা হাঁকতে হাঁকতে ততক্ষণে সামনের দিকে এগিয়ে গেছে। সুকান্তবাবু আবারও বললেন, "আমি যে ভুল করেছি, সেই ভুল বাবু করবে না। এত ভয় পাচ্ছ কেন তুমি?"
নিশিবালাদেবী সামনের দিকে তাকিয়েই উত্তর দিলেন, "যেদিন তুমি গিয়েছিলে, সেদিন যদি এই ভয়টা পেতাম, তাহলে আজ আমায় এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হতো না।"
সুকান্তবাবু আর কিছু না বলে পকেট থেকে আবার একটা সিগারেট বের করে তাতে আগুন দিলেন। সামনের লেকের জলের মধ্যে ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে। পাখিদের কিচিরমিচির কমে আসছে। কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে উঠছে জায়গাটা।
সুকান্ত ফিরেছিল। হ্যাঁ, বিদেশ যাওয়ার বছর তিনেক পরে সে ফিরে এসেছিল। তখনও অপেক্ষা করেছিল নিশি। হঠাৎ করেই কোনো এক শীতের সকালে পরিযায়ী পাখির মতো নিশির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সুকান্ত। নিশিও তাকে নিজের ভেবে আবার আশ্রয় দিয়েছিল। সুকান্ত বলেছিল, "এবার বাড়িতে বল নিশি। আমি এবার তোকে বিয়ে করেই একেবারে নিজের সঙ্গে বিদেশে উড়িয়ে নিয়ে চলে যাব।"
নিশির কেমন যেন ভয় হয়েছিল। গলাটা শুকিয়ে এসেছিল। হাত-পা কেঁপে উঠেছিল সুকান্তের কথা শুনে। কিন্তু সে তখন কিছু বলেনি। বাড়িতে এসে বাবাকে সবটা জানিয়েছিল। তার বাবা-মা একেবারে রাজি হয়েছিল তার আর সুকান্তের বিয়ের জন্য, কিন্তু তবুও তার মনের ভেতর জন্মেছিল একটা "কিন্তু"... এই পৃথিবীতে তাকে ছাড়া তার বাবা-মায়ের আর কেউ নেই। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবটাই তাঁরা নিজেদের মেয়ের মধ্যে খুঁজে নিয়েছিলেন। আর সেই নিশিই কিনা নিজের স্বার্থের জন্য বিয়ে করে বিদেশে চলে যাবে? সে জানে, বিদেশ থেকে বললেই ফেরা যাবে না। অনেক প্রক্রিয়া, অনেক ঝামেলা সে দেশ থেকে ফেরার। যে বাবা-মা তাঁদের সমস্ত কিছু উজাড় করে দিল মেয়ের জন্য, সেই মেয়ে কিনা তাঁদের ছেড়ে এত দূরে চলে যাবে? কিছুতেই সেদিন নিজের মনকে বোঝাতে পারেনি নিশি।
পরদিন সুকান্ত যখন এক বুক আশা নিয়ে তার কাছে এসেছিল, তখন তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল নিশি। সুকান্তের হাতে হাত রেখে বলেছিল, সে তার মা-বাবাকে এই দেশে ফেলে রেখে নিজের স্বার্থের জন্য অন্য দেশে গিয়ে সুখী হতে পারবে না।
সুকান্ত প্রথমটায় একটু হতাশ হলেও নিশির এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানিয়েছিল। সে আরও একটা প্রতিশ্রুতি সেদিন দিয়েছিল নিশিকে। কিছুদিনের মধ্যেই সে সম্পূর্ণরূপে ফিরে আসবে এই দেশে। আর তখন তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে। সুকান্তের চোখ থেকে সেদিন চোখ সরাতে পারেনি নিশি। তার প্রথম বিদেশে যাওয়ার দিন যে বিশ্বাস, যে প্রতিশ্রুতিটা সে দেখেছিল, আজ সেই বিশ্বাস আর প্রতিশ্রুতিটাই ফিকে হয়ে ফুটে উঠেছিল সুকান্তের চোখে। মনে মনে হেসেছিল নিশি। ভেবেছিল, তুই আর ফিরবি না রে সুকান্ত, কোনোদিন ফিরবি না। আমি জানি।
তার কিছুদিন পরেই সুকান্ত উড়ে গিয়েছিল বিদেশের মাটিতে; কিন্তু নিশিকে দিয়ে গিয়েছিল ভালোবাসার এক অমূল্য উপহার। যে উপহারটিকে সঙ্গে নিয়ে নিশির এতগুলো বছর কেটে গেল।
সুকান্তবাবু উঠে দাঁড়ালেন। নিশিবালাদেবী ঝাপসা চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে পুনরায় প্রশ্ন করলেন, "এতগুলো বছর পর কেন এসেছ জানালে না তো?"
সুকান্তবাবু চুপ করে রইলেন। নিশিবালাদেবীও লাঠিতে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। অশ্রুসিক্ত চোখে তাকালেন নিজের ভালোবাসার দিকে। এই হয়তো তাঁদের শেষবারের মতো দেখা। আর হয়তো কোনোদিন দেখা হবে না তাঁদের। কিন্তু নিশিবালাদেবী প্রতিদিন দেখে সুকান্তকে। দিনরাত তাঁর সামনে ঘুরে বেড়ায় সুকান্ত। সেই সুকান্ত, যে সুকান্তকে সে আজীবন ভালোবেসে এসেছে।
সুকান্তবাবু একটা ঢোক গিলে বললেন, "প্লিজ নিশি, ছেলেটাকে যেতে দাও। নিজের স্বার্থের জন্য ছেলেটার ক্ষতি কোরো না তুমি, প্লিজ। এইভাবে স্বার্থপর হয়ে যেয়ো না নিশি।"
সুকান্তবাবু আর কোনো কথা বললেন না। কেবল চোখের ইশারায় বোঝালেন, তিনি পরাজিত। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন সামনের দিকে। নিশিবালাদেবী আবারও পিছনে পড়ে রইল। তিনি আর একবারও তাকালেন না তাঁর দিকে। কেবল পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে একটা ফোন করলেন।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ওপার থেকে কেউ একজন ফোনটা রিসিভ করলে তিনি বলে উঠলেন, "পারলাম না মহুয়া। আমি আমার ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারলাম না। আমাদের সারাটা জীবন এইভাবেই নিঃসন্তান কাটাতে হবে। ও স্বার্থপর, খুব স্বার্থপর।"
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।