আহ, Cockroach Janata Party (CJP) — ভারতের বহু প্রতীক্ষিত Gen Z আন্দোলন, যেখানে দেশের অতিশিক্ষিত, অর্ধ-বেকার এবং রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে “আরশোলা” যুবসমাজ নিজেদের প্রকৃত স্পিরিট অ্যানিম্যাল খুঁজে পেয়েছে।
সবকিছুর সূত্রপাত সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্য কান্তের সেই ঐতিহাসিক মন্তব্য ঘিরে, যেখানে কর্মসংস্থানের দাবিতে সরব যুবকদের “পরজীবী” ও “আরশোলা”-র সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে বলে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। আর অনলাইনে বাসাবাঁধা ভারতের যুবপ্রজন্ম সেই তুলনাকে নিজের প্রকৃত পরিচয় বানানোর দুঃসাহস দেখিয়ে দিয়েছে। গর্বের সঙ্গে বলছে: “হ্যাঁ, আমরা সস্তা ভাড়ার ফ্ল্যাটে অনেকে মিলে থাকি, মাঝরাতে ইনস্ট্যান্ট নুডলস খাই, ক্যারিয়ারের দুশ্চিন্তা নিয়ে বেঁচে থাকি, কিন্তু তবুও মরতে রাজি নই — আমরা আরশোলা।”
কারণ, গণতান্ত্রিক মর্যাদা, কর্মসংস্থান বা নীতিগত জবাবদিহি চাওয়ার মতো ক্লান্তিকর কাজ কেন করবেন? যখন রাষ্ট্র আপনাকে পোকা ভাবছে, তখন পোকার মতোই সংগঠিত হওয়াই তো যৌক্তিক।
এলিট ট্রোলিং হিসেবে শুরু হয়ে CJP খুব দ্রুতই ডিজিটাল ক্ষোভের ম্যাসকট হয়ে উঠেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এক কোটির বেশি ফলোয়ার। এই মুহূর্তে সংখ্যাটা আড়াই কোটি ছাড়িয়ে গেছে। মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর থেকেও দ্রুত ডিজিটাল বিস্তার। কারণ স্যাটায়ারের আড়ালে আসলে জমে থাকা উদ্বেগ — বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস, আর সিস্টেমের প্রতি ভয়াবহ অবিশ্বাস।
এক মাস আগেও এটিকে আর পাঁচটা ইন্টারনেট ট্রেন্ডের মতোই মনে হতে পারত। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ সেই মূল্যায়নকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। গত একটা মাস এই আরশোলাদের গতিবিধি লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে, এরা কেবল ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্ক্রোল করতে করতে মরে যাওয়ার পোকা নয়। যে আন্দোলনকে ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের টাইমলাইনে বন্দি ভাবা হচ্ছিল, তা আচমকাই স্যাটায়ারের খোলস ছেড়ে দিল্লির যন্তর মন্তরের তপ্ত রাজপথে এসে আছড়ে পড়েছে।
হ্যাঁ, CJP এখন আর শুধু একটি ছদ্মনামী পেজ নয়; তারা রীতিমতো তিনজন অফিশিয়াল মুখপাত্র (যার মধ্যে ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্ট থেকে ফিল্মমেকারও আছেন) নিয়োগ করে মূলধারার মিডিয়ার ক্যামেরার সামনে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দাবিও স্পষ্ট — NEET-NET পেপার লিক এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক অরাজকতার দায় নিয়ে খোদ শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফা চাই।
তবে এই নাটকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মোড়টা ছিল অন্য জায়গায়। CJP প্রতিষ্ঠাতা যখন সদলবলে ঘোষণা করলেন যে তিনি দিল্লি পৌঁছালেই তাঁকে গ্রেফতার করা হতে পারে, তখন রাষ্ট্র এক অদ্ভুত ‘রিভার্স সাইকোলজি’ বা বিপরীত মনস্তত্ত্বের তাস খেলল। পুলিশ তাঁকে হাতকড়া তো পরালোই না, উল্টো এয়ারপোর্টেই প্রোটেস্টের পারমিশন দিয়ে দিল! এটা কি আরশোলাদের নেহাতই ‘কীটপতঙ্গ’ ভেবে অবজ্ঞা করা, নাকি অতি-স্মার্ট কৌশলে তাদের ‘শহীদ’ হওয়া থেকে আটকে আন্দোলনের হাওয়া কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা — তা নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পণ্ডিতরা মাথা চুলকাতেই পারেন। তবে একটা কথা পরিষ্কার, সরকার এদের গ্রেফতার করে লাইমলাইট দিতে না চাইলেও, ভেতরে ভেতরে যে বেশ অস্বস্তিতে আছে, তা বোঝা যায় সোশ্যাল মিডিয়ার হাওয়া দেখলেই।
ডিজিটাল দুনিয়ায় এখন পুরোদস্তুর ‘মিম-যুদ্ধ’ শুরু হয়ে গেছে। ডানপন্থী ট্রোল-ফ্যাক্টরিগুলো পুরোদমে মাঠে নেমে পড়েছে — হাজারটা মিম বানিয়ে প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে যে এই আরশোলারা আসলে ‘অপরিণত, পরজীবী এবং কোনো অদৃশ্য বিদেশি এজেন্ডার সস্তা পুতুল’। তবে মুশকিল হলো, ট্রোলিংয়ের এই চেনা টনিক এখানে কতটা কাজ করবে তা নিয়ে খোদ আইটি সেলের অন্দরেই সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। কারণ, যে নিজেকে আগেই ‘আরশোলা’ বলে ডিক্লেয়ার করে দিয়েছে, তাকে নোংরা ড্রেনের গল্প শুনিয়ে নতুন করে অপমান করা বেশ কঠিন কাজ।
CJP সমর্থকরাও অবশ্য কম যায় না; তারা এই ডানপন্থী আক্রমণগুলোকেই পরম শান্তিতে রি-সাইকেল করে পাল্টা কাউন্টার-মিমের মারণাস্ত্র বানাচ্ছে। একদিকে চলছে ‘দেশদ্রোহী-পরজীবী’ তকমা দেওয়ার চেনা পলিটিক্স, অন্যদিকে চলছে সেই তকমাকেই বর্ম বানিয়ে আইরনির সেলফি তোলার জেন-জি কায়দা। এই কাদা ছোঁড়াছুড়ির খেলায় শেষ পর্যন্ত কার গায়ে কতটা কাদা লাগল, আর কে সেই কাদায় দাঁড়িয়েই রিচ (Reach) কামিয়ে নিল — তা বোঝা দায়।
তবে CJP হয়তো কয়েক মাস পরেই “RIP trend” হয়ে যেতে পারে। কারণ ইন্টারনেটের রাগের মেয়াদ খুব কম। আজকে “আরশোলা বিপ্লব”, কালকে নতুন মিম। অ্যালগরিদম চায় দ্রুত উত্তেজনা, দ্রুত এনগেজমেন্ট, তারপর দ্রুত বিস্মৃতি। সারাদিন অনলাইনে থাকা যুবকদের দিয়ে স্থায়ী রাজনৈতিক সংগঠন চালানো যতটা সহজ শোনায়, বাস্তবে ততটা নয়। মিম বানানো সহজ, বুথ সামলানো নয়।
দিল্লির যন্তর মন্তরের সাম্প্রতিক বিক্ষোভেই তার আভাস মিলেছে। তীব্র গরম, দীর্ঘ বিমানযাত্রা আর মাঠে নেমে সংগঠন চালানোর বাস্তব চাপের মাঝে CJP প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের শারীরিক অসুস্থতার খবর সামনে এসেছে। অন্যদিকে, প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাসকে ঘিরেও এমন ভিডিও সামনে এসেছে যেখানে দেখা যাচ্ছে, প্রচণ্ড গরমে একজন ব্যক্তি কাগজ দিয়ে তাঁকে একটানা হাওয়া করছেন এবং ঠান্ডা পানীয় এনে দিচ্ছেন।
দৃশ্যগুলো মনে করিয়ে দেয় যে রাজনীতির রোম্যান্টিক পোস্টার আর বাস্তব রাজপথ এক জিনিস নয়। অভিজ্ঞ রাজনীতিকেরা বছরের পর বছর ধরে যে সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, তার পেছনে শুধু আদর্শ নয় — জল, খাবার, বিশ্রাম, লোকবল এবং প্রচণ্ড সহনশীলতার মতো অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু জরুরি জিনিসও কাজ করে। মিম বানানো সহজ, দিল্লির জ্যৈষ্ঠ মাসের রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আন্দোলন টিকিয়ে রাখা নয়।
প্যারোডি-ভিত্তিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ভোটের রাজনীতিতে ঢুকলেই আয়রনি মারা যায়। নির্বাচন কমিশনের ফর্ম, ফান্ডিং, কর্মী আর বুথ ম্যানেজমেন্টের মতো বাস্তব ঝক্কিগুলো এই এলিট ট্রোলিং-এর অ্যাস্থেটিক্স নষ্ট করে দেয়। এছাড়া মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো ইন্টারনেট বিদ্রোহ খেতে খুব ভালোবাসে।
তবে এটাকে “Just another Gen Z trend” বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ সমস্যাগুলো মিম নয়, বাস্তব। ২৯% শিক্ষিত বেকারত্ব, পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস, আর বেকার যুবকদের “বোঝা” হিসেবে দেখার সংস্কৃতি — এগুলো ট্রেন্ড শেষ হলেই উধাও হচ্ছে না। তাছাড়া CJP শুধু “সিস্টেম বদলাও” টাইপ ফেসবুক পোস্ট নয়। তাদের নির্দিষ্ট দাবিদাওয়াও আছে — অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের দ্রুত রাজনৈতিক পদ না দেওয়া, RTI কঠোর করা, ভোট মুছে দেওয়াকে গুরুতর অপরাধ ধরা ইত্যাদি। অর্থাৎ, দেশের যুবসমাজ এখন ব্যঙ্গও ফুটনোট দিয়ে করছে। এবং CJP নাকি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার কথাও ভাবছে!
ব্যঙ্গ যখন রাজপথে এসে স্লোগান হয়ে যায়, আর মিম যখন ব্যালট বক্সের (থুড়ি, ইভিএম-এর) দিকে চোখ রাঙাতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে খেলাটা আর নিছক ‘টাইমপাস’ নেই।
কোটি কোটি বছরের ইতিহাস বলে — আরশোলা নির্মূল করা প্রায় অসম্ভব। তবে Cockroach Janata Party কি ইতালির Five Star Movement বা AAP-এর মতো ভবিষ্যতে কোনো বাস্তব রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারে? নাকি এটাও অ্যালগরিদমের পরবর্তী বিস্মৃতির অপেক্ষায় থাকা আরেকটি ট্রেন্ড?