About Bangali.Network
About Bangali.Network
মাসিক সংখ্যা
লেখক–লেখিকা
লেখা পাঠান
আমাদের কথা
উদ্যোগ
Web Magazine
Contests


উদ্যোগ Web Magazine
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
Glocal বাঙালি | Vocal বাঙালি
প্রজাপতি আর একটি জীবন
দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

দায়স্বীকার

লেখা, মতামত, মন্তব্য, বিশ্লেষণ, সাক্ষাৎকার বা অন্য যে কোনো প্রকাশিত লেখার সকল বক্তব্য সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা / সাক্ষাৎকারদাতার নিজস্ব এবং সকল বক্তব্যের নৈতিক, তথ্যগত ও আইনগত দায় সম্পূর্ণভাবে তাঁদের উপরই বর্তায়। কোনো লেখা প্রকাশিত হওয়া মাত্রেই তা Bangali Network-এর সম্পাদকীয় অবস্থান, নীতি, মতাদর্শ, সমর্থন, অনুমোদন বা সরকারি মতামতের প্রতিফলন হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

তথ্যভিত্তিক প্রবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য, উদ্ধৃতি, অনুবাদ, পরিসংখ্যান, গবেষণা, শাস্ত্রীয় বা ঐতিহাসিক সূত্র, আইনগত বা বৈজ্ঞানিক তথ্য, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা, সিদ্ধান্ত ও উপসংহারের যথার্থতা, নির্ভুলতা, পূর্ণতা, প্রাসঙ্গিকতা, বৈধতা ও হালনাগাদকরণের দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকার। Bangali Network সম্পাদকীয় বিবেচনায় কোনো লেখা প্রকাশ, সম্পাদনা, সংক্ষিপ্তকরণ বা ভাষাগত সংশোধন করতে পারে; তবে এ ধরনের সম্পাদকীয় প্রক্রিয়াকে প্রকাশিত তথ্য, সূত্র, উদ্ধৃতি, বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা মতামতের সত্যতা, নির্ভুলতা, বৈধতা বা নির্ভরযোগ্যতার প্রত্যয়ন বা নিশ্চয়তা হিসেবে গণ্য করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত কোনো দায় Bangali Network গ্রহণ করে না।

লেখক পরিচিতিতে প্রকাশিত তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব বিবরণের ভিত্তিতে প্রকাশিত। Bangali Network উক্ত তথ্যের যথার্থতা, সম্পূর্ণতা বা নির্ভুলতা সম্পর্কে কোনো প্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো দায় গ্রহণ করে না।

কোনো প্রকাশিত বিষয়বস্তুর কারণে কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, সংস্থা বা গোষ্ঠীর আপত্তি, দাবি বা আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হলে, প্রযোজ্য আইন অনুসারে তার দায় সংশ্লিষ্ট লেখক / লেখিকা বা সাক্ষাৎকারদাতার উপর বর্তাবে, যদি না আইন ভিন্নভাবে নির্ধারণ করে।

কোনো প্রকাশিত তথ্য বা দাবির যথার্থতা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণসহ আপত্তি উত্থাপিত হলে Bangali Network বিষয়টি সম্পাদকীয়ভাবে পর্যালোচনা করবে। পর্যালোচনায় তথ্যগত ভুল প্রমাণিত হলে, Bangali Network নিজস্ব সম্পাদকীয় বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট অংশ সংশোধন, অপসারণ, প্রত্যাহার বা প্রয়োজনীয় সম্পাদকীয় নোট সংযোজন করার অধিকার সংরক্ষণ করে।

প্রজাপতি আর একটি জীবন

"টা টা মামমাম..." দুটো ঝুঁটি দোলাতে দোলাতে ঘুঙুর বাঁধা ছোট ছোট পায়ে মেয়ে দৌড়ালো তার নাচের ক্লাসে। মিশুকের এই দৌড়ে উড়ে যাওয়া দেখতে চন্দনা বড্ড ভালোবাসে। দেশবন্ধু বালিকা বিদ্যালয়ের একতলায় এখন "অতনু স্যারের ডান্স একাডেমি"। ব্রিটিশ ভারতের যুগে রানাঘাটে সম্মানীয় ব্যক্তি ছিলেন হরেন্দ্রনাথ রায় মহাশয়। ব্যবসায়ী এই মানুষটি ছিলেন কংগ্রেসের সমর্থক এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের একনিষ্ঠ ভক্ত। স্বাধীনতা লাভের পর নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য এই চূর্ণী নদীর ধারে পাঁচিল-ঘেরা খোলামেলা বাড়িটা দান করেন। এখন এখানে লোয়ার কেজি থেকে ক্লাস ফোর অবধি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল হয়।

সোমবার থেকে শুক্রবার অবধি আর বুধবার ও শুক্রবার সন্ধ্যা ছটা থেকে প্রায় রাত ন'টা অবধি চলে অতনু স্যারের ডান্স একাডেমির ক্লাস। শুধু রানাঘাট নয়, হবিবপুর, এমনকি চাকদা থেকেও ছাত্র-ছাত্রীরা আসেন। হলঘরের মেঝেটা কী লাল! যত্ন হয় স্কুলটার, দেখে বোঝাই যায়। মোটা মোটা সাদা থাম, দেওয়ালজুড়ে রয়েছে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং হরেন্দ্রনাথ রায় মহাশয়ের ছবি। হলঘরটা ঘিরে ঘরগুলোতে মিশুকদের মতো ছোট, কী একটু বড় বাচ্চাদের ক্লাস চলে। মিশুককে দেখা যাচ্ছে, তনয়া ম্যাম ওদের লাইন করাচ্ছেন। ছটফটে মেয়েটা কী মনোযোগ দিয়ে তনয়া ম্যামের দিকে তাকিয়ে! দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। হলঘরে ক্লাস করাবেন অতনু স্যার নিজে, বড় ছাত্র-ছাত্রীদের। তবে ছাত্রসংখ্যা তুলনায় অনেক কম। এটাই হয়তো স্বাভাবিক। এই রানাঘাটের মতো মফস্বল শহরে।

অতনু স্যার আসছেন, অভিভাবকরা এবার বেরিয়ে যাবেন। স্যার আসেন নৈহাটি থেকে। ওড়িশি নাচের জন্য স্যার বহু পুরস্কার পেয়েছেন, ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতিও বেশ যত্নশীল। চন্দনা তো খুবই খুশি। জুতো রাখার নির্দিষ্ট জায়গায় নিজের জুতোজোড়া খুঁজতে গিয়ে খেয়াল করে আজও কুহেলি আসল না, তার মানে আবার অনন্যার ক্লাস কামাই হলো।

প্রতিটা ক্লাসের সময় পঁয়তাল্লিশ মিনিট, অবশ্য সেটা ছোটদের জন্য। বড়দের হিসেব আলাদা। এইটুকু সময়ের জন্য চন্দনা আর বাড়িতে যায় না, নদীর ধারের পার্কে অথবা রাধাবল্লভতলার বসার জায়গায় বাকি অভিভাবকদের সঙ্গে বসে অপেক্ষা করে। তবে কুহেলি আসলে নদীর ধারের ক্যাফেতে বসে থাকে। ভালো লাগে। "কী যে হলো ওদের?"

টোটোতে যখন নিজের খেয়ালেই মগ্ন, মেয়ে কলকল করে বকে চলেছে মে মাসের বসন্ত উৎসবের কথা। চন্দনা ভাবছে আবার খরচ। ওড়িশি নাচের বিশেষ শাড়ি, গয়না অতনু স্যারের চেনা জায়গা থেকেই কিনতে হবে। আহেলীতে খুব বড় অনুষ্ঠান হবে। প্রতিবারই হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমসহ নদিয়ার কিছু বিশিষ্ট মানুষজন আসেন। গতবারই দেখেছিল কুহেলির সঙ্গে বসে। তবে পাঁচ বছরের বাচ্চা এবং নতুন বলে অতনু স্যার ওদের দিয়ে নাচ করাননি। যদি অত আলো, লোকজন দেখে বাচ্চাগুলো ঘাবড়ে যায়!

বাড়ির গলির কাছে টোটোটা দাঁড়ায়। ভাড়া দিয়ে গিয়ে চন্দনা জিজ্ঞাসা করে মেয়েকে, "হ্যাঁ রে, অনন্যা নাচ করবে না?"

"সব্বাই নাচ করবে মা। তবে আমি, তোতা, রিয়া আর মিঠি আগে 'গুরু বন্দনা' করব। তারপর তনয়া ম্যাম নাচবে 'অয়ি গিরি নন্দিনী'... আমিও নাচব। মানে দুটো নাচ।" কচি কচি আঙুল দিয়ে মিশুক সংখ্যাটা দেখায় মাকে। "দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ / ধীরে ধীরে বহিতেছে মলয় বাতাস..."

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধূপ-প্রদীপ, ফল-মিষ্টি সহযোগে লক্ষ্মীপুজো করার অভ্যাস বনানীর। মিশুক যখন আরও ছোট ছিল, সন্ধ্যায় ঠাকুমার পাশে এসে হাতজোড় করে বসত, আধো আধো স্বরে লক্ষ্মীর পাঁচালি বলারও চেষ্টা করত মেয়েটা। এখন আর তার সময় কোথায়! ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে। ধূপটা সারা ঘরে দেখাতে গিয়ে দেখেন বাচ্চাটা সেই কখন থেকে নেচে যাচ্ছে। মনে মনে বলেন, "সব কিছুতেই বাড়াবাড়ি।"

ঠাকুরের সামনে ধূপটা রেখে, পুজোর কাপড়টা ছেড়ে, রোজের শাড়িটা পরে নেন বনানী। সাড়ে সাতটার সিরিয়ালটা বেশ ভালো লাগে দেখতে। গরম চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে ঘরে যেতে গিয়ে একটা হাঁক দেন, "চন্দনা, তোমার মেয়ে তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কখন থেকে নেচে চলেছে। এবার কিন্তু পায়ে ব্যথা করবে।"

বনানী নাতনির ছোট ছোট হাত-পায়ের মুদ্রা, মুখের অঙ্গভঙ্গি দেখে ভারী মজা পান, কিন্তু এই সময় কচি পা দুটোর ব্যথা করা নিয়ে চিন্তিত। অনুষ্ঠানের তো এখনও দিন কুড়ি বাকি। "পাকা বুড়ি, থাম এবার।" বলে চায়ের কাপটা নিয়ে ঘরে গেলেন।

মিশুকের ঘেমো জামাটা ছাড়িয়ে, এক গ্লাস দুধ হাতে ধরিয়ে বারান্দায় গেল চন্দনা। আকাশের বুকে বিদ্যুতের রেখাটা চিরে বেরিয়ে গেল। দমকা হাওয়া উঠেছে। সুমন এখনও ফেরেনি। সারাদিন খুব গরম দিয়েছে, এখন ঠান্ডা হাওয়ায় শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। রানাঘাট শহরটাও ইঁট-কাঠের জঙ্গলে ছেয়ে যাচ্ছে। তবু কিছু গাছ তো আছেই এখনো, সেই গাছপালা থেকেই ফুলের গন্ধ নাকে ঝাপটা দিচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তি দূর হলো অবশেষে।

নিজের চায়ের কাপটা নিয়ে আসে। হোয়াটসঅ্যাপে ডান্স একাডেমির তরফ থেকে তনয়া ম্যাম মিশুক অনুষ্ঠানে যে নাচটা করবে, তার একটা ভিডিও শেয়ার করেছেন। বাড়িতে যাতে দেখে অনুশীলন করতে পারে। স্যারের কোনো ত্রুটি নেই, সত্যি! সাড়ে চার বছরে মিশুক যখন ভর্তি হলো, সেই সময় ক্লাস শেষে প্রতিটা মাকে তনয়া ম্যাম হাত এবং পায়ের মুদ্রা দেখিয়ে দিতেন। আর হোয়াটসঅ্যাপে তো ভিডিও থাকতই। মা মেয়ের সঙ্গে নাচলে ছোট বাচ্চাদের নাচ করতে ভালো লাগবে, নাচের সঙ্গে ভালোবাসা গড়ে উঠবে। এইভাবে নাচ করতে গিয়েই তো দেড় বছর আগে বন্ধুত্ব হয় কুহেলির সঙ্গে।

দুজনেই মোটা মানুষ, পা আর ভাঁজ হয় না! উফফ, কী জ্বালা! তবে শুধু কী নাচের মুদ্রা মনে রাখার সমস্যা ছিল, আরও তো অনেক কিছুই ছিল। চন্দনার ওড়িশি নাচের অভ্যাস দেখে উপহাসগুলো — না, চন্দনা কিছুই ভোলেনি।

ঝড়টা আর উঠল না। বারান্দা থেকে দেখে সুমন বাড়ি আসছে...

রাতে খেতে বসে আজ আবার বিরক্ত লাগে বনানীর। "কাকলিটা নিরামিষ কোনো রান্না পারে না, আসলে ও কোনো রান্নাই পারে না। মোচার ঘণ্টটা যাচ্ছেতাই হয়েছে।"

বলেই দিলেন বনানী। জানেন, চন্দনার কিছু যায় আসে না। তবু একসঙ্গে খেতে বসলে বউমাকে একটু কথা শোনান। কে জানে, তাতেই হয়তো বিস্বাদ তরকারিতে 'স্বাদ' পান। তবে আজ কথাগুলো একেবারে মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল। অন্যবার হলে একটা-দুটো টিপ্পনি চন্দনাও কাটে। কিন্তু আজ মনটা কুহেলি কুহেলি করছে। এই সপ্তাহে একটা ক্লাসও অনন্যা করল না।

মিশুক ঘুমিয়ে পড়েছে। মেয়েটার চুলে বিলি কাটতে কাটতে মনে পড়ে একদম ছোট্ট তিন-চার বছরের মিশুকের কথা। চন্দনা ওর সঙ্গে গান চালিয়ে এ-তাল ও-তাল নাচ করত। আসলে চন্দনার বাবার ধারণা ছিল, "নাচ শিখে কী, মেয়ে আমার স্টেজে উঠে ধেই ধেই করে নাচবে? তারচেয়ে গান শিখুক।"

চন্দনা কোনোদিনও জোরের সঙ্গে বলে উঠতে পারেনি, "আমার নাচ করতে ভালো লাগে। গান করতে না।" মিশুকের বেলায়ও চেয়েছিল মেয়ে নাচ শিখুক। অনেক খুঁজে এই "ডান্স একাডেমি"-কে পছন্দ করে। ভর্তির আগে অতনু স্যার বলেছিলেন মেয়েকে নিয়ে ছোটদের ক্লাসে আসতে। সমবয়সী, প্রায় সমবয়সীদের নাচতে দেখলে বাচ্চাটা এমনিই নাচ করবে। "সত্যি, এই হলো অভিজ্ঞ শিক্ষক!"

বাড়িতে নাচের স্কুলে ভর্তি করা প্রসঙ্গে বনানী সবার আগে বলেছিলেন, "তোমার ওই বড়লোকি জায়গার নাচের খরচ আসবে কোথা থেকে?" অবিশ্বাস্য লেগেছিল শাশুড়ির এই কথা! সুমনকে বাধ্য হয়েছিল জানাতে, কিন্তু ও ছিল নির্বাক।

ছোট্ট একটা বেসরকারি স্কুলে পড়ায় চন্দনা। ঠিক করে নাচের যাবতীয় খরচ কোনোদিনও সুমনের কাছে চাইবে না। তবে একটা রান্নার লোক আর মেয়েকে দেখাশোনা করার লোকের প্রয়োজন। কাকলি আগে থেকে এই বাড়িতে কাজ করত। ওকেই বলে বাকি কাজের দায়িত্ব নিতে। সময়টা প্রায় ছয় ঘণ্টা হবে। সেক্ষেত্রে মাইনেটা বাড়বে, আর দুপুরে দুটোর মধ্যে চন্দনা চলে আসলে ওর ছুটি। আজ বছর দেড়েক এই রুটিন চলছে। তবে কাকলির মাইনে সহ মিশুকের নাচের স্কুল মিলিয়ে যে খরচটা হয়, তারপর আর ওর নিজের হাতে বিশেষ কিছু থাকে না। না থাকলেও এখন আর জবাবদিহি করতে হয় না। এটাই যা ভালো।

নিজের ভাবনায় মশগুল চন্দনা খেয়ালই করেনি, সুমন শুতে চলে এসেছে।

বুধবারের নাচের ক্লাসে কুহেলি আর অনন্যাকে দেখতে পেয়ে বেশ খুশিই হয় চন্দনা। তবে কুহেলির চোখ আজ ছলছল করছিল, বোধহয় তনয়া ম্যাম আর স্যারের কাছে বকুনি খেয়ে। আসলে অনুষ্ঠানের আর মাত্র সপ্তাহ দুই বাকি। স্টেশনের কাছে, নদীর ধারে আর মিউনিসিপ্যাল মার্কেটের কাছে ছোট-বড় বিজ্ঞাপন চোখে পড়ছে। অথচ অনন্যার নাচ তোলা হয়নি। তাহলে বাচ্চাটাকে বাদ দিতে হবে শুধুমাত্র অভিভাবকের গাফিলতিতে। না, সত্যি কথাগুলো অপমানজনক। কে জানে, তাই হয়তো কুহেলির বাজে লাগছে! কাঁধে একটা হাত রেখে বলে চন্দনা, "নদীর ধারের ক্যাফেটাতে যাবে?"

চূর্ণী নদীটার গতিপথ মানুষের খামখেয়ালিপনার জন্য রুদ্ধ হয়ে পড়ছে! ভাবা যায়, এই নদীতে নৌকা চলত ঝুলন্ত ব্রিজটা হওয়ার আগে, আর এখন কচুরিপানায় ভরে গেছে। একটু পরেই বাংলাদেশের চিনিকলের কালো জল মিশতে থাকবে নদীতে। বেচারা নদী রে! চা এসে গেছে। খাতায়-কলমে বৈশাখ মাস, গরমটা মারাত্মক ছিল আজ। এখন হাওয়া দিচ্ছে...

কুহেলি কোনো কথা না বলে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। চা শেষ হতে হতেই ডান্স একাডেমিতে যাওয়ার সময় হয়ে গেল। বাইরে বেরিয়ে আসার সময় কুহেলি হঠাৎ বলে ওঠে, "আমার না বাড়িতে ফিরতে একদম ইচ্ছে করে না।"

এই কথার কী উত্তর দেবে বুঝে উঠতে পারে না চন্দনা। দেড় বছরের আলাপ, বন্ধুত্ব গভীর নয়। মিল — দুজনেই নাচ ভালোবাসে, দুজনের পরিবার নাচের বিরোধী। অথবা অতনু স্যারের নাচের স্কুলের অতিরিক্ত খরচের! এর বেশি কিছু চন্দনা জানে না। এত কামাইয়ের কারণও জিজ্ঞেস করতে পারেনি, যদি কুহেলি ভাবে অতিরিক্ত কৌতূহলী। আজ চূর্ণী নদীর সঙ্গে চন্দনা, কুহেলি আর নিজের মিল খুঁজে পেল। ওরা তিনজনেই মানুষের নিজস্ব ইচ্ছে, চাহিদা আর খামখেয়ালিপনার শিকার।

এই প্রথম নিজে থেকে কুহেলি কিছু বলল... অপ্রস্তুত চন্দনা ভেবে পাচ্ছে না কী বলা যায়! তবু হাতটা চেপে ধরে কুহেলির, নরম গলায় বলে, "কিছু কি হয়েছে? আমাকে বলতে পারো। জানি গো, মেয়েদেরই সর্বক্ষেত্রে প্রতিকূলতার সামনে আসতে হয়।"

বাচ্চাদের ছুটি হয়ে গেছে। সাদা কামিজ-চুড়িদার, হলুদ রঙের ওড়নায় সাজা এক ঝাঁক প্রজাপতি এখন উড়ে বেড়াচ্ছে... এই উড়ন্ত প্রজাপতিদের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে নির্বাক কুহেলি।

রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছটা থেকে অনুষ্ঠান শুরু হবে। কিন্তু মিশুক যেহেতু নাচ করবে, চারটের মধ্যে চন্দনা মেয়েকে নিয়ে আহেলীতে চলে গেছে। মেয়ে আজ ওড়িশি নাচের বিশেষ সাজে। নীল শাড়িতে, রুপোর কোমরবন্ধনী, মাথার মুকুট, হাতের আলতায় একটা নরম নীল প্রজাপতি। ছয় বছরের ছোট্টটার সঙ্গে বাবা, ঠাকুমা সেলফি তুলছে। এবার চন্দনা নিয়ে যাবে গ্রিনরুমে। বাকিটা একাডেমির দায়িত্ব।

বসার জায়গায় চলে আসে চন্দনা, সুমন আর বনানীর কাছে। স্টেজে জগন্নাথ দেবের একটা কাঠের মূর্তিতে জুঁই ফুলের মালা দিলেন অতনু স্যার। স্যারও নাচ করবেন। খালি গায়ে, চন্দনরঙা ধুতিতে, ওড়িশি নাচের মানানসই গয়নায়। স্যারকে দেখে গোটা অডিটোরিয়াম মুগ্ধ। বিশেষত বনানী। মঞ্চে বিশিষ্টজনেরা, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, ইউটিউবাররা চারপাশে।

সবাই আছে, শুধু কুহেলি আর অনন্যাই নেই এখানে। সেই বুধবারের পর আর নাচের ক্লাসে আসেনি ওরা। ফোন করেছিল চন্দনা বার কয়েক, কিন্তু সেই বেজে বন্ধ হয়ে যেত। শুধু একবারই এক ভারী গলার পুরুষকণ্ঠ বলে ওঠে, "এই নামে এখানে কেউ থাকে না।" হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েছিল, কিন্তু একটাই টিক হয়ে রয়ে গেছে। কে জানে কী হলো ওদের?

হঠাৎ একটা কনুইয়ের গুঁতো... "কী ভাবো এত? মেয়ের নাচ তো শুরু হয়ে গেল..."

চন্দনা দেখে স্টেজের লাল, হলুদ আলোর মাঝে তার ছোট্ট পুতুলটা আজ নীল রঙের প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে... চোখটা মোছে চন্দনা।




আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’

এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন

এই সংখ্যায় প্রযোজ্য নিয়ম

একজন পাঠক এই সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই প্রতিক্রিয়া এই সংখ্যার অন্য কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা। দ্রষ্টব্য: আষাঢ় ১৪৩৩ সংখ্যা থেকে এই নিয়ম আরও সহজ ও উদার করা হয়েছে।

আগামী সংখ্যার জন্য লেখা পাঠান

❛উদ্যোগ❜ ওয়েব ম্যাগাজিনের অগ্রহায়ণ ১৪৩৩ সংখ্যাটি ৩০ নভেম্বর ২০২৬ (১৩ই অগ্রহায়ণ) প্রকাশিত হবে। ওয়েবসাইটে প্রদত্ত লেখার বিভাগ ও বিষয় থেকে আপনার পছন্দের বিষয় বেছে নিয়ে লেখা পাঠান ২০ নভেম্বরের মধ্যে। নির্বাচিত লেখাগুলি লেখক / লেখিকার ছবি ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতিসহ প্রকাশিত হবে। লেখা পাঠানোর ফর্ম এবং অন্যান্য সকল তথ্যের জন্য অনুগ্রহ করে মেনুতে ‘লেখা পাঠান’ বিভাগটি দেখুন।

পৃষ্ঠা
ভালো লাগলে ভালোবাসা দিন
গঠনমূলক পরামর্শ দিন
মন্তব্যে আপনার মতামত জানান
0 0 ভোট
স্টার
guest
3 কমেন্ট
নতুন থেকে পুরোনো
পুরোনো থেকে নতুন ভোটসংখ্যা অনুসারে
ফেসবুক পেজ
Udyog Bengali Web Magazine by Bangali Network

বিভিন্ন বিষয় থেকে বেছে নিয়ে লেখা পড়ুন

বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত হওয়া লেখা পড়ুন

মাসিক সংখ্যাগুলি দেখুন
Scroll to Top

‘উদ্যোগ’ ফোনে রাখুন

‘উদ্যোগ’ ওয়েব ম্যাগাজিন ইনস্টল করুন। ইনস্টলের পর অ্যাপ তালিকা থেকে আইকনটি হোমস্ক্রিনে যোগ করে নিতে পারেন। এরপর সহজেই পড়ুন আপনার প্রিয় ম্যাগাজিন। ভালো না লাগলে যেকোনো সময় এক ক্লিকে আনইনস্টল করতে পারবেন।