পৃথিবীর বুকে প্রাণের ইতিহাস আসলে এক আশ্চর্য সুতোয় বোনা চাদর। সেখানে একটা সুতো ছিঁড়ে গেলে পুরো চাদরটাই কেমন যেন আলগা হয়ে যায়। আজ এমন দশটি প্রাণীর কথা বলবো — যার মধ্যে পাঁচটি ইতিমধ্যেই আমাদের ভুলে পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেছে, আর বাকি পাঁচটি আজ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গোনাগুনতি শেষ দিন কাটকাচ্ছে। কিন্তু গল্পটা শুধু হারিয়ে যাওয়ার নয়, হারানোকে ফিরে পাওয়ার এক অবিশ্বাস্য বিজ্ঞানেরও।
শুরু করা যাক সেইসব পাখিদের দিয়ে, বিবর্তনীয় অভিযোজনের ফলে যারা ওড়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। ভারত মহাসাগরের মরিশাস দ্বীপে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে শান্তিতে বাস করত ডোডো পাখি। দ্বীপে কোনো হিংস্র শিকারী না থাকায় এরা মানুষকে দেখেও পালাতে শেখেনি। ১৫৯৮ সালে ওলন্দাজ নাবিকরা যখন দ্বীপে পা রাখল, ডোডোরা কৌতূহল নিয়ে তাদের দিকেই এগিয়ে গিয়েছিল। মানুষ এদের মাংসের জন্য যতটা না মেরেছে, তার চেয়ে বেশি ধ্বংস করেছে জাহাজে করে আনা শুয়োর, বিড়াল আর ইঁদুরের দল; যারা ডোডোদের মাটিতে পেড়ে রাখা ডিমগুলো এক নিমেষে সাবাড় করে দিল। ১৬৬২ সালের মধ্যে শেষ ডোডোটি হারিয়ে গেল পৃথিবী থেকে।
ঠিক একই রকম এক করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছিল আমেরিকার প্যাসেঞ্জার পায়রাদের জন্য, যারা ডানা পেয়েও মানুষের লোভ আর অবিবেচনার হাত থেকে বাঁচতে পারেনি। ১৮০০ শতকের শুরুতে এদের সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচশো কোটি! যখন এরা আকাশে উড়ত, মাইলের পর মাইল জুড়ে মেঘের মতো অন্ধকার হয়ে যেত। কিন্তু আমেরিকার গৃহযুদ্ধের পর সস্তা মাংসের ব্যবসার জন্য জাল পেতে, ডিনামাইট ফাটিয়ে কোটি কোটি পাখি মারা হতে থাকে। এই পাখিরা একা বংশবৃদ্ধি করতে পারত না, এদের বিশাল দলের প্রয়োজন হতো। সংখ্যা কমতে কমতে ১৯১৪ সালে সিনসিনাটি চিড়িয়াখানায় 'মার্থা' নামের শেষ পায়রাটির মৃত্যুর সাথে সাথে একটা সুবিশাল সাম্রাজ্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
আবার খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, ২০১৮ সালে কেনিয়ার ওল পেজেটা কনজারভেন্সিতে যখন 'সুদান' নামের এক ৪৫ বছরের গণ্ডার মারা গেল, তখন তার সাথে সাথেই শেষ হয়ে গেল উত্তরী শ্বেত গণ্ডারের (Northern White Rhino) প্রাকৃতিকভাবে বেঁচে থাকার শেষ আশা। বর্তমানে মাত্র দুটি স্ত্রী গণ্ডার বেঁচে থাকলেও তারা মা হতে অক্ষম।
এই তালিকায় রয়েছে জলের প্রাণীরাও — যেমন নিঃশব্দে হারিয়ে গেছে চীনের ইয়াংজি নদীর 'বাইজি' বা সাদা ডলফিন। অতিরিক্ত মাছ ধরা, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধ আর জাহাজের পাখার আঘাতে ২০০৬ সালের পর এই ডলফিনের আর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি নদীতে।
কিন্তু আজ, এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, বিজ্ঞান আর হাহাকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জিনপ্রযুক্তির (Genetic Engineering) হাত ধরে শুরু হয়েছে এক অবিশ্বাস্য 'ডি-এক্সটিংকশন' বা পুনর্জন্মের লড়াই। বিজ্ঞানীরা মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ডোডোর হাড় বা তাসমানিয়ান টাইগারের চামড়া থেকে প্রাচীন ডিএনএ (Ancient DNA) উদ্ধার করছেন। ক্রিসপার (CRISPR) প্রযুক্তির সাহায্যে সেই ভাঙা ডিএনএ-র টুকরোগুলোকে জোড়া লাগিয়ে তৈরি হচ্ছে নিখুঁত জিনোম ম্যাপ। যেহেতু ডোডো আসলে এক ধরণের বিশাল আকৃতির মাটির পায়রা, তাই তার সবচেয়ে কাছের জীবিত আত্মীয় 'নিকোবর পায়রা'-র ভ্রূণ কোষের ভেতর ডোডোর জিন এডিট করে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে তাসমানিয়ান টাইগারের জিনোম প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে তার ইঁদুর-সদৃশ মারসুপিয়াল আত্মীয় 'ফ্যাট-টেইলড ডুনার্ট'-এর কোষে। আর উত্তরী শ্বেত গণ্ডারদের ক্ষেত্রে? বিজ্ঞানীরা সুদানের হিমায়িত শুক্রাণু আর জীবিত স্ত্রী গণ্ডার ফাতুর ডিম্বাণু ল্যাবে নিষিক্ত করে ইতিমধ্যেই নাকি ৩৯টি খাঁটি ভ্রূণ তৈরি করে ফেলেছেন, যা এখন 'দক্ষিণী শ্বেত গণ্ডার'-এর জরায়ুতে সারোগেসির মাধ্যমে বড় করার চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তিটি সফল হলে ভবিষ্যতে এই প্রাণীদের ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অথচ একদিকে যখন আমরা মৃতদের প্রাণ ফেরানোর এই কঠিন লড়াই লড়ছি, অন্যদিকে আমাদের চোখের সামনেই আরও পাঁচটি প্রজাতি মৃত্যুর মিছিলে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। মেক্সিকোর ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে বাস করা পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ডলফিন 'ভাকিতা' (Vaquita) আজ চোরা শিকারীদের অবৈধ জালের কারণে মাত্র ১০-১২টা পিঠে এসে ঠেকেছে। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের 'নর্থ আটলান্টিক রাইট হোয়েল' বা তিমিগুলো বিশালাকার বাণিজ্যিক জাহাজের ধাক্কায় এবং সমুদ্রে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের জালে জড়িয়ে আজ মাত্র সাড়ে তিনশোর ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের ঘরের কাছেই, রাজস্থান আর গুজরাটের চারণভূমি ধ্বংস হওয়ায় 'গ্রেট ইন্ডিয়ান বাস্টার্ড' বা সোনচিড়িয়া পাখি আজ মাত্র একশোর কিছু বেশি বেঁচে আছে। সুমাত্রার গভীর জঙ্গলে চোরা শিকার আর পাম তেলের চাষের জন্য জঙ্গল সাফ হতে হতে 'সুমাত্রান গণ্ডার' আজ আশিটারও কম। আর রাশিয়ার বরফাবৃত অঞ্চলে হরিণ শিকার এবং বাসস্থান ধ্বংসের কারণে 'আমুর চিতাবাঘ' (Amur Leopard) আজ মাত্র একশোটার মতো টিকে আছে।
আমরা হয়তো ভাবছি, একটা ডলফিন বা একটা বাঘ হারিয়ে গেলে মানুষের কী-ই বা এসে যায়? কিন্তু প্রকৃতির এই শৃঙ্খল ভাঙার মাশুল শেষ পর্যন্ত মানুষকেই সুদ-আসলে মেটাতে হবে। প্রতিটি প্রাণী তাদের নিজস্ব বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেমের এক একজন ইঞ্জিনিয়ার।
গণ্ডার বা হাতির মতো বড় তৃণভোজী প্রাণীরা বনের ঘাস ও ঝোপঝাড় ছেঁটে আগুন লাগার সম্ভাবনা কমিয়ে দেয় এবং কার্বন শোষণে সাহায্য করে। এদের অনুপস্থিতিতে জলবায়ু পরিবর্তন আরও মারাত্মক রূপ নেবে, যার ফলে অসময়ে খরা, বন্যা আর অতিমারির মতো নতুন নতুন ভাইরাস জঙ্গল ছেড়ে মানুষের শহরে হানা দেবে।
প্রকৃতি আসলে একটা তাসের ঘরের মতো; তলার দিকে একটা তাস টেনে নিলে ওপরের রাজপ্রাসাদটাও ভেঙে পড়তে বাধ্য। এই প্রাণীদের বাঁচানো তাই শুধু দয়া বা মায়া নয়, মানুষের নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখারই এক চরম স্বার্থপর লড়াই।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।