১
শীতের ছুটি চলছে, তাই ছেলে-মেয়েরা বাড়িতে। সংসারের সব কাজকর্ম মিটিয়ে, খাওয়াদাওয়া সেরে দুপুরে শুতে বেশ দেরি হয়েছিল। সবে একটু চোখটা লেগেছে — হঠাৎ ছেলে দীপনের কথা কানে যেতে তন্দ্রাটা ছুটে গেল। কানটা একটু খাড়া করে শুনতে চেষ্টা করলাম, কার সঙ্গে ও এভাবে কথা বলছে? অন্য গলাটা ঠিক শুনতে পাচ্ছি না। আর আমরা দুপুরে রেস্ট নিলে ওরা তো এমন জোরে কথা বলে না! শুনতে পাচ্ছি দীপন বলছে — "নো শৈলজা নো, আমি এখন বাইরে যেতে পারব না। মাই মম..."
লাফ দিয়ে খাট থেকে নেমে তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে বেরিয়ে ডাক দিলাম ছেলেকে — "দীপন, তুমি কার সঙ্গে কথা বলছ? কে ওখানে?"
আমার গলার আওয়াজে মেয়েরা তাদের ঘরে মগ্ন হয়ে গল্পের বই পড়ছিল, তারাও কৌতূহলী হয়ে বেরিয়ে এলো। দীপন কাঁচুমাচু হয়ে বলল — "মা, দ্যাখ না শৈলজা এসে আমার সুইংয়ে বসে দুলছে, আর আমাকে বারবার ডাকছে। আমি বলছি, আমি এখন বাইরে যেতে পারব না, তুমি বকবে, কিন্তু ও শুনছে না। আমি বলছি গো হোম, এখন বাড়ি যাও, আমরা পরে খেলব — শুনছে না কিছুতেই। মা দ্যাখ, ওর কপাল কেটে গেছে, রক্ত বেরোচ্ছে। ওকে একটু ওষুধ লাগিয়ে দাও তো।"
আমার পিঠ বেয়ে যেন একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালাম। কোথাও কাউকে দেখতে পেলাম না, কিন্তু দোলনাটা তখনও খুব জোরে দুলছিল। হাওয়া-বাতাস কিছু নেই, অথচ যেন কেউ জোরে ধাক্কা দিচ্ছে।
আমার দুই মেয়ে দুদিক থেকে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমার গলাটা যেন শুকিয়ে গেছে, হাত-পা ঠান্ডা। আমি হাত বাড়িয়ে দীপনকে কাছে টেনে নিলাম।
আমার ছোট মেয়েটা স্কুল থেকে ফেরার সময় একদিন রাস্তা থেকে একটা কুকুরছানা তুলে এনেছিল। আমরা ওকে ভুলু বলে ডাকতাম, রোজ খেতে দিতাম। ও সকাল-সন্ধ্যা সারা পাড়া ঘুরে বেরালেও রাতে ও দুপুরে আমাদের গ্যারেজের পাশে শুয়ে থাকত। বাইরে থেকে আকাশের দিকে মুখ তুলে সেই ভুলু করুণ সুরে কেঁদে চলেছে... রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে কে ঢিল ছুঁড়ে মারল।
অফিসের গাড়ি এসে অতনুকে ড্রপ করে গেল। দরজার বেলটা শুনে যেন বাস্তবে ফিরে এলাম। "বাপী, বাপী" করে ছুটে গিয়ে দীপন দরজা খুলে দিল।
২
আমাদের রান্নাঘর থেকে সোজা দেখা যেত রাস্তার ওপারে এ-সি-পি মাধব নাইডুর বাড়িটা। মাস ছয়েক হলো এ পাড়ায় বিশাল বাড়ি বানিয়ে এসেছে। দু-ছেলে, দু-বউ, নাতি-নাতনি — ভদ্রলোক বিপত্নীক। কিছুদিন আগে বিদেশ থেকে মেয়ে-জামাই তাদের দুটি মেয়ে নিয়ে ছুটিতে এসেছে। শুনেছি মেয়ে ও জামাই ডাক্তার।
যদিও ওরা পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে তেমন মেলামেশা করত না, কিন্তু মাধববাবুর নাতি-নাতনি দুটো আমাদের বাড়িতে খুব আসত এবং মেয়ের ঘরের বড় নাতনীটিও আসার পরদিন থেকেই ওদের সঙ্গে চলে আসত।
মাধববাবুর বড় ছেলের মেয়ে শৈলজার বছর সাতেক বয়স। সবার মধ্যে বয়সে বড়, বেশ দাপুটে আর একটু জেদি ছিল। অন্য সব কটাকে বেশ "বুলি" করত। সরোজিনী, মেয়ের ঘরের নাতনি, মেয়েটি খুব শান্ত-নম্র। শৈলজাকে "আক্কা" মানে দিদি বলত, একটু ভয়ও পেত। ওনার ছোট ছেলের পুত্র পবন আর আমার দীপন একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ে। ওরা বেশি সময়টা সাইকেল নিয়ে ব্যস্ত থাকত। আশপাশ থেকে আরও দু-চারটে বাচ্চাও আসত কখনও-সখনও।
৩
সংক্রান্তিটা এ দেশে পোঙ্গাল নামে পরিচিত। সব বাড়ি-বাড়ি খুব ধুমধাম করে পালন করে। সারাদিন সবাই ঘুড়ি ওড়ায়, ঘরে ঘরে রকমারি মিষ্টি খাবারদাবার তৈরি করে, নতুন পোশাক পরে।
সব থেকে আমার যেটা ভালো লাগে, সেটা হলো সংক্রান্তি স্পেশাল "মুগ্গু", মানে আলপনা। প্রত্যেক বাড়ির মেন গেটের সামনে ওরা সাদা ও নানা রঙের গুঁড়ো দিয়ে বিশাল করে দেখার মতো সব মুগ্গু দেয়। অবশ্য বারোমাস তিরিশ দিনই ওরা সকালে বাড়ির সামনে জল ছিটিয়ে ছোট করে একটি মুগ্গু দেয়। মুগ্গুগুলো বেশিরভাগ জ্যামিতিক প্যাটার্নের হয়। ওদের এই মুগ্গুর রেওয়াজটা আমার বেশ লাগে।
সেটা ছিল পৌষ-সংক্রান্তির আগের দিন। আমি প্রতিবছরের মতো রান্নাঘরে পায়েস, পিঠা তৈরি করায় ব্যস্ত ছিলাম। দীপনের মনটা খারাপ। ও বাড়ির বাচ্চাগুলো আজ তিন-চার দিন হলো খেলতে আসছে না। ওরা সবাই মিলে তিরুপতি গেছে। শৈলজা বলে গেছে, ওরা পোঙ্গালের দিন সকালে ফিরবে। অফিসে ছুটি পায়নি বলে ওর বাবা-মা যাবে না, তাই ওর মনটা যাওয়ার আগে একটু খারাপ ছিল।
দীপন রান্নাঘরের জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বলে উঠল — "দেখ মা, শৈলজাদের বাড়িটা ফুল-পাতা দিয়ে কী সুন্দর সাজাচ্ছে!"
দেখলাম গাঁদাফুল আর আমপল্লব দিয়ে ওদের গেটের ওপর তোরণ ঝোলাচ্ছে এক সেপাই। শৈলজার মা কাজের লোকের সঙ্গে নিয়ে বাড়ির সামনে খুব সুন্দর মুগ্গু আঁকছে। সবাই সন্ধ্যা বা রাতের বেলাতেই মুগ্গুটা দিয়ে রাখে, কারণ সকালে উঠে সেই মুগ্গুর ওপর ওরা পুজো করে।
অনেক ঘুড়ি ও লাটাই নিয়ে বাড়ি ঢুকল শৈলজার বাবা। এবার বিদেশ থেকে মেয়ে-জামাই এসেছে, তাই নিশ্চয় ঘটা করে পোঙ্গাল পালন করা হবে। রাত পোহালেই সবাই ফিরবে — তার প্রস্তুতি চলেছে।
৪
রাত তখন নটা হবে। রান্নাঘরের জানলাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখি ওদের বাড়ির সামনে বেশ কয়েকটা গাড়ি দাঁড়ানো, আর ছোট ছোট গ্রুপ করে লোকজন কথাবার্তা বলছে। কেমন যেন থমথমে ভাব। একটা গাড়ি এলো। দুজন মহিলা মনে হলো কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
এক অজানা বিপদের আশঙ্কায় মনটা ছটফট করে উঠল। আবছা অন্ধকারে দেখলাম আমাদের দু-চারজন প্রতিবেশীও দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাড়াতাড়ি অতনুকে ডেকে সব বললাম। ও চিন্তিত মুখে এগিয়ে গেল শৈলজাদের বাড়ির দিকে। মিশুক না মিশুক, হাজার হোক প্রতিবেশী, আর বাচ্চাগুলো রোজ আসে আমাদের বাড়িতে।
একটু পরে ফিরে এসে যা বলল, শুনে যেন পাথর হয়ে গেলাম। তিরুপতি থেকে ফেরার পথে হাইওয়েতে ওদের গাড়ির সঙ্গে নাকি এক ট্রাকের হেড-অন কলিশন হয়। অন-দা-স্পট মাধববাবুর জামাই ও বড় নাতনী মারা গেছে। মেয়ের ছ-মাসের বাচ্চা মেয়েটা নাকি ছিটকে ধানক্ষেতের নরম মাটিতে পড়ে গিয়েছিল, তাই তেমন বেশি চোট পায়নি, তবে খুব শকড।
মাধববাবুর অবস্থা আশঙ্কাজনক এবং আর সকলের আঘাতই খুব গুরুতর। হাসপাতালে ভর্তি আছে। সব ফরম্যালিটি সারা হলে ওদের বডি বাড়িতে নিয়ে আসবে। তবে অত বড় পুলিশের কর্তা, তাই সময় বেশি লাগবে না — রাতেই নিয়ে আসবে।
দীপন ঘুমিয়ে পড়েছিল। অতনু বলল, দীপনকে এ ব্যাপারে এখন কিছু বলো না। মেয়েরা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল বুঝতে পারিনি। সব শুনে ওরা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওদের শান্ত করে শুতে পাঠালাম।
পরদিন সকালে অতনুর মর্নিং-ফ্লাইট ডিউটি, তাই ওকেও শুতে পাঠালাম, যদিও জানি ওর ঘুম হবে না। আমি আবার জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। খুব অস্থির বোধ করছিলাম। দোলনা নিয়ে ঝগড়া বাঁধলে প্রায় আমাকে মধ্যস্থতা করতে হতো! মেয়েটার কথা, গলার স্বর আমার কানে বাজছে... কিছুতেই মানতে পারছি না, সেই তরতাজা ফুলের মতো মেয়েটা আর নেই।
আমি বারবার রান্নাঘর আর বসার ঘর করছি। ওদের বাড়ির সামনের মুগ্গু, ফুলের তোরণ যেন কাঁটার মতো চোখে বিঁধছে। নিঝুম রাত। মাঝে মাঝে ও বাড়ির কান্নার করুণ আওয়াজ ভেসে আসছে।
হঠাৎ গাড়ির ঘড়ঘড় শব্দ শুনে উঠে জানলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। পৌষের রাতের এক ঝলক শীতল বাতাস জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকল। আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল! ঝাপসা চোখে দেখলাম, প্রথমে সাদা চাদরে মুড়ে একটা ছোট দেহ পাঁজাকোলা করে ভেতরে নিয়ে গেল একজন। তারপর স্ট্রেচারে করে সাদা চাদরে ঢাকা একটি বডি... ভেতর থেকে কান্নার রোল উঠল...
রাস্তার কুকুরগুলো সব সমস্বরে চেঁচাচ্ছে। কতগুলো কাক অসময়ে কা-কা করে তারস্বরে ডাকতে ডাকতে উড়ছে... অতনু এসে আমার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেল। বিছানায় শুলাম, কিন্তু সারা রাত দুজনে চোখের পাতা এক করতে পারলাম না।
৫
কে এসেছিল? দীপন কাকে দেখেছিল? কার সঙ্গে কথা বলছিল? দোলনাটা কেন অমনভাবে দুলছিল? আজও তার উত্তর পাইনি।
লেখিকা চারুকলা অনুরাগী। ৺স্বামীর কর্মসূত্রে দীর্ঘদিন প্রবাসে কেটেছে। এখনো অধিকাংশ সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তিন সন্তানের কাছে কাটান। দেশে বিদেশে বিভিন্ন লিটিল্ ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। নানা সাহিত্য প্রতিযোগিতায় বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। বর্তমানে অনেকগুলি সাহিত্য পরিবার ও অনলাইন-পত্রিকার সাথে গভীর ভাবে যুক্ত।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।