১
‘‘আশ্চর্য! তুমি চুপ করো না৷ যা বোঝো না তা নিয়ে কথা বলতে এসো না৷"
নীরবে সরে যায় অনু৷ এতগুলো মিস্ত্রির সামনে বলল, খুব লজ্জা লাগল৷ বাড়িটা কি ওর নয়? ও কি কোনো মতামত জানাতে পারে না৷
অনু তার রন্ধন কর্মে মন দিল লজ্জিত, ভারাক্রান্ত মন নিয়ে৷ কথাশেষে সুবিমল রান্নাঘরে ঢুকে অনুকে বলে — "বাঃ, দারুণ গন্ধ বেরোচ্ছে৷ কী রাঁধছ গো? ও ফুলকপির রোস্ট? আমার দারুণ প্রিয়৷"
অনু কোনো উত্তর দেয় না৷ সে বোঝে সুবিমল মনের গভীরে বোঝে এভাবে বলাটা উচিত নয়৷ কিন্তু ওর অভ্যাস হয়ে গেছে৷ না বলে থাকতে পারে না৷ আবার স্বভাবও পরিবর্তন করতে পারে না৷ তাই প্রতিবার বলার পর এরকম ফালতু, সস্তা মন রাখা কথা বলে অনুর চারপাশে ঘোরাঘুরি করে৷ বিয়ের পরপর মাস দুয়েক অনু এই সস্তা চাটুকারিতায় ভুলেছে, এখন আর ভোলে না৷
সেদিন সুবিমলের বন্ধুরা বিকেলে আমন্ত্রিত ছিল৷ ওদের আড্ডায় সাধারণত অংশগ্রহণ করে না অনু অর্থাৎ অনুপূর্বা৷ কিন্তু সেদিন সরবত আর সিঙারা টেবিলে রাখার সময় কানে এল ওদের জোর আলোচনা চলছে — কাশ্মীরে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় কোনটা এবং কেন? কখন কোনটা উপলব্ধ?
অনুপূর্বা বলে ওঠে — "সবচেয়ে ভালো আমার মতে..."
তাকে থামিয়ে সুবিমল বিশ্রিভাবে বলে ওঠে — "সব ব্যাপারে নাক গলানো চাই৷ যাও না রান্নাঘরে যাও৷ যা জান না তা নিয়ে বলতে যেও না৷"
অনুপূর্বার গায়ের রং শ্যামলা, তবু তাও লাল হয়ে ওঠে অপমানে৷ সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়৷ মনে হয় তার পেছনে সবাই যেন হাসছে — নীরব হাসি৷ সুবিমলকেই তো তার বলা উচিত ছিল — "যা জান না তা নিয়ে বলতে যেও না৷" কারণ সুবিমল কোনোদিন কাশ্মীর যায়নি৷ আর অনু কাশ্মীর দু’বার ঘুরে এসেছে৷ একবার সাত-আট বছর বয়সে, একবার বিয়ের ঠিক পাঁচ মাস আগে৷
এর কিছুদিন পর সুবিমলের ডাকে বাড়ি এল সুবিমলের ভাই৷ কোনো একটা ইনভেস্টমেন্টের ব্যাপারে হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত কিছু একটা নিয়ে সুবিমল সঠিকভাবে জানার জন্য ভাইকে ডাকে৷ ভাইয়ের ওপর সুবিমলের অগাধ আস্থা বিয়ের আগে থেকেই দেখেছে অনু৷ বিয়ের সম্বন্ধ ঠিক হবার পর মাস পাঁচেক ওরা একসাথে টুকটাক ঘুরেছে, রেস্টুরেন্টে দেখা করেছে৷ তখন কথায় কথায় সুবিমল বলত — "জানো তো এ ব্যাপারটা ভাই দারুণ জানে", "জানো তো ভাই এই রেস্টুরেন্টটার ঠিকানা দিল", "ভাই ক্যাটারিংয়ের দিকটা দেখছে, ও এ ব্যাপারে দক্ষ" ইত্যাদি ইত্যাদি৷
অনু মুখ কালো করে দ্রুত চলে আসে৷ হায়রে, বিয়ের প্রায় দু’বছর আট মাসের মধ্যেই সুবিমল ভুলে গেল অনু বি.কম পাশ৷ শুধু পাশ নয়, ওরা যা নিয়ে আলোচনা করছিল সেটা খুব ভালো করেই বোঝে অনু৷
এমনই ভাবে কত যে জমতে থাকে "তুমি কিছু বোঝো না"-র তালিকা আর অনুর হৃদয় ভাঙতে থাকে৷ কিন্তু এই ছোট্ট বাক্যটার জন্য তো ডিভোর্স হয় না৷ সবাই বলবে — "সুবিমল এত ভালো ছেলে৷ এত ভালোবাসে স্ত্রীকে, এত যত্ন করে৷ তাছাড়া কোনও অশ্লীল, খারাপ শব্দ ব্যবহার করে না স্ত্রীর উদ্দেশ্যে৷ শুধু ঐ সামান্য একটা বাক্য, তাও সবসময় নয়, মাঝে মাঝে৷ এটুকুও আজকালকার মেয়েরা সহ্য করতে পারে না৷ এরা আসলে ঘর করার জন্য তৈরিই হয়নি৷"
লোকে বলবে কি, মনে মনে অনুপূর্বাও তো ভাবে এটা কাউকে বোঝানোর নয়৷ কিন্তু অন্য কারুর সামনে, সে বাইরের লোকই হোক বা ঘরের লোক, এভাবে তাকে তুচ্ছ করাটা খুবই অন্যায়৷ তাছাড়া সে বুঝবে না কেন? মেয়ে বলে? স্ত্রী বলে?
মনে পড়ে বিয়ের পর দ্বিতীয় বছরের পুজোয় অনু বলে সে তার বন্ধুদের সাথে পুজোর মার্কেটিং করতে যাবে৷ বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ির সবার জন্য কত কিনতে হবে৷ সুবিমল বলে ওঠে — "আরে তুমি আর তোমার ঐ গাঁইয়া বন্ধুগুলো ফ্যাশনের কী জানে? কিচ্ছু বোঝো না৷ আমার দিদিকে ডেকে নাও৷ ওর চয়েস অসাধারণ৷"
সেই থেকে ওর দিদির অসাধারণ পছন্দের ওপর ভরসা করে মার্কেটিং করতে হচ্ছে অনুকে৷
২
"এটা সম্ভব নয় গীতা৷ মেয়েদের পক্ষে এ এক অসম্ভব কাজ৷ মেয়েদের শরীর সেভাবে তৈরি হয়নি৷"
তার পাশে "Not applicable" দেখা সার্কুলারটা পাওয়ার পর ড. গায়ত্রী চন্দ্র অফিসে গিয়ে কথা বলে এই উত্তর পান৷ উনি থেমে থাকলেন না৷ উনি তো মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই ভারতবর্ষের বিমান বাহিনীর ডাক্তারিতে যোগ দিয়েছেন৷ এ যে অন্য রকম সেবা৷ তবে বিমান বাহিনীর ডাক্তারদের প্যারাট্রুপার হবার জন্য বিমান কর্তৃপক্ষ সার্কুলার পাঠালে তিনি রাজি হলেও কেন তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে না? নারী বলে?
"মেয়েরা কিছু বোঝে না, জানে না, স্বল্পবুদ্ধি, হেঁশেলই ওদের উপযুক্ত স্থান" — শুনতে শুনতে ওর কান পচে গেছে৷ এর মুখতোড় জবাব দিতেই তো তার এই প্রফেশনে আসা৷ অসুস্থ পুরুষকে তারই চিকিৎসায় থেকে সুস্থ হতে হবে৷ চিকিৎসার "কিছু বোঝে না, জানে না" বলবার সাহসও হবে না তাদের৷
তারাভরা আকাশের নীচে বসে আছে গায়ত্রী৷ কোয়ার্টারে যেতে ইচ্ছা হচ্ছিল না৷ ভাবছিলেন ছোট্ট বেলার কথা৷ মা আজ নেই৷ যতদিন বেঁচে ছিলেন, সে দেখেছে — বাবা, ঠাকুরদা, জ্যেঠা সবার মুখে মাকে শুনতে হয়েছে — "মেয়ে মানুষ তো দুর্বল, কমবুদ্ধি, কিছু বোঝে না৷ মা অঙ্ক বোঝে না, বিজ্ঞান বোঝে না, বাইরের জগত বোঝে না, ইতিহাস বোঝে না, ভূগোল বোঝে না, কিচ্ছু বোঝে না, শুধু খাবার বানানো ছাড়া৷"
সেখানেও না বোঝা আছে৷ ভাত-তরকারি বাড়লে বা কম পড়লেও শুনতে হয় — "এতকাল সংসার করছ, এখনো কতটা কী লাগবে হিসাব বোঝ না? বাইরে খেটে রোজগার তো করতে হয় না, বুঝবে কী করে টাকার মূল্য? জিনিসের দাম?"
আর সেকারণেই গায়ত্রী গতানুগতিকতার বাইরে যেতে চেয়েছে৷ অথচ মা যে অনেক পুরুষের চেয়ে অনেক কিছুই বেশি বুঝতেন, তা ও জানে৷ মা বোঝে কিনা তার পরীক্ষা না নিয়েই ওরা কেমন রেজাল্ট ঘোষণা করে দিত৷
গায়ত্রী দৃঢ় মনোবল নিয়ে উঠে দাঁড়াল৷ বেশ ক’বার গিয়েও হতোদ্যম হয়নি সে৷ বেশ মাস দু’য়েক পরে এয়ার মার্শাল সমৃদ্ধ ব্যানার্জী তাঁর সংকল্পকে মর্যাদা দিলেন এবং তার প্রচেষ্টায় তিনি জুন মাসে প্যারাট্রুপার স্কুলে যোগ দিলেন৷
গায়িত্রী মন দিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে লাগলেন৷ প্রচুর পরিশ্রম — দু’মাস ধরে প্যারেড, পিটি, দৌড়ানো, সাঁতার, নর্মাল ব্যায়ামসহ কত কী যে শিখতে হল৷ প্রতিদিন সাত মাইল ছোটা৷ ওদিকে বাড়ি থেকেও বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন বলছেন — "কী দরকার প্রাণ ঝুঁকি নেওয়া? পুরুষগুলো গেল না, তোর বাড়াবাড়ি৷ বাদ দে৷"
না, কোনও বাধা শোনেননি তিনি৷ ট্রেনিং স্কুলের একা শিক্ষার্থী তিনি৷ তাতে কী? পারতে তাকে হবেই৷
৩
"কী হল তোমার?" উদ্বিগ্ন হয়ে অনু সুবিমলকে সোফায় বসায়৷ সুবিমল অফিস থেকে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে কোনো রকমে ফিরেছে৷ সোফাতেই জুতোসুদ্ধ শুয়ে পড়ে৷ অনু জুতোটা খুলে নেয়৷ বেল্ট, টাই কোনো রকমে খুলে জামার বোতাম খুলে ঘরের জামা পরিয়ে দেয়৷ থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর দেখে ১০৪°৷ মাথায় জলপট্টি দিতে দিতে ফোন করে সুবিমলের দিদিকে৷ ও কাছেই থাকে৷
দিদি ফোনে বলে — "একটু জ্বর হয়েছে তো৷ এতে এত ভয় পাওয়ার কী আছে? ডাক্তারের কাছে নিয়ে যা বা বাড়িতে ডাক্তার ডাক৷ সিজন চেঞ্জের সময়, জ্বর হতেই পারে৷ তাছাড়া আমার শ্বশুরের শরীরটা খারাপ৷ আমি এখন যেতে পারব না৷ এটুকুও সামলাতে পারবি না?"
দেওরকে ফোন করে৷ দেওর বলে — "আমারও জ্বর, শুয়ে আছি৷ কিচ্ছু হবে না৷ ডাক্তার ডাকো৷ পাড়ায় হাজারোটা ডাক্তার৷ এ আর এমন কী কাজ বৌদি৷ তুমি কি কিছুই পারো না?"
ওষুধ কিনে, ওখানেই কথা বলে নেয় সকালে লোক পাঠিয়ে ব্লাড টেস্টের স্যাম্পেল নিতে৷ অ্যাডভান্সও করে দেয়৷ পাশের গ্রসারি থেকে টুকিটাকি দরকারি কিছু জিনিস কেনে৷ এগুলো আজ সুবিমলেরই আনার কথা ছিল৷ বাড়ি ফিরে সুবিমলের জন্য সুপ বানিয়ে, খাইয়ে দেয় একটু একটু করে৷ সুবিমল খেতে চাইছিল না৷ অনু বাচ্চাদের মতো করে ওকে বোঝায় কিছু না খেলে শরীর দুর্বল হয়ে যাবে৷ তাছাড়া ওষুধ খেতে হবে৷
সুবিমলকে খাইয়ে আবার মাথায় জলপট্টি দেয়৷ হালকা গরম জলে মুখ, পা, হাত মুছিয়ে কোনো রকমে ধরে ধরে বিছানায় শোয়ায়৷
পরদিনও ওষুধে কোনও সুরাহা হল না৷ মরার মতো পড়ে আছে৷ ডাক্তারকে বলতে উনি বললেন রিপোর্ট পেলে নিয়ে দেখা করতে৷ একটা দিন কেটে গেল৷ সুবিমল কিছুই খাচ্ছে না৷ অফিস থেকে বন্ধুরা দু’একজন ফোন করে খবর নিয়েছে৷ ননদ ফোন করেনি, দেওরও নয়৷ সত্যিই ওরাও তো ব্যস্ত, অসুস্থ৷ কী করা যাবে৷ তবে মার্কেটিং-এ যাবার সময় ননদকে কোনওদিন কোনো কারণে "অসুবিধা আছে, যাব না" বলতে শোনেনি৷ না, না, এমন ভাববে না অনু৷ সত্যিই হয়তো অসুবিধায় পড়েছে৷
পরদিন রিপোর্ট নিয়ে দেখা করতে গেল অনু৷ ডাক্তার বললেন — "ডেঙ্গু৷ এক্ষুনি হসপিটালে ভর্তি করতে হবে৷"
ওনার আন্ডারেই ভর্তি করতে হবে৷ অনু ওর বাড়ির পাশের ক্লাবে সরাসরি চলে গেল৷ জানে ওদের অ্যাম্বুলেন্স আছে৷ ছেলেগুলো খুবই উপকারী৷ অ্যাম্বুলেন্সে ওর সাথে দুটি ছেলে গেল৷ ইতিমধ্যে অনু ওদের মেডিক্লেমের এজেন্টটিকে ফোন করে বলে দিল৷ নার্সিং হোমে গিয়ে ফোনে স্টোর করে রাখা হেলথ ইনসিওরেন্সের I.D নাম্বারটা জানাল৷ সব ব্যবস্থা করে অনেক রাতে বাড়ি ফিরল একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে৷
পরদিন নার্সিং হোমে যেতেই নার্স জানাল প্লেটলেট কাউন্ট একেবারে কমে গেছে৷ প্লাজমা দিতে হবে৷ অনু ঘাবড়ে গেল না৷ বলল — "এখান থেকে ব্যবস্থা করে দিন৷"
হয়ে গেল ব্যবস্থা৷ প্রায় সারাটা দিন এখানেই কেটে যায় অনুর৷ ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নিচে ওষুধের দোকানে লাইন দিয়ে ওষুধ আনা, ভিসিটিং আওয়ারে সারাক্ষণ সুবিমলের পাশে বসে থাকা, টুকটাক কথা৷ ভিসিটিং আওয়ার শেষ হলে নিচে বসে ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করা৷ ডাক্তারবাবু পেশেন্ট দেখে ফিরলে ওনার সাথে দেখা করে খবরাখবর নেওয়া৷ প্রায় দুপুর গড়িয়ে যাওয়া বিকেলে ঘরে ফিরে টুকটাক ঘরের কাজ সেরে, দুটো যা হোক মুখে দিয়ে আবার বিকেলের ভিসিটিং আওয়ারে ছোটা৷
এর মধ্যে দু-একজন আত্মীয় বন্ধু দেখা করে গেছে — জাস্ট ভিসিটিং৷ ননদ একদিন এসে খানকতক মুসুম্বি দিয়ে গেছে৷ সত্যি সুবিমল বলে না ওর দিদির চয়েস দারুণ — সেটা আজ উপলব্ধি করল অনু হাসপাতালে ওর দিদির পরিধেয়টি দেখে৷
কীভাবে ঘোরের মধ্যে কেটে গেল দশটা দিন৷ আজ সুবিমল ছাড়া পাবে৷ তার আগেও অনেক ফর্মালিটি৷ মেডিকেল ইনসিওরেন্সের ক্লিয়ারিং পেতেই বেশ সময় লাগল৷ ডাক্তারের ফিস ক্যাশে দিতে হবে, অনু জানত না৷ ফলে নিকটবর্তী এটিএমে গিয়ে ক্যাশ তুলে জমা দিল৷ আয়ার পে মেটাল৷ সব জিনিস আর সুবিমলকে নিয়ে লিফটে নিচে নেমে, ওকে বসিয়ে উবার বুক করল৷
বাড়ি ফিরে আরো কাজ৷ বিছানায় ওঠার ক্ষমতা সুবিমলের নেই৷ নিচে বিছানা পাতল৷ ওকে হাতমুখ, পা ধুইয়ে দিয়ে, জামা পালটে দিয়ে শোয়াল৷ মুসুম্বি কেটে খেতে দিল৷ নির্দেশ অনুযায়ী পথ্য দেওয়া, ওর যা যা লাগবে সব জোগাড় করা — এভাবে দু’টো দিন কাটাল৷ এখনো সুবিমলের গায়ে কোনও জোর নেই৷ বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারে না৷
তিন দিনের দিন ডাক্তারবাবুকে কল করল অনু৷ ডাক্তারবাবু এলেন৷
৪
আজকে সেই প্রতীক্ষিত দিন৷ গায়ত্রী খুব উত্তেজিত৷ উড়ন্ত ডাকোটা থেকে আজ তার প্রথম ঝাঁপ৷ ঝাঁপ দেবে চার জন প্যারাট্রুপার৷ প্রথমে ঝাঁপ দেবেন যে তিন জন, তারা সবাই শিক্ষক৷ আর তাদের পেছনে চতুর্থ জন একমাত্র শিক্ষার্থী৷ পুরুষ ডাক্তাররা কেউ এই প্রশিক্ষণ নিতে রাজি হয়নি৷
নিচে বিশাল জনসমাগম৷ প্যারাট্রুপিং-এর জন্য নয়, একজন মহিলা ঝাঁপ দেবে তার জন্য৷ বুঝতে হবে সময়টা আমাদের স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছর পর৷ একবিংশ শতক পেরোনোর পরও যখন অনুকে শুনতে হয় — "তুমি এসব বোঝো না, চুপ করে থাকো", "তুমি ওসব বোঝো না, রান্নাঘরে যাও", তখন প্যারাট্রুপার একজন মহিলা — "কী অবাক কাণ্ড! পারবে? কী জানি? কী সব ধিঙ্গিপনা!"
হয়তো এমন আদিরসাত্মক উক্তিও করছে কেউ কেউ৷ না, না, গায়ত্রীদের এসবে কিছু যায় আসে না৷ সংকেত দেওয়া হল৷ তিনজন শিক্ষক ঝাঁপ দিলেন৷ তারপর খোলা দরজার চৌকাঠে পা রাখলেন গায়ত্রী৷ সবুজ সংকেত পেয়ে প্যারাট্রুপার গায়ত্রী চৌকাঠ পেরিয়ে শূন্যে ঝাঁপ দিলেন৷
এ কী! এত টুইস্ট হচ্ছে কেন? একটু ভয় হল তাঁর৷ এ দিকে প্যারাসুটের দড়িতে দড়িতে জট পাকিয়ে গেছে৷ না খুললে ভয়ংকর বিপদ৷ প্রশিক্ষণ অনুযায়ী ক্ষিপ্র গতিতে, সেকেন্ডের মধ্যে জট ছাড়ালেন এবং সাফল্যের সঙ্গে আকাশে ভাসলেন৷
৫
ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করলেন এবং অনুকে বললেন — "আপাতত ঠিক আছে৷ তবে কিছু নির্দেশ দিচ্ছি, শুনে নিন৷"
তখন হঠাৎ সুবিমল বলে উঠল — "আমাকে বলুন৷"
সুবিমল কেমন ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে যায়৷ অনুর মনে খুব আনন্দ হয়৷ পেরেছে সে, পেরেছে৷ তার মতো করে সে শূন্যে ঝাঁপ দিয়ে সে জিতেছে৷ তৈরি করেছে ইতিহাস৷ এই ইতিহাসকে মাইলস্টোন করেই তার যাত্রা শুরু হল৷
লেখিকার জন্ম জন্ম কালনা শহরে৷ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি করে সোনারপুর মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় রত৷ প্রবন্ধ, কথাসাহিত্য ও কবিতা লেখেন৷ 'প্রকাশিত হয়েছে 'নারী প্রগতির সেকাল ও একাল',' নারী প্রগতি নানা ভাবনায়', 'এক মলাটে তিন ভুবন', 'বাংলা কথাসাহিত্যে অস্তিত্ববাদের প্রভাব', 'রূপকথা ছড়া ও রহস্যের জগৎ', 'দেশে বিদেশে : এক স্বতন্ত্র পাঠ', 'জীবনস্মৃতি কিছু কথা কিছু ছবি', 'বৃন্দাবন দাস বিরচিত শ্রীচৈতন্য ভাগবত আদিখণ্ড', 'প্রথম প্রতিশ্রুতি এক নারীর লেখায় এক নারীর কথা' প্রভৃতি বই সহ অসংখ্য প্রবন্ধ৷ আসন্ন কলকাতা বইমেলায় 'মাটির টানে' নামক একটি উপন্যাস প্রকাশিত হবে৷
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।