ভাবুন তো, মানুষের মাথার ভেতরে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন ছোট ছোট বিদ্যুতের ঝলকের মতো কাজ করছে। স্মৃতি তৈরি হচ্ছে, অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। আর এই পুরো ব্যবস্থাটার শক্তি আসছে কোথা থেকে? খুব সাধারণ একটা জিনিস থেকে — খাবার।
বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মস্তিষ্ক শরীরের মোট ওজনের মাত্র ২% হলেও, শরীরের প্রায় ২০% শক্তি একাই ব্যবহার করে। মানে, শরীর যে শক্তি তৈরি করছে, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ চলে যাচ্ছে এই ছোট্ট নরম অঙ্গটার জন্য।
মস্তিষ্কের সবচেয়ে পছন্দের জ্বালানি হলো গ্লুকোজ, যা আমরা মূলত কার্বোহাইড্রেট থেকে পাই। কিন্তু সব কার্বোহাইড্রেট একরকম নয়। ফল, ওটস বা গোটা শস্য ধীরে ধীরে শক্তি দেয়, তাই মস্তিষ্ক স্থিরভাবে কাজ করতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত চিনি? সেটা হঠাৎ এনার্জি বাড়ায়, আবার দ্রুত নামিয়েও দেয়। ফলে ক্লান্তি আসে, মনোযোগ কমে যায়। গবেষণা বলছে, দীর্ঘদিন বেশি চিনি খেলে স্মৃতিশক্তি আর শেখার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আর সবচেয়ে অবাক করার মতো ব্যাপার হলো — আমাদের মস্তিষ্কের বড় একটা অংশই আসলে চর্বি দিয়ে তৈরি।
মস্তিষ্কের শুকনো ওজনের প্রায় ৬০% হলো ফ্যাট। তাই ভালো ফ্যাট, বিশেষ করে ওমেগা-৩, নিউরনের মধ্যে যোগাযোগ ঠিক রাখতে খুব দরকারি। স্নায়ুবিজ্ঞানী ফার্নান্দো গোমেজ-পিনিল্লা দেখিয়েছিলেন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার মস্তিষ্কের নতুন সংযোগ তৈরির ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। মানে, খাবার শুধু শরীর নয়, নিউরনের সংযোগও বদলে দিতে পারে।
তারপর আসে প্রোটিন, যা মানুষের আবেগের এক নীরব রাসায়নিক কারিগর। কারণ প্রোটিন থেকে তৈরি হয় নিউরোট্রান্সমিটার — যেগুলো আমাদের মুড, আনন্দ, মোটিভেশন আর মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৫০-এর দশকে সুইডিশ বিজ্ঞানী আরভিড কার্লসন ডোপামিনের ভূমিকা আবিষ্কার করে দেখিয়েছিলেন, খাবার থেকে পাওয়া রাসায়নিক উপাদান মানুষের আচরণ পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে।
চিকিৎসক মাইকেল গ্যারশন আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে বলেছিলেন শরীরের “দ্বিতীয় মস্তিষ্ক”। কারণ অন্ত্রের ভেতরেও আছে লক্ষ লক্ষ নিউরন, যারা মস্তিষ্কের সঙ্গে সারাক্ষণ যোগাযোগ করছে। এখন বিজ্ঞানীরা মনে করেন, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়াও হয়তো আমাদের স্ট্রেস, উদ্বেগ, এমনকি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপরও প্রভাব ফেলে। তাই “gut feeling” কথাটা হয়তো শুধু কথা নয়।
জলও এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্কের প্রায় ৭৩% হলো জল। ফিজিওলজিস্ট লরেন্স ই. আর্মস্ট্রং-এর গবেষণা দেখিয়েছে, সামান্য ডিহাইড্রেশন বা জলের ঘাটতিও মনোযোগ আর স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। মানে, তৃষ্ণার্ত মস্তিষ্ক আসলে ধীর মস্তিষ্ক।
আর সবশেষে আছে নিউরোপ্লাস্টিসিটি — মস্তিষ্কের সেই আশ্চর্য ক্ষমতা, যার মাধ্যমে সে নিজেকে বদলে ফেলতে পারে। মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হেব একটি বিখ্যাত তত্ত্ব দিয়েছিলেন, “Cells that fire together wire together.” মানে, আমরা যা খাই, যা করি, যেভাবে বাঁচি — সবকিছু ধীরে ধীরে আমাদের মস্তিষ্কের গঠন বদলে দেয়।
তাই খাবার শুধু শরীর বাঁচানোর জন্য নয়। খাবারই রূপান্তরিত হয় আমাদের চিন্তায়, আবেগে, স্মৃতিতে, কল্পনায়, এমনকি আমাদের নিজস্ব সত্তায়। পরের বার যখন আমরা টেবিলে খেতে বসব, তখন যেন মনে রাখি — আমরা কেবল একটা শরীরকে খাওয়াচ্ছি না, বরং খাওয়াচ্ছি সেই বৈদ্যুতিক মহাবিশ্বকে, যা আমাদের মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।