পুনমের একটা বিচ্ছিরি স্বভাব হয়েছে ইদানীং — চারতলার "এ-এইট"-এর ফ্ল্যাটে আড়ি পাতা। তবে খুব যে ইচ্ছে করে কান পাতে দরজায়, তা ঠিক নয়। ঐ পাঁচতলায় ওদের ফ্ল্যাটে উঠতে গিয়ে অনেক সময়ই চিৎকার, কান্নার আওয়াজ কানে আসে। উপেক্ষা করাই যায় — কিছু যখন করতে পারবে না। কিন্তু কেন যে পারে না, এটাই ওর নিজের কাছে নিজের প্রশ্ন।
"এ-সিক্স"-এর মহুয়া বৌদি অবশ্য বলে, "থাকিস তো বাবা দুই জনে, শ্বশুরবাড়ির ঝামেলা নেই আমার মতো। তাও টিকতে পারিস না? শাঁওলিটাই ঝগড়া করে। বরটাকে টিকতে দেয় না।"
পুনম অতশত জানে না। তবে সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামার সময় অনেকবারই চোখে পড়েছে শাঁওলি বলে বৌটার হাতে-কপালে কালসিটে দাগ। পুনমেরই বয়সী হবে হয়তো বৌটা। ইচ্ছে করে কথা বলতে, তবু কী যে হয়...
যাক্, বৌটার আর কান্নার আওয়াজ ভেতর থেকে আসছে না। পুনম সরে আসে ধীরে ধীরে "এ-এইট"-এর দরজার সামনে থেকে।
আজ নবরাত্রির শেষ দিন। অজন্তা সিনেমা হলের কাছে পুনমের এক ভাসুর থাকে, সেখানে "জাগরাত্রা" আছে। শাশুড়ি, শ্বশুর চলে গেছে। পুনম পরে যাবে।
নবরাত্রির উপোস পুনম এখন আর করে না। আজ খুব ছোলে-ভাটুরে খেতে ইচ্ছে করছে। পুনমের হাতের ছোলে-ভাটুরে লোকে চেয়ে চেয়ে খায়। কিছুটা "তিখা, খাট্টা, মিঠা আর নমকিন" বানিয়ে যদি শাঁওলির কাছে নিয়ে যাওয়া যেত, বেশ হতো!
আরে, শাঁওলি তো বের হচ্ছে! পুনম সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়েও দাঁড়িয়ে যায়। আড়াল থেকে দেখে বৌটা দরজায় তালা দিচ্ছে। খুব সেজেছে।
বাঙালিদেরও তো পুজো আছে — মাতারাণীর পুজো। অন্নপূর্ণা পুজো বলে ওরা। এই গল্পটা পুনম জানে। বিয়ের আগে তো থাকত কলকাতাতেই। শিবঠাকুরকে মা পার্বতী ভিক্ষা দিয়েছিলেন।
তবে পুনমের আর বেনারস যাওয়া হলো না। এই তো জানুয়ারি মাসে ওর মা-বাবা ঘুরে এলো।
"জাগরাত্রা" থেকে ওঠা উচিত নয়, কিন্তু পুনম কী আর করে! এত ভিড়, হাসি-ঠাট্টা আর ভালো লাগছিল না।
রাস্তায় কী ভিড়! চৈত্র সেলের সময় না! কে বলবে এখন সাড়ে দশটা বাজতে চললো! বেহালা ট্রাম ডিপো, চোদ্দ নম্বর তো এমনিতেই ঘুমায় দেরিতে। আর এখন তো সেলের বাজার।
ভিড় কাটিয়ে, জামাকাপড় দেখতে দেখতে পুনমের বেশ মজাই লাগছে। তবে দোকানিরা সবাই এখন দোকান গোটাতে ব্যস্ত। বাড়ি যেতে হবে তো। ঘর, নিজের ঘর। পুনমের ঘরও বেশি দূরে না, যদিও ঐ বনমালী নস্কর রোডে।
আজও নিজের ফ্ল্যাটে যাওয়ার আগে "এ-এইট"-এর দরজায় কান পাতে পুনম। টিভির আওয়াজ...
সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে পাঁচতলায় নিজের ফ্ল্যাটে যেতে গিয়ে ভাবে — ছাতে গেলে কেমন হয়! আজ বিকেলে ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে। বেশ ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। গেলেই হয়, একবার।
ছাতটা বড় সুন্দর। তবে বিশাল কিছু বড় না। পুরনো ফ্ল্যাটবাড়িটা, লিফ্ট নেই ওদের। না থাক্, পুনমের ছিমছামই ভালো লাগে। ওদের বনমালী নস্কর রোডে প্রচুর বাড়ি হলেও বেশ সবুজও আছে।
বুক ভরে রাতের গন্ধ নেয় পুনম। সামনেই পূর্ণিমা, চাঁদটা তাই কেমন ঝকঝক করছে!
"কে? শাঁওলি না? এত রাতে?"
জলের ট্যাঙ্কিটার গা ঘেঁষে দাঁড়ায় পুনম, শাঁওলি যেন না দেখে!
"কিন্তু মেয়েটা ঐ রকম করে কার্নিস ধরে ঝুঁকে আছে কেন? বিপদ হয়ে যাবে তো!"
পুনম কী মানা করবে? সামনে এগোবো ভাবতে ভাবতেই শোনে চাপা একটা গলার স্বর —
"শাঁওলি! এত রাতে কী সব নাটক শুরু করলে? নিচে চলো। কাল সবার আগে তোমাকে মাথার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। তারপর অন্য কাজ।"
পুনম জানে এটা শাঁওলির বর। হেব্বি রাগ। বদরাগী হয় বরগুলো বড্ড!
মেয়েটা ছোট বাচ্চার মতো কাঁদতে কাঁদতে বরের পেছন পেছন চললো "ঘরে"।
চাঁদটা কী রকম বোকা! বিনা কারণেই আলো দিচ্ছে। চারপাশটা কী রকম অন্ধকার!
দূর! পুনমও ঘরের দিকে পা বাড়ায়।
চৈত্র সেলের শেষদিন। বেহালা ট্রাম ডিপোর প্রতিটা দোকান, কী ফুটের দোকানগুলোতে অসম্ভব ভিড়! এই যে শোনে টাকা নেই, গ্যাস নেই, চাকরি নেই, খাবার নেই — তবে?
কে জানে, সত্যি নেই হয়তো! ওরা পুনমের মতো এমনই ঘুরছে, ঘোরার নেশায়। এটাই আনন্দ। বেঁচে থাকাটাই আনন্দ।
আজও "এ-এইট"-এর ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়ায় পুনম। সেই কান্না আর চিৎকারের আওয়াজ। ঘরের মধ্যে ধুপধাপ পায়ের শব্দ! বৌটা কী দৌড়াল? ওকে কী মারছে? কিছুই বুঝতে পারে না পুনম। ধীরে ধীরে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে চলে ও।
আজ বড্ড গুমোট লাগছে। একবার ছাতে গেলে হয়! পায়ের শব্দ না করে ছাতে ওঠে পুনম।
"দরজাটা আজ খোলা কেন? কে এখন আসলো ছাতে? এ কী! শাঁওলি না? কার্নিসটা দিয়ে কী রকম ঝুঁকছে! ও কী কোনো কাণ্ড করতে যাচ্ছে?" পুনম ছুটে যায় শাঁওলির কাছে।
"আমি আর পারছিলাম না গো। চার বছর হলো বিয়ে হয়েছে। শুরুতে সব ঠিকই ছিল। কিন্তু জানো, আমার মনে না খুব তাড়াতাড়ি মেঘ জমে। ওষুধ না খেলে কাটতেই চায় না। তখন খুব ঘুমাই, খেয়ালই থাকে না। ও ইদানীং খুব রাগ করে, ঝগড়া করে। আমি চিৎকার করি, কাঁদি। ডাক্তারের কাছে যাই, ও 'সরি' বলে। আবারও জোরে জোরে ঝগড়া করে, তেড়ে আসে। দুই-তিন বার জোরে হাত চেপে ধরে কালসিটে ফেলে দিয়েছে। একবার তো ওর ভয়ে দৌড়াতে গিয়ে আছাড় খেয়ে কপালে কালসিটে ফেললাম। তবে আজ আমার দিকে জলভরা ভারী গ্লাসটা ছুঁড়ে দিল। আর পেরে উঠছি না। তাই ভাবলাম আমি চলে গেলে ভালোই হবে। জানো মা-ও বলে আমি অকারণে 'ঘ্যান ঘ্যান' করি। বাবাও কী নিরুত্তাপ! তাই তো চলে যেতে চাইলাম।"
কার্নিস থেকে কথা বলতে বলতে সরে আসে শাঁওলি। শান্ত এখন মেয়েটি, স্থির ছবি।
"দ্যাখো শাঁওলি, তুমি চলে গেলে কিন্তু আর ফিরতে পারবে না। কোনোদিনও এই চাঁদটা, আলো-হাওয়া, এই আকাশ — কিচ্ছু দেখতে পারবে না।" পুনম ফিসফিস করে বলে শাঁওলির কানে — "ঝাঁপ দিও না প্লিজ। এই 'থাকা'টাই মজার বুঝলে। আর কাল না তোমাদের নতুন বছরের শুরু! দ্যাখো না আবার সব নতুন শুরু করতে পারো কিনা! বেঁচে থাকাটা অতোটাও খারাপ নয়। তবে চেষ্টা করাটা ছাড়তে নেই।"
শাঁওলি ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে যায়। সেই দিকেই তাকিয়ে থাকে পুনম। ছাতের কার্নিসে হেলান দিয়ে বোকা চাঁদটার দিকে তাকিয়ে একটু হাসে ও। কেমন তাকিয়ে আছে দ্যাখো! নিজের দুই হাতের পাতায় চাঁদের আলো মাখে পুনম।
চাঁদটা ফিসফিস করে বলে, "ভাবো কী?"
"ও আমাকে দেখলো কী করে?"
চাঁদ হাসে। বলে, "ও দেখল ঘোরের মধ্যে, আর কিছু না।"
হাসিটা দেখে পুনমের ইচ্ছে করে ছোলে-ভাটুরে, টমেটোর চাটনি আর পায়েস খেতে। বাঙালিদের মতো চালের পায়েস না, ওদের বিহারীদের মতো অল্প নারকেল কোড়া দিয়ে বানানো পায়েস খেতে ইচ্ছে করছে। সেই যে হোলির দিন বানিয়েছিল।
চাঁদটা আবার হাসে পুনমের কথা শুনে — "খাও তবে, দ্যাখো কেমন স্বাদ লাগে!"
"খাবো কী করে? শরীরটাই তো নেই। তাই স্বাদ, গন্ধ কিচ্ছু নেই।"
"অন্যকে তো বাঁচার মন্ত্র দিলে, নিজের বেলায় কী করলে? বোকার মতো মরতে গেলে..."
"সেটাই তো ভুল হয়ে গেল। জোর করে সানিকে বিয়ে করলাম। মদো-মাতাল-লম্পট একটা! ছোট একটা চাকরি করতাম, ছিলাম নিজের মতোই, ওদের গালাগালি উপেক্ষা করে। তবুও কী গায়ে লাগতো না? লাগতো। শাশুড়ি বলতো কাম-কাজ কিচ্ছু পারি না, সানির 'বে-ফালতু' কথা। ছিলাম তবু। বুঝলে, হোলির দিন ছিল। উপোস করলাম, পুজো করলাম। বন্ধুরা আসলো, আবির দিলাম, মাখলামও। ছোলে-ভাটুরে, চাটনি, পায়েস করেছিলাম। সবাই খেল।
তারপর থেকে এই ভাবে হাওয়ায় মিশে, ফ্ল্যাট, চারপাশে ঘুরে বেরাই। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি কেন যে কেউ আমার কানে বাঁচার মন্ত্র দিল না! কেউ যদি সেই সময় ফ্ল্যাটে আসতো, কানে কানে আমাকে বলতো — ভুল করো না, বাঁচো, বাঁচো...
তাই আমিও হাওয়ার মধ্যে মিশে ফিসফিস করে বলে যাই — 'না-বাঁচার ইচ্ছেটাকে মুছে ফেল প্লিজ। বেঁচে থাকলে আমার সেই না-খাওয়া ছোলে-ভাটুরের স্বাদটা তো টের পাবে — তিখা, খাট্টা, মিঠা, নমকিন — একদম জীবনের মতো।'"
শেষ রাতের চাঁদ ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে। ফর্সা আকাশে লালের ছোপ লাগে। অনেকদিন বালক সূর্যের আলোকে পুনম গায়ে মাখেনি। নতুন বছরের প্রথম দিনে সেই পুরনো সূর্যের আলোর দিকে দুই হাত পাতে পুনম।
ভোর হয় কলকাতায়...
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।