গাড়িতে আর একবার স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করে বিফল হয়ে একটা সিগারেট ধরাল বারীন। বছরের শেষ দিনে কেমন একটা কুয়াশা-মাখা মনখারাপ বারীনের শরীরের প্রতিটি কোষকে তন্দ্রাচ্ছন্ন করে তুলেছে। পশ্চিমে সূর্য একটা বিশাল মাঠের মধ্যিখানে গলন্ত মোমের মতো কমলা আভা ছড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে। পুবদিকে একটা বিশাল শাল-পিয়ালের বন। বারীনের ইচ্ছে ছিল এই বছর প্রিয় মানুষটির সাথে বছরের শেষ দিনে এইখানেই এসে সাবেকি প্রথায় বিয়ের প্রস্তাব দেবে। অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় তানিশা তাকে না করতে পারবে না — এই আশায় বারীন ফিক্সড ডিপোজিট ভেঙে হীরের আংটি-ও কিনে ফেলেছে। কিন্তু বিধি বাম। তানিশার বাবা-মা ব্রাহ্মণ হয়ে কায়স্থ ছেলেকে কখনোই মেনে নেবে না বলেছে, আর তানিশাও দশ বছরের স্মৃতি ভুলে অন্য ব্রাহ্মণ আমেরিকা-নিবাসী ছেলের সাথে বাগদান সেরে ফেলেছে। পুরোনো কথা রোমন্থন করতে করতে বারীন গাড়ির বনেট খুলে দেখছে, এমন সময় পেছন থেকে একজন হাঁক পারল, "দাদা! সন্ধ্যে নামতাসে — এইখানেক আর দাঁড়াইবেন না। বিপদ হবেক।"
বারীন হেসে পেছন ফিরে দেখে — খাটো করে গামছা পরা, দোহারা চেহারার খাটো মাঝবয়সী লোক এক বস্তা শাল পাতা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে তাকে।
"কিসের বিপদ? বাঘ আছে নাকি এদিকে?" লোকটি সন্ত্রস্ত দৃষ্টিতে চলন্ত সাদা ধোঁয়াশার আড়ালে ক্রমশ অদৃশ্য হতে থাকা জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কী বলতে লাগল। বারীন ফের বলল, "আমার গাড়ি খারাপ হয়ে গেছে। এখানে মেকানিক পাওয়া যাবে কি?" লোকটি ঠোঁট চেটে আশপাশ দেখে ফিসফিস করে জবাব দিল, "এয়েথ ভোর হোত লাগ কউ আসব না। তু মো সঙ্গে চল। আর এয়েথ থাক নি।"
বারীনের কেমন সন্দেহ হল — এ সেই নিউজে পড়া চোরেদের গ্যাং নয় তো? সাদাসিধে টুরিস্টদের দেখে ভুলিয়ে নিয়ে লুঠ করে। বারীন বলল সে গাড়ি ছেড়ে নড়বে না; লোকটি পারলে কাউকে মেকানিক পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বলুক। লোকটি যাওয়ার আগে তাকে বারংবার জঙ্গলের দিকে ইশারা করে ভেতরে ঢুকতে নিষেধ করল। তারপর গ্রামে যাওয়ার একমাত্র ধুলো-মাখা রাস্তায় সন্ধ্যার অন্ধকারে মিশে চলে গেল। বারীন আর একটা সিগারেট ধরিয়ে হেডলাইটে একটা লাথি মারল। জীবনটাই তার থমকে দাঁড়িয়ে গেছে যেন। চারদিকে মিশমিশে অন্ধকার। অফিসে প্রমোশন নেই, প্রেমটাও দমকা হাওয়ায় উড়ে গেছে। একটা আলোর রেখাও যদি থাকত জীবনে, তো...
অকস্মাৎ জঙ্গলের ভেতর থেকে কালো রঙের মালকোচা দিয়ে পড়া ধুতি আর গলায় উত্তরীয় জড়ানো, শ্বেতশুভ্র শ্মশ্রু-জটাধারী এক ব্যক্তিকে লন্ঠন হাতে বেরোতে দেখে সে চমকে সিগারেটটা হাত থেকে ফেলে দিল। বিশালাকায় সেই ব্যক্তিকে লন্ঠনের নিভু নিভু আলোয় আর সন্ধ্যার হালকা আঁধারে প্রাচীন যুগের মুনিবর ন্যায় মনে হলেও, তার চোখের স্থির হিমশীতল দৃষ্টির রহস্যময়তা যেন সম্মোহনী নাগিনীর কথা মনে করিয়ে দেয়। "সন্ন্যাসীকে আবার কিসের লজ্জা বাবা? আমরা তো শিবের বরপুত্র। তার প্রসাদ না পেলে যে পুজো অধরা থেকে যায়।"
বারীন জিজ্ঞেস করল, "আপনি এখানে একা থাকেন?" সন্ন্যাসী ঘাড় নাড়লেন। বারীন বলল, "কিন্তু আপনার ভয় লাগে না? সবাই তো দেখি সন্ধ্যের পর এদিকে ঘেঁষেই না। আমাকে একজন বারবার চলে যেতে বলছিল।"
বারীন একটু ইতস্তত করে কথাটা পারল, "আসলে গাড়িটা খারাপ..." বারীনের কথা শেষ না হতেই সাধুবাবা চোখ দিয়ে ইশারা করে তাকে সঙ্গে যেতে বললেন। বারীনের মনে হল তার সমস্ত মনখারাপ উবে গিয়ে যেন একটা অদ্ভুত আনন্দে মন উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। বারীন বড় আশ্চর্য হল। সকাল থেকে তার পা ভারী হয়ে আসছিল, সারা শরীর যেন অদৃশ্য পাথর দিয়ে বেঁধে রাখা — চলতে গেলে হুমড়ি খেয়ে পড়তে হয়। আচ্ছা, দুঃখ কি মস্তিষ্কের কোষগুলোকে স্থবির করে দেয়? তাই বুঝি নার্ভগুলো অকেজো হয়ে নিস্তেজ করে দেয় শক্তসমর্থ মানুষকেও। কিন্তু এখন এই হঠাৎ করে খুশি হওয়ার কারণ বারীন কিছুতেই খুঁজে পেল না।
কিছুদূর গিয়ে সাধুবাবা থমকে দাঁড়ালেন। বারীন একটা গাছের শেকড়ে হোঁচট খেয়ে তার গায়ের ওপর গিয়ে পড়ল। বারীন সরি বলার জন্য মুখ খুলতেই তার দৃষ্টি সাধুবাবার পিঠের চামড়ার ওপর গিয়ে পড়ল। একটা বিদ্যুৎরেখা তার শিরদাঁড়া বেয়ে খেলে গেল — মানুষের নয়, সেটা সরীসৃপের ন্যায় শক্ত, শুষ্ক, আঁশযুক্ত ত্বক। বারীনের মুখ থেকে অজান্তেই একটা ক্ষীণ, ভয়ার্ত আর্তনাদ বেরিয়ে গেল। বারীন সাধুবাবা ঘুরে তাকানোর আগেই প্রাণপণে যে রাস্তা ধরে এসেছে, সেই রাস্তার দিকে দৌড় লাগাল। প্রায় কুড়ি মিনিট গাছ-ঝোপঝাড়ের আঁচড় খেয়ে বারীন একটা ফাঁকা জায়গামতো এসে চারপাশে তাকিয়ে দেখল — সেই অশরীরী অজ্ঞাত ব্যক্তি পিছু ধাওয়া করে এসেছে কি না। কোনো আওয়াজ না পেয়ে সে ক্লান্ত শরীরে একটা কুসুম গাছের তলায় বসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। বারীনের মনে এই আতঙ্কের মধ্যেও সেই খুশির রেশ যায়নি — যেন তার এই শিকার ও শিকারির খেলায় মজা লাগছে। সেই সাধুবাবা আসলে কে? মানুষ তো নয়, কিন্তু জন্তু-ও তো নয়।
বারীন গাছে হেলান দিয়ে হাতের ঘড়ির কাঁটায় চোখ রাখল। সময় সাতটা, কিন্তু এখানে অন্ধকার এখনো গাঢ় হয়ে নামেনি কেন? যেন এখানে সন্ধেবেলাটা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। কুয়াশাচ্ছন্ন আলো-আঁধারিতে বারীন সামনে চেয়ে দেখে — একটা বিশাল শাল গাছের পত্রহীন শুকনো ডালের আগায় ভিড় করে একদল কাক বসে অশুভ দূতের মতো কর্কশ সুরে কাকে ডাকছে। গাছটি জীবন্ত ছায়ার মতো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে বারীনকে। মনকে শক্ত করে বারীন গাছে থাকা কাকেদের সংখ্যা গুনতে শুরু করল। আশ্চর্য ব্যাপার — দশ বার গোনার পরেও ম্যাথমেটিক্সের গোল্ড মেডেলিস্ট ছাত্র বারবার সংখ্যা গুলিয়ে ফেলছে। চারপাশে পাতা-ঝরা গাছ আর থমথমে নীরবতা। হিমেল বাতাসের সঙ্গে কারো যেন অদৃশ্য শ্বাস-প্রশ্বাস মিশে আছে।
বারীন আবার চারদিকটা ভালো করে তাকিয়ে দেখল, কিন্তু সবদিক যেন বনানী দিয়ে ঘেরা — বেরোবার কোনো রাস্তা নেই। বারীনের মনে হল, সে কী জন্য এসেছে এখানে — আর মনে পড়ছে না। ইচ্ছে করছে এখানে সারাজীবন সে কাকেদের সংখ্যা গুনে কাটিয়ে দিতে পারে। এমন সময় বারীনের ফোন বেজে উঠল। সারাদিন নেটওয়ার্ক পায়নি, এখন হঠাৎ কী করে ফোন এল বারীন জানে না, কিন্তু রিং হওয়ার আওয়াজে তার যেন সম্বিৎ ফিরে এল। ওপারে মা চিৎকার করে বলছে, "বাবু! পালিয়ে যা। কোথাও দাঁড়াস না। পেছনে দেখবি না।"
বারীনের মাথা গুলিয়ে গেল। মা আজ পাঁচ বছর হল ইহলোক ত্যাগ করে চলে গেছে। মায়ের মৃত্যুর সময় কাজের চাপে হাসপাতালে উপস্থিত থাকতে পারেনি বলে বারীনের আজ বুকের ভেতরটা চিনচিন করে ওঠে। বারীন তবু ফুঁপিয়ে উঠে বলল, "আমাকে ক্ষমা করে দিও মা।" ওপারের মায়ামাখা পরিচিত স্বর তখন অট্টহাসি হেসে বলল, "একবার এসে পড়েছিস, এবার আর বেরোনোর রাস্তা নে।" বারীন আর্তনাদ করে বলে উঠল, "আমি কেন?" ওপারের কণ্ঠ জবাব দিল, "তোর মনে আঁধার এত গাঢ় যে সেখানে আলো ঢোকার জায়গা নেই। জীবনকে নিজে হাতে শেষ করতে পারিসনি ঠিকই, তবে মন তোর বিষিয়ে গেছে। কেউ নেই তোর। আমাদের কাছে থেকে যা — দেখবি আর কোনো কষ্ট নে। তোর মনের আঁধারই আমাদের তোর কাছে টেনে এনেছে।"
ফোন কেটে যেতেই বারীন চিৎকার করে জ্ঞান হারাল। কতক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরল বারীন জানে না। কাকের দল আগের মতোই অবিচল। এই সময় একটা তীব্র বাতাসের ঝাপ্টা এসে তার গায়ে লাগল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে তার নাম ধরে কে ডেকে উঠল দূর থেকে — একটা ফিসফিসে কণ্ঠস্বর। বারীন চারদিকে তাকাল — কেউ নেই। উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে আবার সেই ভারী শরীর অনুভূত হল তার। বারীন দেখল কাকেরা আর চেঁচাচ্ছে না। থমথমে ভিড়ে বসে তারা স্তব্ধ হয়ে সমবেতভাবে যেন বারীনের চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। বারীনের মনে হল, এতক্ষণ কাকেরা কি তাকে সতর্ক করছিল, না উপহাস? আবার তার ভেতর সেই অজানা খুশির মেজাজ চাগাড় দিচ্ছে। বারীন জোরে জোরে নিজের গালে দুটো চড় মারল। বারীনের মনে হল সে কোনো এক প্রাচীন নিয়ম ভেঙে ফেলেছে — তার হৃৎস্পন্দন বেড়েই চলেছে, পা মাটিতে আটকে আছে। বারীন সর্বশক্তি একত্রিত করে উঠে দাঁড়াল। ঠান্ডা বাতাস তার কানে কিছু বলতে লাগল — সেই ভাষা মানুষ বোঝে না। বারীন মনে মনে বলল — সে আজ যদি এই গোলকধাঁধা থেকে বেরোতে পারে, তবে আর কখনো ঘুমের ওষুধ হাতে বসে থাকবে না, একা চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে আটকে রাখবে না। বারীনের মনে হল সে ওই সন্ন্যাসীকে দূরের গাছগাছালির ফাঁকে লন্ঠন হাতে এগিয়ে আসতে দেখছে। সে উর্ধশ্বাসে দৌড় দিল। তার মনে হল তাকে পেছন থেকে কিছু একটা টেনে ধরেছে, কিন্তু বারীন দাঁতে দাঁত চেপে সামনের দিকে দৌড়োতে থাকল।
পরদিন বারীনকে বনের প্রান্তে রক্তাক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছিল। সে বারবার দাঁড়কাকের দল আর কোনো এক সাধুবাবার কথা বলে যাচ্ছিল। গ্রামের মোড়লের কথায় ওই গ্রামে নাকি এক লোককথা প্রচলিত আছে। অনেককাল আগে দেবতারা এক ঋষিকে পাতালে নির্বাসন করেছিল, কারণ সে মানুষের আত্মাকে কব্জা করে তার শরীরকে আবেগহীন কাঠপুতুল বানিয়ে ছেড়ে দিত। কিন্তু সেই ঋষি নিজের যোগবলে এই বনের গভীরে নিজেকে আড়াল করে এক নিজস্ব দুনিয়া বানিয়ে রেখেছে। যে কারণে অন্য সব জায়গায় বন কেটে সাফ হয়ে গেলেও এদিকের বন যেন নিজের আয়তন বাড়িয়ে চলেছে — প্রতিটি আত্মা সেই বনের এক একটি গাছের ইতিহাস। আর ওই দাঁড়কাকের দল এই ইহলোক আর পরলোকের মাঝে কাণ্ডারী হয়ে দাঁড়িয়ে পথভোলা পথিকদের ঘরে ফেরার কথা মনে করানোর চেষ্টা করে। বারীন হাসপাতালে চোখ খুলতে দেখে — কোনো এক অজানা আতঙ্ক তার চোখের মণি স্থির করে দিয়েছে। কথা জড়িয়ে এসেছে। এই বারীন যেন আর সেই বারীন নেই, যে আগের বছর জঙ্গলে হাইকিং করতে গেছিল। এদিকে শোনা যায়, ওই জঙ্গলের প্রান্তরে নাকি আর একটা নতুন গাছ বিশাল আকার হয়ে গজিয়েছে, যার কাণ্ডের আকারটা অনেকটা পাঁচ ফুট আট ইঞ্চির অনুদেহী বারীনের অবয়বের মতো।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।