যে আন্দামান সকলের চোখে স্বপ্নের অথবা রূপকথার, প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো সেই আন্দামানে মানুষ বিপর্যয়ের মধ্যে। বর্তমানে বাঙালিরা সেখানে কী পর্যায়ে বসবাস করছেন? অভিজ্ঞতা লব্ধ হয়ে "মুক্তির মন্দির সোপান তলে"-র স্রষ্টা মোহিনী চৌধুরীর পুত্র দ্বিগবিজয় চৌধুরী স্বয়ং শিহরিত হয়েছিলেন। কোনো কল্পনা নয়, একেবারে প্রত্যক্ষ বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে সেই সব অবহেলার চিত্র তুলে ধরা হলো। উদ্দেশ্য একটাই — বাংলাকে ভালোবেসে, বাংলা ভাষার জন্য একটু মরমিয়া দৃষ্টিভঙ্গি প্রার্থনা।
আজ থেকে প্রায় দুই যুগ আগে কলকাতায় একটি "সহমর্মী" প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় — "বিভিন্ন রাজ্যে বাংলা সহ মাতৃভাষায় পড়ার অধিকার" বিষয়ে। তারিখটি ছিল ২০.১২.২০০২। আয়োজক সংস্থা ছিল — বাংলার বাইরে বাঙালি সহায়ক সমিতি। সেই সভায় আন্দামানের বাংলা-বঞ্চিত মানুষজনের কিছু কথা ভাবা হয়েছিল। যাতে — (ক) N.C.E.R.T.-এর বই বাংলায় অনুবাদ, (খ) আন্দামানের বাংলা মাধ্যমের জন্য বাংলায় বই প্রকাশ ও সরবরাহের ব্যবস্থা, (গ) কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে ভারতের ২য় প্রধান ভাষা বাংলা মাধ্যমে পড়ার সুযোগ তৈরির জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ — এসব ছিল মূল আলোচ্য বিষয়। মিত্র-ঘোষ প্রকাশনার কর্ণধার সবিতেন্দ্র নাথ রায় বাংলার বাইরে বাংলা ভাষাভাষী ছাত্র-ছাত্রীদের মাতৃভাষায় পড়ার অধিকার আদায়ে সকলকে সোচ্চার হতে বলেন। সভাপতি ড. পবিত্র সরকার অন্যান্য রাজ্যে বাংলা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট নির্দেশ করে ওই সব রাজ্যের বাঙালি পড়ুয়াদের প. বঙ্গের লেখকদের বই পড়ানো বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান। অধ্যাপিকা এষা দে — ওড়িশা, বিহার ও আন্দামানে বাংলা সংখ্যালঘু হয়ে পড়ার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেন। আমরা তখন আশাবাদী হয়েছিলাম।
এরপর নদী থেকে সাগরে পড়েছে অনেক দূষিত জল। ২০০৪-এর ভয়ংকর সুনামি অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। আমরা অনেক কিছু হারিয়েছি। সঙ্গে সঙ্গে বাংলা পাঠ্যপুস্তকের ভাবনাও কি আরও দুর্বল হয়েছে এখানে? বাংলা স্কুলগুলোর অবস্থা টিমটিম করছে। আজকের দিনের হিসেব বলছে, চার-চারটি বাংলা মাধ্যম উচ্চতর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানোর কেউ নেই। পড়াচ্ছেন উপযুক্ত ভাষা-সাহিত্যে পারদর্শী নন এমন শিক্ষকরা। বাংলা সংস্কৃতি খুবই ম্রিয়মাণ। অনেক আগে আকাশবাণী পোর্টব্লেয়ারে মৌলিক বাংলা অনুষ্ঠান হত, কিন্তু মাঝখানে রেকর্ডিং ছাড়া কিছুই চলত না। যদিও সম্প্রতি আবারও কিছু মৌলিক অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। দূরদর্শনেও বাংলা অনুষ্ঠান প্রায় হয়ই না বললেই চলে। বলার মতো কেউ নেই। পত্রপত্রিকা যেগুলো চলে, তাদের বেশির ভাগের দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে তাঁরা মনে করেন — তাঁদের মতো পণ্ডিত আর দুটো নেই।
রাজধানী পোর্টব্লেয়ার থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরে উত্তর আন্দামানের ডিগলিপুরে শারদীয় পুজো বলুন আর সাংস্কৃতিক কোনো অনুষ্ঠান বলুন — বাঙালিদের কিছুটা রমরমা আছে। অন্তত হৈ-চৈ করে দুর্গাপুজোর সময় কিছু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, যাত্রা-নাটক হয়ে থাকে। নীল দ্বীপে বিবেকানন্দ মেলা, হ্যাভলক দ্বীপে ও মধ্য-আন্দামানের বকুলতলায় সুভাষ মেলা কিছুটা স্বাতন্ত্র্যের দাবি রাখে। আর লিটল আন্দামানের কিছু বাঙালি আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে অন্যান্য এলাকার যেন যোগই নেই। আর রাজধানীতে বাংলা অনুষ্ঠান? নেহাতই ঘরোয়া ভাবে দু-একটি সংস্থার পক্ষ থেকে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন ইত্যাদি ছাড়া সর্বসাধারণকে নিয়ে কোনো বাংলা অনুষ্ঠান দেখাই যায় না। আর সংস্থাগুলোও সকলকে ডেকে মিলেমিশে একসঙ্গে কোনো অনুষ্ঠান করার মতো খোলা মানসিকতা দেখাতেই পারে না। যেসব বাঙালি সংগঠন আছে, তারা বনগাঁয় শিয়াল রাজা সেজে বসে থাকে — নতুনদের জন্য তাদের দরজা বন্ধ। প্রায় চোখেই পড়ে না। যদি-ও চোখে পড়ে, সেই অনুষ্ঠানে আপনার-আমার অংশগ্রহণের অধিকার সীমায়িত। খড়ির গণ্ডি কেটে রেখে উদ্যোক্তারা নিজেদের সুরক্ষা দেন। নতুন লোককে সে গণ্ডিতে ঢুকিয়ে তাঁর প্রতিভা সর্বসমক্ষে তুলে ধরে বিপদ বাড়ানোর কী দরকার!
কিন্তু অন্যান্য উদ্যোগ? কীভাবে তাঁকে সম্মান প্রদর্শনের চেষ্টা হয়েছে, সেটা আপনিই একটু ভেবে দেখুন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে ধিক্কার জানিয়ে, ইংরেজদের গোলামির প্রতিবাদ জানিয়ে ১৯৪৩-এর ৩০শে ডিসেম্বর নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু আন্দামান-নিকোবরের পোর্টব্লেয়ারের জিমখানা গ্রাউন্ডে (বর্তমান নেতাজি স্টেডিয়ামের উল্টোদিকে নেতাজি ক্লাবের স্থানে) প্রথম স্বাধীন ভারতের তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করে সমগ্র জাতির সমীহ আদায় করে নিয়েছিলেন। তাঁর একান্ত বাসনা ছিল এই আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের নতুন নামকরণ করবেন যথাক্রমে "শহীদ দ্বীপ" এবং "স্বরাজ দ্বীপ" হিসেবে।
এত বছর বাদে হলেও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে সেই উদ্যোগ নিয়ে ২০১৮-এর ৩০শে ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদী আন্দামানে এলেন জনগণের দীর্ঘদিনের একটি অপূর্ণ আশার পরিপূরণের জন্য। কিন্তু জটিল রাজনীতির দাবার চাল অনিবার্য কারণে পাল্টে গেল, শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হল না। পোর্ট ব্লেয়ারের অনতিদূরের নীল দ্বীপের নাম বদলে হয়ে গেল "শহীদ দ্বীপ" আর হ্যাভলক হল "স্বরাজ দ্বীপ"। নীল ও হ্যাভলক দ্বীপের সঙ্গে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ভাবনার সেই অর্থে কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল না। তাহলে? নীল আর হ্যাভলক কেন হল শহীদ আর স্বরাজ দ্বীপ? কারণ অজানা। মন্দ লোকেরা মন্দ কথা বলে থাকেন। কারও কারও মনে প্রশ্ন জাগে — "কিন্তু নেতাজির ইচ্ছেটা? সেটার কী হল?" — "চুপ! চুপ!" মুখে আঙুল দিয়ে থামতে ইশারা করেন কেউ। যদিও পাশ থেকে হাতছানি দিতে থাকা ব্রিটিশ যুগের রাজধানী সেই ঐতিহাসিক রসদ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্রের নামে। কিন্তু সেটা এখনও অনেকের কাছেই অজানা।
কারও কারও মতে, নাকি বাঙালিদের এতটা গৌরবের অধিকারী করা বাঞ্ছনীয় নয় ভেবে শেষ পর্যন্ত বাঙালি দেশনায়কের ভাবনা অনুযায়ী আন্দামান আর নিকোবরের নামবদল করা হয়নি ইচ্ছাকৃতভাবে। সে সব বাজে রাজনীতির কথা চুলোয় যাক। নেতাজির কপাল ভাল — সরকারি প্রেসের পাশের সমুদ্রতীরবর্তী স্থানে অবশেষে কিছুটা জায়গা পেয়েছেন। অনেক সাজানো-গোছানো হয়েওছে। রাতদিন উত্তোলিত ১৫০ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট ভারতের জাতীয় পতাকা শোভিত ১৯৪৩-এর সেই স্মৃতিচারণার স্থান হিসেবে জায়গাটিকে দেখে অন্তত কেউ হাততালি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। সমুদ্রপারের ওই মনোরম স্থানে এখন নিয়মিত পর্যটক আর স্থানীয় মানুষদের ভিড় আর সেলফি তোলার ধুম দেখে অদৃশ্য স্বর্গলোক থেকে মহামহিম নেতাজির আত্মা কি জানি, হয়তো কিছুটা আত্মশ্লাঘা বোধ করেন নাকি!
তবে কয়েক বছর আগে থেকে আন্দামানের বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে অনেক দিনের একটি চাপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। হয়তো আন্দামানের দৈনিক ইংরেজি সংবাদপত্র — আন্দামান শিখা — পড়ে অনেকে জেনে গেছেন যে নন-সেটলার বাঙালিদের আন্দামান থেকে বিতাড়নের চেষ্টা চলছে বলে সম্প্রতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ উঠেছে। আন্দামানের ৬৪% মানুষ বাঙালি। ক্রমশ এদের সংখ্যাধিক্য ঘটছে। এভাবে চললে বাঙালি আধিপত্য বেড়ে যাবে, তাই তার দাওয়াই হিসেবে লোকাল বর্ন অ্যাসোসিয়েশন গত বছর ৬ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ আন্দামান বন্ধের ডাক দেয়। আন্দামানের বাঙালিদের আসামের বাঙালিদের মতো বিতাড়নের ব্যবস্থা করাই ছিল বন্ধের উদ্দেশ্য। সেদিন সাংসদ শ্রী বিষ্ণুপদ রায় প্রকাশ্যে বাঙালিদের পক্ষ নেওয়ায় তাঁকে প্রচুর লাঞ্ছিত হতে হয়। অবস্থা বিরূপ হওয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বাঙালিরা আবার জয়েন্ট অ্যাকশন কমিটির পক্ষ থেকে ৭ই অক্টোবর, ২০১৮ বন্ধ ডাকে। সেদিন পোর্টব্লেয়ার অচল হওয়ার ফল খারাপ হয় অনেক।
২১শে এপ্রিল ২০১৯, দক্ষিণ আন্দামানের ডলিগঞ্জের দুজন বাঙালি শ্রমিক — জগন্নাথ এবং বৃদ্ধ শরৎ — কাজে যাওয়ার পথে প্রি-ফরটি টু গোষ্ঠীর দুজন ব্যক্তি আবদুল্লাহ কুট্টি এবং নবীনের কাছে অন্যায়ভাবে আক্রান্ত হন। প্রথমোক্ত ব্যক্তিদের কাছে দ্বিতীয়োক্ত ব্যক্তিরা পরিচয়পত্র দেখতে চেয়ে ঝামেলা করেন। ভাবখানা এমনই যেন তারাই আন্দামানের হর্তা-কর্তা-বিধাতা, তারাই যেন এখানকার লেফটেন্যান্ট গভর্নর! পরিচয়পত্র দেখাতে না পেরে বুকে-পিঠে লাথি খেয়ে বৃদ্ধ শরৎ খুবই আহত হন, আর জগন্নাথ কাঠের ডান্ডার আঘাতে মরণাপন্ন হন। অপরাধীদের প্রথমে গ্রেপ্তার করা হলেও পরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তবে বাংলা ও বাঙালিদের অবস্থার ভাল-মন্দের কথা বলতে গিয়ে শুধু মন্দ নয়, ভাল একটি কথা বলাও খুব দরকারি। সেই কবে থেকে তো বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যপুস্তক নিয়ে প্রচুর অসুবিধা। আন্দামানে শিক্ষার প্রথম অবস্থা থেকে বাংলা মাধ্যমের ছাত্র-ছাত্রীরা যে সমস্ত পাঠ্যপুস্তক ব্যবহার করতে বাধ্য হত, তা সি.বি.এস.ই.-র ইংরেজি অথবা হিন্দি মাধ্যমের। বাংলা মাধ্যমের জন্য বই ছিল না। কখনও কখনও প. বাংলা থেকে সেখানকার পাঠ্যবই আনা হয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে সি.বি.এস.ই.-র পাঠ্যসূচির অমিল ঘটে যাওয়ার ফলে ছাত্র-ছাত্রীরা দিশাহীন হয়ে যায়। ফলে শিক্ষকের দেওয়া নোটসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে শিক্ষার্থীরা। এতে মাঝে মাঝে যে সব অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানার মুখোমুখি হতে হয়, সে সব না বলাই বাঞ্ছনীয়।
এর আগেও দু-একবার পাঠ্যবই বাংলায় রচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল অথবা বাংলায় অনুবাদের ক্ষীণ চেষ্টা হয়নি তা নয়, তবে অনেক অর্থই জলে গেছে, কিন্তু সবটাই ব্যর্থ প্রচেষ্টায় পর্যবসিত হয়েছে। এ ব্যাপারে একটি স্মরণীয় উদ্যোগ হল ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে আন্দামান-নিকোবরের সরকারি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক স্তরে বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রচলন হওয়া।
তৎকালীন শিক্ষাসচিব আই.এ.এস. তানভি গর্গ পাঠ্যপুস্তকের মুখবন্ধে লিখেছেন — "For the current academic session 2016-17, the Ministry of Human Resource Development, Government of India in its Project Approval Board for A & N Islands has approved the proposal to develop textbooks for elementary classes of these Islands in regional languages under the intervention ‘Learning Enhancement Programme’. Accordingly, SSA, UT Mission Authority, A & N Islands has made admirable efforts to translate and develop textbooks of elementary classes in Bangla language."
তারই ফলশ্রুতিতে আন্দামান-নিকোবর প্রশাসনের শিক্ষাবিভাগের বদান্যতায়, সর্বশিক্ষা মিশনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও অর্থানুকূল্যে প্রায় ষোল লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা মাধ্যমের ইংরেজি ভাষার পাঠ্যপুস্তক ছাড়া বাকি সমস্ত পাঠ্যপুস্তক বাংলা ভাষায় অনুদিত হওয়াটা সত্যিই অভূতপূর্ব ঘটনা। রাজ্য প্রকল্প আধিকারিক ড. ব্রীজমোহন ভাটের দৃষ্টান্তমূলক কর্মপ্রবণতাকে তাঁর অবসর গ্রহণের পর খুব সার্থকভাবে রূপায়িত করেছেন পরবর্তী প্রকল্প আধিকারিক রবীন্দ্র কুমার সিং।
তানভি গর্গ আরও লিখেছেন — "In my opinion, it is an unprecedented initiative taken by SSA, UT Mission Authority, A & N Islands to fulfil their lingual gaps and enhance the quality of education at elementary level of Bengali Medium students."
শিক্ষাসচিব জানিয়েছেন — "I appreciate the hard work done by the team led by State Project Officer, SSA, UT Mission Authority, A & N Islands. I would like to congratulate those teachers who have contributed their valuable efforts for translation and development of these NCERT textbooks in Bangla language."
আমি স্বয়ং গর্বিত — Dr. B. M. Bhatt-এর ঐকান্তিক ইচ্ছায় অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা কাটানোর পরেও এই Translation & Development Committee of NCERT Textbook in Bangla-র সংযোজক হিসেবে নিজেকে যুক্ত করতে পেরে এবং যুগ্মভাবে সংযোজক-অনুবাদক হিসেবে এই বিরাট কর্মতৎপরতার সফল রূপায়নের সাফল্যে। কমিটিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত সকলের কল্যাণস্পর্শেই এই পরিকল্পনার স্বপ্ন বাস্তব হয়। তবে কম্পিউটার যার হাতে জাদু দেখায়, মালয়ালম ভাষাভাষী হয়েও সেই বন্ধু কে. এস. প্রদীপের অনন্য কারিগরি সহায়তা ছাড়া এই রূপায়ন বাস্তবিক অর্থেই অধরা থেকে যেত। খুশির খবর (এক) — এই সব অনুদিত বই বাংলা মাধ্যম স্কুলে বিতরণের পর একদিকে গুণমান, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অপূর্ণ প্রত্যাশা পূরণ — এই দুইয়ে মিলে জনমানসে খুশির লহর বয়ে যায়। এবং (দুই) — কর্মসফলতার স্বীকৃতিস্বরূপ আমাদের কমিটির প্রতিটি সদস্যকে আন্দামান-নিকোবরের সর্বোচ্চ সম্মান মাননীয় উপ-রাজ্যপালের প্রশস্তিপত্রে ভূষিত করা হয়।
ভাল-মন্দে এভাবে বিচার করলে আন্দামানের বাঙালিদের জন্য সত্যিই কি আশার খবর অনেক বেশি? সন্দেহ জাগে মনে। লিখতে লিখতে মনে পড়ল, নিরাশার খবর আরও আছে। সেটা ঐতিহাসিক সেলুলার জেলকেন্দ্রিক। কদিন আগেই ঐকতান গবেষণা পত্রিকার সম্পাদক, বাংলা ও বাঙালি গবেষক প্রাক্তন অধ্যাপক শ্রী নীতিশ বিশ্বাস কোনো পত্রিকায় লিখেছেন — "আসলে কংগ্রেস, হিন্দু মহাসভা (বর্তমান বি. জে. পি.) সকলেই বাঙালি বিরোধী। তা আসাম সহ সারা ভারতে বাঙালি উদ্বাস্তুদের প্রতি তাঁদের বিমাতৃসুলভ আচরণের মধ্যে দিয়ে সহজেই বোঝা যায়। আর বি. জে. পি. তো সরাসরি বাঙালি বিরোধী (হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান পন্থী) দল। তাই কেবল মোদীজিই নন, ভূতপূর্ব বি. জে. পি. প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীজির আমলে আন্দামান সেলুলার জেলের যে আলো ও ধ্বনি প্রকল্প চালু হয়, সেখানে এই জেলের ৭০% বাঙালি দেশপ্রেমী ও শহিদদের যোগ্য মর্যাদা দেওয়া যে হয়নি, তা যে কোনো দর্শকই সহজেই বুঝতে পারবেন।"
বলার যোগ্য কারণ নিশ্চয়ই আছে। বিশিষ্ট জনের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। আচ্ছা, "মুক্তির মন্দির সোপানতলে, কত প্রাণ হল বলিদান / লেখা আছে অশ্রুজলে" — গানটার কথা কার মনে নেই? সর্বজনশ্রদ্ধেয় শ্রী মোহিনী চৌধুরীর লেখা অসম্ভব জনপ্রিয় দেশাত্মবোধক এই গানটি শুনলে তো এখনও আমাদের লোমকূপে শিহরণ জাগে! ১৯৮২-৮৩ সালে জাহাজে চড়ে আন্দামান দর্শনে এসেছিলেন সেই মোহিনী চৌধুরীর কন্যা মিতালী সেন (চৌধুরী) সহ আরও অনেকে। ঐতিহাসিক সেলুলার জেলের অভ্যন্তরে পা রেখেই চমকে উঠেছিলেন! ঢুকেই বাঁ দিকে ছবিতে নেতাজির প্রসিদ্ধ "দিল্লি চলো"-র ভঙ্গিমা আর দু-পা এগিয়ে যেখানে স্বাধীনতার সৈনিকদের স্মরণে রয়েছে শহিদস্তম্ভ। তার নীচের দেওয়ালে লেখা মোহিনী চৌধুরীর সেই বিখ্যাত গান — "মুক্তির মন্দির সোপানতলে..."। আহা হা! কী দুর্লভ অভিজ্ঞতা! খুশিতে, শ্রদ্ধায় আর অহঙ্কারের মিশ্রণে মোহিনী চৌধুরীর কন্যা হিসেবে সেদিন মাটিতে পা পড়ছিল না যেন! শুনেছিলেন, সেই সময়ের বিখ্যাত বাঙালি ক্লাব (আসলে অতুল স্মৃতি সমিতি) এবং আরও বিশিষ্ট বাঙালিদের ঐকান্তিক ইচ্ছায় সরকারি বদান্যতায় এটি গড়ে উঠেছে।
মোহিনী চৌধুরীর সুযোগ্য পুত্র, লেখক, সাংবাদিক, সরকারি চাকুরে দিগ্বিজয় চৌধুরী সে গল্প শুনেছিলেন শুধু দিদি মিতালীর মুখেই নয়, আরও কতজন সে গল্প করেছিলেন আন্দামান থেকে ফিরে গিয়ে। ২০০৪ সালের পর স্বচক্ষে সেই অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের অদম্য আগ্রহ নিয়ে ছুটে এসেছিলেন। কিন্তু কোথায় কী? সে রামও নেই আর সে অযোধ্যাও নেই! ব্যাপার কী? নেতাজির "দিল্লি চলো"-র ছবি, বাবার লেখা সেই গান — কোথায় সে সব? দিদি কি তাকে এভাবে মিথ্যে কথা বলে বংশমর্যাদার অহংকারে অহংকারী করেছে? তাহলে বাকি মানুষজন? তারাও এভাবে মিথ্যে বলল?
চোখ যখন চারিদিকে সেসব স্মৃতির নিদর্শন খুঁজে বেড়াচ্ছে, ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তখন কেউ জানালেন — নেই, নেই, সেসব আর নেই। ভয়ংকর সুনামি এসে সব ধুয়ে-মুছে নিয়ে চলে গেছে! বিস্ময়ে গালে হাত রাখলেন দিগ্বিজয়বাবু। খোঁজ নিয়ে জানলেন — অবাস্তব ব্যাপার! সেলুলার জেলে সুনামি এলে পোর্ট ব্লেয়ারে তো কিছুই থাকত না! তখনই পাশ থেকে কেউ ফিসফিস করে বললেন — "স্যার, কিছু মনে করবেন না, এটা হিন্দি ভাষীদের চক্রান্ত! ওরা বুঝিয়েছিল বাংলা ভাষায় কী যা-তা লেখা, যা কেউ বুঝবে না। ফালতু সেসব রেখে কী লাভ বলুন তো?" চোখের কোণটা চিকচিক করে উঠেছিল। হতভম্বের মতো দিগ্বিজয়বাবুর চোখ চারিদিকে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আনমনা হয়ে তিনি গুনগুন করে বলে উঠলেন — "বটেই তো, বটেই তো! কী যা-তা লেখা...!"
তবু কারও কারও মতে এখানে মানুষে-মানুষে কোনো ভেদ নেই, খুবই সদ্ভাব সমস্ত জাত, ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে। সন্দেহ নেই, সেটা অতীতে ছিল। কিন্তু আমরা শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি — সবকিছুকে অন্তত কিছুটা ছুঁয়ে দেখাতে চেষ্টা করলাম আন্দামানের বর্তমান চেহারাটা। ব্যাপারটা সত্যিই যে এখন অশনি-সংকেত এসে মাঝেমাঝেই মাথাচাড়া দিচ্ছে। আন্দামানের সবুজ-শ্যামল মাটিতে মাঝে-মাঝেই রক্তচিহ্ন দিয়ে উত্তেজনার আগুন ছড়াতে চাইছে। আমাদের সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় ভেবে দেখা দরকার "মিনি ইন্ডিয়া"-র সেই পরিচিত ছবিটা আবার কীভাবে সমস্ত ভারতবাসীর কাছে মেলে ধরা যায়। আমরা আশাবাদী সুদিনের অপেক্ষায়। নতুন দিনের সূর্য নিশ্চয় আমাদের আশার আলো দেখাবেই দেখাবে।
লেখক স্বাধীনতা সংগ্রামী খলিলুর রহমান ও সেতারা বেগমের পুত্র, পূর্ব বর্ধমানের টোলা গ্রামে জন্ম। বাংলা ও শিক্ষা তত্বে স্নাতকোত্তর এবং বি.এড ডিগ্রিধারী এই শিক্ষাবিদ দীর্ঘদিন আন্দামানে শিক্ষা বিভাগে কর্মরত ছিলেন। শিক্ষকতা ও অনুবাদ ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদানের জন্য তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রশস্তিপত্রে সম্মানিত হন। CBSE-র ইংরেজি ও হিন্দি পাঠ্যপুস্তক বাংলায় অনুবাদের জন্যও তিনি বিশেষভাবে প্রশংসিত। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে তাঁর অটুট সম্পর্ক রয়েছে। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ১৭; তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় আকাশবাণী, দূরদর্শন ও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়।
আপনার ভোটেই নির্ধারিত হবে ‘মাসের সেরা কলম’
এখনই আপনার পছন্দ বেছে নিন
বিস্তারিত নিয়ম
একজন পাঠক একটি সংখ্যায় সর্বোচ্চ ৫টি ভিন্ন কলম প্রতিক্রিয়া দিতে পারবেন — অর্থাৎ প্রতিটি প্রতিক্রিয়া একবার করে দেওয়া যাবে। একই মাসে একই প্রতিক্রিয়া ভিন্ন কোনো লেখায় নতুন করে নির্বাচন করলে, আগেরটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে এবং সর্বশেষ নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াটিই গণ্য হবে। অর্থাৎ, পাঠক প্রতিটি প্রতিক্রিয়া বিভাগে একটি করে লেখা নির্বাচন করতে পারবেন। এই প্রতিক্রিয়াগুলির ভিত্তিতেই নির্বাচিত হবেন ‘মাসের সেরা কলম’ সম্মানের ‘পাঠকের প্রতিক্রিয়া’ বিভাগে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক–লেখিকারা।